Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ডিগ্রি হাতে নতুন স্বপ্নের পথে, IEM-এর কনভোকেশনে নজর কাড়ল পড়ুয়ারা

সল্টলেকের ম্যানেজমেন্ট হাউজ ক্যাম্পাসে ২২ আগস্ট অনুষ্ঠিত হল IEM-এর ২০২৬ সালের সমাবর্তন উৎসব। ডিগ্রি হাতে নতুন স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন একঝাঁক পড়ুয়া।

আইইএম-এর সমাবর্তন ২০২৬: ডিগ্রি হাতে নতুন স্বপ্নের পথে শয়ে শয়ে পড়ুয়া

নতুন জীবনের পথে পা বাড়ালেন শয়ে শয়ে তরুণ-তরুণী। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায়, মেধা এবং স্বপ্নপূরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী থাকল কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (IEM)। ডিগ্রি অর্জনের আনন্দ, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রত্যাশা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আত্মবিশ্বাসে মুখরিত হয়ে উঠল প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস। গত ২২ আগস্ট সল্টলেকের ম্যানেজমেন্ট হাউজ ক্যাম্পাসে আয়োজিত হয় আইইএম-এর ২০২৬ সালের সমাবর্তন উৎসব বা ডিগ্রি কনভোকেশন সেরিমনি। মেধা, উদ্ভাবন, শিক্ষাগত সততা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকারকে সামনে রেখেই উদযাপিত হয় এই বিশেষ অনুষ্ঠান।

শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শেষ করে কর্মজীবন কিংবা উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে চলেছেন পড়ুয়ারা। তাঁদের কাছে সমাবর্তন শুধুমাত্র ডিগ্রি হাতে পাওয়ার অনুষ্ঠান নয়, বরং এতদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি এবং আগামী দিনের দায়িত্ব গ্রহণের প্রতীক। সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে আয়োজিত হয় আইইএম-এর সমাবর্তন অনুষ্ঠান। পড়ুয়া, শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে গোটা অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে আনন্দ, গর্ব ও অনুপ্রেরণার এক বিশেষ উপলক্ষ।

জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমাবর্তনের সূচনা

আইইএম-এর ২০২৬ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সূচনা হয় জমকালো শোভাযাত্রার মাধ্যমে। প্রথাগত আয়োজনের সঙ্গে শিক্ষার মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে। এরপর প্রদীপ প্রজ্বলন এবং সমবেত সংগীতের মাধ্যমে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়। এই আনুষ্ঠানিক সূচনা সমাবর্তনের পরিবেশকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

সমাবর্তন যে কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। কারণ, এই দিনেই শিক্ষার্থীদের অর্জন, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবদান এবং অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। আইইএম-এর অনুষ্ঠানেও সেই আবহ স্পষ্ট ছিল। পড়ুয়াদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার মূল মূল্যবোধগুলিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

একটি ডিগ্রি অর্জনের পিছনে থাকে বহু বছরের পড়াশোনা, পরীক্ষা, প্রকল্পের কাজ, দলগত প্রচেষ্টা এবং নানা ধরনের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই। কখনও থাকে ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা, কখনও আবার নতুন কিছু শেখার আনন্দ। সমাবর্তনের মঞ্চ সেই সমস্ত অভিজ্ঞতাকে একসূত্রে বেঁধে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।

সভাপতির ভাষণে শিক্ষার গুণগত মানের উপর গুরুত্ব

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইইএম-এর সভানেত্রী অধ্যাপক বনানী চক্রবর্তী। তাঁর সভাপতির ভাষণে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশের গুরুত্ব উঠে আসে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জনই শেষ কথা নয়। শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা এবং মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন, সেই লক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা দ্রুত বদলাচ্ছে। বিভিন্ন পেশায় সাফল্য অর্জনের জন্য বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি প্রয়োজন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, যোগাযোগের ক্ষমতা এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্বও ক্রমশ বাড়ছে।

আইইএম-এর মতো প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনামুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আধুনিক জ্ঞান এবং বাস্তবমুখী দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে তোলার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমাবর্তনের মঞ্চে শিক্ষার গুণগত মানের প্রসঙ্গ উঠে আসা সেই বৃহত্তর উদ্দেশ্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত MAKAUT-এর উপাচার্য

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি (MAKAUT)-এর উপাচার্য অধ্যাপক তাপস চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্যে পড়ুয়াদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, শিক্ষাগত সততা এবং রাষ্ট্র গঠনে যুবসমাজের ভূমিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে উদ্ভাবনকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নতুন প্রযুক্তি তৈরি করা, প্রচলিত সমস্যার বিকল্প সমাধান খুঁজে বের করা কিংবা কোনও কাজকে আরও সহজ ও কার্যকর করে তোলার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী চিন্তার ভূমিকা অপরিসীম। উচ্চশিক্ষার পড়ুয়াদের কাছে তাই শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করাই যথেষ্ট নয়, সেই জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার ক্ষমতাও গড়ে তুলতে হয়।

প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে শিল্প, ব্যবসা, গবেষণা, প্রশাসন কিংবা উদ্যোগপতি হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পান। তাঁদের নতুন ভাবনা এবং বাস্তবসম্মত উদ্যোগ দেশের অর্থনীতি ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দায়িত্বশীলতা এবং উদ্ভাবনী মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন।

অধ্যাপক তাপস চক্রবর্তীর বক্তব্যে শিক্ষাগত সততার প্রসঙ্গও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো ফল করা কিংবা কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। নিজের কাজের প্রতি সততা, তথ্যের সঠিক ব্যবহার, অন্যের অবদানকে সম্মান করা এবং নৈতিক দায়িত্ব পালন করাও একজন শিক্ষিত মানুষের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পেশাগত জীবনে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে এই মূল্যবোধগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রাষ্ট্র গঠনে যুবসমাজের দায়িত্ব

দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং অর্থনীতির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ উন্নয়নের গতি বাড়াতে পারে। তবে সেই অবদান কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সমস্যাগুলি সম্পর্কে সচেতনতা।

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং কর্মক্ষেত্রের নতুন চাহিদা তরুণদের সামনে একদিকে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনই তৈরি করছে প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত জ্ঞান বাড়ানো, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

সমাবর্তনের মতো অনুষ্ঠান পড়ুয়াদের এই বৃহত্তর দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ডিগ্রি অর্জনের পর প্রত্যেকে নিজস্ব কর্মজীবনের পথে এগিয়ে যাবেন। কেউ উচ্চশিক্ষায় মনোনিবেশ করবেন, কেউ গবেষণার জগতে প্রবেশ করবেন, আবার কেউ বিভিন্ন সংস্থায় কাজ শুরু করবেন কিংবা নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলবেন। পথ আলাদা হলেও তাঁদের অর্জিত শিক্ষা যেন সমাজের কাজে লাগে, সেই প্রত্যাশাই গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষক ও অভিভাবকদের অবদানকে স্বীকৃতি

আইইএম-এর অধিকর্তা ড. সত্যজিৎ চক্রবর্তী তাঁর বক্তব্যে শিক্ষক এবং অভিভাবকদের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেন। শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পিছনে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, উৎসাহ এবং মানসিক সমর্থন—শিক্ষকদের অবদান পড়ুয়াদের এগিয়ে চলার পথে সাহায্য করে।

অন্যদিকে, অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা এবং উৎসাহও শিক্ষাজীবনের অন্যতম ভিত্তি। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কিংবা পেশা নির্বাচনের মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পরিবারের সমর্থন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে।

একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যকে তাই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, পরিবার এবং সহপাঠীদের সম্মিলিত সহযোগিতা। সমাবর্তনের মঞ্চে এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া শিক্ষার সামাজিক চরিত্রকেও তুলে ধরে।

ডিগ্রি হাতে পাওয়ার মুহূর্তে পড়ুয়ারা যেমন নিজেদের পরিশ্রমের ফল উদযাপন করেন, তেমনই তাঁদের সাফল্যে যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। এই পারস্পরিক স্বীকৃতি সমাবর্তনের আবেগঘন দিকগুলির মধ্যে অন্যতম।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নিজেদের আপডেট রাখার পরামর্শ

ড. সত্যজিৎ চক্রবর্তীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), জেনারেটিভ এআই এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM)-এর দ্রুত পরিবর্তনশীল দুনিয়া। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা এবং কর্মক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। একই সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা ও কাজের ধরনেও পরিবর্তন আনছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তথ্য বিশ্লেষণ, বিভিন্ন কাজের প্রাথমিক খসড়া তৈরি, কোডিংয়ে সহায়তা, জটিল বিষয় ব্যাখ্যা এবং বহু ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সহজ করা সম্ভব হচ্ছে। জেনারেটিভ এআই নতুন লেখা, ছবি, ধারণা এবং অন্যান্য ডিজিটাল উপাদান তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল মানুষের ভাষা বুঝে তার ভিত্তিতে উত্তর তৈরি এবং বিভিন্ন ভাষাভিত্তিক কাজে সাহায্য করার জন্য ব্যবহৃত হয়।

এই প্রযুক্তিগুলির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট বিষয় শিখে পড়াশোনা শেষ করলেই চলবে না। পেশাগত জীবনে এগিয়ে যেতে হলে নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে হবে, প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। এআই-নির্ভর তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখা, কপিরাইট ও নৈতিকতার বিষয়গুলি বোঝা এবং নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা জরুরি। প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, অন্ধভাবে তার উপর নির্ভর করা উচিত নয়।

শিক্ষার্থীদের জন্য এই বার্তা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, তাঁদের অনেকেই এমন এক কর্মজগতে প্রবেশ করতে চলেছেন যেখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি শেখার মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নতুন সফটওয়্যার, কাজের পদ্ধতি কিংবা শিল্পক্ষেত্রের পরিবর্তন সম্পর্কে নিয়মিত জানার অভ্যাস ভবিষ্যতে তাঁদের এগিয়ে থাকতে সাহায্য করতে পারে।

পেশাগত জীবনে নীতি ও নিষ্ঠার শপথ

সমাবর্তন অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল গ্র্যাজুয়েটদের শপথ গ্রহণ। ড. সত্যজিৎ চক্রবর্তীর পরিচালনায় সমস্ত গ্র্যাজুয়েট পেশাগত জীবনে নীতি ও নিষ্ঠা বজায় রাখার শপথ নেন। শিক্ষাজীবনের পর কর্মজীবনে প্রবেশের আগে এই শপথ তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

যে কোনও পেশায় সাফল্যের জন্য দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু দক্ষতার পাশাপাশি সততা, দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত নৈতিকতার গুরুত্বও সমান। প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে কাজ করার সময় কোনও সিদ্ধান্ত বহু মানুষের জীবন, নিরাপত্তা কিংবা দৈনন্দিন পরিষেবার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

news image
আরও খবর

একজন পেশাদার মানুষকে তাই নিজের কাজের মান বজায় রাখার পাশাপাশি তার প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হয়। ভুল হলে তা স্বীকার করা, তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা, নিয়ম মেনে কাজ করা এবং অন্যের প্রতি সম্মান দেখানো পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সমাবর্তনের শপথ সেই মূল্যবোধগুলিকে সামনে নিয়ে আসে। ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতার স্বীকৃতি পান। আর সেই জ্ঞানকে কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগাবেন, তা নির্ধারণ করে তাঁদের ভবিষ্যৎ পথচলা।

শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের গুরুত্ব

অনুষ্ঠানে শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়েও বক্তব্য রাখেন ড. রাজশ্রী পাল। আধুনিক উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শ্রেণিকক্ষে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা পেশাগত জীবনের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারেন।

শিল্পক্ষেত্রে কাজের ধরন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়োগের চাহিদা নিয়মিত বদলায়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষার উপরও গুরুত্ব দিতে হয়। ইন্টার্নশিপ, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, শিল্পক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করা শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

অন্যদিকে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন প্রতিভা খুঁজে পেতে পারে। গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দক্ষ কর্মী তৈরির ক্ষেত্রে এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনামুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সংযোগের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যার সমাধান করা এবং দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতাও কাজে লাগাতে হবে।

শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি আরও বাস্তবমুখী হতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ডিগ্রি থেকে কর্মজীবন: নতুন অধ্যায়ের শুরু

সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘদিনের পড়াশোনা শেষে ডিগ্রি হাতে পাওয়া যেমন আনন্দের, তেমনই এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রত্যাশা। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, চাকরি কিংবা উদ্যোগপতি হিসেবে পথচলা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

কর্মজীবনের শুরুতে অনেকেই নতুন পরিবেশ, কাজের চাপ এবং দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের পার্থক্যও রয়েছে। সেখানে সময়মতো কাজ শেষ করা, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা, নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন দক্ষতা অর্জন করা জরুরি হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি ধৈর্য ও শেখার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কাজ বা প্রথম দায়িত্বই কারও সম্পূর্ণ কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয় না। বরং ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা, ভুল থেকে শিক্ষা এবং নতুন সুযোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে পেশাগত বিকাশ ঘটে।

আইইএম-এর সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যগুলির মধ্যে প্রযুক্তির পরিবর্তন, উদ্ভাবন, সততা এবং দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ এই বাস্তবতার সঙ্গেই যুক্ত। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের নিজের দক্ষতার উপর আস্থা রাখার পাশাপাশি নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বজায় রাখতে হবে।

শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধের সমন্বয়

উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবলমাত্র কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা নয়। শিক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষকে যুক্তিবাদী, দায়িত্বশীল এবং সমাজসচেতন করে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োগের সঙ্গে নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে।

প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির ফলে একাধিক সুবিধা তৈরি হলেও তার সঙ্গে নতুন প্রশ্নও সামনে আসছে। তথ্যের গোপনীয়তা, এআই ব্যবহারের নৈতিকতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব নিয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের পেশাদারদের তাই প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি তার দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কেও জানতে হবে।

একইভাবে, কোনও প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি দলগত সাফল্যের গুরুত্বও বোঝা দরকার। সহকর্মীদের সঙ্গে সহযোগিতা, মতপার্থক্য সামলানোর ক্ষমতা এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

সমাবর্তনের শপথ এবং বিশিষ্ট অতিথিদের বক্তব্য এই বিষয়গুলিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। ডিগ্রি শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞানের স্বীকৃতি দিলেও সেই জ্ঞানের প্রয়োগের মাধ্যমে কী ধরনের অবদান রাখা হবে, তা নির্ভর করে তাঁদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত ও কাজের উপর।

নতুন প্রজন্মের সামনে সম্ভাবনার বিস্তৃত দিগন্ত

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি, ব্যবসা, গবেষণা এবং শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। তাই শিক্ষার্থীদের নিজেদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী লক্ষ্য স্থির করা এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ হয়তো প্রযুক্তিগত গবেষণায় আগ্রহী, কেউ সফটওয়্যার ও ডিজিটাল পরিষেবায় কাজ করতে চান, আবার কেউ ব্যবস্থাপনা কিংবা ব্যবসার জগতে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শেখার ধারাবাহিকতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের যুগে নতুন ধরনের দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার পাশাপাশি কোথায় তার ব্যবহার উপযুক্ত, কোথায় মানুষের বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য এবং কীভাবে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা শনাক্ত করতে হয়, সেই জ্ঞানও প্রয়োজন।

এছাড়া যোগাযোগের দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা এবং দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে সহায়তা করতে পারে। পেশাগত জীবনে সব সমস্যার উত্তর আগে থেকেই জানা সম্ভব নয়। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে শেখার এবং সমাধান খোঁজার মানসিকতা থাকলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হয়।

আইইএম-এর ২০২৬ সালের সমাবর্তন এই নতুন যাত্রারই সূচনা। ডিগ্রি হাতে পাওয়া পড়ুয়ারা এখন নিজেদের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে প্রয়োগ করার সুযোগ পাবেন।

স্মরণীয় অনুষ্ঠানে ভবিষ্যতের অঙ্গীকার

সল্টলেকের ম্যানেজমেন্ট হাউজ ক্যাম্পাসে আয়োজিত আইইএম-এর সমাবর্তন অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল। জমকালো শোভাযাত্রা, প্রদীপ প্রজ্বলন, সমবেত সংগীত এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। শিক্ষার গুণগত মান, উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা, পেশাগত সততা এবং শিল্প ও শিক্ষার সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলি অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

অধ্যাপক বনানী চক্রবর্তীর সভাপতির ভাষণ, MAKAUT-এর উপাচার্য অধ্যাপক তাপস চক্রবর্তীর বক্তব্য এবং আইইএম-এর অধিকর্তা ড. সত্যজিৎ চক্রবর্তীর পরামর্শ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথচলার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। পাশাপাশি ড. রাজশ্রী পালের বক্তব্যে শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের প্রসঙ্গও উঠে আসে।

সমাবর্তনের দিন ডিগ্রি হাতে পাওয়া পড়ুয়াদের কাছে একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে তেমনই নতুন দায়িত্ব গ্রহণের মুহূর্ত। আগামী দিনে তাঁরা যে ক্ষেত্রেই কাজ করুন না কেন, অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগানো, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখা তাঁদের পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।

শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় শেষ হলেও শেখার প্রক্রিয়া কখনও শেষ হয় না। সময়ের সঙ্গে নতুন দক্ষতা অর্জন, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং সমাজের প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন থাকা ভবিষ্যতের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। সেই প্রত্যাশা নিয়েই আইইএম-এর ২০২৬ সালের সমাবর্তনে নতুন জীবনের পথে পা বাড়ালেন শয়ে শয়ে তরুণ-তরুণী।

মূল বিষয়: আইইএম সমাবর্তন ২০২৬, কলকাতা আইইএম কনভোকেশন, MAKAUT-এর উপাচার্য অধ্যাপক তাপস চক্রবর্তী, ড. সত্যজিৎ চক্রবর্তী, উচ্চশিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পেশাগত সততা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন।

Preview image