এশিয়ান গেমস ২০২৬ এ আরও একটি সোনা ভারতের ঝুলিতে। মেয়েদের কবাডির হাড্ডাহাড্ডি ফাইনালে ইরানকে ৩৭-৩৪ পয়েন্টে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। ২৬ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি নাগোয়ার টোকাই সিটিজেন জিমনেশিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ফাইনালে শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে তীব্র লড়াই দেখা যায়। প্রথমার্ধ শেষে ভারত ২২-১৬ পয়েন্টে এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে ইরান দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্যবধান কমিয়ে ম্যাচকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় খেলোয়াড়েরা চাপ সামলে ৩৭-৩৪ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন। এই জয়ের ফলে এশিয়ান গেমস ২০২৬ এ ভারতের সোনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিনে। মেয়েদের কবাডিতে এটি ভারতের চতুর্থ সোনা। ২০১০ সালে এশিয়ান গেমসে মেয়েদের কবাডি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে ভারত এই ইভেন্টে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০১৮ সালের জাকার্তা গেমসে ইরানের কাছে ফাইনালে হারার পর সেই আসরে ভারত রুপো পেয়েছিল। এরপর ২০২২ সালের হাংঝো গেমসে ভারত আবার সোনা জেতে এবং এবার আইচি নাগোয়া গেমসেও শিরোপা ধরে রাখল।
এশিয়ান গেমস ২০২৬-এ আরও একটি সোনার পদক জিতে নিল ভারত। মেয়েদের কবাডিতে হাড্ডাহাড্ডি ফাইনালে ইরানকে ৩৭-৩৪ পয়েন্টে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারতীয় মহিলা দল। শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের টোকাই সিটিজেনস জিমনেশিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ফাইনাল ম্যাচ শুরু থেকেই ছিল উত্তেজনায় ভরা। একদিকে ছিল এশিয়ান গেমসে মেয়েদের কবাডির অন্যতম শক্তিশালী দল ভারত, অন্যদিকে ছিল ইরান, যারা অতীতে ভারতকে কঠিন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিন পয়েন্টের ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে ভারত শুধু সোনার পদকই নিশ্চিত করেনি, একই সঙ্গে আগের এশিয়ান গেমসে জেতা মেয়েদের কবাডির শিরোপাও ধরে রাখল। এই জয় ২০২৬ এশিয়ান গেমসে ভারতের তৃতীয় সোনা বলেও নিশ্চিত হয়েছে।
ফাইনালের ফলাফল যতটা কাছাকাছি, ম্যাচের লড়াইও ছিল ততটাই কঠিন। ভারত প্রথমার্ধে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং বিরতিতে ২২-১৬ পয়েন্টে এগিয়ে যায়। প্রথমার্ধে ভারতীয় রেইডাররা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সংগ্রহ করেন এবং রক্ষণভাগও ইরানের আক্রমণ থামাতে কার্যকর ভূমিকা নেয়। ছয় পয়েন্টের ব্যবধান নিয়ে ভারত যখন বিরতিতে যায়, তখন ম্যাচে তাদের অবস্থান কিছুটা সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ইরান দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ার্ধে ইরান ১৮ পয়েন্ট সংগ্রহ করে, যেখানে ভারত পায় ১৫ পয়েন্ট। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচের উত্তেজনা বজায় ছিল। তবুও প্রথমার্ধে তৈরি করা ব্যবধান ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত ৩৭-৩৪ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ভারত।
ভারতের এই জয়কে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে পুরো টুর্নামেন্টে তাদের অপরাজিত অভিযান। গ্রুপ পর্ব থেকেই ভারতীয় মহিলা কবাডি দল ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে। প্রতিযোগিতার প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশকে ৪২-২১ পয়েন্টে হারিয়ে অভিযান শুরু করেছিল ভারত। সেই ম্যাচে শুরু থেকেই ভারতীয় দল আক্রমণাত্মক ছিল। রেইডিংয়ের পাশাপাশি রক্ষণেও তারা দারুণ সমন্বয় দেখায়। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জয় দিয়ে ভারত নিজেদের আত্মবিশ্বাসের জায়গাটি শক্ত করে নেয় এবং পরবর্তী ম্যাচগুলিতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত হয়।
গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচেই ভারতের সামনে ছিল ইরান। এই ম্যাচটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল, কারণ ২০১৮ সালের এশিয়ান গেমসের ফাইনালে ইরান ভারতের শিরোপার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০২৬ সালের গ্রুপ পর্বে সেই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই ভারত ৩৭-২৩ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। অর্থাৎ ফাইনালের আগে ভারত ইরানের শক্তি সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা পেয়েছিল। গ্রুপ পর্বের সেই জয় ফাইনালের জন্য ভারতীয় দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও, ফাইনালে ইরান যে আরও শক্তিশালীভাবে ফিরে আসবে, সেটিও প্রত্যাশিত ছিল। তাই সোনার লড়াইয়ে ভারতের জন্য কোনোভাবেই ম্যাচটি সহজ ছিল না।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ভারত মুখোমুখি হয়েছিল আয়োজক দেশ জাপানের। সেই ম্যাচেও ভারতীয় দল নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে ৫০-২৫ ব্যবধানে জয় পায়। এই জয়ের মাধ্যমে ভারত গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের তিনটিতেই জয় নিশ্চিত করে। জাপানের বিরুদ্ধে ভারত প্রথমার্ধেই ৩২-১৩ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে জাপান কিছুটা লড়াই করার চেষ্টা করলেও ভারত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। তিন ম্যাচে তিনটি জয় নিয়ে ভারত গ্রুপ পর্ব শেষ করে এবং সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে।
সেমিফাইনালেও ভারতীয় মহিলা দলের দাপট অব্যাহত ছিল। ২৫ সেপ্টেম্বর টোকাই সিটিজেনস জিমনেশিয়ামে অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ ছিল নেপাল। ম্যাচে ভারত ৪৮-২৪ ব্যবধানে জয় পেয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায়। সেমিফাইনালে ভারতীয় রেইডাররা শুরু থেকেই নেপালের রক্ষণকে চাপে রাখেন। প্রথমার্ধ শেষে ভারত ৩১-১৭ পয়েন্টে এগিয়ে ছিল। দ্বিতীয়ার্ধে নেপাল ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করলেও ভারতীয় দলের শক্তিশালী রক্ষণ ও ধারাবাহিক রেইডিং তাদের সেই সুযোগ দেয়নি। শেষ পর্যন্ত ২৪ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়ে ভারত ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে।
ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ ইরানও নিজেদের সেমিফাইনাল জিতে এসেছিল। ফলে দুই দলের মধ্যেই ছিল এশিয়ান গেমসের সোনার জন্য সরাসরি লড়াই। ভারতের সামনে ছিল নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার সুযোগ, আর ইরানের সামনে ছিল ভারতকে হারিয়ে সোনা ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ। এই দুই লক্ষ্য থেকেই ফাইনালের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে থেকেই দুই দলের শক্তি, আগের মুখোমুখি লড়াই এবং টুর্নামেন্টে তাদের পারফরম্যান্স নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
ফাইনালের শুরুতেই ভারত নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে শুরু করে। ভারতীয় রেইডাররা ইরানের ডিফেন্সের দুর্বল জায়গাগুলি খুঁজে নিয়ে পয়েন্ট সংগ্রহের চেষ্টা করেন। অন্যদিকে ভারতীয় ডিফেন্ডাররাও ইরানের রেইডারদের আটকাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ট্যাকল করেন। দুই দলের মধ্যে দ্রুত পয়েন্ট আদান-প্রদান চলতে থাকে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভারত ধীরে ধীরে কিছুটা ব্যবধান তৈরি করে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ভারত ছয় পয়েন্টের লিড নিয়ে বিরতিতে যায়। স্কোর ছিল ২২-১৬।
প্রথমার্ধের এই ছয় পয়েন্টের লিড ভারতকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও ম্যাচ তখনও পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ইরানের দল দ্বিতীয়ার্ধে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ভারতীয় রক্ষণভাগের ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং ইরান একের পর এক পয়েন্ট তুলে ব্যবধান কমিয়ে আনে। দ্বিতীয়ার্ধে ইরান ভারতের তুলনায় তিন পয়েন্ট বেশি সংগ্রহ করে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, ম্যাচের দ্বিতীয় অংশে লড়াই কতটা কঠিন হয়ে উঠেছিল। ভারত প্রথমার্ধে যে ব্যবধান তৈরি করেছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাদের সোনা এনে দেয়।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তগুলো ছিল সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ। তিন পয়েন্টের ব্যবধান নিয়ে ভারত এগিয়ে থাকলেও ইরান বারবার ম্যাচে ফিরে আসার চেষ্টা করে। একটি ভুল বা একটি গুরুত্বপূর্ণ রেইড ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারত। ভারতীয় খেলোয়াড়রা সেই চাপের মুহূর্তে নিজেদের সংযত রাখেন। রেইডিংয়ে প্রয়োজনীয় পয়েন্ট সংগ্রহের পাশাপাশি রক্ষণে সতর্ক থেকে ইরানকে বড় কোনো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না দিয়ে শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করেন। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতীয় শিবিরে শুরু হয় সোনার উদ্যাপন।
এই জয় ভারতের মেয়েদের কবাডির ধারাবাহিক সাফল্যের আরেকটি অধ্যায়। এশিয়ান গেমসে মেয়েদের কবাডি ২০১০ সালে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে ভারত এই ইভেন্টে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ২০১০ এবং ২০১৪ সালে ভারত সোনা জিতেছিল। ২০১৮ সালে ইরানের কাছে ফাইনালে হেরে ভারত রুপো পেয়েছিল। এরপর ২০২২ সালের হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে ভারত আবার সোনা জেতে। ২০২৬ সালে ইরানকে হারিয়ে সেই শিরোপা ধরে রাখার ফলে মেয়েদের কবাডিতে ভারতের এশিয়ান গেমসের সাফল্যের ধারাবাহিকতা আরও একবার সামনে এল।
২০১৮ সালের ফাইনালের স্মৃতিও এই ম্যাচের আগে বিশেষভাবে আলোচনায় ছিল। সেই ফাইনালে ইরান ভারতকে ২৭-২৪ ব্যবধানে হারিয়ে মেয়েদের কবাডিতে নিজেদের একমাত্র এশিয়ান গেমস সোনা জিতেছিল। এরপর ভারত ২০২২ সালে আবার শিরোপা ফিরে পায়। ২০২৬ সালের ফাইনালে একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জয় তাই ভারতীয় দলের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। এবার অবশ্য ফাইনালের ফল ভারতের পক্ষে গেছে এবং ৩৭ -৩৪ ব্যবধানে ইরানকে হারিয়ে ভারত নিজেদের শিরোপা ধরে রেখেছে।
ভারতীয় দলের এই সাফল্যের পিছনে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দলগত পারফরম্যান্স ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অধিনায়ক পুষ্পা রানার নেতৃত্বে দলটি প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। স্কোয়াডে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি এমন খেলোয়াড়ও ছিলেন যারা এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে নিজেদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পেয়েছেন। প্রতিটি ম্যাচে রেইডার এবং ডিফেন্ডারদের মধ্যে সমন্বয় ভারতের শক্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল। ফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে সেই দলগত সমন্বয়ই ভারতকে সাফল্য এনে দেয়।
সঞ্জু দেবীর পারফরম্যান্সও পুরো টুর্নামেন্টে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ থেকেই তিনি দলের আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নেপালের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালেও তাঁর রেইডিং ভারতের আক্রমণকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ভারতীয় দল যখন দ্রুত পয়েন্ট সংগ্রহের প্রয়োজন অনুভব করেছে, তখন রেইডাররা সামনে থেকে দায়িত্ব নিয়েছেন। একইভাবে রক্ষণভাগও প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ রেইডারদের আটকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে।
ভারতের এই সাফল্য শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, পুরো টুর্নামেন্টের ধারাবাহিকতার ফল। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ, ইরান ও জাপানের বিরুদ্ধে তিনটি জয়, তারপর সেমিফাইনালে নেপালকে হারানো এবং শেষে ফাইনালে ইরানের বিরুদ্ধে জয় প্রতিটি ম্যাচেই ভারত নিজেদের শক্তি প্রমাণ করেছে। বিশেষ করে গ্রুপ পর্বে ইরানকে ৩৭-২৩ ব্যবধানে হারানোর পর ফাইনালে আবার একই দলের মুখোমুখি হওয়া ভারতের জন্য মানসিক ও কৌশলগতভাবে একটি আলাদা পরীক্ষা ছিল। কিন্তু গ্রুপ ম্যাচের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভারত শেষ পর্যন্ত সোনার পদক নিশ্চিত করে।
এবারের এশিয়ান গেমসে কবাডি অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাপানের আইচি প্রিফেকচারের টোকাই সিটিজেনস জিমনেশিয়ামে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ইভেন্টের ম্যাচগুলি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেয়েদের বিভাগে আটটি দল দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রতিযোগিতা করেছে। গ্রুপ পর্বের পর সেমিফাইনাল এবং তারপর ফাইনালের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে মেয়েদের সোনার ম্যাচ। ভারতের সঙ্গে ইরানের ফাইনাল সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হিসেবে সামনে আসে।
কবাডি এশিয়ান গেমসে ভারতের জন্য ঐতিহ্যবাহীভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি খেলা। পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েদের কবাডিতেও ভারত দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। এই খেলার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সাফল্য এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর জনপ্রিয়তা জড়িয়ে রয়েছে। এশিয়ান গেমসে সোনা জেতার ফলে ভারতীয় মহিলা দলের এই সাফল্য দেশের কবাডি খেলোয়াড়দের জন্য আরও একটি বড় মঞ্চ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতীয় মেয়েদের কবাডির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও এই জয়ের মাধ্যমে আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
ভারতের তৃতীয় সোনা হিসেবে এই পদকের গুরুত্বও কম নয়। ২০২৬ আইচি নাগোয়া এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রথম সোনা এসেছিল মেয়েদের টি টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ভারত ক্রিকেটে সোনা জিতেছিল। এরপর মেয়েদের কবাডির এই জয় ভারতের সোনার তালিকায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করেছে। ফলে এশিয়ান গেমসের পদক তালিকায় ভারতের অবস্থানকে এগিয়ে নিতে এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভারতীয় মহিলা কবাডি দলের এই সাফল্য দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় মহিলা খেলোয়াড়রা বিভিন্ন খেলায় ধারাবাহিকভাবে নিজেদের দক্ষতা দেখাচ্ছেন। ক্রিকেট থেকে শুরু করে কবাডি, অ্যাথলেটিক্স, শুটিং, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলায় ভারতীয় মহিলা ক্রীড়াবিদরা বড় প্রতিযোগিতায় নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। এশিয়ান গেমসের মতো বহুজাতিক প্রতিযোগিতায় সোনা জয় সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ।
ফাইনালে ভারতের জয় অবশ্য সহজে আসেনি। স্কোরলাইন ৩৭-৩৪ হওয়ায় বোঝা যায়, ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত কতটা কাছাকাছি ছিল। প্রথমার্ধে ভারত ছয় পয়েন্ট এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে ইরান ব্যবধান কমিয়েছে। অর্থাৎ ম্যাচের শেষ পর্যন্ত কোনো দলই নিশ্চিতভাবে স্বস্তিতে ছিল না। ভারতকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের লিড ধরে রাখার জন্য প্রতিটি রেইড ও ট্যাকলে সতর্ক থাকতে হয়েছে। ইরানের আক্রমণ প্রতিহত করার পাশাপাশি নিজেদের স্কোরও বাড়াতে হয়েছে। এই চাপ সামলে জয় পাওয়াই ভারতের পারফরম্যান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ইরানের মহিলা কবাডি দলও এশিয়ার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল। ভারত ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হয়েছে। ২০১৮ সালের ফাইনালে ইরানের জয় এবং ২০২২ সালের পর ভারতের শিরোপা পুনরুদ্ধারের ইতিহাস দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। ২০২৬ সালে একই টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব ও ফাইনালে দুই দলের মুখোমুখি হওয়া সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও গভীর করেছে। গ্রুপে ভারতের বড় ব্যবধানে জয় হলেও ফাইনালে ইরান অনেক বেশি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত ভারত তিন পয়েন্টে জয় পায়।
ভারতের ফাইনাল জয় নিয়ে ম্যাচ শেষে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বাস দেখা যায়। ভারতীয় খেলোয়াড়রা সাফল্য উদ্যাপন করেন এবং দলগতভাবে শিরোপা জয়ের আনন্দ ভাগ করে নেন। সংবাদ প্রতিবেদনে জানা যায়, জয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভারতীয় দল জয় উদ্যাপন করে এবং বিজয়োল্লাসে অংশ নেয়। পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত থাকার পর এমন একটি কঠিন ফাইনাল জিতে সোনা পাওয়া খেলোয়াড়দের কাছে বিশেষ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের সাফল্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ফাইনালের আগে তারা প্রতিটি ধাপে নিজেদের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ৪২-২১ জয়, ইরানের বিরুদ্ধে ৩৭-২৩ জয়, জাপানের বিরুদ্ধে ৫০-২৫ জয় এবং নেপালের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে ৪৮-২৪ জয় ভারতকে আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে নিয়ে যায়। তবে ফাইনালে আগের ম্যাচগুলির মতো বড় ব্যবধান তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ইরান নিজেদের রক্ষণ ও আক্রমণে অনেক বেশি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারপরও ভারতীয় দল নিজেদের প্রথমার্ধের লিডকে কাজে লাগিয়ে ম্যাচ জিতে নেয়।
এবারের প্রতিযোগিতায় ভারতের অপরাজিত অভিযান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরে সেমিফাইনালে পৌঁছনো এবং সেখানেও জয়, তারপর ফাইনালে জয়ের মাধ্যমে ভারত পুরো টুর্নামেন্টে নিজেদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে। একটি বড় প্রতিযোগিতায় প্রতিটি ম্যাচে আলাদা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কখনও বড় ব্যবধানে জয় আসে, কখনও প্রতিপক্ষ ঘুরে দাঁড়ায়, আবার কখনও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচের ফল অনিশ্চিত থাকে। ভারতীয় দল এই তিন ধরনের পরিস্থিতিই সামলে শেষ পর্যন্ত সোনা জিতেছে।
কবাডির মতো খেলায় শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি কৌশলগত পরিকল্পনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কখন রেইডে ঝুঁকি নিতে হবে, কখন প্রতিপক্ষের রেইডারকে আটকাতে হবে, কখন বোনাস পয়েন্ট নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং কখন ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এসব সিদ্ধান্ত মুহূর্তের মধ্যে নিতে হয়। ফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধে যখন ইরান চাপ বাড়িয়ে দেয়, তখন ভারতের জন্য ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ ছিল না। সেই পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা ও দলগত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই জয় ভারতের মহিলা কবাডির ভবিষ্যতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে নিয়মিত সাফল্য পাওয়া একটি দলের আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে তরুণ খেলোয়াড়দের কাছেও জাতীয় দলের হয়ে বড় প্রতিযোগিতায় খেলার অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। ভারতীয় মহিলা কবাডির জন্য এশিয়ান গেমসে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল পাওয়া সেই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
ভারতীয় দলের এই শিরোপা ধরে রাখার যাত্রা অবশ্যই সহজ ছিল না। টুর্নামেন্টে প্রতিটি দলই নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দিতে চেয়েছে। ইরান, জাপান, বাংলাদেশ এবং নেপালের মতো দলগুলির বিরুদ্ধে ম্যাচগুলিতে ভারতকে নিজেদের কৌশল বারবার মানিয়ে নিতে হয়েছে। গ্রুপ পর্বে অপেক্ষাকৃত বড় ব্যবধানে জয় এলেও নকআউট পর্বে প্রতিপক্ষের চাপ আরও বেড়ে যায়। সেমিফাইনালে নেপালের বিরুদ্ধে বড় জয় এবং ফাইনালে ইরানের বিরুদ্ধে তিন পয়েন্টের জয় সেই পার্থক্য স্পষ্ট করে।
ফাইনালের স্কোরলাইন ৩৭-৩৪ ভারতের জন্য একটি স্মরণীয় জয় হয়ে থাকবে। কারণ এটি শুধু আরেকটি সোনা নয়, বরং প্রতিপক্ষ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল জয়। ২০১৮ সালের হারের স্মৃতি, ২০২২ সালে শিরোপা পুনরুদ্ধার এবং ২০২৬ সালে শিরোপা ধরে রাখা এই ধারাবাহিকতার মধ্যে ভারতের মেয়েদের কবাডির এশিয়ান গেমস যাত্রার একটি বড় গল্প রয়েছে। এবারের ফাইনাল সেই গল্পে আরও একটি অধ্যায় যোগ করল।
এশিয়ান গেমস ২০২৬-এ ভারতের তৃতীয় সোনা হিসেবে মেয়েদের কবাডির এই জয় এখন দেশের ক্রীড়া সংবাদে অন্যতম বড় খবর। ভারতীয় মহিলা দল ইরানকে ৩৭-৩৪ ব্যবধানে হারিয়ে সোনা জিতেছে এবং পুরো টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকেছে। প্রথমার্ধে ২২-১৬ লিড নেওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে ইরানের প্রবল প্রত্যাবর্তন সত্ত্বেও ভারত শেষ পর্যন্ত নিজেদের লিড ধরে রেখেছে। ইরান দ্বিতীয়ার্ধে ১৮-১৫ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও ম্যাচের সামগ্রিক স্কোরে ভারতের প্রথমার্ধের ছয় পয়েন্টের সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে ভারতীয় মহিলা কবাডি দল আবারও দেখিয়ে দিল যে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তারা এখনও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সোনা জয় ভারতীয় দলের জন্য বড় সাফল্য। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রথম জয় থেকে শুরু করে ইরান ও জাপানের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের সাফল্য, নেপালের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের জয় এবং শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ইরানকে হারানোপ্রতিটি ধাপেই ভারতীয় দলের পারফরম্যান্স ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, আইচি নাগোয়া এশিয়ান গেমসে মেয়েদের কবাডিতে ভারতের সোনা জয় শুধু একটি পদক জয়ের ঘটনা নয়, এটি ভারতীয় কবাডির দীর্ঘদিনের সাফল্যের ধারাবাহিকতার আরও একটি অধ্যায়। ৩৭-৩৪ ব্যবধানে ইরানকে হারিয়ে ভারত শিরোপা ধরে রাখল এবং ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে নিজেদের তৃতীয় সোনা নিশ্চিত করল। ফাইনালের কঠিন লড়াই, প্রথমার্ধের লিড, দ্বিতীয়ার্ধে ইরানের প্রত্যাবর্তন এবং শেষ মুহূর্তে ভারতের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা সব মিলিয়ে এই ম্যাচ ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য একটি স্মরণীয় লড়াই হয়ে থাকবে। ভারতের মহিলা কবাডি দল এবারও এশিয়ান গেমসের মঞ্চে সোনার মুকুট ধরে রাখল, আর ইরানের বিরুদ্ধে ৩৭-৩৪ ব্যবধানের এই জয় তাদের শিরোপা অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকল।