চিন দ্রুত বাড়াচ্ছে তার ডুবোজাহাজ ও নৌসামরিক শক্তি। এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রশক্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান কোথায়, কার হাতে কতটা শক্তিশালী সাবমেরিন বহর এবং ভবিষ্যতে ভারসাম্য কোন দিকে যেতে পারে—জেনে নিন বিস্তারিত।
বিশ্বের সামরিক ভারসাম্যে সমুদ্র এখন ক্রমশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থলসীমান্তের পাশাপাশি সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তা, সামরিক সরবরাহ এবং কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই নৌবাহিনীর ভূমিকা বেড়েছে। আর এই নৌক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ডুবোজাহাজ বা সাবমেরিন। কারণ, সমুদ্রের গভীরে দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে অবস্থান করে শত্রুপক্ষের গতিবিধি নজরে রাখা, প্রয়োজন হলে আঘাত হানা এবং প্রতিপক্ষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা—এই ক্ষমতা একটি দেশের সামরিক কৌশলে বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার সমুদ্রশক্তির মানচিত্রে চিন, ভারত ও পাকিস্তান—এই তিন দেশের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে। চিন গত কয়েক দশকে তার নৌবাহিনীকে দ্রুত আধুনিকীকরণ করেছে। বিশেষ করে সাবমেরিন প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণের ক্ষমতা এবং নৌবহরের আকার বৃদ্ধিতে বেজিং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। অন্যদিকে ভারতও নিজস্ব পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন এবং প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের মাধ্যমে সমুদ্রের নিচে নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সাবমেরিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের নৌবাহিনী ছোট হলেও সাবমেরিনকে তারা নিজেদের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে। বিশেষ করে ভারতীয় নৌবাহিনীর তুলনামূলক বড় আকারের মোকাবিলায় সাবমেরিন-ভিত্তিক কৌশল পাকিস্তানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চিনের নৌবাহিনী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নৌবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। শুধু যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা নয়, সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমুদ্র নজরদারি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও চিন ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
চিনের সাবমেরিন বহরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত এবং পারমাণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ। প্রচলিত সাবমেরিনের পাশাপাশি চিন তার পারমাণবিক শক্তিচালিত আক্রমণাত্মক সাবমেরিন এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর ফলে চিন শুধু উপকূলীয় জলসীমা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং আরও দূরের সমুদ্রাঞ্চলে কাজ করার ক্ষমতা অর্জন করছে।
চিনের জন্য এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পূর্ব ও দক্ষিণ চিন সাগরের পাশাপাশি ভারত মহাসাগরেও বেজিংয়ের আগ্রহ বাড়ছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ ভারত মহাসাগরের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে চিনের সাবমেরিন শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নও।
ভারতের অবস্থান চিনের থেকে আলাদা। ভারত মহাসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় দেশের নৌকৌশলের ক্ষেত্রে সমুদ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বজায় রাখা।
ভারতের সাবমেরিন বহরে রয়েছে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন এবং পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন বা SSBN। এই ধরনের সাবমেরিন পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ হিসেবে কাজ করে।
সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিনকে শনাক্ত করা কঠিন। ফলে কোনও দেশের স্থলভিত্তিক পরমাণু অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর আঘাত এলেও সমুদ্রভিত্তিক এই শক্তি পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। এটিই পারমাণবিক 'second-strike capability'-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভারতের নিজস্ব পারমাণবিক সাবমেরিন কর্মসূচি তাই শুধু নৌবাহিনীর শক্তি বাড়ানোর প্রকল্প নয়। এটি দেশের সামগ্রিক কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ।
ভারতের প্রচলিত সাবমেরিন বহরেও রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির ডুবোজাহাজ। ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার ক্ষেত্রে পারমাণবিক সাবমেরিনের মতো সক্ষম নয়। তবে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, নজরদারি এবং নির্দিষ্ট সামুদ্রিক এলাকায় অপারেশনের ক্ষেত্রে এগুলির গুরুত্ব যথেষ্ট।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সাবমেরিন বহর আধুনিকীকরণের চেষ্টা করছে। নতুন প্রজন্মের সাবমেরিন সংযোজন, পুরনো সাবমেরিনের আধুনিকীকরণ এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে ডুবোজাহাজ নির্মাণ—এই তিনটি দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল বহরের আকার এবং পুরনো প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তন। আধুনিক সাবমেরিন তৈরি অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। ফলে দ্রুত নতুন সাবমেরিন যোগ করা সহজ নয়।
ভারত ও চিনের তুলনায় পাকিস্তানের নৌবাহিনী ছোট। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক কৌশলে সাবমেরিনের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, তুলনামূলকভাবে ছোট নৌবাহিনী দিয়ে বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাবমেরিন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
পাকিস্তানের সাবমেরিন বহরে ফ্রান্স ও চিনের প্রযুক্তির প্রভাব রয়েছে। চিনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ফলে পাকিস্তান ভবিষ্যতে আরও আধুনিক সাবমেরিন সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সাবমেরিন সংগ্রহের পরিকল্পনা পাকিস্তানের নৌক্ষমতার ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে পারে। এগুলি যুক্ত হলে পাকিস্তানের পানির নিচের যুদ্ধক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চিন ও ভারতের সাবমেরিন শক্তির তুলনা করলে শুধু মোট ডুবোজাহাজের সংখ্যা দেখলে পুরো ছবিটি পাওয়া যাবে না।
সাবমেরিনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—
চিনের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলির একটি হল জাহাজ নির্মাণের বিশাল শিল্পভিত্তি। দেশটি দ্রুত বড় সংখ্যায় যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন তৈরি করতে পারে। এই উৎপাদনক্ষমতা ভবিষ্যতে চিনের নৌবাহিনীর আকার আরও বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
ভারতের শক্তি অন্য জায়গায়। ভারত দীর্ঘদিন ধরে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌ-অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে এবং পারমাণবিক সাবমেরিন কর্মসূচিতে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
ভারত মহাসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল। পারস্য উপসাগর, আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রপথকে সংযুক্ত করে এই অঞ্চল।
বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহণ এই সামুদ্রিক রুটগুলির ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনও বড় শক্তি যদি এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়, তা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের জন্য ভারত মহাসাগর তাই স্বাভাবিক কৌশলগত অগ্রাধিকার। অন্যদিকে চিনের অর্থনীতি সমুদ্রপথে জ্বালানি ও বাণিজ্যের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। ফলে ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা চিনের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গাতেই দুই দেশের নৌকৌশলের মধ্যে প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সাবমেরিন একা কোনও যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে না। তবে এটি একটি দেশের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি আধুনিক সাবমেরিন শত্রুপক্ষের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে, কারণ সমুদ্রের নিচে থাকা অবস্থায় তাকে শনাক্ত করা কঠিন। একটি সাবমেরিনের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত না থাকলেও প্রতিপক্ষকে ধরে নিতে হয় যে সেখানে সাবমেরিন থাকতে পারে। ফলে তাকে অতিরিক্ত নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়।
একে অনেক সময় 'deterrence' বা প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলি কোনও দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ হতে পারে।
চিনের নৌ আধুনিকীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন। পারমাণবিক শক্তির সুবিধা হল এগুলি দীর্ঘ সময় ধরে পানির নিচে থাকতে পারে এবং দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে।
চিনের নৌবাহিনী নিজেদের পারমাণবিক সাবমেরিন প্রযুক্তিকে ক্রমাগত উন্নত করছে। শব্দ কমানোর প্রযুক্তি, সেন্সর, অস্ত্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি আনার চেষ্টা চলছে।
ভবিষ্যতে চিনের সাবমেরিন বহর আরও আধুনিক হলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও তার প্রভাব বাড়তে পারে।
ভারতের জন্য পারমাণবিক সাবমেরিনের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হল কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা। স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বা বিমানঘাঁটি কোনও সংঘাতে আঘাতের লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা সাবমেরিনকে ধ্বংস করা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
এই কারণে সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক অস্ত্র একটি দেশের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।
ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে SSBN তৈরির মাধ্যমে এই সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও উন্নত পারমাণবিক আক্রমণাত্মক সাবমেরিন তৈরির বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সাবমেরিন মূলত প্রচলিত নৌযুদ্ধের পাশাপাশি ভারতের তুলনামূলক বড় নৌক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরির একটি উপায়।
আরব সাগরে পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং করাচি ও গওয়াদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরকে ঘিরে সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নে সাবমেরিনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
চিন-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সাবমেরিন সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে সাবমেরিন শুধু কেনা হলেই শক্তিশালী নৌবাহিনী তৈরি হয় না। প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্র, যোগাযোগ এবং সমুদ্রভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যদি সামগ্রিক সাবমেরিন শক্তির কথা বলা হয়, তাহলে চিন বর্তমানে আকার, উৎপাদনক্ষমতা এবং বিভিন্ন ধরনের সাবমেরিন তৈরির ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে।
ভারত তুলনামূলকভাবে ছোট বহর নিয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক সাবমেরিন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ভারত মহাসাগরে ভৌগোলিক অবস্থানও ভারতের জন্য বড় সুবিধা।
পাকিস্তানের বহর তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও সাবমেরিনকে তার নৌকৌশলের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন সাবমেরিন যুক্ত হলে পাকিস্তানের প্রচলিত পানির নিচের যুদ্ধক্ষমতা বাড়তে পারে।
তাই তিন দেশের শক্তিকে এক লাইনে বিচার করা কঠিন। চিনের শক্তি হল আকার ও শিল্পক্ষমতা, ভারতের শক্তি হল কৌশলগত পারমাণবিক প্রতিরোধ ও ভারত মহাসাগরের ভৌগোলিক সুবিধা, আর পাকিস্তানের শক্তি হল তুলনামূলক ছোট নৌবাহিনীর মধ্যে সাবমেরিনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।
আগামী দিনে সাবমেরিন যুদ্ধ আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সোনার, স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট নজরদারি—সবই সাবমেরিন অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শুধু সাবমেরিনের সংখ্যা নয়, তাকে কতটা নিঃশব্দ রাখা যাচ্ছে এবং কত দ্রুত শত্রুর সাবমেরিন শনাক্ত করা যাচ্ছে—এগুলিও বড় প্রশ্ন।
এখানে 'underwater domain awareness' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সমুদ্রের নিচে কোথায় কী ধরনের সামরিক কার্যকলাপ হচ্ছে, তা শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা।
ভারত ইতিমধ্যেই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই ধরনের নজরদারি ও তথ্য ভাগাভাগির ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। চিনও একইভাবে তার সামুদ্রিক নজরদারি ক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
একটি দেশের সাবমেরিন শক্তির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হল প্রতিপক্ষের সাবমেরিন খুঁজে বের করার ক্ষমতা। এটিকে বলা হয় Anti-Submarine Warfare বা ASW।
যুদ্ধজাহাজ, সামুদ্রিক টহল বিমান, হেলিকপ্টার, সোনার এবং বিভিন্ন সেন্সর ব্যবহার করে সাবমেরিন শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
অর্থাৎ সমুদ্রের নিচের যুদ্ধে একটি দেশ শুধু সাবমেরিন দিয়ে শক্তিশালী হয় না। সাবমেরিন শনাক্ত এবং প্রতিহত করার ক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত, চিন ও পাকিস্তান—তিন দেশই নিজেদের ASW সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সামরিক বিশ্লেষণে অনেক সময় একটি দেশের হাতে কতগুলি সাবমেরিন আছে তা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সংখ্যাই সব নয়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি পুরনো সাবমেরিন এবং অত্যাধুনিক সেন্সর, উন্নত সোনার, আধুনিক অস্ত্র ও কম শব্দের প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন সাবমেরিনের সক্ষমতা এক নয়।
একইভাবে একটি সাবমেরিন কতক্ষণ পানির নিচে থাকতে পারে, কত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং কত দ্রুত তথ্য আদানপ্রদান করতে পারে—এসব বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই চিনের বড় বহর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভারতের নির্দিষ্ট কৌশলগত সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের সাবমেরিনকেন্দ্রিক নৌকৌশলকেও আলাদা করে দেখতে হবে।
ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল সাবমেরিন বহরের আধুনিকীকরণের গতি। নতুন সাবমেরিন নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে পুরনো সাবমেরিনকে অবসর দেওয়া এবং নতুন প্ল্যাটফর্ম যোগ করার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।
দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং দ্রুত নির্মাণক্ষমতা—এই বিষয়গুলি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে পারমাণবিক সাবমেরিন কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রচলিত সাবমেরিন বহরও আধুনিক রাখা প্রয়োজন।
পাকিস্তানের সামনে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অত্যাধুনিক সাবমেরিন কেনা এবং দীর্ঘদিন পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
সাবমেরিনের শুধু ক্রয়মূল্য নয়, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্র, খুচরো যন্ত্রাংশ এবং ঘাঁটি পরিচালনাতেও বড় খরচ হয়।
তবে চিনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পাকিস্তানকে এই ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা দিতে পারে।
চিনের হাতে বড় শিল্পভিত্তি ও বিপুল নৌক্ষমতা থাকলেও তারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দূরবর্তী সমুদ্রাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সাবমেরিন অপারেশন পরিচালনা, যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ভারত মহাসাগরে স্থায়ীভাবে কার্যকর উপস্থিতি তৈরি করা সহজ নয়।
এছাড়া সমুদ্রের নিচে অপারেশন অত্যন্ত জটিল। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষের ASW সক্ষমতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
চিন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সমুদ্রশক্তির প্রতিযোগিতা আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চিন তার বিশাল নৌবহর এবং সাবমেরিন উৎপাদনক্ষমতার মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ভারত অন্যদিকে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত অবস্থান এবং পারমাণবিক সাবমেরিন সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। পাকিস্তান তুলনামূলকভাবে ছোট নৌবাহিনী নিয়ে সাবমেরিনকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
তবে কে সবচেয়ে শক্তিশালী—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সাবমেরিনের সংখ্যা দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। একটি দেশের সমুদ্রশক্তি বিচার করতে হয় সাবমেরিনের প্রযুক্তি, পারমাণবিক সক্ষমতা, অস্ত্রব্যবস্থা, সোনার ও সেন্সর, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, সামুদ্রিক নজরদারি এবং সামগ্রিক নৌকৌশলের ভিত্তিতে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারত মহাসাগর ক্রমশ আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। ফলে চিনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণের পাশাপাশি ভারতের সামুদ্রিক কৌশল এবং পাকিস্তানের সাবমেরিন সক্ষমতার দিকেও নজর থাকবে। ভবিষ্যতের সমুদ্রযুদ্ধে শুধু বড় জাহাজ নয়, বরং সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য শক্তিই অনেক সময় কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।