Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘বলেছিলাম, সাবধানে ঘুরবি মা…’ মেয়ের সঙ্গে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শেষ কথা, তারপরই চোরবাগানের মর্মান্তিক খবর

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মেয়ের সঙ্গে শেষবার ফোনে কথা হয়েছিল মায়ের। মেয়ে জানিয়েছিল, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরছে, খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে। এরপরই চোরবাগানের ভয়াবহ পদপিষ্টের খবর। মেয়েকে হারিয়ে এখন বারবার সেই শেষ কথাই মনে পড়ছে পরিবারের।

বলেছিলাম, সাবধানে ঘুরবি মা।’
এই কয়েকটি কথাই এখন বারবার মনে পড়ছে শোকস্তব্ধ পরিবারের। যে মেয়েটি সন্ধ্যার সময় বন্ধুদের সঙ্গে দুর্গাপুজো দেখতে বেরিয়েছিল, যে মেয়ে ফোন করে মাকে জানিয়েছিল—‘বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে’—সেই মেয়ের সঙ্গেই সেটিই হয়ে উঠল শেষ কথা।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল পরিবারের। কথাবার্তায় কোনও অস্বাভাবিকতার আভাস ছিল না বলেই পরিবারের দাবি। বরং মেয়ের গলায় ছিল স্বাভাবিক আনন্দের সুর। পুজোর দিন, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, মণ্ডপ দেখা, খাওয়া-দাওয়া—সব মিলিয়ে উৎসবের সন্ধ্যা কাটছিল তার। মা-ও হয়তো ভাবেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই আনন্দের সন্ধ্যা পরিণত হবে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে।

মেয়ে ফোনে জানিয়েছিল, সে বন্ধুদের সঙ্গে রয়েছে। খাওয়া-দাওয়াও হয়ে গিয়েছে। হয়তো এরপর আরও কিছুক্ষণ পুজো ঘুরে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনাই ছিল। মায়ের স্বাভাবিক উদ্বেগ থেকেই শেষবার বলা হয়েছিল, ‘সাবধানে ঘুরবি মা।’ তারপর ফোন কেটে যায়।

তারপর?

তারপর আসে সেই ভয়াবহ খবর।

চোরবাগানে দুর্গাপুজোর ভিড়ে পদপিষ্টের ঘটনায় একের পর এক মানুষ আহত হচ্ছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিবারের দুশ্চিন্তা শুরু হয়। প্রথমে হয়তো বিশ্বাসই করতে পারেননি তাঁরা। কারণ কিছুক্ষণ আগেই তো মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। মেয়ে ভালো ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে ছিল। খাওয়া-দাওয়া করেছিল। তাহলে হঠাৎ এমন কী হল?

ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। উৎসবের আলো, মানুষের ভিড়, মণ্ডপের আনন্দ—সবকিছুর মধ্যে এক পরিবারের কাছে তখন একটাই চিন্তা, মেয়েটা কোথায়?

চোরবাগানের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর যত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, ততই উদ্বেগ বাড়তে থাকে পরিবারের। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ শুরু হয়। পরিচিতদের ফোন করা হয়। মেয়ের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলে। কে কোথায় আছে, কে নিরাপদে আছে, কার কী খবর—সবকিছু জানার চেষ্টা করতে থাকে পরিবার।

কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে কয়েক মিনিটও যেন কয়েক ঘণ্টার মতো মনে হয়।

একদিকে চারদিকে উৎসবের ভিড়, অন্যদিকে প্রিয়জনের খোঁজে উৎকণ্ঠিত পরিবার। ফোনের ওপারে আর মেয়ের পরিচিত কণ্ঠস্বর নেই। যে মেয়েটি কিছুক্ষণ আগেও মাকে বলেছিল, ‘বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি’, সেই মেয়ের কোনও খবরই পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিবারের কাছে সবচেয়ে বেশি কষ্টের বিষয় হয়ে উঠেছে সেই শেষ ফোনকল। কথাগুলি বারবার কানে বাজছে। ‘খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে।’ কত সাধারণ একটি কথা। প্রতিদিনের জীবনে এমন কথা কতবারই না বলা হয়। কিন্তু কখনও কখনও একটি সাধারণ কথাই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শেষ স্মৃতি।

মা এখন সেই কথাগুলিই মনে করছেন। মনে পড়ছে মেয়ের গলার স্বর। মনে পড়ছে, পুজোর সন্ধ্যায় মেয়ের বাইরে যাওয়ার কথা। মনে পড়ছে, যাওয়ার আগে হয়তো কী কী কথা হয়েছিল। আর বারবার মনে পড়ছে নিজের বলা সেই সতর্কবার্তা—‘সাবধানে ঘুরবি মা।’

কেউ কি কখনও ভাবতে পারেন, এই কথাটিই একদিন শেষ কথা হয়ে যাবে?

চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর এমনই অসংখ্য পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে শোক। উৎসব দেখতে বেরিয়ে যাওয়া মানুষদের মধ্যে কেউ আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। কেউ আবার এখনও প্রিয়জনের খোঁজে ছুটছেন।

দুর্গাপুজো বাঙালির অন্যতম বড় উৎসব। বছরের এই কয়েকটি দিনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে থাকে অন্যরকম উচ্ছ্বাস। নতুন জামাকাপড়, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন, রাত জেগে পুজো দেখা—সব মিলিয়ে শহর এবং শহরতলির রাস্তায় নেমে আসে মানুষের ঢল।

সপ্তমীর সন্ধ্যাতেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। মানুষ বেরিয়েছিলেন পুজো দেখতে। পরিবার নিয়ে কেউ, আবার বন্ধুদের সঙ্গে কেউ। তরুণ-তরুণীদের অনেকেই সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। চোরবাগানেও জমেছিল বিপুল ভিড়।

কিন্তু উৎসবের সেই ভিড়ই একসময় ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।

মানুষের ভিড়ের মধ্যে আচমকা চাপ তৈরি হয়। শুরু হয় হুড়োহুড়ি। কে আগে বেরোবেন, কে কোথা দিয়ে যাবেন—কিছুই বোঝার উপায় থাকে না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কেউ পড়ে গেলে তাঁকে ওঠানোর সুযোগও অনেক সময় থাকে না। পিছন থেকে আসা মানুষের চাপ আরও বাড়তে থাকে।

চোরবাগানের ঘটনাতেও ঠিক কীভাবে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা তদন্তের বিষয়। তবে ঘটনার ভয়াবহতা সামনে আসার পর থেকেই নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

পরিবারের কাছে অবশ্য এসব প্রশ্নের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন—মেয়েটা কেন আর বাড়ি ফিরল না?

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সেই ফোনকল এখন পরিবারের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে গিয়েছে। মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনটি হয়তো তখন একেবারেই স্বাভাবিক ছিল। মা হয়তো জানতে চেয়েছিলেন, কোথায় রয়েছে। মেয়ে জানিয়েছিল, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরছে। খাওয়া হয়ে গিয়েছে। তারপর হয়তো আরও কিছুক্ষণ কথা হয়েছে।

এরপর মা বলেছিলেন, ‘সাবধানে ঘুরবি মা।’

সাধারণ একটি মায়ের সাধারণ উদ্বেগ। কিন্তু সেই কথার মধ্যে কতটা ভালোবাসা, কতটা মমতা এবং কতটা নিরাপত্তার চিন্তা ছিল, তা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

একজন মা যখন সন্তানকে বাইরে যেতে বলেন, তখন তাঁর মনে কত প্রশ্ন থাকে—কখন ফিরবে, কার সঙ্গে থাকবে, নিরাপদে ফিরবে তো? ফোন করবে তো? রাস্তায় কোনও সমস্যা হবে না তো? পুজোর ভিড় বেশি, সাবধানে থাকবে তো?

সেই সমস্ত উদ্বেগই হয়তো সেই একটি বাক্যে প্রকাশ পেয়েছিল—‘সাবধানে ঘুরবি মা।’

কিন্তু উৎসবের ভিড়ে সেই সতর্কবার্তাও যেন অসহায় হয়ে গেল।

ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা যে মানসিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক, অন্যদিকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনার কারণ জানার অপেক্ষা। কী হয়েছিল? কীভাবে হয়েছিল? ঠিক কোন সময়ে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছিল? মেয়েটি তখন কার সঙ্গে ছিল? তাকে কীভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল? হাসপাতালে কখন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?—একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তাঁরা।

এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া এখন তদন্তকারীদের দায়িত্ব।

চোরবাগানের ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগও উঠেছে। ঘটনায় ১২ জনকে আটক করে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ঘাটতি ছিল কি না, ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যথাযথভাবে কাজ করেছিলেন কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।

পরিবারগুলির কাছে তদন্ত শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়। তাঁদের কাছে তদন্ত মানে সত্যিটা জানা। প্রিয়জন কীভাবে মারা গেলেন, কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হল এবং এই মৃত্যু কি কোনওভাবে এড়ানো সম্ভব ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর তাঁদের প্রয়োজন।

কারণ কোনও পরিবারই চায় না, একটি উৎসবের দিন তাদের ঘর শ্মশানের নীরবতায় ভরে উঠুক।

যে মেয়েটি কয়েক ঘণ্টা আগেও বন্ধুদের সঙ্গে হাসছিল, পুজো দেখছিল, খাওয়া-দাওয়া করছিল, তার হঠাৎ চলে যাওয়া পরিবারের কাছে এখনও যেন অবিশ্বাস্য। হয়তো বাড়ির কোনও ঘরে এখনও তার ব্যবহার করা জিনিসপত্র পড়ে রয়েছে। হয়তো ফোনের কনট্যাক্ট লিস্টে এখনও তার নাম রয়েছে। হয়তো পরিবারের কেউ এখনও অভ্যাসবশত তার ফোন আসার অপেক্ষা করছেন।

কিন্তু ফোন আর আসবে না।

শুধু থেকে যাবে সেই শেষ ফোনকল।

‘বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

‘খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে।’

আর মায়ের শেষ কথা—

‘সাবধানে ঘুরবি মা।’

এই কয়েকটি বাক্যই এখন পরিবারের কাছে একটি সম্পূর্ণ জীবনের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্গাপুজোর সময় শহরে বিপুল মানুষের সমাগম হয়। বিশেষ করে সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধ্যায় বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য আগাম পরিকল্পনা করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক, ব্যারিকেড, আলাদা প্রবেশ ও বহির্গমন পথ, জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা এবং অ্যাম্বুল্যান্স চলাচলের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

কারণ বড় জমায়েতে একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

একজন মানুষ পড়ে গেলে তাঁর পিছনে থাকা মানুষদেরও ভারসাম্য হারানোর সম্ভাবনা থাকে। কোনও একটি জায়গায় যদি মানুষের চাপ আটকে যায়, তাহলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই ভিড়ের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানুষের চলাচলের পথ পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চোরবাগানের ঘটনার পর এই প্রশ্নগুলিই নতুন করে সামনে এসেছে।

পুজো উদ্যোক্তাদের কি আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল?

প্রশাসনের প্রস্তুতি কি যথেষ্ট ছিল?

ভিড়ের পরিমাণ অনুযায়ী নিরাপত্তাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবক কি পর্যাপ্ত ছিলেন?

জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষকে দ্রুত বের করে আনার মতো ব্যবস্থা কি ছিল?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে।

কারণ চোরবাগানের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। এমন ঘটনায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেউ সন্তান হারান, কেউ বাবা-মাকে, কেউ ভাই-বোনকে, কেউ বন্ধু বা জীবনসঙ্গীকে।

উৎসবের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলির পিছনে থাকে অসংখ্য গল্প।

কেউ হয়তো প্রথমবার বন্ধুদের সঙ্গে পুজো দেখতে বেরিয়েছিলেন।

কেউ হয়তো অনেকদিন পর পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন।

কেউ হয়তো কাজের ব্যস্ততার মাঝখানে এক সন্ধ্যার জন্য সময় বের করেছিলেন।

কেউ হয়তো মাকে ফোন করে বলেছিলেন, একটু পরে বাড়ি ফিরবেন।

কিন্তু সেই ‘একটু পরে’ আর আসেনি।

এই ঘটনাই পরিবারগুলির কাছে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

news image
আরও খবর

মেয়ের সঙ্গে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কথা হওয়ার সময় মা হয়তো জানতেনই না যে সেটিই শেষ কথা। মানুষ সাধারণত শেষ কথোপকথনকে শেষ কথা হিসেবে কখনও ভাবেন না। তাই সেখানে কোনও বিদায় থাকে না। থাকে না দীর্ঘ আলিঙ্গন। থাকে না ‘ভালো থেকো’ বলা। থাকে না শেষবার মুখোমুখি দেখা।

থাকে শুধু খুব সাধারণ কিছু কথা।

‘কোথায় আছিস?’

‘বন্ধুদের সঙ্গে আছি।’

‘খেয়েছিস?’

‘হ্যাঁ, খাওয়া হয়ে গিয়েছে।’

‘সাবধানে ঘুরবি।’

তারপর ফোন কেটে যায়।

এই সাধারণ কথাগুলিই পরে অসাধারণ মূল্যবান হয়ে ওঠে।

পরিবারের সদস্যরা হয়তো এখন সেই ফোনকলটি বারবার মনে করছেন। ফোনের ওপারে মেয়ের কণ্ঠস্বর কেমন ছিল, কী বলেছিল, কতক্ষণ কথা হয়েছিল—প্রতিটি ছোট মুহূর্তই এখন স্মৃতি।

এমন ঘটনায় পরিবারের মানসিক আঘাত কতটা গভীর হতে পারে, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। হঠাৎ করে প্রিয়জনকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতাটাকেও মেনে নিতে হয়। তার সঙ্গে থাকে নানা প্রশ্ন, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়।

এই কারণেই দুর্ঘটনার সঠিক তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি কোথাও গাফিলতি থেকে থাকে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ঘাটতি থেকে থাকে, তা সামনে আনা প্রয়োজন। আর যদি ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কোনও বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা দরকার।

কারণ কোনও তদন্তই মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু তদন্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের প্রাণহানি আটকানো সম্ভব।

চোরবাগানের ঘটনার পর তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পুজোর মতো বড় উৎসবে আনন্দের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

একটি মণ্ডপ যতই সুন্দর হোক, যতই জনপ্রিয় হোক, যতই বিপুল মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠুক—সেখানে মানুষের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে সেই উৎসবই বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সপ্তমীর সেই সন্ধ্যা তারই এক মর্মান্তিক স্মৃতি হয়ে রইল।

পরিবারের কাছে অবশ্য এসব আলোচনা এখন অনেক দূরের বিষয়। তাঁদের কাছে এখন শুধু মেয়েটি।

যে মেয়েটি বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিল।

যে মেয়েটি ফোনে বলেছিল, ‘খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে।’

যে মেয়েটিকে মা বলেছিলেন, ‘সাবধানে ঘুরবি মা।’

আর যে মেয়েটি আর বাড়ি ফিরল না।

এই একটি ঘটনা একটি পরিবারের সমস্ত আনন্দকে মুহূর্তে বদলে দিয়েছে। পুজোর নতুন জামা, ঘোরাঘুরি, মণ্ডপ দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—সবকিছুই এখন স্মৃতির অংশ।

বাড়ির দরজার দিকে তাকিয়ে হয়তো এখনও মনে হচ্ছে, এই বুঝি মেয়েটি এসে বলবে—‘মা, দরজা খোলো।’

ফোনটা বেজে উঠলে হয়তো এক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছে, মেয়েই ফোন করেছে।

কিন্তু তারপর বাস্তবতা ফিরে আসে।

আর মনে পড়ে যায় সেই শেষ ফোনকল।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা।

মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা।

‘বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

‘খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে।’

মায়ের শেষ সতর্কবার্তা—

‘সাবধানে ঘুরবি মা।’

তারপরই যেন থেমে যায় সবকিছু।

চোরবাগানের মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। ১৯ জনের মৃত্যু মানে ১৯টি পরিবারে শোক, ১৯টি অসমাপ্ত গল্প এবং অসংখ্য মানুষের জীবনে এক গভীর শূন্যতা।

আর প্রতিটি পরিবারের গল্পের মধ্যে হয়তো এমনই কোনও শেষ ফোনকল লুকিয়ে রয়েছে।

কারও বাবা হয়তো ছেলেকে বলেছিলেন, তাড়াতাড়ি ফিরিস।

কেউ হয়তো মেয়েকে বলেছিলেন, বেশি রাত করিস না।

কেউ হয়তো বন্ধুকে বলেছিলেন, ভিড় বেশি, সাবধানে থাকিস।

কেউ হয়তো প্রিয়জনকে বলেছিলেন, পৌঁছলে ফোন করিস।

এই কথাগুলি সাধারণ। প্রতিদিন বলা হয়। কিন্তু কোনও কোনও দিন সেই কথাগুলিই হয়ে ওঠে শেষ স্মৃতি।

চোরবাগানের ঘটনায় তাই মানুষের শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। উৎসবের সময়ে মানুষের ভিড় থাকবে, আনন্দ থাকবে, রাত জেগে পুজো দেখার উৎসাহ থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভিড় যেন কখনও মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশাসন এবং পুজো কমিটিগুলির কাছে এই ঘটনা একটি বড় সতর্কবার্তা। ভিড় যতই হোক, মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপস করা যায় না।

চোরবাগানের তদন্তে প্রকৃত সত্য সামনে আসার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবারগুলি। কার গাফিলতি ছিল, কোথায় ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল এবং কীভাবে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল—সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া প্রয়োজন।

কারণ শোকাহত পরিবারগুলির কাছে শুধু সমবেদনা যথেষ্ট নয়। তাঁদের সত্য জানা দরকার। তাঁদের জানতে হবে, তাঁদের প্রিয়জনের সঙ্গে কী হয়েছিল। এবং যদি কারও গাফিলতি থাকে, তাহলে তার যথাযথ জবাবদিহিও প্রয়োজন।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সেই ফোনকল হয়তো পরিবারের কাছে সারাজীবন থেকে যাবে।

একটি সাধারণ ফোনকল।

একটি সাধারণ কথোপকথন।

একটি মায়ের সাধারণ সতর্কবার্তা।

‘বলেছিলাম, সাবধানে ঘুরবি মা।’

কিন্তু সেই সতর্কবার্তার পর যে ঘটনা ঘটল, তা কোনও মা-বাবার কল্পনাতেও আসতে পারে না।

দুর্গাপুজোর আলোয় ভরা সেই সন্ধ্যা তাই একটি পরিবারের কাছে আজ অন্ধকার স্মৃতি। আনন্দের বদলে কান্না, পুজোর বদলে শোক, ঘোরাঘুরির বদলে হাসপাতাল ও প্রশাসনিক দফতরে ছুটে বেড়ানো—সবকিছু যেন এক রাতেই বদলে গেল।

এখন পরিবারের একটাই দাবি—ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসুক। দুর্ঘটনার কারণ স্পষ্ট হোক। গাফিলতি থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনও মা তাঁর সন্তানকে পুজোর রাতে বাইরে পাঠিয়ে এমন ভয়াবহ অপেক্ষার মধ্যে না পড়েন।

কারণ একটি উৎসবের আনন্দ কোনও মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।

আর সেই কারণেই চোরবাগানের এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়—এটি একটি মায়ের শেষ ফোনকলের স্মৃতি, একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি এবং উৎসবের ভিড়ে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার এক কঠিন সতর্কবার্তা।

Preview image