ক্রিকেটের ইতিহাসে সচিন তেন্ডুলকরের নাম মানেই একের পর এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে যে কীর্তি ছিল ক্রিকেট ঈশ্বর এর দখলে, এবার সেই রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে নতুন ইতিহাসের দরজা খুলে দিলেন ভারতের তারকা ব্যাটার রোহিত শর্মা। হিটম্যান এর ব্যাটে ফের দেখা গেল আগ্রাসন, অভিজ্ঞতা এবং অসাধারণ ধারাবাহিকতার মিশেল। সচিন যেখানে একসময় নিজের ব্যাটিং দক্ষতায় নজির গড়েছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই যেন নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন রোহিত। তাঁর এই কীর্তি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের জন্যও অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে পারফর্ম করে আসা রোহিত বারবার প্রমাণ করেছেন, বয়স কিংবা সময় কোনও কিছুই তাঁর ক্রিকেটীয় ক্ষুধাকে থামাতে পারে না। রোহিতের এই রেকর্ড ভাঙার দৌড়ে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা নিঃসন্দেহে সচিন তেন্ডুলকর। এক প্রজন্মের কিংবদন্তির রেকর্ড যখন পরবর্তী প্রজন্মের একজন তারকা চ্যালেঞ্জ করেন, তখন ক্রিকেটের ইতিহাসে তৈরি হয় এক বিশেষ মুহূর্ত। সচিনের ২২ বছরের পুরনো নজিরে রোহিতের আঘাত তাই শুধুই পরিসংখ্যানের গল্প নয়, এটি ভারতীয় ক্রিকেটের দুই প্রজন্মের অসাধারণ উত্তরাধিকারের গল্প। হিটম্যান এর এই সাফল্য নিয়ে ইতিমধ্যেই ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উচ্ছ্বাস। রোহিত কি শেষ পর্যন্ত সচিনকে টপকে নতুন মাইলফলক গড়তে পারবেন? তাঁর ব্যাটে কি আরও বড় ইতিহাস অপেক্ষা করছে? নজর এখন সেই দিকেই।
ক্রিকেটে কিছু রেকর্ড শুধুমাত্র পরিসংখ্যান নয়, সেগুলি হয়ে ওঠে একটি যুগের প্রতীক। কোনও একজন ক্রিকেটারের ব্যাট থেকে তৈরি হওয়া এমন কিছু মাইলফলক থাকে, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। ভারতীয় ক্রিকেটে সচিন তেন্ডুলকরের নাম এমন অসংখ্য রেকর্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনে সচিন এমন বহু কীর্তি গড়েছেন, যেগুলিকে একসময় মনে করা হতো ভাঙা প্রায় অসম্ভব। সেই কারণেই তাঁকে বলা হয় ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’। কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হল, সময়ের সঙ্গে পুরনো রেকর্ডকে নতুন প্রজন্মের তারকারা চ্যালেঞ্জ করেন। এবার সেই তালিকায় আরও একবার উঠে এল রোহিত শর্মার নাম। হিটম্যানএর ব্যাটে এমন এক কীর্তি ধরা দিয়েছে, যা দীর্ঘ ২২ বছর ধরে সচিন তেন্ডুলকরের দখলে ছিল বলে আলোচনায় এসেছে।
রোহিত শর্মার ক্রিকেটজীবন বরাবরই ওঠানামায় ভরা। শুরুতে প্রতিভাবান ব্যাটার হিসেবে পরিচিতি পেলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরবর্তীকালে ওপেনিংয়ে উঠে এসে তিনি সম্পূর্ণ বদলে দেন নিজের ক্রিকেটজীবনের চেহারা। একদিনের ক্রিকেটে একের পর এক অবিশ্বাস্য ইনিংস, রেকর্ড সংখ্যক ডাবল সেঞ্চুরি, বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং অধিনায়ক হিসেবে সাফল্য তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম বড় নাম করে তুলেছে। তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরনও অন্যদের থেকে আলাদা। শুরুতে পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে পরে বোলারদের উপর এমন আক্রমণ করেন যে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কয়েক ওভারের মধ্যেই বদলে যায়। সেই কারণেই তাঁর ডাকনাম হয়ে যায় ‘হিটম্যান’।
সচিন তেন্ডুলকরের সঙ্গে রোহিত শর্মার তুলনা অবশ্য নতুন নয়। দুই প্রজন্মের দুই তারকার ব্যাটিংয়ের ধরন আলাদা হলেও তাঁদের মধ্যে একটি জায়গায় দারুণ মিল রয়েছে। দুজনেই দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় ক্রিকেটের ব্যাটিংয়ের অন্যতম ভরসা ছিলেন। সচিন যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের সাম্রাজ্য তৈরি করছিলেন, তখন রোহিত ছিলেন ভারতীয় দলের এক তরুণ প্রতিভা। সময়ের সঙ্গে সেই তরুণই হয়ে উঠেছেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার। ফলে সচিনের কোনও দীর্ঘস্থায়ী রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছনো রোহিতের জন্য যেমন বড় ব্যাপার, তেমনই ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও তা বিশেষ আবেগের।
২২ বছর ধরে কোনও রেকর্ড টিকে থাকা নিজেই একটি অসাধারণ ঘটনা। ক্রিকেটের নিয়ম, খেলার ধরন, ফিটনেস, ব্যাটিং প্রযুক্তি এবং ম্যাচের সংখ্যা সবকিছুই সময়ের সঙ্গে বদলেছে। আধুনিক ক্রিকেটে ব্যাটাররা আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। টি টোয়েন্টির প্রভাব একদিনের ক্রিকেটেও দেখা যায়। পাওয়ারপ্লেতে ঝুঁকি নিয়ে রান করা, দ্রুত স্ট্রাইক রোটেট করা এবং বড় শট খেলার প্রবণতা বেড়েছে। তারপরও কোনও রেকর্ড যদি দুই দশকের বেশি সময় ধরে অক্ষত থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সেই রেকর্ড তৈরি করেছিলেন কতটা অসাধারণ একজন ক্রিকেটার। সচিনের সেই দীর্ঘস্থায়ী কীর্তির সামনে এবার রোহিতের নাম উঠে আসা তাই নিছক একটি পরিসংখ্যানের পরিবর্তন নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে উত্তরাধিকারের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়।
সচিন তেন্ডুলকর ভারতীয় ক্রিকেটে যে মানদণ্ড তৈরি করে গিয়েছেন, তা পরবর্তী ক্রিকেটারদের জন্য একই সঙ্গে অনুপ্রেরণা এবং চ্যালেঞ্জ। ছোটবেলা থেকেই অসংখ্য ভারতীয় ক্রিকেটার সচিনকে দেখে ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখেছেন। রোহিত শর্মাও সেই প্রজন্মেরই একজন। সচিনের ব্যাটিং দেখে বড় হওয়া রোহিত যখন তাঁরই কোনও রেকর্ডকে ছুঁয়ে ফেলেন বা অতিক্রম করেন, তখন ঘটনাটির আবেগ আরও বেড়ে যায়। কারণ এটি এমন একজন ক্রিকেটারের কীর্তি, যিনি একসময় নিজের আদর্শের খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আজ তাঁর ব্যাট থেকেই সেই আদর্শের রেকর্ডের উপর নতুন করে আঘাত এসেছে।
রোহিতের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সময়জ্ঞান। তিনি এমন ব্যাটার, যিনি শুধু শক্তি দিয়ে বড় শট খেলেন না, বরং বলের গতি এবং বাউন্সকে কাজে লাগিয়ে শট নির্বাচন করেন। তাঁর পুল শট, হুক শট এবং কভার ড্রাইভ ক্রিকেটপ্রেমীদের বহুবার মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে ফাস্ট বোলারদের বিরুদ্ধে শর্ট বলকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। যখন রোহিত সেট হয়ে যান, তখন তাঁর ব্যাটিং দেখতে প্রতিপক্ষের বোলারদের জন্য যেমন কঠিন, দর্শকদের জন্য তেমনই আনন্দের। তাঁর ইনিংসের একটি পর্যায়ে গিয়ে মনে হয়, মাঠের প্রতিটি অংশই যেন তাঁর রান করার জায়গা।
এই কারণেই রোহিতের রেকর্ড ভাঙার ঘটনাগুলি অনেক সময় শুধু সংখ্যার হিসাব হয়ে থাকে না। তাঁর কেরিয়ারের বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু ইনিংস এসেছে, যা ভারতীয় ক্রিকেটের স্মৃতিতে থেকে গেছে। একদিনের ক্রিকেটে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি করা থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে ধারাবাহিক শতরান রোহিত দেখিয়েছেন যে বড় মঞ্চে চাপ সামলে দীর্ঘ ইনিংস খেলার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। শুধু রান করার ক্ষমতাই নয়, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের গতি পরিবর্তন করার ক্ষমতাও তাঁর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য।
অন্যদিকে সচিনের রেকর্ড ভাঙার বিষয়টি সবসময়ই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ সচিনের রেকর্ড মানেই শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ ক্রিকেটজীবন, অসংখ্য ঐতিহাসিক ম্যাচ এবং কোটি কোটি মানুষের আবেগ। সচিনের ব্যাট হাতে ভারতের হয়ে খেলার সময়টা ভারতীয় ক্রিকেটের এক বিশেষ যুগ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সময় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ভারতের হয়ে দায়িত্ব নেওয়া, নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা এবং একের পর এক বিশ্বমানের বোলারের বিরুদ্ধে রান করা ছিল তাঁর নিয়মিত কাজ।
রোহিত যখন সেই দীর্ঘস্থায়ী রেকর্ডের দিকে এগিয়ে যান, তখন স্বাভাবিকভাবেই ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সচিনের মতো একজন কিংবদন্তির রেকর্ড কি সত্যিই রোহিত ভাঙতে পারবেন? কেউ কেউ আবার মনে করিয়ে দেন যে রেকর্ড তৈরি হয় ভাঙার জন্যই। শেষ পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্সই সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। রোহিতের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। তাঁর ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা তাঁকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রজন্ম বদলের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। সচিনের আগে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের বড় নাম ছিলেন সুনীল গাভাসকর। গাভাসকরের রেকর্ড একসময় সচিন ভেঙেছিলেন। আবার সচিনের তৈরি করা কিছু মাইলফলকের দিকে পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটাররা এগিয়ে গিয়েছেন। এই ধারাটিই ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যায়। একজন কিংবদন্তি যে জায়গায় শেষ করেন, সেখান থেকেই আরেকজন নতুন তারকা নিজের অধ্যায় শুরু করেন। রোহিত ও সচিনের গল্পেও সেই একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে।
রোহিত শর্মার কেরিয়ারকে যদি কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছিল ওপেনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। মিডল অর্ডারে নিজের জায়গা তৈরি করতে না পারলেও ওপেনিংয়ে সুযোগ পাওয়ার পর তিনি নিজের প্রকৃত ক্ষমতা দেখাতে শুরু করেন। সাদা বলের ক্রিকেটে ওপেনার হিসেবে তাঁর সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ভারতের দলগত সাফল্যেও বড় ভূমিকা রেখেছে। নতুন বল সামলে নেওয়ার পর দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সফল ওপেনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রোহিতের ব্যাটিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর বড় ইনিংস খেলার মানসিকতা। অনেক ব্যাটার পঞ্চাশ বা সত্তরের পর নিজেদের উইকেট হারান। রোহিতের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি একবার সেট হয়ে গেলে নিজের ইনিংসকে আরও বড় করার চেষ্টা করেন। তাঁর ডাবল সেঞ্চুরিগুলি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০০ রান পেরিয়ে যাওয়ার পরও তাঁর ব্যাটিংয়ের গতি কমেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও আক্রমণাত্মক হয়েছেন। এই মানসিকতাই তাঁকে অন্যান্য ব্যাটারের থেকে আলাদা করেছে।
সচিনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ক্ষুধা দেখা যেত। তিনি শুধু রান করতে চাইতেন না, নিজের ইনিংসকে দলের জন্য যতটা সম্ভব কার্যকর করতে চাইতেন। শতরান করার পরও তাঁর মনোযোগ থাকত আরও রান করার দিকে। দুই প্রজন্মের দুই তারকার এই মানসিক মিলই হয়তো তাঁদের মধ্যে তুলনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। একজন ছিলেন ক্রিকেটের দীর্ঘ রাজত্বের প্রতীক, অন্যজন সেই রাজত্বের কিছু রেকর্ডে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া আধুনিক ক্রিকেটের তারকা।
২২ বছর ধরে টিকে থাকা কোনও রেকর্ড যখন ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিসংখ্যানবিদদের কাছেও তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্রিকেটের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী রেকর্ডগুলি সাধারণত বিশেষভাবে সংরক্ষিত থাকে। কারণ সময়ের সঙ্গে খেলার পরিবর্তন ঘটলেও কিছু রেকর্ডের স্থায়িত্ব ক্রিকেটারের অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ হয়ে থাকে। সচিনের ক্ষেত্রে এমন রেকর্ডের সংখ্যা কম নয়। তাই তাঁর কোনও দীর্ঘস্থায়ী কীর্তির পাশে রোহিতের নাম লেখা হলে সেটি নিঃসন্দেহে ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকে।
রোহিতের সাফল্যের পেছনে তাঁর মানসিক দৃঢ়তাও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুটা প্রত্যাশামতো না হলেও তিনি নিজেকে বদলেছেন। দীর্ঘদিন দলের বাইরে থাকা, প্রত্যাশার চাপ, ব্যর্থতার সমালোচনা সবকিছু পেরিয়ে তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা সাদা বলের ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর কেরিয়ার তাই শুধু প্রতিভার গল্প নয়, বরং নিজেকে বারবার নতুন করে তৈরি করার গল্পও।
একসময় রোহিতকে বলা হতো এমন একজন ক্রিকেটার, যার প্রতিভা অনেক, কিন্তু ধারাবাহিকতা কম। সেই সমালোচনাই পরবর্তীতে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রেরণায় পরিণত হয়। ওপেনিংয়ে এসে তিনি নিজের ব্যাটিংয়ের নতুন সংস্করণ দেখান। প্রথম দিকে ধীর গতিতে শুরু করলেও পরে বোলারদের উপর চাপ তৈরি করার কৌশল আয়ত্ত করেন। তাঁর ব্যাটিংয়ের এই পরিবর্তনই তাঁকে রেকর্ডের দরজায় পৌঁছে দেয়।
সচিনের রেকর্ডের সঙ্গে রোহিতের নাম যুক্ত হওয়া আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় ক্রিকেটে একদিনের ফরম্যাটের গুরুত্ব দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত বেশি। এই ফরম্যাটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ নয়। প্রতিটি ম্যাচে নতুন পরিস্থিতি, নতুন পিচ এবং নতুন বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে খেলতে হয়। তবুও রোহিত দীর্ঘ সময় ধরে এই ফরম্যাটে অসাধারণ পারফর্ম করেছেন। ফলে তাঁর নাম যখন কোনও ঐতিহাসিক ওয়ানডে রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা তাঁর কেরিয়ারের সামগ্রিক মানেরও প্রমাণ দেয়।
তবে সচিন বনাম রোহিতকে শুধুমাত্র কে বেশি বড় ক্রিকেটার এই বিতর্কে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। দুই ক্রিকেটার দুই ভিন্ন যুগের প্রতিনিধি। সচিন এমন এক সময়ে খেলেছেন যখন ক্রিকেটের চাপ, মিডিয়ার ধরন এবং ম্যাচের কাঠামো আজকের থেকে আলাদা ছিল। রোহিত খেলেছেন টি টোয়েন্টির বিস্ফোরক যুগে, যেখানে ব্যাটারদের কাছ থেকে দ্রুত রান করার প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই দুই প্রজন্মের পরিসংখ্যান তুলনা করার সময় সময়ের প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তারপরও রেকর্ডের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। সেখানে আবেগ বা যুগের পার্থক্য সবসময় জায়গা পায় না। সংখ্যা বলে দেয় কে কত রান করেছেন, কত ম্যাচ খেলেছেন, কতবার নির্দিষ্ট মাইলফলক ছুঁয়েছেন। সেই সংখ্যার পাতাতেই যদি সচিনের পাশে রোহিতের নাম লেখা হয়, তাহলে সেটি ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য অবশ্যই গর্বের মুহূর্ত।
রোহিতের এই কীর্তি তাঁর সমর্থকদের কাছেও বিশেষ আনন্দের। কারণ ‘হিটম্যান’কে নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের আবেগ বহু পুরনো। তাঁর ছক্কা, তাঁর দীর্ঘ ইনিংস, তাঁর শান্ত মুখের অভিব্যক্তি এবং বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা জনপ্রিয়তা দিয়েছে। মাঠে তিনি যতটা শান্ত দেখান, ব্যাট হাতে ততটাই বিধ্বংসী। সেই কারণেই তাঁর একটি বড় রেকর্ড ভাঙার মুহূর্ত সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করে।
সচিনের ভক্তদের কাছেও অবশ্য এই ঘটনা অন্যভাবে বিশেষ। কারণ সচিনের রেকর্ড ভাঙা মানে তাঁর কৃতিত্বকে ছোট করা নয়। বরং একজন কিংবদন্তির তৈরি করা পথ ধরে পরবর্তী প্রজন্মের একজন তারকা আরও সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। ক্রিকেটে এটাই স্বাভাবিক উত্তরাধিকার। সচিন নিজেও বহু কিংবদন্তির রেকর্ড ভেঙে নিজের ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। তাই আজ তাঁর কোনও রেকর্ড রোহিতের হাতে নতুন রূপ পেলে সেটিকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
রোহিতের কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। প্রতিভা থাকলেই হয় না, সেই প্রতিভাকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করতে হয়। ব্যর্থতার সময় নিজেকে বদলাতে হয়। সুযোগ এলে তা কাজে লাগাতে হয়। রোহিত সেই পথেই এগিয়েছেন। তিনি নিজের ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা বুঝেছেন, নিজের শক্তিকে আরও কার্যকর করেছেন এবং ওপেনিংয়ে এমন একটি জায়গা তৈরি করেছেন, যেখানে তিনি দীর্ঘদিন ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার হয়ে থাকতে পেরেছেন।
এই রেকর্ড ভাঙার ঘটনাকে তাই রোহিতের ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটের প্রজন্মান্তরের গল্প হিসেবেও দেখা যায়। একদিকে সচিন, যিনি ভারতীয় ক্রিকেটকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে রোহিত, যিনি আধুনিক যুগে সেই ঐতিহ্যকে নিজের ব্যাটিং দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দুজনের ব্যাটিংয়ের ধরন আলাদা হলেও তাঁদের প্রভাবের জায়গায় রয়েছে অসাধারণ মিল।
ক্রিকেটে সময় কখনও থেমে থাকে না। আজ যে রেকর্ডকে অমর মনে হচ্ছে, কাল হয়তো কোনও তরুণ ক্রিকেটার সেটিও ভেঙে দেবেন। কিন্তু কিছু রেকর্ড ভাঙার সময় যে গল্প তৈরি হয়, সেটাই থেকে যায়। সচিনের রেকর্ডের ক্ষেত্রে সেই গল্পে এখন রোহিতের নাম যুক্ত হয়েছে। ২২ বছর ধরে টিকে থাকা একটি কীর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ‘হিটম্যান’ দেখিয়ে দিয়েছেন যে আধুনিক ক্রিকেটেও কিংবদন্তিদের তৈরি করা সীমা নতুন প্রজন্মের তারকারা অতিক্রম করতে পারে।
রোহিতের সামনে এখনও ক্রিকেটের আরও অনেক অধ্যায় লেখা বাকি থাকলে তাঁর প্রতিটি বড় ইনিংস নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। বয়স, ফিটনেস, ফর্ম এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিবর্তিত বাস্তবতা সবকিছুর মধ্যেও তিনি যে মানের ক্রিকেট খেলেছেন, তা তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় ব্যাটার করে তুলেছে। তাঁর রেকর্ডের তালিকায় আরও কত নাম যুক্ত হবে, তা সময়ই বলবে। তবে সচিনের দীর্ঘদিনের রেকর্ডে আঘাত হেনে নতুন ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখানো নিঃসন্দেহে তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।
আজ যখন ক্রিকেটপ্রেমীরা সচিনের পুরনো কীর্তি এবং রোহিতের নতুন সাফল্য পাশাপাশি দেখছেন, তখন আসলে তাঁরা ভারতীয় ক্রিকেটের দুই ভিন্ন যুগকে একসঙ্গে দেখতে পাচ্ছেন। একসময় যে রেকর্ড তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে অনুপ্রেরণা ছিল, আজ সেই রেকর্ডের পাশে নতুন নাম যুক্ত হয়েছে। সচিন যেখানে থেমেছিলেন, সেখান থেকেই যেন রোহিত নতুন গল্প লিখছেন এটাই ক্রিকেটের সৌন্দর্য।
রেকর্ড ভাঙা মানেই পুরনো কিংবদন্তিকে মুছে দেওয়া নয়। বরং পুরনো কিংবদন্তির কীর্তিকে আরও একবার স্মরণ করার সুযোগ তৈরি করা। রোহিতের এই সাফল্যও তাই সচিনের মহত্ত্বকে আরও একবার সামনে নিয়ে আসে। কারণ যে রেকর্ড ২২ বছর ধরে টিকে ছিল, সেটি ভাঙতে হলে সেই মানের ক্রিকেটই প্রয়োজন ছিল। রোহিত সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন এবং নিজের ব্যাট দিয়ে তার উত্তর দিয়েছেন।
ক্রিকেট ঈশ্বর সচিন তেন্ডুলকর ভারতীয় ক্রিকেটকে যে উত্তরাধিকার দিয়ে গিয়েছেন, তারই পরবর্তী অধ্যায়ে হিটম্যান’ রোহিত শর্মার নাম ক্রমশ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। তাঁর ব্যাটে যখন নতুন রেকর্ড লেখা হয়, তখন শুধু একটি সংখ্যা বদলায় না, বদলে যায় ক্রিকেটের ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠা। ২২ বছর ধরে অক্ষত থাকা সেই রেকর্ডে রোহিতের আঘাত তাই নিছক ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং ভারতীয় ক্রিকেটের দীর্ঘ ঐতিহ্যের মধ্যে নতুন প্রজন্মের আগমনের এক শক্তিশালী বার্তা। সচিনের মতো কিংবদন্তির তৈরি করা মাইলফলককে ছুঁয়ে রোহিত প্রমাণ করেছেন, ক্রিকেটে কোনও রেকর্ডই চিরস্থায়ী নয়। তবে সেই রেকর্ড ভাঙার গল্পই একজন ক্রিকেটারকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী জায়গা করে দেয়।
আর সেই ইতিহাসের পাতায় এখন আরও একবার জ্বলজ্বল করছে ‘হিটম্যান’ রোহিত শর্মার নাম।