Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

এক সঙ্গেই পাহাড়-নদী-ঝর্না, ঘুরে আসুন ঝাড়খণ্ডের সিমডেগা

পাহাড়, নদী, ঝর্না আর জলাধারের অপূর্ব মেলবন্ধন—প্রকৃতির কোলে দু’দিন কাটাতে চারচাকায় ঘুরে আসুন ঝাড়খণ্ডের সিমডেগা।

? পুজোর ছুটিতে চারচাকায় ঘুরে আসুন ঝাড়খণ্ডের সিমডেগা

পুজোর ছুটি মানেই বেড়ানোর পরিকল্পনা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ট্রেন, বাস কিংবা বিমানের টিকিট না কাটতে পারলে মন খারাপ করার কিছু নেই। বরং এ বার পুজোয় চারচাকাকেই বানিয়ে ফেলতে পারেন আপনার সফরসঙ্গী। কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন ঝাড়খণ্ডের পথে। পরিচিত রাঁচি, নেতারহাট কিংবা ম্যাকলুস্কীগঞ্জের বাইরে এ বার আপনার গন্তব্য হতে পারে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত সিমডেগা।

পাহাড়, নদী, ঝর্না, জলাধার, প্রাচীন দুর্গ এবং বহু পুরনো মন্দির—সব মিলিয়ে প্রকৃতি ও ইতিহাসের এক অন্য রকম মেলবন্ধন রয়েছে এই জেলায়। পর্যটকদের ভিড় তুলনামূলক ভাবে কম হওয়ায় সিমডেগার সৌন্দর্য এখনও অনেকটাই নির্জন ও স্বাভাবিক। তাই পুজোর ছুটিতে যদি ভিড় এড়িয়ে একটু অন্য ধরনের রোড ট্রিপের স্বাদ নিতে চান, তা হলে সিমডেগা হতে পারে আপনার জন্য বেশ আকর্ষণীয় একটি ঠিকানা।

? কলকাতা থেকে রোড ট্রিপে সিমডেগা

কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতে সিমডেগা যাওয়া সম্ভব। তবে সফরটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চাইলে রাঁচি হয়ে যেতে পারেন। কলকাতা থেকে রাঁচির দূরত্ব সড়কপথে মোটামুটি ৮-৯ ঘণ্টার পথ। ভোরে বেরিয়ে পড়লে পথে কয়েক বার বিরতি নিয়েও বিকেলের মধ্যে রাঁচি পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

রাঁচিকে শুধু যাত্রাবিরতির জায়গা না রেখে সফরের তালিকায় একটি গন্তব্য হিসাবেও রাখতে পারেন। পুজোর সময় বর্ষার শেষভাগ হওয়ায় রাঁচির জলপ্রপাতগুলিতে তখন জলের পরিমাণও বেশ ভাল থাকে। শহর এবং তার আশপাশে ঘোরার মতো একাধিক জায়গা রয়েছে। সময় হাতে থাকলে প্রথম দিন রাঁচির কিছু দর্শনীয় স্থান দেখে রাতটা সেখানেই কাটিয়ে দিতে পারেন।

পড়ন্ত বিকেলে যেতে পারেন টেগোর হিল। টিলার উপর থেকে রাঁচি শহরের চারপাশের দৃশ্য বেশ মনোরম লাগে। দীর্ঘ গাড়ি-যাত্রার পরে সন্ধ্যার সময় এখানে কিছুটা সময় কাটানো যেতে পারে। রাঁচিতে থাকার জন্য হোটেলের অভাবও নেই। তাই প্রথম রাতটা রাঁচিতে রেখে পরের দিন ভোরে সিমডেগার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়া যেতে পারে।

? সোজা পথে নয়, ঘুরপথে সিমডেগা

রাঁচি থেকে সিমডেগার সরাসরি দূরত্ব প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার। কিন্তু রোড ট্রিপের আসল মজা তো শুধু গন্তব্যে পৌঁছোনোর মধ্যে নেই, পথেও রয়েছে। তাই একটু ঘুরপথে গিয়ে ইতিহাস ও প্রকৃতিকে একসঙ্গে দেখার পরিকল্পনা করতে পারেন।

রাঁচি থেকে ভোরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে প্রথমে যেতে পারেন গুমলার সিসই ব্লকের নবরতনগঢ় দুর্গে। রাঁচি থেকে এই জায়গার দূরত্ব প্রায় ৭৭ কিলোমিটার। গাড়িতে যেতে যেতে বদলে যাবে চারপাশের দৃশ্য। শহরের ব্যস্ততা পিছনে ফেলে ধীরে ধীরে সামনে আসবে সবুজে ঢাকা মালভূমি, পাথুরে টিলা আর গ্রামীণ ঝাড়খণ্ডের নিজস্ব রূপ।

নবরতনগঢ় শুধু একটি পর্যটনস্থল নয়, ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। এখানে রয়েছে ছোটনাগপুরের নাগবংশী রাজা দুর্জন শালের পুরনো গড়ের ধ্বংসাবশেষ। চারপাশে পাথুরে টিলা এবং বর্ষার পরে সবুজ ঘাসে ঢাকা প্রান্তর জায়গাটিকে আরও সুন্দর করে তোলে।

দুর্গের ভাঙা অংশ, পুরনো মন্দির এবং জলাধার মিলিয়ে জায়গাটিতে এখনও অতীতের ছাপ স্পষ্ট। বলা হয়, এক সময়ে এখানে পাঁচতলা দুর্গ ছিল। প্রতিটি তলায় ছিল ন’টি করে কক্ষ। সেই থেকেই ‘নবরতনগঢ়’ নামটির প্রচলন হয়েছে বলে জানা যায়।

ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থাকলে এই জায়গায় কিছুটা সময় হাতে নিয়ে ঘুরুন। শুধু ছবি তুলে চলে না গিয়ে দুর্গের স্থাপত্য, আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পুরনো জলাধারগুলিও দেখে নিতে পারেন। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের আওতাধীন এই ঐতিহাসিক স্থানে প্রায় এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় কাটানো যেতে পারে।

? নবরতনগঢ় থেকে বাঘমুন্ডা

নবরতনগঢ় ঘোরার পরে আবার গাড়িতে উঠে পড়ুন। এ বার গন্তব্য বাঘমুন্ডা জলপ্রপাত। বসিয়া রোড ধরে এগোতে হবে। নবরতনগঢ় থেকে বাঘমুন্ডার দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার।

এই পথটিও রোড ট্রিপের অন্যতম আকর্ষণ। রাস্তার দু’পাশে সবুজ টিলা, গাছপালা আর বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে পড়বে। বর্ষার শেষে ঝাড়খণ্ডের মালভূমি তখন সবুজে মোড়া থাকে। শহরের কংক্রিটের একঘেয়েমি থেকে দূরে এমন পথে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা আলাদা।

প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এই যাত্রাপথই হয়ে উঠতে পারে সফরের অন্যতম স্মরণীয় অংশ। কোথাও সবুজ টিলা, কোথাও পাথুরে জমি, আবার কোথাও ঘন গাছপালার ফাঁক দিয়ে দূরের পাহাড়—সব মিলিয়ে চারচাকায় এই সফরের আলাদা একটা রোমাঞ্চ রয়েছে।

? কোয়েল নদীর পাহাড়ি সৌন্দর্য

সিমডেগা জেলার অন্যতম আকর্ষণ হল কোয়েল নদী। পাহাড়ি পথে নদীর স্রোত, পাথরের গা বেয়ে বয়ে চলা জল এবং চারপাশের সবুজ প্রকৃতি মিলে এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

শহুরে পর্যটনকেন্দ্রের মতো এখানে সাজানো-গোছানো ভিড় কিংবা পর্যটকদের কোলাহল নেই। বরং প্রকৃতিকে তার নিজস্ব রূপে দেখার সুযোগ রয়েছে। কোথাও নদীর স্রোত শান্ত, কোথাও আবার পাথরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে।

পুজোর সময় বর্ষার জল অনেকটাই থাকে বলে নদী, ঝর্না এবং জলাধারের রূপও তখন বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তবে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। জলের গভীরতা বা স্রোত সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে নদী বা জলপ্রপাতের খুব কাছে যাওয়া ঠিক নয়।

? মালভূমির পাথুরে সৌন্দর্য

সিমডেগার বিশেষত্ব শুধু পাহাড় বা জলপ্রপাত নয়। এই জেলার ভূপ্রকৃতিই তার অন্যতম বড় আকর্ষণ। ছোটনাগপুর মালভূমির অংশ হওয়ায় জায়গায় জায়গায় দেখা যায় পাথুরে জমি, টিলা এবং উঁচুনিচু ভূভাগ।

সবুজ ঘাসের চাদরের সঙ্গে পাথুরে ভূপ্রকৃতির এই বৈপরীত্য ছবির মতো সুন্দর। বর্ষার শেষে প্রকৃতি যখন নতুন করে সবুজ হয়ে ওঠে, তখন পাথরের ফাঁক দিয়ে গজিয়ে ওঠা ঘাস, গাছপালা এবং দূরের পাহাড় মিলিয়ে এক অন্য রকম দৃশ্য তৈরি হয়।

যাঁরা সাধারণ পাহাড়ি শহরের বদলে একটু আলাদা ভূপ্রকৃতি দেখতে চান, তাঁদের জন্য সিমডেগা তাই বেশ আকর্ষণীয় হতে পারে।

news image
আরও খবর

? প্রাচীন মন্দির ও ইতিহাসের ছোঁয়া

সিমডেগার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো মন্দির ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। সব জায়গাই হয়তো জনপ্রিয় পর্যটন তালিকায় নেই, কিন্তু সেখানেই রয়েছে এই অঞ্চলের আসল আকর্ষণ।

অনেক জায়গায় পৌঁছতে স্থানীয় মানুষের সাহায্য নিতে হতে পারে। সব দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে অনলাইনে বিস্তারিত তথ্যও সবসময় পাওয়া যায় না। ফলে এই সফরটি অনেকটাই হতে পারে অনুসন্ধানের মতো—রাস্তা খুঁজে বের করা, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা এবং অচেনা জায়গার সন্ধান পাওয়া।

এই কারণেই সিমডেগার রোড ট্রিপ একটু অন্য ধরনের। এটি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে ছবি তুলে ফিরে আসার সফর নয়। বরং পথে পথে নতুন জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোই এই ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ।

? থাকার ব্যবস্থা কেমন?

সিমডেগায় পর্যটকদের আনাগোনা এখনও তুলনামূলক কম। ফলে রাঁচি বা ঝাড়খণ্ডের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলির মতো এখানে প্রচুর হোটেল বা থাকার ব্যবস্থা নেই। এই কারণে পুরো সফরের পরিকল্পনা আগে থেকে করে নেওয়া ভাল।

রাঁচিতে থাকার ব্যবস্থা তুলনামূলক সহজ। তাই যাঁরা প্রথম বার সিমডেগা যাচ্ছেন, তাঁরা রাঁচিতে এক রাত থেকে পরের দিন ভোরে সিমডেগার দিকে যেতে পারেন। এতে দীর্ঘ যাত্রার ধকল কিছুটা কমবে এবং পথে নবরতনগঢ়ের মতো জায়গাও ঘুরে দেখা সম্ভব হবে।

সিমডেগায় রাত কাটানোর পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই থাকার জায়গা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে বুকিং করে নেওয়া ভাল। অফবিট জায়গায় যাওয়ার ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে থাকার জায়গা খুঁজতে গেলে সমস্যা হতে পারে।

? কেন বেছে নেবেন সিমডেগা?

পুজোর ছুটিতে অধিকাংশ মানুষ পরিচিত পাহাড়ি শহর, সমুদ্রসৈকত কিংবা জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের দিকে ছুটে যান। ফলে সেই সময় ভিড়ও থাকে প্রচুর। আপনি যদি সেই ভিড় থেকে দূরে থাকতে চান, সিমডেগা হতে পারে একটি ভিন্ন ধরনের বিকল্প।

এখানে এক সফরেই পাওয়া যায় ইতিহাস, পাহাড়, নদী, জলপ্রপাত, জলাধার এবং মালভূমির প্রকৃতি। চারচাকায় যাওয়ার সুবিধার কারণে নিজের মতো করে সময় নিয়েও ঘোরা যায়।

রাস্তায় যখন ইচ্ছা থামতে পারেন, পছন্দের জায়গায় কিছুক্ষণ সময় কাটাতে পারেন এবং স্থানীয় প্রকৃতিকে কাছ থেকে উপভোগ করতে পারেন। বিশেষ করে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে রোড ট্রিপে গেলে এই স্বাধীনতাটা সফরের আনন্দ অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।

? পুজোর ছুটিতে কাদের জন্য আদর্শ?

সিমডেগা তাঁদের জন্য বিশেষ ভাবে উপযুক্ত, যাঁরা অফবিট জায়গা, রোড ট্রিপ, প্রকৃতি, ইতিহাস এবং কম ভিড়ের পর্যটনকেন্দ্র পছন্দ করেন।

যাঁরা শুধু বিলাসবহুল রিসর্টে বসে ছুটি কাটাতে চান, তাঁদের কাছে এই সফর কিছুটা আলাদা মনে হতে পারে। কারণ এখানে অনেক জায়গায় পৌঁছতে স্থানীয়দের সাহায্য নিতে হবে, সব রাস্তা সম্পর্কে অনলাইনে স্পষ্ট তথ্য নাও থাকতে পারে এবং পর্যটন পরিকাঠামোও জনপ্রিয় জায়গাগুলির মতো উন্নত নয়।

কিন্তু যাঁরা অচেনা জায়গা আবিষ্কার করতে ভালবাসেন, তাঁদের কাছে সেটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

? যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখুন

সিমডেগা যাওয়ার পরিকল্পনা করলে কিছু বিষয় আগে থেকেই মাথায় রাখা ভাল। প্রথমত, গাড়ির জ্বালানি পর্যাপ্ত রয়েছে কি না দেখে নিন। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় জল সঙ্গে রাখা সুবিধাজনক। তৃতীয়ত, প্রত্যন্ত এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক সব জায়গায় সমান নাও থাকতে পারে।

গুগল ম্যাপে সব জায়গার অবস্থান বা রাস্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না-ও পাওয়া যেতে পারে। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে রাস্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভাল। বর্ষার পরে জলপ্রপাত বা নদীর কাছে গেলে অতিরিক্ত সতর্ক থাকুন।

প্রকৃতির জায়গায় প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলে আসবেন না। পাহাড়, নদী, ঝর্না এবং জলাধারের সৌন্দর্য বজায় রাখার দায়িত্ব পর্যটকদেরও।

? শেষ কথা

পুজোর ছুটি মানেই যে শুধুই জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে যেতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। বরং এ বার যদি চারচাকায় একটু অন্য রকম সফরের পরিকল্পনা করেন, তা হলে ঝাড়খণ্ডের সিমডেগাকে তালিকায় রাখতে পারেন।

কলকাতা থেকে রাঁচি, সেখান থেকে নবরতনগঢ়ের ইতিহাস ছুঁয়ে বাঘমুন্ডার জলপ্রপাত, তারপর সিমডেগার পাহাড়ি পথ, কোয়েল নদী, জলাধার ও প্রাচীন মন্দির—পুরো সফরটাই হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতি ও ইতিহাসের এক অনন্য মেলবন্ধন।

ভিড় থেকে দূরে, মালভূমির পাথুরে সৌন্দর্যের মধ্যে, পাহাড়ি নদীর স্রোত আর ঝর্নার শব্দ শুনতে শুনতে পুজোর কয়েকটা দিন কাটাতে চাইলে সিমডেগা হতে পারে আপনার পরবর্তী অফবিট রোড-ট্রিপের ঠিকানা।

Preview image