Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

দেশের খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রধান সচিব সতর্কবার্তা দিয়েছেন। পরিস্থিতি গুরুতর বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশের খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রধান সচিব সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

ভূমিকা: সংকটের ছায়ায় ভারত

২০২৬ সালের শেষার্ধে এসে ভারতের অর্থনীতি এক জটিল ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রধান সচিব পি কে মিশ্র নয়াদিল্লিতে কৌটিল্য ইকোনমিক কনক্লেভে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা কেবল একটি সরকারি বিবৃতি নয়—এটি ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে এক গভীর উদ্বেগের প্রকাশ। "একটি বিশ্ব যাকে ঝুঁকির জন্য মূল্য দিতে হচ্ছে" (A World Priced for Risk) শীর্ষক এই সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে ভূরাজনীতি ও অর্থনীতি এখন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে, এবং এর ফলে খাদ্য, জ্বালানি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা ভারতের মতো একটি উদীয়মান পরাশক্তির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা ।

অর্থনৈতিক হাতিয়ারের অস্ত্রীকরণ: নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা

পি কে মিশ্রের সতর্কবার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে "হাতিয়ার" (weaponised) হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা। কোনো দেশের নাম না নিলেও তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপগুলো এখন কেবল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে । ভারতের উপর মার্কিন শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্যের তাৎপর্য অনেক গভীর। মিশ্র উল্লেখ করেন যে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা খাদ্য ও জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, আর সমুদ্রপথ ও ভৌগোলিক সংকীর্ণ পথগুলো (choke points) অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রধান উৎস হয়ে ওঠে ।

হরমুজ প্রণালী: ভূগোল যখন অর্থনৈতিক ঝুঁকি

হরমুজ প্রণালীর প্রসঙ্গটি এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ভারত প্রতিদিন প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যার একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই আসে। মিশ্র সতর্ক করেছেন যে হরমুজ প্রণালীর দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত কেবল জ্বালানির মূল্য নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে । এই ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ভারতকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে—বিকল্প পথ ব্যবহার করলে আফ্রিকা হয়ে যাত্রাপথ ১৫ থেকে ২০ দিন বেড়ে যায়, যা পরিবহন ও বীমা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয় । মিশ্রের মতে, "ভূগোল এখন একটি অর্থনৈতিক চলকে পরিণত হয়েছে" ।

জ্বালানি সংকট: ভারতের কৌশলগত প্রতিক্রিয়া

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত ইতিমধ্যেই কয়েকটি স্তরে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে। মিশ্র জানিয়েছেন যে অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশের সংখ্যা ২৭ থেকে বেড়ে ৪৩-এ দাঁড়িয়েছে, যা সরবরাহ উৎসের বৈচিত্র্যকরণে এক বড় অগ্রগতি । তবে এই কৌশলগত পদক্ষেপের পাশাপাশি ভারতের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিকল্প শক্তির উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানো। নবায়নযোগ্য শক্তি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও শক্তি সঞ্চয় প্রযুক্তিতে ঘরোয়া সক্ষমতা বাড়ানোর উপর মিশ্র জোর দিয়েছেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বাহ্যিক ধাক্কার প্রভাব কমে ।

খাদ্য সংকট: মুদ্রাস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপ

খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫.৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ । আদা (৭৩.৮২%), পেঁয়াজ (৪৮.২৭%), রসুন (৪৩.৬%) ও চিনির (২৪.২%) দামে আকাশচুম্বী বৃদ্ধি ঘটেছে। এর পেছনে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ—প্রথমত, দুর্বল বর্ষা যা ধান বপনের পরিমাণ ৪% কমিয়ে দিয়েছে , এবং দ্বিতীয়ত, জ্বালানির উচ্চ মূল্য যা পরিবহন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভারতের কৃষি খাত জিডিপির প্রায় ১৮% এবং জনসংখ্যার ৪৩% এই খাতের উপর নির্ভরশীল । ফলে ফসলের ফলন কমলে গ্রামীণ আয় ও সামগ্রিক ভোগ ব্যয় সরাসরি প্রভাবিত হয়। গ্রাহক মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫.১% পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস জানিয়েছে । এই মুদ্রাস্ফীতি কেবল পরিসংখ্যান নয়—মুম্বাইয়ের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গ্রামীণ কৃষক পর্যন্ত প্রত্যেকে এর প্রভাব অনুভব করছেন।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতা: পূর্বাভাসে নিম্নমুখী সংশোধন

বহুমুখী এই সংকটের প্রভাবে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস একাধিক সংস্থা নিম্নমুখী সংশোধন করেছে। মোডিস অ্যানালিটিক্স বলছে যে ভারত ২০২৬ ও ২০২৭ সালে দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে থাকবে, তবে গতি কিছুটা হারাবে । এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৭% থেকে কমে ৬.৬% হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে । ফিচ রেটিংসের পূর্বাভাস আরও নিম্নমুখী—৬.৪% ।

এই মন্থরতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল বর্ষা ও বিশ্বব্যাপী চাহিদা হ্রাস—এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করছে। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে সরবরাহ-পার্শ্বের রেশনিং এবং মুনাফার চাপ তৈরি হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে তুলছে । রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার সমীক্ষা অনুযায়ী, শহুরে ভোক্তাদের আস্থা টানা তিন দফায় কমেছে, এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৯% থেকে কমে ৬.৫% হয়েছে ।

news image
আরও খবর

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রুপির পতন

জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ৩,৩০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের ২,৮০০ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে অনেক বেশি । অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির মোট ব্যয়ের ২২% এবং সোনা-রুপা প্রায় ১১% দখল করেছে।

ভারতীয় রুপি এই চাপের মুখে দুর্বল হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরুর পর থেকে রুপি ডলারের বিপরীতে ৫.৫% কমেছে, যা এশিয়ার প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স । ২০২৬ সালের ১৮ মে রুপি ডলারের বিপরীতে ৯৬.১৮-এ নেমে আসে, যা একাধিকবার ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন স্তর । এই দুর্বলতা আমদানি করা পণ্যের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা মুদ্রাস্ফীতির চাপকে তীব্রতর করছে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া: কৃচ্ছ্রতা থেকে সতর্কতা

প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছেন—গাড়ি ও ডিজেলের ব্যবহার কমানো এবং সোনার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য । এই আহ্বান কেবল নৈতিক নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষার এক কৌশলগত পদক্ষেপ।

সরকার ইতিমধ্যেই একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। সোনা ও রুপার আমদানি শুল্ক ৬% থেকে বাড়িয়ে ১৫% করা হয়েছে, এবং সোনার আমদানিতে নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করা হয়েছে । পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা মূল্য চার বছর পর প্রথমবার বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছে ।

তবে এই পদক্ষেপগুলোর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। শুল্ক বৃদ্ধি বাজার-ভিত্তিক সংস্কারের বিপরীতে যায় এবং সোনার চোরাচালানকে উৎসাহিত করতে পারে । জ্বালানির খুচরা মূল্য না বাড়িয়ে সরকার ইতিমধ্যেই তেল বিপণন সংস্থাগুলোর উপর বিশাল বোঝা চাপিয়েছে—প্রতিদিন প্রায় ১০ বিলিয়ন রুপি ক্ষতি হচ্ছে ।

বিদ্যুৎ সংকট: গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি

গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ছয় বছরের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে, কারণ হরমুজ সংকট গ্যাস সরবরাহকে ব্যাহত করেছে । গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড ২৭০.৮ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, কিন্তু সন্ধ্যা ও রাতে সৌরশক্তির অভাবে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে । এই পরিস্থিতি ভারতের জ্বালানি কাঠামোর দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

কৌশলগত খনিজ: নতুন নির্ভরতার উৎস

মিশ্রের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কৌশলগত খনিজ ও শিল্প কাঁচামালের উপর নির্ভরতা। লিথিয়াম, কোবাল্ট ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানের মতো খনিজ ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস ও নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য অপরিহার্য। এগুলোর উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণ ভৌগোলিকভাবে কেন্দ্রীভূত, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে দুর্বলতা তৈরি করে । ভারত জাতীয় ক্রিটিক্যাল মিনারেল মিশনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান, প্রক্রিয়াকরণ ও পুনর্ব্যবহারকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিয়েছে ।

প্রতিক্রিয়ার কৌশল: স্থিতিস্থাপকতা, বিচ্ছিন্নতা নয়

মিশ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত এই যে ভারতের প্রতিক্রিয়া কখনোই আত্মনির্ভরতার নামে বিচ্ছিন্নতা হতে পারে না। তিনি স্পষ্ট করেছেন, "স্থিতিস্থাপকতা মানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং অতিরিক্ত দুর্বল না হয়ে বিশ্বের প্রতি উন্মুক্ত থাকার ক্ষমতা" । অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা, বৈচিত্র্যকরণ এবং বৈশ্বিক সংহতির সমন্বয়ই হলো প্রকৃত সমাধান। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কৌশলগত পরিপক্বতার পরিচয় দেয়—সংকট মোকাবিলায় বাণিজ্যিক বাধা নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নির্ভরতা কমানো।

উপসংহার: এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন ভারত

Preview image