প্রথম চাকরিতে মাসে ২৫ হাজার টাকার বেশি বেতনে যোগ দিলে কর্মচারীকে পিএফ পেনশন প্রকল্পের আওতায় রাখা হবে না। নতুন চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে EPFO-র এই নিয়ম কী, জেনে নিন বিস্তারিত।
চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম স্পষ্ট করল কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংগঠন বা EPFO। প্রথম চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় যদি কোনও কর্মচারীর মাসিক বেতন ২৫ হাজার টাকার বেশি হয়, তাহলে তিনি কর্মী পিএফ পেনশন প্রকল্প বা Employees’ Pension Scheme (EPS)-এর আওতায় থাকবেন না। অর্থাৎ, শুরুতেই নির্ধারিত বেতনসীমার বেশি বেতনে চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে EPS-এর জন্য বেতন থেকে কন্ট্রিবিউশন কাটার নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
বেতনসীমা নিয়ে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর চাকরিজীবীদের মধ্যে যাতে কোনও বিভ্রান্তি না থাকে, সেই কারণেই এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছে শ্রমমন্ত্রকের আওতাধীন EPFO। বিশেষ করে বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের জন্য এই নিয়মটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনও কর্মী যদি প্রথম চাকরিতেই নির্ধারিত সীমার বেশি বেতন পান, তাহলে তাঁর ক্ষেত্রে EPFO-র পেনশন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির নিয়ম অন্যভাবে কার্যকর হবে।
EPFO জানিয়েছে, প্রথম চাকরিতে মাসে ২৫ হাজার টাকার বেশি বেতনে যোগ দেওয়া কোনও কর্মী EPS-এর আওতায় না থাকলে তাঁর বেতন থেকে এই খাতে কন্ট্রিবিউশনও কাটা যাবে না। কোনও কর্মী যদি লক্ষ্য করেন যে তাঁর বেতন থেকে নিয়মিত EPS-এর টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে, তাহলে তাঁকে দ্রুত সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে EPFO-র কাছেও অভিযোগ জানাতে পারবেন তিনি।
সম্প্রতি বাধ্যতামূলক কর্মী পিএফের বেতনসীমা সংক্রান্ত নিয়মে বড় পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে EPFO-র নির্ধারিত বেতনসীমা ছিল মাসে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী কর্মীদের ক্ষেত্রে এই সীমার ভিত্তিতেই বাধ্যতামূলক PF পরিষেবার নিয়ম কার্যকর হত।
নতুন নিয়মে সেই সীমা বাড়িয়ে মাসে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে বলে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যাচ্ছে। ফলে যেসব কর্মীর বেতন এতদিন নির্ধারিত সীমার বাইরে ছিল, তাঁদের একটি অংশ নতুন নিয়মের আওতায় আসতে পারেন।
শ্রমমন্ত্রকের দাবি অনুযায়ী, বেতনসীমা বাড়ানোর ফলে দেশজুড়ে বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অতিরিক্ত প্রায় ৫১ লক্ষ কর্মী এর ফলে উপকৃত হবেন। বেতনসীমা বৃদ্ধির ফলে আরও বেশি সংখ্যক কর্মী PF-এর সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন।
তবে PF-এর আওতায় আসা এবং EPS-এর আওতায় আসা—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখলে চলবে না। এখানেই EPFO-র সাম্প্রতিক ব্যাখ্যার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
অনেক চাকরিজীবীর কাছেই PF এবং pension contribution একই বিষয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কর্মীদের ভবিষ্যৎ সঞ্চয় এবং পেনশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
EPFO-র আওতাভুক্ত যোগ্য কর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার অবদানের একটি অংশ PF অ্যাকাউন্টে জমা হয় এবং আরেকটি অংশ EPS অ্যাকাউন্টে যায়। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগকর্তার ১২ শতাংশ অবদানের মধ্যে ৩.৬৭ শতাংশ PF খাতে এবং ৮.৩৩ শতাংশ EPS খাতে জমা হওয়ার নিয়ম রয়েছে।
অর্থাৎ, একজন কর্মীর ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের পাশাপাশি অবসরকালীন পেনশনের জন্যও একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ করা হয়। তবে কোনও কর্মী EPS-এর আওতায় না থাকলে তাঁর বেতন থেকে সেই EPS contribution কাটার প্রশ্নই ওঠে না।
এই কারণেই প্রথম চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় বেতন কত, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চাকরিজীবনের শুরুতেই যদি কোনও কর্মী নির্ধারিত বেতনসীমার মধ্যে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী তিনি EPFO-র পরিষেবার আওতায় আসতে পারেন। কিন্তু প্রথম চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়ই যদি তাঁর বেতন নির্ধারিত সীমার বেশি হয়, তাহলে EPS-এর ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য হয়।
এখানেই এতদিন অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল। কারণ কর্মজীবনে পরে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধির ফলে কারও বেতন নির্ধারিত সীমার বেশি হয়ে গেলে তাঁর PF পরিষেবা নিয়ে নিয়ম এক রকম। অন্যদিকে, কেউ যদি প্রথম চাকরিতেই সীমার বেশি বেতন নিয়ে যোগ দেন, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন।
EPFO-র সাম্প্রতিক ব্যাখ্যার উদ্দেশ্য হল এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা।
ধরা যাক, কোনও ব্যক্তি প্রথমবার চাকরিতে যোগ দিলেন এবং তাঁর মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, তিনি চাকরিতে প্রবেশের সময়ই নতুন নির্ধারিত ২৫ হাজার টাকার সীমার বেশি বেতন পাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে তিনি EPS-এর আওতায় থাকবেন না। ফলে তাঁর বেতন থেকে EPS contribution কাটার নিয়মও প্রযোজ্য হবে না।
EPFO-র বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সংস্থা যদি এমন কর্মীর বেতন থেকে EPS-এর জন্য নিয়মিত টাকা কেটে নেয়, তাহলে কর্মীর বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। প্রথমে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। সমস্যা সমাধান না হলে EPFO-তে অভিযোগ জানানো যেতে পারে।
এখানে কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজের salary slip বা বেতন সংক্রান্ত নথি নিয়মিত পরীক্ষা করা। বেতনের বিভিন্ন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, কোন খাতে কত contribution জমা হচ্ছে—সেগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বেতনসীমা ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে বলেই ২৫ হাজার টাকার বেশি বেতন পাওয়া প্রত্যেক কর্মীর PF সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রথম চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি এবং কর্মীর PF/EPS-এর আওতায় আসার যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। আবার কর্মজীবনের পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধির কারণে কারও বেতন নির্ধারিত সীমার বেশি হয়ে গেলে বিষয়টি আলাদা হতে পারে।
দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোনও কর্মীর বেতন পদোন্নতির ফলে ধাপে ধাপে নির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমার বেশি হয়ে গেলে তাঁর ক্ষেত্রে PF পরিষেবা প্রাপ্তির বিষয়টি ঐচ্ছিক হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, প্রথম চাকরিতে সীমার মধ্যে থাকা এবং পরে বেতন বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আর প্রথম চাকরিতেই সীমার বেশি বেতন নিয়ে যোগ দেওয়ার ঘটনা এক নয়।
PF এবং EPS-এর নিয়ম অনেকটাই প্রযুক্তিগত। কর্মীর বেতন, চাকরিতে যোগদানের সময়, EPFO-র আওতায় থাকা এবং নিয়োগকর্তার contribution—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি নির্ধারিত হয়।
তার উপর সম্প্রতি বেতনসীমা ১৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করার ফলে অনেক কর্মী নতুন নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে প্রথম চাকরিতে তুলনামূলক বেশি বেতন পাওয়া তরুণ কর্মীদের ক্ষেত্রে EPS-এর নিয়ম কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
EPFO-র সাম্প্রতিক ব্যাখ্যা সেই বিভ্রান্তি দূর করার লক্ষ্যেই দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়মের পরে চাকরিজীবীদের কয়েকটি বিষয়ে নজর রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় নিজের বেতন এবং EPFO-র আওতায় পড়ার বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার।
দ্বিতীয়ত, প্রতি মাসের salary slip ভালো করে দেখা উচিত। PF এবং EPS-এর নামে কোনও টাকা কাটা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, যদি এমন কোনও কর্মী থাকেন যিনি প্রথম চাকরিতেই ২৫ হাজার টাকার বেশি বেতনে যোগ দিয়েছেন এবং তাঁর বেতন থেকে EPS contribution কাটা হচ্ছে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে প্রথমে সংস্থার HR বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
সমস্যার সমাধান না হলে EPFO-র কাছে অভিযোগ জানানো যেতে পারে। অর্থাৎ, কর্মীদের নিজেদের বেতন সংক্রান্ত তথ্য ও contribution-এর হিসাব সম্পর্কে সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বেতনসীমা ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা করায় আরও বেশি সংখ্যক কর্মী PF-এর সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পেয়েছেন বলে শ্রমমন্ত্রকের দাবি। আনুমানিক ৫১ লক্ষ অতিরিক্ত কর্মী এর ফলে উপকৃত হতে পারেন।
এর ফলে তুলনামূলক কম ও মাঝারি বেতনের বহু কর্মী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন। বিশেষ করে বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত কর্মীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে EPS-এর নিয়মকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। PF এবং pension contribution-এর কাঠামো আলাদা হওয়ায় কর্মীদের নিজেদের ক্ষেত্রে কোন নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে, সেটি বুঝে নেওয়া জরুরি।
বর্তমানে বহু তরুণ চাকরিজীবী প্রথম চাকরিতেই তুলনামূলক ভালো বেতন পাচ্ছেন। তাঁদের ক্ষেত্রে EPFO-র নতুন বেতনসীমা এবং EPS-এর নিয়ম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় শুধু হাতে পাওয়া বেতন বা take-home salary-এর দিকে নজর না দিয়ে salary structure-ও বোঝা প্রয়োজন। Basic salary, PF contribution, employer contribution এবং pension contribution—প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত।
কারণ মাসের শেষে হাতে পাওয়া টাকার পরিমাণ এবং PF/EPS-এর জন্য নির্ধারিত বেতনের হিসাব এক বিষয় নয়।
EPFO-র এই নির্দেশিকা শুধু কর্মীদের জন্য নয়, নিয়োগকর্তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও কর্মী EPS-এর আওতায় না থাকলে তাঁর কাছ থেকে সেই খাতে contribution কাটা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তাই বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের HR এবং payroll বিভাগকে কর্মীর চাকরিতে যোগদানের সময়কার বেতন এবং প্রযোজ্য EPFO নিয়ম যথাযথ ভাবে যাচাই করতে হবে। কর্মীদের salary structure-এ PF ও EPS-এর হিসাব সঠিক ভাবে প্রয়োগ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ভুলভাবে contribution কাটা হলে পরবর্তীতে কর্মী এবং সংস্থা—দুই পক্ষেরই সমস্যা তৈরি হতে পারে।
EPFO-র সাম্প্রতিক নিয়ম ও ব্যাখ্যা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় বেতনসীমা এবং কর্মীর PF/EPS status গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রথম চাকরিতে ২৫ হাজার টাকার বেশি বেতন পাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে EPS নিয়ে আলাদা নিয়ম রয়েছে।
অন্যদিকে, কর্মজীবনের পরে বেতন বাড়লে সেই পরিস্থিতিকে প্রথম চাকরির পরিস্থিতির সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। ফলে প্রত্যেক কর্মীর নিজের চাকরিতে যোগদানের সময়কার তথ্য, বেতন কাঠামো এবং EPFO contribution-এর হিসাব আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
বেতন থেকে PF বা pension-এর নামে কোনও টাকা কাটা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া কর্মীদের অধিকার। কোনও অসঙ্গতি দেখা দিলে EPFO-র কাছে অভিযোগ জানানোর পথও খোলা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, PF বেতনসীমা ১৫ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি EPS নিয়ে EPFO-র এই স্পষ্টীকরণ বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত বহু চাকরিজীবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁরা নতুন চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রথম চাকরির বেতন কত এবং সেই অনুযায়ী কোন সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প প্রযোজ্য হবে, তা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।