আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির শেষ সফর ঘিরে আবেগঘন বার্তা দিল দেশটির ফুটবল সংস্থা। কিংবদন্তি এই ফুটবলারের বিদায় মুহূর্তে আবেগে ভাসছে গোটা ফুটবল বিশ্ব।
আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে লিয়োনেল মেসির শেষ অধ্যায় ঘনিয়ে এসেছে। দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ফুটবল কেরিয়ারে যে ফুটবলার আর্জেন্টিনাকে একের পর এক সাফল্য এনে দিয়েছেন, সেই কিংবদন্তিই এবার জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচকে ঘিরে তাই শুধু আর্জেন্টিনা নয়, গোটা ফুটবল বিশ্বেই তৈরি হয়েছে আবেগের আবহ।
আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্থা জাতীয় শিবিরে মেসির যোগ দেওয়ার ছবি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেছে। সেই ছবির সঙ্গে দেওয়া হয়েছে আবেগঘন বার্তাও। মেসিকে উদ্দেশ্য করে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার বার্তা— “তোমাকে দেখতে সব সময়ই ভাল লাগে, গোট।” স্বাভাবিক ভাবেই এই পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগকে আরও উসকে দিয়েছে।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারকে শুধুমাত্র পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তাঁর কেরিয়ারে যেমন রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, তেমনই রয়েছে একের পর এক ঐতিহাসিক সাফল্য। বিশ্বকাপ থেকে কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা থেকে অলিম্পিক্স সোনা— জাতীয় দলের হয়ে সম্ভাব্য প্রায় সব বড় ট্রফিই নিজের করে নিয়েছেন মেসি।
মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় অধ্যায় নিঃসন্দেহে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন মেসি। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক ফাইনাল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফাইনালে মেসি জোড়া গোল করেছিলেন। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময়ের পর ম্যাচের ফল ছিল ৩-৩। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। সেই সাফল্যের সঙ্গে মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও পূরণ হয়।
বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসি আর শুধুমাত্র আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা ফুটবলার ছিলেন না; দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলির একজন হয়ে ওঠেন। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা যে সাফল্য পেয়েছে, তা মেসির উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সাফল্যের তালিকা শুধু বিশ্বকাপেই থেমে নেই। ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের পর মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনও ট্রফি জিততে না পারার যে আক্ষেপ বছরের পর বছর তাঁকে ঘিরে ছিল, কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে তার অনেকটাই শেষ হয়।
এর পর ২০২২ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিরুদ্ধে ফাইনালিসিমা জেতে আর্জেন্টিনা। ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচেও মেসির পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। ফলে পরপর বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের পথে আরও একটি অধ্যায় যুক্ত হয় তাঁর কেরিয়ারে।
এর আগে ২০০৮ সালের বেজিং অলিম্পিক্সে আর্জেন্টিনার হয়ে সোনা জিতেছিলেন মেসি। ফলে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে রয়েছে অলিম্পিক্স সোনা, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ— এমন একটি সাফল্যের তালিকা, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
আর্জেন্টিনার সিনিয়র জাতীয় দলে মেসির পথচলা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। সেই সময় একজন প্রতিভাবান তরুণ হিসেবে জাতীয় দলের জার্সি পরেছিলেন তিনি। এরপর কেটে গিয়েছে দুই দশকেরও বেশি সময়। সেই সময়ের মধ্যে মেসি বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলের ইতিহাস।
শুরুতে তাঁকে ঘিরে ছিল বিপুল প্রত্যাশা। ক্লাব ফুটবলে একের পর এক সাফল্য পেলেও জাতীয় দলের হয়ে বড় ট্রফি না পাওয়ায় তাঁকে নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমালোচনার জায়গা নিয়েছে শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকার কার্যত সম্পূর্ণ হয়ে যায়। জাতীয় দলের হয়ে নিজের সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বপ্ন পূরণ করার পর তাঁর বিদায়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় আরও জোরালো ভাবে।
মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচকে ঘিরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে আবেগের মাত্রা যে অন্যরকম, তা বলাই বাহুল্য। বছরের পর বছর যে ফুটবলারকে তাঁরা মাঠে দেখেছেন, তাঁর পায়ের জাদুতে আনন্দ পেয়েছেন, তাঁর ব্যর্থতায় হতাশ হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ হাতে তুলে নিতে দেখেছেন— সেই ফুটবলারই এবার জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামতে পারেন।
ঘরের মাঠে প্রিয় সমর্থকদের সামনে মেসির বিদায় আরও বিশেষ হয়ে উঠতে চলেছে। তাঁর জন্য বিশেষ সম্মাননা ও বিদায় সংবর্ধনার পরিকল্পনাও রয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার।
এমন একটি মুহূর্তে স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শকের সামনে মেসিকে দেখা মানেই আবেগের বিস্ফোরণ। সমর্থকদের কাছে এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং একটি যুগের সমাপ্তির প্রতীক।
মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল কেরিয়ারকে একটি প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি বললেও অত্যুক্তি হবে না। তাঁর সঙ্গে বড় হয়েছে অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী। যারা ছোটবেলায় মেসিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখেছে, তারা তাঁর কেরিয়ারের উত্থান, হতাশা, প্রত্যাবর্তন এবং বিশ্বজয়ের সাক্ষী।
বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের গল্প যেন পূর্ণতা পেয়েছিল। কিন্তু তাঁর মাঠে থাকার সময় যত এগিয়েছে, ততই সমর্থকদের মনে হয়েছে— একদিন না একদিন এই কিংবদন্তিকেও বিদায় জানাতে হবে।
সেই বিদায়ের সময় যত এগিয়ে এসেছে, আবেগ তত বেড়েছে।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে মেসির পরিসংখ্যানই বলে দেয় তাঁর প্রভাব কতটা বিশাল। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে তিনি দেশের হয়ে অসংখ্য ম্যাচ খেলেছেন এবং গোলের রেকর্ড গড়েছেন। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের গোল করাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁর সাফল্যের তালিকায় রয়েছে—
তবে সংখ্যার বাইরেও মেসির গুরুত্ব অনেক বেশি। তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবলে এমন একটি উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে মেসির গুরুত্ব শুধুমাত্র একজন তারকা ফুটবলার হিসেবে নয়। তিনি দেশের ফুটবল সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন।
বিশ্বকাপের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে বড় ট্রফি না জেতায় মেসিকে ঘিরে যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর বদলাতে শুরু করে। এরপর ফাইনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ জয় তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার রাস্তায় যে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, তা মেসি এবং দেশের মানুষের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। কোটি কোটি মানুষ তাঁদের অধিনায়ককে বিশ্বকাপ হাতে দেখে উদ্যাপন করেছিলেন।
এখন সেই মানুষটির বিদায়ের সময় সামনে আসায় আবেগও তাই স্বাভাবিক ভাবেই তীব্র।
মেসির বিদায়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনাও হতে চলেছে। মেসির মতো একজন কিংবদন্তির জায়গা সরাসরি কেউ পূরণ করতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে তাঁর পরে আসা তরুণ ফুটবলারদের সামনে থাকবে মেসির তৈরি করা মানদণ্ড।
জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এখন আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রজন্মের অন্যতম বড় দায়িত্ব। মেসি যে উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন, সেটিকে সামনে রেখেই এগোতে হবে তাঁদের।
আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্থার আবেগঘন বার্তাতেও যেন সেই সম্পর্কেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। “গোট” বলে মেসিকে সম্বোধন করার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং সম্মান।
মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ নিয়ে শুধু আর্জেন্টিনার সমর্থকরাই আগ্রহী নন। গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন এই বিশেষ মুহূর্তের জন্য। কারণ আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির উপস্থিতি মানেই একটি আলাদা আকর্ষণ।
একজন ফুটবলার হিসেবে মেসি ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁর অবসর সেই ইতিহাসকে শেষ করবে না; বরং তাঁর কেরিয়ারের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
মাঠে মেসিকে আর দেখা যাবে না— এমন সম্ভাবনা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে নিঃসন্দেহে আবেগের। কিন্তু তাঁর খেলা, গোল, ড্রিবল, পাস, নেতৃত্ব এবং ট্রফি— সবই থেকে যাবে ফুটবল ইতিহাসের অংশ হিসেবে।
মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা। এত বছর ধরে যে দল মেসিকে কেন্দ্র করে খেলেছে, সেই দলকে ধীরে ধীরে নতুন কাঠামোয় এগোতে হবে।
তবে মেসি যে ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছেন, সেটিই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বড় সম্পদ। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন একটি দলের আত্মবিশ্বাস, অভিজ্ঞতা এবং সাফল্যের সংস্কৃতি এখন আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মেসির উত্তরসূরি কে হবেন, কে নেতৃত্ব দেবেন, কারা দলের মূল তারকা হয়ে উঠবেন— এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, মেসির মতো একজন ফুটবলারের বিদায় সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
একদিন যে তরুণ ফুটবলার আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পথচলা শুরু করেছিলেন, আজ সেই মেসিই সেই জার্সিতে নিজের শেষ অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে।
বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। কোপা আমেরিকা জিতেছেন। ফাইনালিসিমা জিতেছেন। অলিম্পিক্সে সোনা জিতেছেন। দেশের হয়ে অসংখ্য গোল করেছেন। সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন। রেকর্ড ভেঙেছেন, নতুন রেকর্ড তৈরি করেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, যা বহু বছর পরেও স্মরণ করা হবে।
তাই মেসির শেষ ম্যাচ শুধুমাত্র আরেকটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি একটি যুগকে বিদায় জানানোর মুহূর্ত। যে যুগের কেন্দ্রে ছিলেন লিয়োনেল মেসি— এলএম টেন।
ঘরের মাঠে যখন নীল-সাদা জার্সি পরে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন তিনি, তখন হয়তো গ্যালারির হাজার হাজার মানুষ একই সঙ্গে আনন্দ, গর্ব এবং বিষাদের অনুভূতি নিয়ে তাঁকে দেখবেন।
কারণ কিংবদন্তিদের বিদায় কখনও শুধুই বিদায় হয় না। তাঁদের বিদায় হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ।
আর আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিয়োনেল মেসির গল্পও ঠিক তেমনই— এক দীর্ঘ অপেক্ষা, অসংখ্য স্বপ্ন, কিছু কঠিন পরাজয়, তারপর একের পর এক ট্রফি এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক হিসেবে বিদায়ের পথে হাঁটা।
নীল-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ অধ্যায় তাই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল বিশেষ হয়ে থাকবে। তাঁর জায়গা হয়তো একদিন অন্য কোনও ফুটবলার নেবেন, কিন্তু মেসি হয়ে ওঠার গল্প আর কোনও দিন পুনরাবৃত্তি হবে না।
এলএম টেনের শেষ আন্তর্জাতিক অধ্যায়— আবেগ, স্মৃতি এবং গর্বের এক অনন্য সমাপ্তি।