Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

চোট সারিয়ে জাতীয় দলে ফেরার প্রস্তুতি, কী ব্যায়াম করেন ভুবনেশ্বর?

দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে জাতীয় দলে ফিরেছেন ভুবনেশ্বর কুমার। ৩৬ বছর বয়সেও কী ভাবে ফিটনেস, সহনশক্তি ও শারীরিক শক্তি বাড়িয়েছেন ভারতীয় পেসার? জেনে নিন তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার নেপথ্যের কাহিনি।

চোট সারিয়ে জাতীয় দলে ফেরার প্রস্তুতি, কী ব্যায়াম করেন ভুবনেশ্বর?
Health & Fitness

চোট সারিয়ে জাতীয় দলে ভুবনেশ্বর কুমার, কী ভাবে বাড়ালেন পেশির জোর ও সহনশক্তি?

দীর্ঘদিনের চোটের ধকল কাটিয়ে আবারও ভারতীয় জাতীয় দলের আলোচনায় উঠে এসেছেন ভুবনেশ্বর কুমার। একসময় ভারতীয় দলের পেস আক্রমণের অন্যতম ভরসা ছিলেন তিনি। নতুন বলে সুইং করানো থেকে শুরু করে ডেথ ওভারে নিখুঁত ইয়র্কার—বোলিংয়ের বিভিন্ন দক্ষতার জন্য ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বরাবরই জনপ্রিয় এই ডানহাতি পেসার। কিন্তু চোটের কারণে বার বার ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘ পুনর্বাসন, ফিটনেস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা এবং নিজের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর লড়াইয়ের পর আবারও মাঠে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি।

৩৬ বছর বয়সে একজন পেসারের কাছে নিজের ফিটনেস ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে যাঁদের নিয়মিত দীর্ঘ সময় ধরে বল করতে হয়, তাঁদের শরীরের উপর চাপও বেশি পড়ে। দ্রুত দৌড়ে এসে বল করা, বার বার লাফিয়ে ক্রিজ়ে পৌঁছনো, শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং প্রতিটি বলের পর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা—সব ক্ষেত্রেই পেশির শক্তি ও সহনশক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ভুবনেশ্বরের ফিটনেস নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ তাঁর শক্তিবর্ধক অনুশীলন। রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিং, স্ট্রেংথ ট্রেনিং এবং ওজন নিয়ে স্কোয়াটের মতো ব্যায়াম পেশির শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে শুধু পেশির জোর বাড়ালেই একজন ক্রিকেটার সম্পূর্ণ ফিট হয়ে ওঠেন না। এর সঙ্গে প্রয়োজন নমনীয়তা, ভারসাম্য, শরীরের নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সঠিক পুনর্বাসন।

তাহলে কী ধরনের ব্যায়ামের মাধ্যমে পেশির শক্তি বাড়ানো যায়? কেন ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে কোর ও লোয়ার বডি স্ট্রেংথ গুরুত্বপূর্ণ? কী ভাবে ধীরে ধীরে ভারী ওজন নিয়ে অনুশীলনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়? জেনে নিন বিস্তারিত।

১. প্রোগ্রেসিভ ওভারলোড: ধীরে ধীরে বাড়াতে হয় পেশির ক্ষমতা

স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল প্রোগ্রেসিভ ওভারলোড। সহজ ভাষায়, শরীর যে পরিমাণ চাপ বা ওজনের সঙ্গে অভ্যস্ত, তার তুলনায় ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাত্রা বাড়ানোকে প্রোগ্রেসিভ ওভারলোড বলা হয়। এর উদ্দেশ্য হল পেশিকে নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।

ধরা যাক, কেউ প্রথম দিনেই ভারী ওজন তুলে স্কোয়াট করতে গেলেন। তাঁর পেশি, জয়েন্ট এবং শরীরের ভারসাম্য যদি সেই চাপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত না থাকে, তা হলে চোটের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্য দিকে, কম ওজন দিয়ে সঠিক ভঙ্গিতে অনুশীলন শুরু করে ধীরে ধীরে সক্ষমতা বাড়ালে শরীরের পক্ষে নতুন চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তুলনামূলক সহজ হয়।

ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁদের শুধু জিমে শক্তি বাড়ালেই চলে না। মাঠে দৌড়নো, বোলিং করা, ফিল্ডিং এবং ম্যাচের মধ্যে বার বার দ্রুত নড়াচড়া করার ক্ষমতাও বজায় রাখতে হয়।

প্রোগ্রেসিভ ওভারলোডের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:

  • প্রথমে শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী হালকা ওজন দিয়ে শুরু করতে হবে।

  • প্রতিটি ব্যায়ামের সঠিক ভঙ্গি বা ফর্ম শিখতে হবে।

  • শরীর অনুশীলনের সঙ্গে মানিয়ে নিলে প্রশিক্ষকের পরামর্শে ধীরে ধীরে ওজন বা পুনরাবৃত্তির সংখ্যা বাড়ানো যায়।

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

  • ব্যায়ামের সময় ব্যথা, অস্বস্তি বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে অনুশীলন বন্ধ করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

ভুবনেশ্বরের মতো পেশাদার ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে অনুশীলনের মাত্রা নির্ধারণ করা হয় তাঁর শারীরিক অবস্থা, খেলার প্রয়োজন এবং চোটের ইতিহাসের কথা মাথায় রেখে। তাই কোনও খেলোয়াড়ের অনুশীলনের ওজন বা পদ্ধতি সবার জন্য একই রকম উপযুক্ত হবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

২. কোর স্ট্রেংথ ট্রেনিং: শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল

কোর বলতে শুধু পেটের পেশিকে বোঝায় না। পেট, কোমর, পিঠ এবং পেলভিসের চারপাশের একাধিক পেশি শরীরের কেন্দ্রীয় অংশকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। এই পেশিগুলি শক্তিশালী হলে শরীরের ভারসাম্য ও নড়াচড়ার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সহজ হতে পারে।

একজন পেসারের ক্ষেত্রে কোর স্ট্রেংথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বল করার সময় শরীরের উপরের অংশ, কোমর এবং পায়ের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়। রান-আপের গতি থেকে শুরু করে বল ছোড়ার মুহূর্ত পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করে। এই প্রক্রিয়ায় কোর পেশি শরীরকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

কোরের শক্তি বাড়ানোর জন্য সাধারণত কয়েকটি ব্যায়াম করা হয়।

প্লাঙ্ক: উপুড় হয়ে কনুই ও পায়ের আঙুলের ভরে শরীরকে সোজা রেখে এই ব্যায়াম করা হয়। এতে পেট ও শরীরের কেন্দ্রীয় অংশের পেশি সক্রিয় থাকে। কোমর যেন বেশি নীচে নেমে না যায় বা অতিরিক্ত উপরে উঠে না থাকে, সে দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

সাইড প্লাঙ্ক: শরীরকে এক পাশের কনুই ও পায়ের ভরে তুলে ধরে রাখতে হয়। এটি শরীরের পাশের পেশি ও স্থিতিশীলতা বাড়ানোর অনুশীলন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বার্ড ডগ: হাত ও হাঁটুর ভরে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বিপরীত হাত ও পা ধীরে প্রসারিত করতে হয়। এতে ভারসাম্য এবং শরীরের নিয়ন্ত্রণ অনুশীলন করা যায়।

ডেড বাগ: চিৎ হয়ে শুয়ে হাত ও পা নিয়ন্ত্রিত ভাবে নাড়াতে হয়। এই ব্যায়াম করার সময় কোমরের অবস্থান নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কারও পিঠে চোট থাকলে নিজের ইচ্ছায় সব ধরনের কোর ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। কোন ব্যায়াম নিরাপদ, কতক্ষণ ধরে করতে হবে এবং কতটা চাপ নেওয়া যাবে, তা ফিজ়িওথেরাপিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা প্রয়োজন।

৩. লোয়ার বডি স্ট্রেংথ: পায়ের পেশির শক্তি কেন প্রয়োজন?

ক্রিকেটে পায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোলারদের দ্রুত রান-আপ নিতে হয়, শরীরের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং বল করার পর ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। পায়ের পেশি শক্তিশালী হলে এই ধরনের নড়াচড়ায় সাহায্য পাওয়া যেতে পারে।

লোয়ার বডি বা শরীরের নিম্নাংশের মধ্যে রয়েছে নিতম্ব, উরু, হ্যামস্ট্রিং, কোয়াড্রিসেপস, কাফ এবং সংশ্লিষ্ট পেশিগুলি। এই পেশিগুলির শক্তি ও সমন্বয় দৌড়নো, লাফানো, থামা এবং দিক পরিবর্তনের মতো কাজে গুরুত্বপূর্ণ।

লোয়ার বডি স্ট্রেংথ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করা হয়।

বডিওয়েট স্কোয়াট: প্রথমে নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করে স্কোয়াটের ভঙ্গি শেখা যায়। পা কাঁধের সমান দূরত্বে রেখে নিতম্ব পিছনের দিকে নিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসার মতো অবস্থানে যেতে হয়। তারপর নিয়ন্ত্রিত ভাবে উঠে দাঁড়াতে হয়।

লাঞ্জ: এক পা সামনে রেখে দুই হাঁটু ভাঁজ করে শরীর নীচে নামানো হয়। এই ব্যায়ামে পায়ের শক্তি ও ভারসাম্য অনুশীলন করা যায়।

গ্লুট ব্রিজ: চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে পা মাটিতে রেখে নিতম্ব উপরে তুলতে হয়। এতে নিতম্বের পেশি সক্রিয় হয়।

কাফ রেইজ: পায়ের পাতার সামনের অংশে ভর দিয়ে গোড়ালি উপরে তোলা হয়। এটি কাফ পেশির শক্তি বাড়ানোর একটি সাধারণ ব্যায়াম।

এই সব ব্যায়ামের ক্ষেত্রেই ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং চোটের ইতিহাস অনুযায়ী অনুশীলনের মাত্রা ঠিক করা প্রয়োজন। বিশেষত দীর্ঘদিন চোটের কারণে অনুশীলন বন্ধ থাকলে পুরনো রুটিনে সরাসরি ফিরে যাওয়া উচিত নয়।

৪. বার্বেল স্কোয়াট: ওজন নিয়ে পেশির শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন

স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ের পরিচিত ব্যায়ামগুলির মধ্যে বার্বেল স্কোয়াট অন্যতম। এই ব্যায়ামে বার্বেল বা দণ্ডে লাগানো ওজন নিয়ে স্কোয়াট করতে হয়। সঠিক পদ্ধতিতে করলে উরু, নিতম্ব এবং শরীরের অন্যান্য স্থিতিশীলতাকারী পেশি সক্রিয় হয়।

ভুবনেশ্বর কুমারের ফিটনেস প্রসঙ্গে ৪০ কেজি থেকে ১২০ কেজি পর্যন্ত ওজন নিয়ে স্কোয়াট করার কথা আলোচনায় এসেছে। তবে এই সংখ্যাগুলিকে তাঁর ব্যক্তিগত অনুশীলনের প্রসঙ্গে দেখতে হবে। এগুলি কোনও সাধারণ মানুষের জন্য লক্ষ্য বা আদর্শ ওজন নয়। এই নির্দিষ্ট ওজনের তথ্যের স্বাধীন নিশ্চিতকরণ না থাকলে তা তাঁর প্রশিক্ষণের প্রমাণিত রেকর্ড হিসাবেও ধরে নেওয়া উচিত নয়।

ভারী ওজন নিয়ে স্কোয়াট করার আগে কয়েকটি বিষয় জানা প্রয়োজন।

প্রথমত, ব্যায়ামের সঠিক কৌশল শিখতে হবে। দ্বিতীয়ত, শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। তৃতীয়ত, হাঁটু ও কোমরের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চতুর্থত, ওজন তোলার সময় শ্বাসপ্রশ্বাসের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। পঞ্চমত, প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

নতুনদের ক্ষেত্রে প্রথমে বডিওয়েট স্কোয়াট বা প্রশিক্ষকের নির্দেশে হালকা ওজন দিয়ে অনুশীলন করা যেতে পারে। শরীরের সক্ষমতা বাড়লে ধাপে ধাপে পরবর্তী স্তরে যাওয়া যায়। কারও কোমর বা পিঠে পুরনো চোট থাকলে ভারী বার্বেল স্কোয়াট শুরু করার আগে চিকিৎসকের অনুমতি নেওয়া বিশেষ জরুরি।

মনে রাখতে হবে, বেশি ওজন তুলতে পারাই ফিটনেসের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সঠিক কৌশল, নিয়ন্ত্রণ, সহনশীলতা এবং চোট ছাড়া নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

৫. রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিং: পেশিকে শক্তিশালী করার আরেক উপায়

রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিং এমন এক ধরনের ব্যায়াম, যেখানে পেশিকে কোনও প্রতিরোধের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। এই প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে ডাম্বেল, বার্বেল, রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড, জিমের যন্ত্র বা নিজের শরীরের ওজনের মাধ্যমে।

এই ধরনের অনুশীলনের উদ্দেশ্য শুধু পেশির আকার বাড়ানো নয়। নিয়মিত এবং উপযুক্ত পদ্ধতিতে করলে পেশির শক্তি, দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা এবং শরীরের নিয়ন্ত্রণও উন্নত হতে পারে।

রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিংয়ের কয়েকটি সাধারণ উদাহরণ হল:

  • রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড দিয়ে রো করা।

  • হালকা ডাম্বেল দিয়ে প্রেস করা।

  • নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে লেগ প্রেস।

  • উপযুক্ত ওজন নিয়ে রো এবং পুলিং ব্যায়াম।

  • শরীরের ওজন ব্যবহার করে পুশ-আপের মতো অনুশীলন।

তবে প্রত্যেকের জন্য একই রুটিন উপযুক্ত নয়। পেশাদার ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণে বোলিংয়ের ধকল, পেশির পুনরুদ্ধার এবং ম্যাচের সূচি অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা বদলানো হয়।

news image
আরও খবর

চোট থেকে ফেরার সময় রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিংয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত ধীরে ধীরে শরীরের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। খুব দ্রুত ভারী ওজন ব্যবহার করা বা অন্যের রুটিন অনুকরণ করা উচিত নয়।

৬. হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং বা HIIT

হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং, সংক্ষেপে HIIT, এমন একটি অনুশীলন পদ্ধতি যেখানে অল্প সময়ের জন্য তুলনামূলক বেশি তীব্রতার ব্যায়ামের সঙ্গে বিশ্রাম বা কম তীব্রতার ব্যায়াম পর্যায়ক্রমে করা হয়।

যেমন, নির্দিষ্ট সময় দ্রুত সাইক্লিং করার পর কিছুক্ষণ ধীরে সাইক্লিং করা। অথবা প্রশিক্ষকের নির্দেশে অল্প সময় দ্রুত নড়াচড়ার পর বিশ্রাম নেওয়া। এই ধরনের অনুশীলন কার্ডিয়োরেসপিরেটরি ফিটনেস বা হৃদ্‌যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাসের সহনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

HIIT-এর কয়েকটি পরিচিত ব্যায়াম হল:

জাম্পিং জ্যাকস: হাত ও পা ছড়িয়ে লাফিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে হয়।

জাম্প স্কোয়াট: স্কোয়াটের ভঙ্গি থেকে লাফিয়ে উপরে ওঠা হয়। এটি তুলনামূলক বেশি তীব্রতার ব্যায়াম।

মাউন্টেন ক্লাইম্বার: প্ল্যাঙ্কের মতো অবস্থানে থেকে পর্যায়ক্রমে হাঁটু বুকের দিকে আনা হয়।

বারপি: স্কোয়াট, প্ল্যাঙ্ক এবং লাফের মতো কয়েকটি নড়াচড়ার সমন্বয়ে এই ব্যায়াম করা হয়।

তবে HIIT সবার জন্য উপযুক্ত নয়। বিশেষত যাঁরা চোট থেকে সুস্থ হয়ে উঠছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে উচ্চ তীব্রতার লাফ বা দ্রুত নড়াচড়া বিপজ্জনক হতে পারে, যদি শরীর সেই চাপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত না থাকে।

তাই প্রথমেই কঠিন HIIT রুটিন শুরু না করে হালকা হাঁটা, সাইক্লিং বা চিকিৎসক অনুমোদিত অনুশীলনের মাধ্যমে ফিটনেস ফেরানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। পরে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে তীব্রতা বাড়ানো যায়।

৭. পিঠের যত্ন ও নমনীয়তা বাড়ানোর অনুশীলন

একজন পেসারের বোলিং অ্যাকশনে পিঠ ও কোমরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বল করার সময় শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়। তাই পিঠের পেশির শক্তি, শরীরের নমনীয়তা এবং নড়াচড়ার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রয়োজন।

তবে পিঠের চোটের ধরন একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারও পেশিতে টান লাগতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড বা সংশ্লিষ্ট কাঠামোর সমস্যা থাকতে পারে। সেই কারণে সবার জন্য একই ব্যায়াম নিরাপদ নয়।

পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা প্রয়োজন অনুযায়ী কোমর ও নিতম্বের গতিশীলতা, পেটের পেশির নিয়ন্ত্রণ এবং পিঠের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর অনুশীলন করাতে পারেন।

অনুশীলনের আগে ওয়ার্ম-আপ করা, শরীরের সক্ষমতার সঙ্গে মানানসই গতিশীলতা বাড়ানোর ব্যায়াম করা এবং ব্যথা হলে থেমে যাওয়া জরুরি। পুরনো চোটের জায়গায় ব্যথা ফিরে এলে নিজের সিদ্ধান্তে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো উচিত নয়।

৮. শুধু জিম নয়, বিশ্রামও ফিটনেসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ

অনেকেই মনে করেন, যত বেশি ব্যায়াম করা যাবে, তত দ্রুত শরীর শক্তিশালী হবে। বাস্তবে পেশির পুনরুদ্ধার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামও স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অনুশীলনের সময় পেশির উপর চাপ পড়ে। বিশ্রামের সময়ে শরীর সেই চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে, খাবার ঠিকমতো না খেলে বা বিশ্রাম ছাড়া একটানা কঠিন অনুশীলন করলে ক্লান্তি বাড়তে পারে।

একজন পেশাদার ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে বিশ্রাম ও অনুশীলনের ভারসাম্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জিমের বাইরে তাঁকে নেট প্র্যাকটিস, দৌড়নো, ফিল্ডিং এবং ম্যাচের প্রস্তুতিও নিতে হয়।

ফিটনেস ধরে রাখার জন্য কয়েকটি সাধারণ বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের চেষ্টা করা।

  • শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন-সহ সুষম খাবার খাওয়া।

  • পর্যাপ্ত জল পান করা।

  • অনুশীলনের মাঝে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়া।

  • ক্লান্তি বা ব্যথার লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া।

  • পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নিয়মিত মূল্যায়ন করা।

চোট থেকে ফেরার ক্ষেত্রে দ্রুত ফল পাওয়ার তাড়ার চেয়ে ধাপে ধাপে উন্নতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৯. পেশির শক্তি বাড়াতে খাবারের ভূমিকা

শুধু ব্যায়াম করলেই পেশির শক্তি বাড়ে না। শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগানোও জরুরি। পেশির গঠন ও পুনরুদ্ধারের জন্য প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কার্বোহাইড্রেট শরীরকে অনুশীলনের শক্তি জোগায়, আর স্বাস্থ্যকর ফ্যাট শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয়।

ডিম, মাছ, দুধ, দই, ডাল, ছোলা, সয়াবিন এবং অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। ভাত, রুটি, ওটস, আলু এবং ফলের মতো খাবার থেকে কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায়। বাদাম, বীজ ও উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেল স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের উৎস।

তবে কতটা প্রোটিন বা কত ক্যালোরি প্রয়োজন, তা নির্ভর করে ব্যক্তির ওজন, বয়স, অনুশীলনের মাত্রা এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার উপর। পেশাদার খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে স্পোর্টস নিউট্রিশন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে খাদ্যতালিকা তৈরি করা হতে পারে।

চোটের পরে ওজন কমানো বা পেশির জোর বাড়ানোর জন্য হঠাৎ করে খাবার কমিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে। সুষম খাবার, পর্যাপ্ত জল এবং নিয়মিত বিশ্রাম—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

১০. ৩৬ বছর বয়সে ফিটনেস ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের পুনরুদ্ধারের গতি এবং ব্যায়াম সহ্য করার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে ৩৬ বছর বয়সে ফিটনেস বাড়ানো সম্ভব নয়। সঠিক প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী অনুশীলনের মাধ্যমে অনেকেই এই বয়সেও শক্তি ও সহনশীলতা বজায় রাখতে পারেন।

ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন খেলার ফলে তাঁরা নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পান। কোন ধরনের অনুশীলনে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন, কখন বিশ্রাম প্রয়োজন এবং কখন চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে, তা বুঝতে শেখেন।

তবে বয়সের সঙ্গে চোটের ইতিহাস ও বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। তরুণ খেলোয়াড়ের রুটিন সরাসরি বয়স্ক বা চোট থেকে ফেরা খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক নয়।

ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তনকে তাই শুধু ওজন তোলার ক্ষমতা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। মাঠে বল করার সক্ষমতা, ধারাবাহিকতা, শরীরের নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে ফিট থাকার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

১১. চোট থেকে ফিরে ব্যায়াম শুরু করবেন কী ভাবে?

দীর্ঘদিন চোটের কারণে অনুশীলন বন্ধ থাকলে আবার শরীরচর্চা শুরু করার আগে কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত। কারণ, বিশ্রামের সময়ে শরীরের শক্তি ও সহনশীলতা কমে যেতে পারে। আগের মতোই ভারী ব্যায়াম শুরু করলে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।

প্রথম ধাপ: চিকিৎসকের অনুমতি। চোটের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক বা ফিজ়িওথেরাপিস্টের কাছ থেকে জেনে নিন কোন ধরনের নড়াচড়া নিরাপদ।

দ্বিতীয় ধাপ: হালকা অনুশীলন। প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটা, হালকা সাইক্লিং বা নির্দিষ্ট পুনর্বাসনমূলক ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

তৃতীয় ধাপ: শরীরের শক্তি বাড়ানো। বিশেষজ্ঞের নির্দেশে সহজ স্ট্রেংথ ব্যায়াম শুরু করে ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাত্রা বাড়ানো যায়।

চতুর্থ ধাপ: ভারসাম্য ও সহনশীলতা। প্রয়োজন অনুযায়ী শরীরের নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য এবং দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ক্ষমতা উন্নত করার অনুশীলন করা হয়।

পঞ্চম ধাপ: ধীরে ধীরে আগের রুটিনে ফেরা। শরীর যথেষ্ট প্রস্তুত হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অনুশীলনের তীব্রতা বাড়ানো যায়।

এই প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট কোনও সময়সীমা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। চোটের ধরন, চিকিৎসার পদ্ধতি এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে সুস্থ হয়ে ওঠার সময় বদলে যেতে পারে।

১২. ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তন থেকে কী শেখার?

ভুবনেশ্বর কুমারের দীর্ঘদিনের চোটের পর আবারও জাতীয় দলে ফেরার প্রস্তুতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—ফিটনেস ধরে রাখার জন্য ধারাবাহিকতা ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু কঠিন ব্যায়াম করলেই হবে না, শরীরের সক্ষমতা বুঝে সঠিক অনুশীলন বেছে নিতে হবে।

রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিং পেশির শক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কোর স্ট্রেংথ শরীরের স্থিতিশীলতা উন্নত করতে পারে। লোয়ার বডি ট্রেনিং দৌড়নো ও নড়াচড়ার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। আর প্রয়োজন অনুযায়ী কার্ডিয়ো অনুশীলন সহনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে।

তবে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি হয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শারীরিক পরীক্ষা এবং খেলার প্রয়োজন অনুযায়ী। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই একই মাত্রার অনুশীলন অনুসরণ করা সব সময় নিরাপদ নয়।

বিশেষ করে পিঠে বা কোমরে পুরনো চোট থাকলে ভারী ওজন নিয়ে স্কোয়াট, জাম্প স্কোয়াট কিংবা উচ্চ তীব্রতার HIIT শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যথাকে উপেক্ষা করে ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া কখনওই ফিটনেসের লক্ষণ নয়।

সব মিলিয়ে, ভুবনেশ্বরের প্রত্যাবর্তন থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—শরীরকে সময় দেওয়া, নিয়মিত অনুশীলন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া। বয়স বা চোটের ইতিহাস যাই হোক, সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতার মাধ্যমে ফিটনেসের উন্নতি সম্ভব। তবে ব্যক্তিগত সক্ষমতা বুঝে প্রশিক্ষণ নেওয়াই সুস্থ থাকার সবচেয়ে জরুরি শর্ত।

Preview image