রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। গুন্ডামি ও অশান্তির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা তাদের তিন পুরুষ মনে রাখবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আরও একবার কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কলকাতার ধর্মতলায় একটি প্রতিবাদ মিছিল ঘিরে অশান্তি, পুলিশকে আক্রমণের চেষ্টা এবং কর্তব্যরত সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ সামনে আসার পর বিধানসভা থেকে কড়া বার্তা দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহভাজন প্রায় ৭০ জনকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলিতে রাজ্যের সদ্য কার্যকর হওয়া গুন্ডাদমন আইন যুক্ত করা হয়েছে।
দোষীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা শুধু অভিযুক্তেরাই নয়, তাঁদের “তিন পুরুষ মনে রাখবে”—এই ভাষাতেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নতুন গুন্ডাদমন আইনের প্রথম প্রয়োগ হিসেবে ধর্মতলার ঘটনাকে চিহ্নিত করা হওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, ২৪ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার ধর্মতলায় আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির প্রতিবাদে বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র ও যুব সংগঠন ওই মিছিলের আয়োজন করেছিল। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত।
কিন্তু মিছিল ধর্মতলার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। পুলিশের দিকে জলের বোতল, জুতো এবং বিভিন্ন বস্তু ছোড়া হয় বলে মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় জানিয়েছেন। কর্তব্যরত সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকদেরও লক্ষ্য করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় অন্তত ছয়জন সাংবাদিক গুরুতরভাবে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধর্মতলার ঘটনার পরদিন, ২৫ জুলাই শনিবার, রাজ্য বিধানসভায় বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা করে তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা ভাঙার চেষ্টা বা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হলে সরকার কোনওভাবেই তা বরদাস্ত করবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মতলার ঘটনায় মোট সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে হেয়ার স্ট্রিট থানায় ছয়টি এবং এন্টালি থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মামলাগুলিতে রাজ্যের নতুন ‘পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাক্ট, ২০২৬’ বা প্রচলিত ভাষায় গুন্ডাদমন আইনের ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
এই প্রথম রাজ্যের নতুন গুন্ডাদমন আইন কোনও ঘটনায় প্রয়োগ করা হলো বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েক দিন আগেই আইনটি কার্যকর হয়েছিল। সংগঠিত অপরাধ, হিংসাত্মক কার্যকলাপ, তোলাবাজি এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো অপরাধ কঠোর হাতে দমন করার উদ্দেশ্যে আইনটি আনা হয়েছে বলে সরকারের দাবি।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবি এবং পুলিশের হাতে থাকা অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রায় ৭০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারের দাবি, চিহ্নিত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশের সঙ্গে মূল ছাত্র আন্দোলন বা নিট প্রশ্নফাঁস-বিরোধী প্রতিবাদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না।
এই দাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকার বোঝাতে চাইছে, ছাত্রছাত্রীদের ঘোষিত আন্দোলনের মধ্যে কিছু বহিরাগত ব্যক্তি প্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না। তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর ব্যবহার করা “তিন পুরুষ মনে রাখবে” মন্তব্যটি দ্রুত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সাংবাদিক, পুলিশ বা সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণের ঘটনায় শুধু সাধারণ ধারায় মামলা দায়ের করেই সরকার থেমে থাকবে না। নতুন আইনের মাধ্যমে এমন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ একই ধরনের ঘটনা ঘটানোর আগে একাধিকবার চিন্তা করে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে সরকারের কঠোর মনোভাব স্পষ্ট হলেও, এই ধরনের তীব্র রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে ভিন্ন মতও তৈরি হতে পারে। একদিকে সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করতে পারেন, প্রকাশ্য রাস্তায় হিংসা, সাংবাদিক নিগ্রহ বা পুলিশের ওপর আক্রমণের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, আইনের প্রয়োগ যেন নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া মেনেই হয়, সেই দাবিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কঠোর বক্তব্য প্রশাসনকে সক্রিয় করতে পারে। কিন্তু সেই বক্তব্য যেন তদন্তকারী সংস্থার ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি না করে এবং অভিযুক্তদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদ, মিছিল, সভা এবং সরকারের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি, নিয়োগে অনিয়ম বা পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের মতো বিষয় নিয়ে ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো এবং সরকারের জবাবদিহি চাওয়া কোনওভাবেই অপরাধ হতে পারে না।
তবে কোনও আন্দোলন থেকে যদি পুলিশ, সাংবাদিক বা সাধারণ পথচারীদের ওপর আক্রমণ করা হয়, সরকারি কিংবা বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করা হয় অথবা শহরের স্বাভাবিক জনজীবন বিপন্ন করার চেষ্টা হয়, তাহলে সেই কার্যকলাপ আর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
ধর্মতলার ঘটনায় তাই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমটি হলো নিট প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ। দ্বিতীয়টি হলো মিছিলের মধ্যে বা মিছিলকে ব্যবহার করে সংঘটিত হওয়া কথিত হিংসাত্মক কার্যকলাপ। প্রকৃত আন্দোলনকারীদের দাবি ও সম্ভাব্য অপরাধীদের কার্যকলাপকে এক করে দেখলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরকারের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করতে হবে, হিংসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে গিয়ে কোনও নিরপরাধ ছাত্রছাত্রী বা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী যেন হয়রানির শিকার না হন। একইভাবে আন্দোলনের আয়োজকদেরও নিশ্চিত করতে হবে, তাঁদের কর্মসূচির মধ্যে কোনও অপরাধী বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বহিরাগত প্রবেশ করে পরিস্থিতি অশান্ত করতে না পারে।
ধর্মতলার ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলির মধ্যে অন্যতম হলো সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকদের ওপর হামলা। সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকরা প্রায়ই উত্তেজনাপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেন। কোনও রাজনৈতিক মিছিল, বিক্ষোভ বা সংঘর্ষের সময় তাঁদের দায়িত্ব হলো ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতি মানুষের সামনে তুলে ধরা।
সাংবাদিকরা কোনও মিছিলের আয়োজক বা প্রশাসনের অংশ নন। তাঁরা ঘটনাটি নথিবদ্ধ করেন এবং জনসাধারণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেন। সেই কারণে তাঁদের ওপর আক্রমণ শুধু কয়েকজন ব্যক্তির শারীরিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি স্বাধীন সংবাদ সংগ্রহ এবং সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকারের ওপরও আঘাত।
মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় জানিয়েছেন, ধর্মতলার ঘটনায় ছয়জন সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তাঁদের চিকিৎসা নিতে হয়েছে। তিনি গোটা বিধানসভার পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা করেন। সরকারি সংবাদমাধ্যম আকাশবাণী এবং পিটিআই-ভিত্তিক একাধিক প্রতিবেদনেও সাংবাদিকদের ওপর কথিত হামলার ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর নিন্দা ও কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাসের কথা জানানো হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারা হামলা চালিয়েছিল, হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, অভিযুক্তরা কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য কি না এবং ঘটনাস্থলে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা উচিত।
একই সঙ্গে আহত সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের কর্তব্য। ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি বা বিক্ষোভের সময় সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ জায়গা নির্ধারণ, পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।