রোগা হওয়ার ডায়েট শুরু করলে অনেকেই রুটি খাওয়া ছেড়ে দেন। পুষ্টিবিদেরা জানাচ্ছেন রুটিও প্রোটিনের উৎস হতে পারে। যদি কয়েকটি উপকরণ দিয়ে তৈরি করা যায়। রইল প্রোটিনে ভরপুর রুটির এমন ৩টি রেসিপি।
রুটি অনেকেরই প্রতিদিনের খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু খাবার নিয়ে সচেতন হতে গিয়ে অনেকেই মনে করেন, রুটিতে শুধু কার্বোহাইড্রেট থাকে এবং তাই স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকায় এর জায়গা নেই। আসলে বিষয়টি এতটা সরল নয়। রুটি তৈরি হয় মূলত আটা দিয়ে, আর আটায় কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি কিছু প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজও থাকে। রুটির পুষ্টিগুণ আরও বাড়াতে চাইলে আটা মাখার সময় কয়েকটি সহজ উপকরণ যোগ করা যায়।
বিশেষ করে যাঁরা প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে চান, তাঁদের জন্য এই ধরনের রুটি একটি সহজ বিকল্প হতে পারে। ডাল, ছাতু, সয়া, দই কিংবা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সাধারণ রুটিকেই আরও পুষ্টিকর করে তোলা সম্ভব।
তবে মনে রাখা দরকার, শুধু একটি খাবার খেলে ওজন কমে বা বেড়ে যায়—এমন ধারণা ঠিক নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি, মোট খাবারের পরিমাণ, দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ, ঘুম এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস—সবকিছুর ওপর স্বাস্থ্যের প্রভাব নির্ভর করে। তাই রুটি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে কীভাবে সেটিকে আরও পুষ্টিকর করা যায়, সেটিই হতে পারে বেশি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।
নিচে রইল এমন ৩টি সহজ প্রোটিনসমৃদ্ধ রুটির রেসিপি, যা বাড়িতেই তৈরি করা যায়।
ডাল শুধু ডালনা বা তরকারি হিসেবেই খেতে হবে এমন নয়। ভিজিয়ে রাখা বা রান্না করা ডাল রুটির আটার সঙ্গে মিশিয়েও ব্যবহার করা যায়। ডালে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থাকে। ফলে সাধারণ আটার রুটির তুলনায় এই রুটিতে প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি যোগ করা সম্ভব।
প্রথমে ডাল ভালো করে ধুয়ে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। এরপর নরম করে সেদ্ধ করে নিন। ডাল খুব বেশি পাতলা করবেন না। ঠান্ডা হলে সেটিকে ভালোভাবে চটকে বা ব্লেন্ড করে নিন।
এবার একটি পাত্রে গমের আটা নিন। তার সঙ্গে চটকানো ডাল, সামান্য দই এবং প্রয়োজনমতো জল দিয়ে মেখে নিন। চাইলে সামান্য জিরে বা ধনেপাতা যোগ করতে পারেন।
ময়দা বা আটার মিশ্রণটি কয়েক মিনিট ভালোভাবে মাখুন। এরপর কিছুক্ষণ ঢেকে রাখুন। এতে আটা নরম হবে এবং রুটি বেলতেও সুবিধা হবে।
এরপর ছোট ছোট লেচি কেটে সাধারণ রুটির মতো বেলে নিন। মাঝারি আঁচে তাওয়া গরম করে রুটি দু’দিক থেকে ভালোভাবে সেঁকে নিন।
এই রুটি ডাল, দই, সবজি বা অন্য কোনো পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে।
ছাতু অনেক ভারতীয় পরিবারেই পরিচিত একটি খাবার। বিশেষ করে ভাজা ছোলার ছাতুতে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও ফাইবার থাকে। আটার সঙ্গে ছাতু মিশিয়ে রুটি তৈরি করলে সাধারণ রুটির স্বাদে সামান্য পরিবর্তন আসার পাশাপাশি পুষ্টিগুণও বাড়ানো যায়।
একটি বড় পাত্রে গমের আটা এবং ছাতু নিন। দু’টি উপকরণ ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এরপর সামান্য লবণ, ধনেপাতা এবং কাঁচালঙ্কা যোগ করতে পারেন।
এবার অল্প অল্প করে জল দিয়ে মাখতে থাকুন। ছাতু জল শোষণ করে, তাই একসঙ্গে বেশি জল না দিয়ে ধীরে ধীরে জল দেওয়া ভালো।
আটা মাখা হয়ে গেলে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখুন। এরপর লেচি তৈরি করে রুটি বেলে নিন।
তাওয়া মাঝারি আঁচে গরম করে রুটি সেঁকে নিন। চাইলে সামান্য তেল বা ঘি ব্যবহার করা যায়, তবে রান্নার পদ্ধতি ও ব্যবহৃত তেলের পরিমাণ ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী ঠিক করা উচিত।
ছাতুর রুটির সঙ্গে টক দই, সবজি বা ডাল খেলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাবার তৈরি করা যায়।
উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস হিসেবে সয়া ব্যবহার করা হয়। সয়া গ্র্যানুল বা সয়া ফ্লাওয়ার ব্যবহার করে রুটির প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। তবে সয়া ব্যবহার করার সময় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি, কারণ বেশি সয়া দিলে রুটি শক্ত বা শুকনো হয়ে যেতে পারে।
যদি সয়া গ্র্যানুল ব্যবহার করেন, প্রথমে সেগুলি গরম জলে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে নিন। এরপর জল ভালোভাবে চেপে বের করে গ্রাইন্ডারে হালকা করে গুঁড়ো করে নিতে পারেন।
এবার গমের আটার সঙ্গে সয়া মিশিয়ে নিন। সামান্য দই, লবণ এবং ধনেপাতা যোগ করুন। প্রয়োজনমতো জল দিয়ে নরম করে মেখে নিন।
মিশ্রণটি কিছুক্ষণ ঢেকে রাখার পর ছোট লেচি তৈরি করুন। খুব পাতলা না করে মাঝারি পুরু করে রুটি বেলে নিন।
গরম তাওয়ায় দু’দিক ভালোভাবে সেঁকে নিন। রুটি যাতে অতিরিক্ত শুকিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
সয়া রুটি সবজি, ডাল বা দইয়ের সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে।
শুধু আটা বদলালেই খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ অনেকটা বেড়ে যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বরং পুরো খাবারটির দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রুটির সঙ্গে ডাল, ছোলা, রাজমা, মটরশুঁটি, দই, পনির, ডিম বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যোগ করা যেতে পারে। যাঁরা নিরামিষ খাবার খান, তাঁদের জন্য ডাল, ছোলা, সয়া, দই, পনির এবং বিভিন্ন ধরনের ডালজাতীয় খাবার প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।
একই সঙ্গে শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখাও জরুরি। কারণ শরীরের জন্য শুধু প্রোটিন নয়, কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ এবং পর্যাপ্ত জলও প্রয়োজন।
রুটিকে একা ওজন বাড়ার কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। শরীরের ওজন বিভিন্ন বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট খাবারকে সম্পূর্ণ দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়।
রুটিতে কার্বোহাইড্রেট থাকে, আর কার্বোহাইড্রেট শরীরের গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে কার্বোহাইড্রেটকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কোন ধরনের খাবার, কতটা পরিমাণে এবং অন্যান্য খাবারের সঙ্গে কীভাবে খাওয়া হচ্ছে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গোটা গমের আটায় ফাইবার থাকে, যা খাবারের সামগ্রিক পুষ্টিমান বাড়াতে সাহায্য করে। রুটির সঙ্গে প্রোটিন ও সবজি যোগ করলে খাবারটি আরও বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর হতে পারে।
‘ডায়েট’ শব্দটির অর্থ অনেকের কাছে শুধুই ওজন কমানোর খাবার। কিন্তু আসলে ডায়েট বলতে একজন মানুষের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসকে বোঝায়। সুস্থ থাকার জন্য প্রত্যেকের খাবারের প্রয়োজন একরকম নয়।
কারও বয়স, শারীরিক কার্যকলাপ, দৈনন্দিন রুটিন এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যের পরিমাণ ও ধরন আলাদা হতে পারে। তাই শুধু রোগা হওয়ার উদ্দেশ্যে ভাত বা রুটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়।
বরং খাবারের বৈচিত্র্য বজায় রেখে পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, শস্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, প্রোটিন রুটি মানেই যে সাধারণ রুটির তুলনায় সবসময় অনেক বেশি প্রোটিন থাকবে, তা নয়। ব্যবহৃত উপকরণ এবং তার পরিমাণের ওপর পুষ্টিমান নির্ভর করে।
দ্বিতীয়ত, শুধু রুটির ওপর নির্ভর করে দিনের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। সারাদিনের খাবারে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রোটিন পাওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, কোনো বিশেষ স্বাস্থ্যগত সমস্যা, খাবারে অ্যালার্জি বা নির্দিষ্ট খাদ্যনিয়ম থাকলে নতুন কোনো উপকরণ নিয়মিত খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শরীরের ওজন বা চেহারার পরিবর্তনের জন্য খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়। বেড়ে ওঠার সময়ে পর্যাপ্ত ও বৈচিত্র্যময় পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনটি রেসিপির মধ্যে কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত, তা নির্ভর করবে আপনার স্বাদ, খাদ্যাভ্যাস এবং সহজলভ্য উপকরণের ওপর।
ডাল মিশিয়ে রুটি তৈরি করলে ডাল থেকে প্রোটিন যোগ করা যায়। ছাতু মেশানো রুটি দ্রুত ও সহজে তৈরি করা যায় এবং ছোলার ছাতু অনেক জায়গায় সহজেই পাওয়া যায়। অন্যদিকে সয়া ব্যবহার করলে উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের একটি অতিরিক্ত উৎস পাওয়া যায়।
তবে তিন ক্ষেত্রেই মূল বিষয় হলো—রুটিকে একটি সম্পূর্ণ খাবারের অংশ হিসেবে দেখা। রুটির সঙ্গে প্রোটিনের অন্য উৎস এবং সবজি যোগ করলে খাবারটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
রুটি স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হতে পারে। তাই খাবার থেকে রুটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার আগে সেটিকে কীভাবে আরও পুষ্টিকর করা যায়, সে বিষয়ে ভাবা যেতে পারে। আটা মাখার সময় ডাল, ছাতু বা সয়ার মতো উপকরণ যোগ করলে রুটিতে অতিরিক্ত প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি যুক্ত করা সম্ভব।
তবে কোনো একটি খাবারকে ‘ম্যাজিক’ খাবার হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস। এই ৩টি প্রোটিনসমৃদ্ধ রুটি সেই খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবে রাখা যেতে পারে।