বিশ্বকাপের সময় ভয়ংকর জঙ্গি হামলার ছক! আর্জেন্টিনা-জর্ডন ম্যাচকে নিশানা করে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে লিয়োনেল মেসি-সহ গোটা আর্জেন্টিনা দলকে হত্যার পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে কোটি কোটি দর্শকের চোখ তখন লিয়োনেল মেসির দিকে। মাঠে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ ধরে রাখার লড়াই চালাচ্ছেন তিনি। কিন্তু স্টেডিয়ামের আলো, দর্শকদের উন্মাদনা এবং ফুটবলের উত্তেজনার আড়ালে নাকি চলছিল সম্পূর্ণ অন্য এক যুদ্ধ—নিরাপত্তার যুদ্ধ। ফাঁস হওয়া একটি পুলিশি ডসিয়ার নিয়ে প্রকাশিত একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিয়োনেল মেসিকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ হামলার হুমকি এসেছিল। শুধু মেসি নন, আর্জেন্টিনা দলের অন্য ফুটবলার, বিভিন্ন দেশের তারকা, ফিফা আধিকারিক, রেফারি এবং নিরাপত্তারক্ষীরাও নাকি একাধিক হুমকির মুখে পড়েছিলেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি সামনে এসেছে আর্জেন্টিনা ও জর্ডনের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ ঘিরে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ম্যাচের আগে এক ব্যক্তি ডালাস এলাকার বিমানবন্দরে ফোন করে ভয়াবহ হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। দাবি করা হয়, ওই ব্যক্তি আরও দুই সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে স্টেডিয়ামে ঢোকার পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁদের কাছে ঘরে তৈরি বিস্ফোরক এবং একটি AR-15 ধরনের অস্ত্র থাকার কথাও হুমকিতে বলা হয়েছিল। ফুটবলার, কর্মকর্তা এবং পুলিশের উপর হামলার কথা বলা হলেও বিশেষ ভাবে লিয়োনেল মেসির নাম উল্লেখ করা হয়েছিল বলে দাবি প্রকাশিত প্রতিবেদনের।
ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ আর্জেন্টিনা–জর্ডন ম্যাচটি সত্যিই ডালাস অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফিফার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপ জে-র সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা জর্ডনকে ৩-১ গোলে হারিয়েছিল এবং লিয়োনেল মেসিও গোল করেছিলেন। অর্থাৎ, হুমকির দাবি যে ম্যাচকে ঘিরে করা হচ্ছে, সেই ম্যাচ ও তার স্থান-কাল সম্পর্কিত তথ্য ফিফার সরকারি ম্যাচ রেকর্ডের সঙ্গে মিলে যায়।
ফাঁস হওয়া পুলিশি নথি নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টগুলির দাবি, বিশ্বকাপ চলাকালীন সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা হুমকি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লিয়োনেল মেসি। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলির একজন হওয়ায় তাঁর নিরাপত্তা এমনিতেই অত্যন্ত কঠোর থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় পরিস্থিতি নাকি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আর্জেন্টিনা দলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হয়েছিল।
আর্জেন্টিনা–জর্ডন ম্যাচের আগে পাওয়া কথিত হুমকিতে শুধু একটি সাধারণ আক্রমণের কথা বলা হয়নি। হামলাকারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি নাকি ফুটবলারদের পাশাপাশি পুলিশকেও নিশানা করার কথা বলেন। কিন্তু রিপোর্টগুলিতে বলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্যে মেসিকে হত্যা করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী পর্যায়ে আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচের আগে আরও একটি ভয়াবহ হুমকির কথা সামনে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে নিজের শরীরে চারটি বোমা বেঁধে স্টেডিয়ামে ঢুকে মেসিকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। ম্যাচ চলাকালীন আরও একজন ব্যক্তি ফোন করে স্টেডিয়ামের দর্শকাসনের আবর্জনার পাত্রে একাধিক বিস্ফোরক রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন। এরপর বম্ব স্কোয়াড এবং বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে স্টেডিয়ামে তল্লাশি চালানোর কথাও রিপোর্টে বলা হয়েছে।
স্বাভাবিক ভাবেই এই ধরনের একটি হুমকি কোনও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে সর্বোচ্চ সতর্কতায় নিয়ে যেতে পারে। হাজার হাজার দর্শক, ফুটবলার, কর্মকর্তা এবং কর্মী উপস্থিত থাকা একটি স্টেডিয়ামে কোনও সম্ভাব্য বিস্ফোরক হুমকিকে হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এই ফাঁস হওয়া ডসিয়ার নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তা হল হুমকির পরিধি। বিষয়টি শুধুমাত্র একজন ফুটবলারকে কেন্দ্র করে ছিল না বলেই দাবি করা হচ্ছে।
মেসির পাশাপাশি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর নিরাপত্তা নিয়েও নাকি উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এক ব্যক্তি রোনাল্ডো বিশ্বকাপ চলাকালীন কোথায় থাকছেন, তাঁর হোটেল বা থাকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত তথ্য জানার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ফিফার সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মী নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেন।
আরও একটি ঘটনায় একজন ব্যক্তি রোনাল্ডোর হোটেলের ভিতরে ঢুকে তাঁর কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে। পরে তাঁকে আটক করা হলে তিনি নাকি জানিয়েছিলেন, শুধুমাত্র রোনাল্ডোর সঙ্গে একটি ছবি তুলতেই সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম পরিচিত একজন ফুটবলারের বাসস্থানের নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করার চেষ্টা স্বাভাবিক ভাবেই নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে গুরুতর বিষয়।
এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে, বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় নিরাপত্তার ঝুঁকি শুধু সংগঠিত হামলার হুমকিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। অতিউৎসাহী সমর্থক, ব্যক্তিগত হুমকি, অনলাইন স্টকিং, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা এবং নিরাপত্তা বলয় ভাঙার ঘটনাও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফুটবল ম্যাচে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া নতুন নয়। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই বিতর্ক নাকি একাধিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ ব্যক্তিগত হুমকিতে পরিণত হয়েছিল।
প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচে কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের ব্যক্তিগত WhatsApp নম্বরে হাজার হাজার হুমকিমূলক বার্তা পৌঁছেছিল। সংখ্যা ৬ হাজারেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ম্যাচের VAR কর্মকর্তা উইলি দেলাজোদকেও মৃত্যুর হুমকি-সহ বিভিন্ন আক্রমণাত্মক বার্তা পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি।
এই ঘটনাগুলি আধুনিক ফুটবলের একটি গুরুতর সমস্যাকেও সামনে নিয়ে আসে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে কোনও খেলোয়াড় বা রেফারির ব্যক্তিগত নম্বর, ঠিকানা কিংবা অন্য তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ সেখানে পৌঁছে যেতে পারেন।
একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা বিতর্কিত মুহূর্ত নিয়ে সমালোচনা করা ফুটবলের অংশ। কিন্তু সেই সমালোচনা যখন মৃত্যুর হুমকি বা পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানোর পর্যায়ে চলে যায়, তখন তা আর খেলার আবেগের মধ্যে থাকে না—সরাসরি নিরাপত্তা এবং আইনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
ফাঁস হওয়া নথি নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টে আরও কয়েকজন ফুটবলারের নাম উঠে এসেছে। নরওয়ের স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সোরলথ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে সতীর্থকে পাস না দেওয়ার পর তিনি এবং তাঁর স্ত্রী নাকি মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন।
কলম্বিয়ার জামিন্টন কাম্পাজ পেনাল্টি নষ্ট করার পর তাঁর বিরুদ্ধেও হুমকি আসে বলে দাবি। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যে দলের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে দেশে ফেরার বিষয়েও তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
ফুটবল ইতিহাসে এমন হুমকির ভয়াবহ পরিণতির নজির রয়েছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের পর কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবারকে হত্যা করা হয়েছিল। নিজের দলের হয়ে আত্মঘাতী গোল করার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ফলে কোনও ফুটবলারকে ঘিরে মৃত্যুর হুমকি এলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি সেটিকে নিছক অনলাইন ক্ষোভ হিসেবে দেখার ঝুঁকি নিতে পারে না।
প্রকাশিত পুলিশি ডসিয়ার সম্পর্কিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপেকেও ঘিরে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের ম্যাচের পর কিছু সমর্থক এমবাপের প্রতীকী কুশপুতুল পোড়ান বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁকে লক্ষ্য করে বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্যের অভিযোগও সামনে আসে।
ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু সময়ই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়। জাতীয় দলের ম্যাচে সেই আবেগ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু কোনও খেলোয়াড়ের জাতি, গায়ের রং, ধর্ম বা ব্যক্তিগত পরিচয়কে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা খেলাধুলার সীমা সম্পূর্ণ ভাবে অতিক্রম করে।
বিশ্বকাপের সময় সাধারণ দর্শক যা দেখেন তা হল—ম্যাচ, গোল, জয়, হার, উদ্যাপন এবং ট্রফির লড়াই। কিন্তু একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে প্রতিদিন এমন অসংখ্য হুমকি বিশ্লেষণ করতে হয় যেগুলির অধিকাংশই কখনও প্রকাশ্যে আসে না।
একটি হুমকি ফোন আসার পরই প্রথম প্রশ্ন হয়—এটি কি সত্যি? কেউ কি সত্যিই হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে? নাকি কোনও ব্যক্তি ভয় দেখানোর জন্য মিথ্যা দাবি করছে?
কিন্তু উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত কোনও হুমকিকেই নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করতে পারে না।
বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় কয়েকটি বিষয় পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। প্রথমত, লক্ষাধিক আন্তর্জাতিক পর্যটক এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করেন। দ্বিতীয়ত, স্টেডিয়ামগুলিতে একসঙ্গে কয়েক দশক হাজার মানুষ উপস্থিত থাকেন। তৃতীয়ত, বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ক্রীড়াবিদদের একই সময়ে একাধিক শহরে যাতায়াত করতে হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে। ফলে তিন দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় ছিল গোটা প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।