দুর্গাপুজোর বিজয় দশমীতে এক অনন্য প্রথার সাক্ষী রায় বাড়ি। ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে দু’বার সিঁদুর খেলার রীতি চলে আসছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের সঙ্গে আজও পালিত হচ্ছে এই প্রাচীন নিয়ম।
দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা নানা রীতি-রেওয়াজ। বিজয় দশমীর দিন সিঁদুর খেলা সেই ঐতিহ্যেরই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বাংলার একটি প্রাচীন বনেদি বাড়িতে বিজয়া দশমীর সিঁদুর খেলার রীতি অন্য অনেক বাড়ির তুলনায় একেবারেই আলাদা। সেখানে একবার নয়, দু’বার সিঁদুর খেলা হয়। আর এই বিশেষ প্রথা চলে আসছে প্রায় ৩৫০ বছর ধরে।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে রায় বাড়ির এই প্রাচীন ঐতিহ্য আজও একইভাবে ধরে রেখেছেন পরিবারের সদস্যরা। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, পুজোর আয়োজনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা এই বিশেষ রীতিতে কোনও ছেদ পড়েনি।
বিজয়া দশমীর দিন দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর আগে বাড়ির মহিলারা সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। সাধারণত বাংলার বিভিন্ন বনেদি বাড়ি ও পুজোমণ্ডপে দশমীর দিন দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে, তারপর একে অপরকে সিঁদুর মাখিয়ে বিজয়ার আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার রীতি দেখা যায়। কিন্তু রায় বাড়ির ঐতিহ্যে রয়েছে তার ব্যতিক্রমী রূপ।
এখানে দু’দফায় সিঁদুর খেলা হয়। বহু বছর ধরে চলে আসা এই নিয়ম পরিবারের কাছে শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বয়স্কদের কাছ থেকে ছোট প্রজন্মের সদস্যদের কাছে এই রীতির কথা পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মও এই প্রথার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
রায় বাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ এই প্রাচীন রীতি। দশমীর দিন সকাল থেকেই বাড়িতে তৈরি হয় বিশেষ পরিবেশ। দেবী দুর্গার বিসর্জনের প্রস্তুতির পাশাপাশি শুরু হয় বিজয়ার আচার-অনুষ্ঠান। পরিবারের মহিলারা ঐতিহ্যবাহী সাজে অংশ নেন সিঁদুর খেলায়। লাল সিঁদুরে রাঙা হয়ে ওঠে পুজোর পরিবেশ।
প্রথম দফার সিঁদুর খেলার পর নির্দিষ্ট রীতি মেনে আবারও সিঁদুর খেলার আয়োজন হয়। কেন দু’বার এই সিঁদুর খেলা হয়, তার সঙ্গে পারিবারিক ইতিহাস ও দীর্ঘদিনের বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা এই রীতি পালন করে আসছেন এবং তাঁদের কাছ থেকেই পরবর্তী প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের অর্থ ও গুরুত্ব জানতে পেরেছে।
প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো এই পুজো তাই শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে একটি পরিবারের দীর্ঘ ইতিহাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি। বছরের পর বছর ধরে একই রীতিতে দুর্গাপুজো পালন করার মাধ্যমে রায় বাড়ি যেন ধরে রেখেছে বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোর এক বিশেষ অধ্যায়।
দুর্গাপুজোর জাঁকজমকের পাশাপাশি এমন প্রাচীন পারিবারিক রীতিই বাংলার পুজোকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে। কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে দুর্গাপুজো ঘিরে নানা ধরনের ঐতিহ্য রয়েছে। কোথাও বিশেষ ভোগ, কোথাও বিশেষ বিসর্জন প্রথা, কোথাও আবার দেবীর অলঙ্কার বা পুজোর আচার ঘিরে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন নিয়ম। রায় বাড়ির দু’বার সিঁদুর খেলার রীতিও সেই ঐতিহ্যেরই একটি অনন্য উদাহরণ।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ধরনের প্রথার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও নিজেদের পারিবারিক শিকড় ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন অনেক বনেদি পরিবার। রায় বাড়ির ক্ষেত্রেও সেই ধারাই বজায় রয়েছে।
দুর্গাপুজোর চারদিনের আনন্দের পর দশমীর দিন আসে আবেগঘন বিদায়ের মুহূর্ত। ঢাকের বাদ্যি, উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি আর সিঁদুরের রঙে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। দেবীকে বিদায় জানানোর আগে মহিলাদের সিঁদুর খেলা যেন আনন্দের পাশাপাশি আগামী বছরের অপেক্ষার বার্তাও বহন করে।
এই সিঁদুর খেলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের মঙ্গল, সুখ-সমৃদ্ধি এবং দীর্ঘায়ুর কামনা। তাই রায় বাড়িতে দু’বার সিঁদুর খেলার ঐতিহ্য শুধুমাত্র একটি দৃশ্যমান উৎসবের অংশ নয়; এর সঙ্গে রয়েছে বিশ্বাস ও পারিবারিক আবেগ।
৩৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি রীতি একইভাবে টিকে থাকা নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এত দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যেও যে ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি, সেটিই এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আজকের প্রজন্ম যখন আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, তখনও রায় বাড়ির সদস্যরা নিজেদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া রীতিকে সম্মানের সঙ্গে পালন করছেন। পরিবারের ছোট সদস্যরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের হাত ধরেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মে পৌঁছে যাবে এই সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো ঐতিহ্য।
দুর্গাপুজো আসলে শুধু দেবীর আরাধনা নয়, বাঙালির কাছে এটি স্মৃতি, পরিবার, সম্পর্ক এবং সংস্কৃতির উৎসব। বনেদি বাড়ির পুজোগুলিতে সেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সদস্যরা একত্রিত হন। পুরনো বাড়ি আবার মুখর হয়ে ওঠে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া নানা আচার।
রায় বাড়ির বিজয়া দশমীর দু’বার সিঁদুর খেলার প্রথা সেই পারিবারিক ঐতিহ্যেরই একটি জীবন্ত নিদর্শন। কয়েকশো বছর ধরে একই রীতি পালন হওয়ায় এটি এখন পরিবারের পরিচয়েরও অংশ হয়ে উঠেছে।
দুর্গাপুজোর শেষ দিনে দেবী দুর্গার বিসর্জনের সঙ্গে যেমন বিষাদের আবহ তৈরি হয়, তেমনই সিঁদুর খেলা সেই বিষাদের মধ্যে আনন্দের রঙ ছড়িয়ে দেয়। একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে শুভেচ্ছা জানান পরিবারের মহিলারা। দেবীর কাছে পরিবারের সকলের মঙ্গল কামনা করা হয়। এরপর আসে দেবীকে বিদায় জানানোর পালা।
রায় বাড়ির ক্ষেত্রে এই আবেগঘন মুহূর্ত আরও বিশেষ হয়ে ওঠে দু’বার সিঁদুর খেলার কারণে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই নিয়মের প্রতিটি ধাপ পরিবারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুজোর ব্যস্ততার মধ্যেও এই ঐতিহ্য পালনে কোনও খামতি থাকে না।
সময়ের সঙ্গে পুজোর আয়োজনের ধরন বদলালেও এই প্রথা বদলায়নি। আধুনিক প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার যুগেও এমন ঐতিহ্যবাহী রীতিগুলি নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখছে।
বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর বিশেষত্বই হল এই ধরনের বহু পুরনো রীতি। কোথাও শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিমার কাঠামো, কোথাও বিশেষ পুজোপদ্ধতি, আবার কোথাও সিঁদুর খেলা বা বিসর্জনকে ঘিরে আলাদা নিয়ম। প্রতিটি পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে সেই রীতিগুলি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
রায় বাড়ির ৩৫০ বছরের পুরনো দু’বার সিঁদুর খেলার প্রথাও তাই কেবল একটি উৎসবের মুহূর্ত নয়। এটি একটি পরিবারের ইতিহাসকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে রাখার মাধ্যম। পুরনো প্রজন্মের স্মৃতি এবং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ মিলিয়ে আজও বেঁচে রয়েছে সেই ঐতিহ্য।
দুর্গাপুজো শেষ হয়ে গেলেও এই ধরনের প্রথাই পরবর্তী বছরের অপেক্ষা তৈরি করে। বিজয়া দশমীর দিন দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের মনে যেমন আবেগ তৈরি হয়, তেমনই থাকে আগামী বছর আবার একইভাবে পুজোর আয়োজন করার প্রত্যাশা।
৩৫০ বছরের প্রাচীন রীতি মেনে বিজয় দশমীতে দু’বার সিঁদুর খেলা—রায় বাড়ির এই ঐতিহ্য তাই আজও বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ। সময় বদলালেও বদলায়নি বিশ্বাস, বদলায়নি আচার, আর তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একইভাবে টিকে রয়েছে এই অনন্য প্রথা।
Durga Puja 2026, Durga Puja, দুর্গাপুজো ২০২৬, দুর্গাপুজো, বিজয় দশমী, বিজয়া দশমী, সিঁদুর খেলা, সিঁদুর খেলা ২০২৬, রায় বাড়ি, রায় বাড়ির দুর্গাপুজো, ৩৫০ বছরের পুরনো পুজো, বনেদি বাড়ির পুজো, বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো, Bengali Durga Puja, Bengal Durga Puja, Durga Puja Tradition, Sindoor Khela, Sindur Khela 2026, Bijoya Dashami, Bijoya Doshomi, Bengali Tradition, Puja Tradition, Durga Puja News, Durga Puja Heritage, Bengal Heritage, Traditional Durga Puja, West Bengal Durga Puja
Durga Puja 2026, Durga Puja, দুর্গাপুজো ২০২৬, দুর্গাপুজো, বিজয় দশমী, বিজয়া দশমী, সিঁদুর খেলা, সিঁদুর খেলা ২০২৬, রায় বাড়ি, রায় বাড়ির দুর্গাপুজো, ৩৫০ বছরের পুরনো পুজো, বনেদি বাড়ির পুজো, বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো, Bengali Durga Puja, Bengal Durga Puja, Durga Puja Tradition, Sindoor Khela, Sindur Khela 2026, Bijoya Dashami, Bijoya Doshomi, Bengali Tradition, Puja Tradition, Durga Puja News, Durga Puja Heritage, Bengal Heritage, Traditional Durga Puja, West Bengal Durga Puja