ক্রিকেট যে দলগত খেলা, সেটাই কি ভুলে গিয়েছে ভারত? একক দক্ষতায় কত দূর যাবে তারা? সেই সমালোচনাই তো করেছেন মহম্মদ আমির।
পাকিস্তানের প্রাক্তন জোরে বোলার Mohammad Amir ইডেনে ভারত হারবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল পরিষ্কার— ভারত দল হিসাবে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করতে পারছে না; এক-দু’জন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত সাফল্যের উপরই ভর করে ম্যাচ জিতছে। কিন্তু কলকাতার Eden Gardens-এ চার বল বাকি থাকতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়কে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠতেই বিতর্ক নতুন মোড় নেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় আমিরকে নিশানা করে সমালোচনা। প্রশ্ন উঠছে— সত্যিই কি ভুল কিছু বলেছেন তিনি, নাকি তাঁর মন্তব্যের ভিতরে রয়েছে বাস্তবতার ছাপ?
সেমিফাইনালে ওঠার পরেও নিজের অবস্থান থেকে সরেননি আমির। তাঁর বক্তব্য, ভারতের ফিল্ডিং মানসম্মত নয়— একাধিক ক্যাচ পড়েছে। বোলিং বিভাগে Jasprit Bumrah ছাড়া বাকিরা ধারাবাহিকভাবে রান আটকাতে পারছেন না। তাঁর মতে, একটি শক্তিশালী দল কখনও এক জনের উপর নির্ভর করে না; বরং ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং— তিন বিভাগেই সমান পারদর্শিতা দেখায়।
আমিরের কথায় যুক্তি আছে কি? তা খতিয়ে দেখতে গেলে ভারতের সাম্প্রতিক ম্যাচগুলির দিকে তাকাতে হয়।
প্রথম ম্যাচে Suryakumar Yadav-এর ৮৪ রানের ইনিংস না হলে ভারত ১৬১ রানে পৌঁছতে পারত কি? সেই ম্যাচে আমেরিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ ফেলেছিল— যা ভারতের পক্ষে মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। সূর্যের ইনিংসেই ২৯ রানের জয় আসে। অর্থাৎ শুরু থেকেই ভারতকে টেনে তুলেছেন এক জন ব্যাটার।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচে Ishan Kishan-এর ৭৭ রান ছিল ম্যাচ নির্ধারক। যদি ১৭৬ নয়, ১৩০-১৪০ রানের লক্ষ্য দিত ভারত, ফল কি একই থাকত? পাকিস্তানের অধিনায়ক Salman Ali Agha নিজেই স্বীকার করেছিলেন, ঈশানের ইনিংস ম্যাচের গতি বদলে দেয়। এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে, ভারতের জয় অনেকাংশে নির্ভর করেছিল ব্যক্তিগত এক উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের উপর।
নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ১৯৩ রান করেও ১৭ রানে হারের ঘটনা ভারতের ব্যাটিং-বোলিং ভারসাম্যের প্রশ্ন তোলে। Shivam Dube-এর ৬৬ রানের ইনিংস সত্ত্বেও ম্যাচ জেতা যায়নি। অর্থাৎ বড় স্কোর করেও দল হিসাবে রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি ভারত। এখানে আমিরের ফিল্ডিং ও বোলিং নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অমূলক নয়।
সবশেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ম্যাচ। ১৯৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ব্যর্থ হন অভিষেক, ঈশান, সূর্য, হার্দিকরা। সেই পরিস্থিতিতে Sanju Samson-এর ৯৭ রানের ইনিংস ভারতকে সেমিফাইনালে তোলে। চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় ইনিংস গড়ে তোলার জন্য বিশেষজ্ঞেরা এই ইনিংসকে টি-টোয়েন্টির অন্যতম সেরা বলে আখ্যা দিয়েছেন। যদি সঞ্জু ওই ইনিংস না খেলতেন, ভারতের ভাগ্য কি অন্যরকম হত? প্রশ্ন থেকেই যায়।
বোলিং বিভাগে Jasprit Bumrah ধারাবাহিকভাবে উইকেট তুলেছেন ও রান আটকে রেখেছেন। কিন্তু অন্য বোলারদের ইকোনমি রেট ও উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা ওঠানামা করেছে। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একটি দল যদি শুধুমাত্র এক জন প্রধান বোলারের উপর নির্ভর করে, তা হলে বড় মঞ্চে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আমিরের বক্তব্য এই জায়গাতেই প্রাসঙ্গিক।
তবে অন্য দিকও আছে। টি-টোয়েন্টি এমন একটি ফরম্যাট, যেখানে প্রায়শই এক জনের অসাধারণ ইনিংস ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। বিশ্বের বহু চ্যাম্পিয়ন দলই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এক বা দুই তারকার পারফরম্যান্সে ভর করে জিতেছে। সেক্ষেত্রে ভারত আলাদা কিছু করছে না। বরং বড় দলের বৈশিষ্ট্যই হল— কেউ না কেউ উঠে দাঁড়ায়।
তবে ধারাবাহিকভাবে আলাদা আলাদা ম্যাচে আলাদা নায়ক— এটা কি দলীয় গভীরতার প্রমাণ, না কি স্থিতিশীলতার অভাব? এই বিতর্কই এখন মূল আলোচ্য বিষয়।
আমির ফিল্ডিং নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আধুনিক ক্রিকেটে ফিল্ডিং একটি ম্যাচের মোড় ঘোরাতে পারে। ক্যাচ ফেললে বা রান আউটের সুযোগ নষ্ট হলে প্রতিপক্ষের মনোবল বাড়ে। ভারত যদি সেমিফাইনাল ও ফাইনালে উঠতে চায়, তবে এই জায়গায় উন্নতি করতেই হবে।
তবে মানসিক দৃঢ়তার জায়গায় ভারতকে কৃতিত্ব দিতেই হয়। চাপের মুখে বারবার ম্যাচ জেতা সহজ নয়। সঞ্জুর ইনিংস বা ঈশানের লড়াই প্রমাণ করে, দলটি ভেঙে পড়ে না। এই মানসিক শক্তিই বড় টুর্নামেন্টে পার্থক্য গড়ে দেয়।
Mohammad Amir-এর মন্তব্য আবেগের নয়, ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণ থেকেই এসেছে। ভারতের জয় সত্ত্বেও তাঁর প্রশ্নগুলো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্যি— ফলাফলই শেষ কথা বলে। ভারত সেমিফাইনালে উঠেছে, এবং সেটা করেছে চাপের মুখে জিতে।
সম্ভবত সত্যিটা মাঝামাঝি কোথাও। ভারত এখনও সেরা ছন্দে নেই; কিন্তু প্রয়োজনের সময় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স দলকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে। যদি সেমিফাইনাল ও ফাইনালে দল হিসাবে ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং তিন বিভাগেই ভারসাম্য আনতে পারে, তবে আমিরের সমালোচনা অচিরেই গুরুত্ব হারাবে।
সব বিতর্কের শেষে এসে প্রশ্নটা একটাই— Mohammad Amir কি শুধুই বিতর্ক উসকে দিতে মন্তব্য করেছিলেন, নাকি তাঁর কথার ভিতরে ছিল ক্রিকেটীয় বাস্তবতার ছাপ? ভারত সেমিফাইনালে উঠেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলাফল স্কোরবোর্ডেই লেখা থাকে, আর ক্রিকেটের ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ই মনে রাখা হয়। কিন্তু বড় টুর্নামেন্টে কেবল জেতাই যথেষ্ট নয়; কীভাবে জিতছে, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিশ্বকাপে ভারতের প্রতিটি ম্যাচ যেন আলাদা গল্প। কখনও Suryakumar Yadav দলের ত্রাতা, কখনও Ishan Kishan, কখনও বা Sanju Samson। বোলিংয়ে ধারাবাহিকভাবে ভরসা দিয়েছেন Jasprit Bumrah। এ যেন প্রতিটি ম্যাচে নতুন নায়ক তৈরির কাহিনি। এক দিক থেকে দেখলে, এটা দলের গভীরতার প্রমাণ— ড্রেসিংরুমে এত বিকল্প আছে যে, কেউ ব্যর্থ হলে অন্য কেউ উঠে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু অন্য দিক থেকে দেখলে, এটা কি স্থায়ী কাঠামোর অভাব নয়? একটি সুসংহত দল সাধারণত ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং— তিন বিভাগেই ধারাবাহিকতা দেখায়।
আমিরের মূল অভিযোগ ছিল, ভারত দল হিসাবে এখনও সেরা ছন্দে নেই। ফিল্ডিংয়ে ভুল, ক্যাচ পড়া, নির্দিষ্ট বোলারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা— এই সব প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেমিফাইনাল বা ফাইনালের মতো মঞ্চে এই ছোট ভুলগুলোই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। বড় দলের বৈশিষ্ট্য হল, তারা নিজেদের দুর্বলতা দ্রুত চিহ্নিত করে সংশোধন করে। ভারতের সামনে এখন সেই সুযোগ।
তবে সমালোচনার মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট— চাপের মুখে ভারত ভেঙে পড়ছে না। বরং সংকটেই বেরিয়ে আসছে লড়াকু মানসিকতা। ১৯৬ রান তাড়া করে জেতা, বা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিরুদ্ধে বড় ইনিংস খেলে ম্যাচ ঘোরানো— এগুলো কেবল কাকতালীয় নয়, মানসিক দৃঢ়তারও পরিচয়। টি-টোয়েন্টির মতো অনিশ্চিত ফরম্যাটে প্রায়শই এক জনের অসাধারণ ইনিংসই ম্যাচ নির্ধারণ করে। সেক্ষেত্রে ভারত যা করছে, তা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
ক্রিকেটে ‘দল’ শব্দটির অর্থ কেবল এগারো জন খেলোয়াড় নয়, বরং তাদের মধ্যে সমন্বয়, পরিকল্পনা, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক আস্থা। যদি ভারতের বিভিন্ন ম্যাচে বিভিন্ন নায়ক উঠে আসেন, তা হলে এটাও বলা যায়— ড্রেসিংরুমে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নেই। প্রত্যেকে জানেন, সুযোগ পেলে ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা তাঁদের আছে। এই বিশ্বাসই বড় টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তবু সতর্কবার্তা থেকে যায়। বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ঝলকানি যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রয়োজন হবে সমষ্টিগত সাফল্য— ওপেনারদের দায়িত্বশীল শুরু, মাঝের ওভারে বোলারদের নিয়ন্ত্রণ, ডেথ ওভারে নিখুঁত পরিকল্পনা, আর ফিল্ডিংয়ে শূন্য ভুল। যদি ভারত এই জায়গাগুলিতে উন্নতি করতে পারে, তবে সমালোচনার জবাব মাঠেই দেওয়া সম্ভব।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আমিরের মন্তব্য সম্পূর্ণ ভুল নয়, আবার সম্পূর্ণ সঠিকও নয়। তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা ভারতের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের লড়াই ও জয়ের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে— দলটি সংকটে মাথা ঠান্ডা রাখতে জানে। এখন সময় এসেছে প্রমাণ করার, তারা শুধু ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং প্রকৃত অর্থেই একটি সুসংগঠিত ও পরিপূর্ণ দল।
সেমিফাইনালের মঞ্চে যখন আবার নামবে ভারত, তখন এই সমস্ত বিতর্কের উত্তর মিলবে মাঠেই। ক্রিকেটে শেষ কথা বলে ব্যাট আর বল। আর সেই শেষ কথাই ঠিক করে দেয়— সমালোচনা ইতিহাসে টিকে থাকবে, নাকি জয়ই সব প্রশ্নের জবাব হয়ে উঠবে।