ভাইরাল জ্বরের পাশাপাশি বাড়ছে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ। এরই মধ্যে শিশুদের মধ্যে ছড়াচ্ছে লিভারের এক গুরুতর রোগ—জেনে নিন লক্ষণ ও সতর্কতার উপায়।
জ্বর, পেটের সমস্যা, বমি বা খাওয়ার অনীহা—এই ধরনের উপসর্গ এখন অনেক শিশুর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন সংক্রমণের প্রকোপও বাড়ছে। ভাইরাল জ্বরের পাশাপাশি ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া-সহ নানা সংক্রমণ নিয়ে সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা। এরই মধ্যে শিশুদের লিভারের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হেপাটাইটিসের মতো ভাইরাসজনিত লিভারের অসুখ নিয়ে বাবা-মায়েদের সচেতন থাকা জরুরি।
হেপাটাইটিস মূলত লিভারের প্রদাহজনিত একটি অসুখ। বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণে এই রোগ হতে পারে। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই—এই পাঁচ ধরনের ভাইরাসের কথা চিকিৎসাবিজ্ঞানে উল্লেখ করা হয়। তবে প্রত্যেকটির সংক্রমণের পথ এবং শরীরে তার প্রভাব এক নয়। তাই হেপাটাইটিসের নাম শুনলেই সব ধরনের সংক্রমণকে একইভাবে দেখা ঠিক নয়।
হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই সাধারণত দূষিত খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ পানীয় জলের অভাব এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার সঙ্গে এই ধরনের সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা অনেক সময় হাত পরিষ্কার না করেই খাবার খেয়ে ফেলে। বাইরে খেলার পর, শৌচাগার ব্যবহারের পর বা অপরিচ্ছন্ন কোনও জিনিস স্পর্শ করার পরে হাত না ধুয়ে খাবার খেলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রাস্তার খাবার, অপরিষ্কার পানীয়, বরফ বা নিরাপদ নয় এমন জল থেকেও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই শিশুর খাবার ও পানীয়ের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বাইরে থেকে আনা খাবার খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বিশেষভাবে সচেতন থাকা উচিত।
তবে হেপাটাইটিসের সব ধরনের ভাইরাস খাবার বা জলের মাধ্যমে ছড়ায় না। হেপাটাইটিস বি, সি এবং ডি মূলত রক্ত বা শরীরের নির্দিষ্ট তরলের সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। ফলে কোন ধরনের হেপাটাইটিস নিয়ে কথা হচ্ছে, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হেপাটাইটিস বি এবং সি দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক সংক্রমণে পরিণত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথম দিকে তেমন কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে রোগটি শরীরে থাকলেও তা সহজে বোঝা যায় না। সময়ের সঙ্গে লিভারে ক্ষতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিনের হেপাটাইটিস বি বা সি সংক্রমণ লিভারের গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। ক্রনিক হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে লিভারে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও ক্ষত তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সিরোসিস এবং কিছু ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই কোনও শিশুর মধ্যে সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে নিজের মতো করে ওষুধ না খাইয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে লিভারে প্রদাহ তৈরি হয়। লিভার শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। খাবার হজমের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে শরীরের বিপাকক্রিয়া, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি এবং বর্জ্য পদার্থ প্রক্রিয়াকরণ—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে লিভারের ভূমিকা রয়েছে।
লিভারে প্রদাহ তৈরি হলে তার স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হতে পারে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে উপসর্গ তুলনামূলক হালকা হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে অসুস্থতা বেশি গুরুতর হতে পারে। বয়স, রোগের ধরন এবং শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর উপসর্গের তীব্রতা নির্ভর করতে পারে।
হেপাটাইটিসের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হল জন্ডিস। শিশুর চোখের সাদা অংশ এবং ত্বক হলুদ হয়ে যেতে পারে। প্রস্রাবের রং স্বাভাবিকের তুলনায় গাঢ় হতে পারে। পাশাপাশি হালকা জ্বর, দুর্বলতা, খাওয়ার অনীহা, বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
কিছু শিশুর পেটের উপরের ডান দিকে অস্বস্তি বা ব্যথা দেখা দিতে পারে। কখনও পেটের সমস্যা, ক্ষুধামন্দা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো উপসর্গও দেখা যায়।
রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিসের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। তবে শুধু ত্বক বা চোখ হলুদ হয়েছে বলেই হেপাটাইটিস হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়। জন্ডিসের আরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা জরুরি।
না। জ্বর শিশুদের অসংখ্য সংক্রমণের সাধারণ উপসর্গ। ভাইরাল ইনফেকশন, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া বা অন্যান্য সংক্রমণেও জ্বর হতে পারে। আবার হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রেও জ্বর দেখা দিতে পারে।
তাই শিশুর জ্বরের সঙ্গে যদি চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া, প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া, বমি, খাওয়ার অনীহা বা পেটের ব্যথার মতো উপসর্গ যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশুদের ক্ষেত্রে খাবারের পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার ধারের খাবার তৈরি বা পরিবেশনের সময় পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি থাকলে বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে যে সংক্রমণ দূষিত খাবার ও জলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে, সেগুলির ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুকে নিয়মিত বাইরের জাঙ্ক ফুড, অপরিষ্কার শরবত বা নিরাপদ নয় এমন পানীয় না দেওয়াই ভালো। প্যাকেটজাত খাবার বা পানীয়ের ক্ষেত্রেও লেবেল, মেয়াদ এবং সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চলা দরকার।
বাড়িতে তৈরি খাবার পরিষ্কার হাতে, নিরাপদ জল ব্যবহার করে এবং যথাযথভাবে রান্না করে পরিবেশন করা উচিত।
কাটা ফল অনেকক্ষণ বাইরে রেখে দিলে তার উপর জীবাণু জমতে পারে। একইভাবে সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা খাবার থেকেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শিশুদের ক্ষেত্রে সদ্য ধোয়া ও কাটা ফল এবং তাজা খাবার দেওয়াই নিরাপদ অভ্যাস।
ফ্রিজে রাখা খাবারও অনির্দিষ্ট সময় ধরে রেখে দেওয়া উচিত নয়। খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সঠিক তাপমাত্রা এবং পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চলতে হবে।
কাঁচা আনাজের স্যালাডের ক্ষেত্রেও ভালোভাবে পরিষ্কার করা জরুরি। অপরিষ্কার জল দিয়ে ধোয়া খাবার থেকেই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শিশুদের নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শৌচাগার ব্যবহারের পরে এবং খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
শুধু শিশুই নয়, বাড়ির সব সদস্যের হাত পরিষ্কার রাখার অভ্যাস থাকা দরকার। কারণ পরিবারের একজনের সংক্রমণ থেকে অন্য সদস্যদের মধ্যেও নির্দিষ্ট কিছু সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
শিশুর ব্যবহারের বোতল, প্লেট, চামচ এবং অন্যান্য সামগ্রীও পরিষ্কার রাখা উচিত।
অসুস্থ অবস্থায় শিশুর শরীরে জলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। জ্বর, বমি বা পেটের সমস্যার সঙ্গে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে পর্যাপ্ত তরল দিতে হবে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট অসুখে কতটা জল বা কোন ধরনের তরল দেওয়া উচিত, তা শিশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করতে পারে। তাই গুরুতর উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
হেপাটাইটিস এ এবং বি-এর বিরুদ্ধে টিকা রয়েছে। শিশুর টিকাকরণের ক্ষেত্রে জাতীয় টিকাকরণ সূচি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত। কোন শিশুকে কখন কোন টিকা দেওয়া হবে, তা বয়স ও স্থানীয় টিকাকরণ নির্দেশিকার উপর নির্ভর করতে পারে।
হেপাটাইটিস সি-এর ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রতিরোধের মূল উপায় হল সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানো এবং প্রয়োজন হলে পরীক্ষা ও চিকিৎসা করানো। তাই সব ধরনের হেপাটাইটিসের জন্য একই প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রযোজ্য নয়।
শিশুর চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেলে, প্রস্রাব অস্বাভাবিক গাঢ় হলে, বারবার বমি হলে, তীব্র পেটব্যথা হলে বা শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশু খুব দুর্বল হয়ে পড়লে, কিছু খেতে বা পান করতে না পারলে কিংবা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ দেখা দিলেও চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইন্টারনেট দেখে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় বা ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। হেপাটাইটিস নিশ্চিত করতে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় শিশুদের নানা ধরনের সংক্রমণ হতে পারে। তাই প্রতিটি জ্বরকে একই রোগের লক্ষণ ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই প্রতিটি জ্বরকে হেপাটাইটিস বলেও ধরে নেওয়া উচিত নয়।
পরিচ্ছন্ন খাবার ও নিরাপদ পানীয় জল, নিয়মিত হাত ধোয়া, প্রয়োজনীয় টিকাকরণ এবং অসুস্থতার লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা—এই কয়েকটি বিষয় শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া, গাঢ় প্রস্রাব, বমি, খাওয়ার অনীহা বা পেটের ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
নোট: হেপাটাইটিসের ধরনভেদে সংক্রমণের পথ, উপসর্গ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের পদ্ধতি আলাদা। তাই শিশুর ক্ষেত্রে সন্দেহজনক কোনও উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।