Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কারও পোশাক বদল, কারও কণ্ঠস্বর! প্রযুক্তির অপব্যবহারে বিপাকে বলিউডের তারকারা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে তারকাদের ছবি ও ভিডিয়ো তৈরির ধরন। বলিউডের একাধিক তারকার ক্ষেত্রে তাঁদের আসল ছবি বা ভিডিয়োকে প্রযুক্তির সাহায্যে পরিবর্তন করে পোশাক, মুখের অভিব্যক্তি এমনকি কণ্ঠস্বরও বদলে দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। কখনও তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ ভুয়ো ভিডিয়ো, আবার কখনও কোনও তারকার বক্তব্য বা উপস্থিতিকে এমনভাবে সম্পাদনা করা হচ্ছে, যাতে আসল ও নকলের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই ধরনের কনটেন্ট নিয়ে তারকাদের পাশাপাশি তাঁদের অনুরাগীদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার যেমন বিনোদন জগতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনই অপব্যবহার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিচয় এবং সুনামের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বলিউডে প্রযুক্তির এই নতুন ঝুঁকি নিয়ে তাই শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।

কারও পোশাক বদল, কারও কণ্ঠস্বর! প্রযুক্তির অপব্যবহারে বিপাকে বলিউডের তারকারা
বিনোদন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এখন বিনোদন দুনিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সিনেমার ভিএফএক্স থেকে শুরু করে পোস্ট-প্রোডাকশন, ডাবিং, ভয়েস প্রসেসিং কিংবা প্রচারের কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিরই অন্য একটি দিক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলিউডে। কারও ছবি বদলে দেওয়া হচ্ছে, কারও ভিডিয়োয় পোশাক পাল্টে দেওয়া হচ্ছে, আবার কারও কণ্ঠস্বর নকল করে এমন বক্তব্য তৈরি করা হচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কখনও বলেনইনি। AI-generated content এবং deepfake প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখা এমনভাবে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে যে সাধারণ দর্শকের পক্ষে অনেক সময় সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। গত কয়েক বছরে একাধিক ভারতীয় তারকা এই ধরনের প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হয়েছেন এবং আদালতের দ্বারস্থও হয়েছেন। ২০২৬ সালে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রীতি জিন্টা, বরুণ ধাওয়ান, জ্যাকি শ্রফ, তবু-সহ একাধিক তারকা তাঁদের নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর বা ব্যক্তিসত্তার অনুমতিহীন ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা চেয়েছেন। আদালতের বিভিন্ন নির্দেশে ব্যক্তির পরিচয়, কণ্ঠস্বর, ছবি ও অন্যান্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও উঠে এসেছে। ডিপফেকের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহারগুলির একটি হল মুখের পরিবর্তন। কোনও একটি ভিডিয়োয় থাকা ব্যক্তির মুখ অন্য কারও মুখ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়। একইভাবে কোনও তারকার পুরনো ছবি নিয়ে তার পোশাক, শরীরের গঠন, মুখের অভিব্যক্তি বা ছবির পরিবেশও বদলে দেওয়া সম্ভব। ফলে আসল ছবির সঙ্গে প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ছবির পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তারকারা সাধারণত জনসমক্ষে থাকেন এবং তাঁদের ছবি ও ভিডিয়োর বিপুল ভাণ্ডার ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকে। পুরনো সাক্ষাৎকার, সিনেমার দৃশ্য, ফটোশুট, অনুষ্ঠান কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট—সবই AI-ভিত্তিক ম্যানিপুলেশনের উপাদান হয়ে উঠতে পারে। একটি ছবিকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব। শিলপা শেট্টির মামলায় এমনই অভিযোগ সামনে এসেছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বম্বে হাইকোর্ট তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে একাধিক প্ল্যাটফর্মকে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত মরফড ও ম্যানিপুলেটেড ছবি এবং ভিডিয়ো সরানোর নির্দেশ দিয়েছিল। মামলায় AI ব্যবহার করে তাঁর কণ্ঠস্বর ও আচরণ নকল করার অভিযোগও ছিল। আদালত প্রাথমিকভাবে বিষয়টিকে গুরুতর বলে বিবেচনা করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সম্মানের অধিকারের প্রসঙ্গ সামনে আনে। AI-এর মাধ্যমে কোনও ছবির পোশাক পরিবর্তন করা এখন প্রযুক্তিগতভাবে খুব সহজ হয়ে উঠেছে। কোনও তারকার স্বাভাবিক পোশাককে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের পোশাকে পরিবর্তন করা, ছবির নির্দিষ্ট অংশ এডিট করা কিংবা এমন দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব যা বাস্তবে কখনও ঘটেনি। বিশেষ করে মহিলা তারকাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ম্যানিপুলেশন নিয়ে উদ্বেগ বেশি। ২০২৬ সালে জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজকে ঘিরে একটি ভিডিয়ো নিয়ে এমনই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ‘Jugni’ গানের একটি ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে অভিনেত্রীর পোশাক নিয়ে আপত্তিকর পরিস্থিতি দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছিল। গায়ক সোনু ঠুকরাল ওই ক্লিপটি AI দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত বলে অভিযোগ করে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, কোনও আসল শুটিংয়ের ফুটেজকেও পরে প্রযুক্তির সাহায্যে এমনভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব, যাতে দর্শকের কাছে সম্পূর্ণ অন্য অর্থ তৈরি হয়। এই ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, মূল ভিডিয়ো এবং পরিবর্তিত ভিডিয়ো পাশাপাশি না দেখলে দর্শকের পক্ষে বোঝা কঠিন হতে পারে কোনটি আসল। তার উপর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছোট ক্লিপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে সম্পূর্ণ ভিডিয়ো বা উৎস যাচাই না করেই সেটি শেয়ার করে দেন। ফলে একটি ভুয়ো কনটেন্ট অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। AI-এর আরেকটি বড় ক্ষমতা হল voice cloning বা কণ্ঠস্বরের অনুকরণ। কোনও ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের নমুনা ব্যবহার করে এমন অডিও তৈরি করা সম্ভব, যাতে মনে হতে পারে সেই ব্যক্তিই কথা বলছেন। জনপ্রিয় অভিনেতা বা গায়কদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। তাঁদের অসংখ্য সাক্ষাৎকার, সিনেমার সংলাপ, গান ও অনুষ্ঠানমূলক ভিডিয়ো অনলাইনে থাকার কারণে কণ্ঠস্বরের নমুনাও সহজলভ্য। এই কারণেই বর্তমানে ব্যক্তিসত্তার অধিকারের আলোচনায় voice বা কণ্ঠস্বর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জ্যাকি শ্রফের মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর নাম, কণ্ঠস্বর এবং তাঁর সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের অনুমতিহীন বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আদালতের এই পদক্ষেপ AI ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহারের বিষয়টিকে আরও আলোচনায় এনেছে। একইভাবে গায়ক কুমার শানুও তাঁর নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর এবং vocal style-এর অনুমতিহীন ব্যবহারের অভিযোগে আদালতে গিয়েছিলেন। দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর ব্যক্তিসত্তার অধিকার রক্ষায় অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয় এবং AI, machine learning, face morphing ও অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁর পরিচয় ব্যবহারের বিষয়টিও আদেশের আওতায় আনে। ডিপফেকের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হল এমন ভিডিয়ো তৈরি করা যেখানে কোনও তারকাকে এমন কথা বলতে দেখা যায়, যা তিনি আদৌ বলেননি। মুখের নড়াচড়া ও কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নতুন বক্তব্য মিলিয়ে দিলে একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক সাক্ষাৎকার বা বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব। এর প্রভাব শুধু বিনোদন বা ব্যক্তিগত সম্মানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনও তারকার নামে রাজনৈতিক বক্তব্য, কোনও ব্র্যান্ডের প্রচার, কোনও পণ্যের endorsement কিংবা বিতর্কিত মন্তব্য তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হলে দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তারকার জনপ্রিয়তা যত বেশি, এমন ভুয়ো কনটেন্টের সম্ভাব্য প্রভাবও তত বেশি। সালমান খান ২০২৫ সালে দিল্লি হাইকোর্টে ব্যক্তিসত্তার অধিকার রক্ষার আবেদন করেছিলেন। তাঁর মামলায় নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর, screen presence, signature dance moves এবং অন্যান্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করে AI, morphing বা voiceover-এর মাধ্যমে ভুয়ো কনটেন্ট তৈরির অভিযোগ তোলা হয়েছিল। শত্রুঘ্ন সিনহার ক্ষেত্রেও তাঁর স্বতন্ত্র dialogue delivery এবং ‘Khamosh’ বলার ধরনকে ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে যুক্ত বৈশিষ্ট্য হিসেবে আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বম্বে হাইকোর্ট তাঁর নাম, ছবি, vocal mannerisms এবং signature phrase-এর অনুমতিহীন ব্যবহারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয়। ভারতে ডিপফেক নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে রশ্মিকা মন্দানার ঘটনা একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০২৩ সালে তাঁর মুখ বসানো একটি ভুয়ো ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘটনাটি নিয়ে রশ্মিকা প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানান এবং প্রযুক্তির এই ধরনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। সেই সময় অমিতাভ বচ্চনও আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিলেন।সেই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, একটি ভুয়ো ভিডিয়ো কত দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি আরও একটি প্রশ্ন সামনে আনে—একজন সাধারণ দর্শক কীভাবে বুঝবেন যে তিনি যে ভিডিয়োটি দেখছেন সেটি আসল নয়? এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—AI নিজে সমস্যার মূল নয়। চলচ্চিত্র নির্মাণ, ভিজ্যুয়াল এফেক্ট, ভয়েস রেস্টোরেশন, অনুবাদ, ডাবিং, পোস্ট-প্রোডাকশনসহ বিনোদন শিল্পে AI-এর বৈধ ও সৃজনশীল ব্যবহার রয়েছে। সমস্যা তৈরি হয় যখন কারও অনুমতি ছাড়া তাঁর পরিচয়, মুখ, কণ্ঠস্বর বা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করা হয় একজন অভিনেতার পুরনো অভিনয়কে প্রযুক্তির সাহায্যে পুনর্গঠন করার ক্ষেত্রে তাঁর বা সংশ্লিষ্ট অধিকারধারীর অনুমতি থাকলে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু অনুমতি ছাড়া একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি করা, ভুয়ো বক্তব্য প্রচার করা বা আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করা হলে তা ব্যক্তির অধিকারের প্রশ্ন তুলতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তি নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্যই এখানে মূল বিষয়।ভারতে celebrity personality rights নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আদালতে একাধিক মামলা হয়েছে। অমিতাভ বচ্চন, অনিল কাপুর, জ্যাকি শ্রফ, সালমান খান, শিলপা শেট্টি, প্রীতি জিন্টা, বরুণ ধাওয়ান, কার্তিক আরিয়ান, সুনীল শেট্টি-সহ বিভিন্ন তারকা তাঁদের নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর বা ব্যক্তিসত্তার অনুমতিহীন ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। ২০২৫ সালে এই ধরনের মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে একটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। ২০২৬ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বরুণ ধাওয়ানের ক্ষেত্রে দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর personality rights-এর সুরক্ষা দিয়েছে এবং অনুমতি ছাড়া তাঁর পরিচিত বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করার বিরুদ্ধে নির্দেশ দিয়েছে। প্রীতি জিন্টাও AI-generated deepfake এবং manipulated digital content নিয়ে বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালত পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট AI-generated deepfake কনটেন্ট সরানোর নির্দেশ দেয় এবং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলিকে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও নির্দেশনা দেয়। তবুর মামলাও এই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর এবং অন্যান্য personality attributes-এর অনুমতিহীন ব্যবহারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয়। আদেশের আওতায় AI, generative AI, machine learning, deepfake এবং face morphing-এর মতো প্রযুক্তির ব্যবহারও রাখা হয়। বলিউডের তারকারা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। তাঁদের ছবি প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া ও ফ্যান পেজে প্রকাশিত হয়। ফলে তাঁদের মুখ ও কণ্ঠস্বরের বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল উপাদান অনলাইনে রয়েছে। এই সহজলভ্যতাই একদিকে তাঁদের জনপ্রিয়তার ভিত্তি, অন্যদিকে AI misuse-এর ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ। একজন অপরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের কয়েকটি নমুনা পাওয়া কঠিন হতে পারে, কিন্তু জনপ্রিয় অভিনেতার ক্ষেত্রে বহু বছরের সাক্ষাৎকার ও সিনেমার সংলাপ অনলাইনে পাওয়া যায়। এছাড়া তারকার জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে ভুয়ো কনটেন্ট থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগও রয়েছে। কোনও অভিনেতাকে ব্যবহার করে ভুয়ো advertisement তৈরি করা হলে দর্শক সেটিকে সত্যি বলে ধরে নিতে পারেন। ফলে তারকার পরিচিতি ব্যবহার করে অন্য কেউ আর্থিক লাভ করতে পারে। ডিপফেক তৈরি করার পাশাপাশি তার দ্রুত প্রচারও একটি বড় সমস্যা। আগে একটি ভুয়ো ছবি বা ভিডিয়ো ছড়াতে সময় লাগত। এখন সামাজিক মাধ্যমের algorithmic distribution-এর ফলে কোনও আকর্ষণীয় বা চমকপ্রদ কনটেন্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। অনেক সময় ব্যবহারকারী মূল উৎস না জেনেই ভিডিয়ো শেয়ার করেন। কেউ সেটিকে সত্যি বলে বিশ্বাস করেন, কেউ আবার শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য শেয়ার করেন। কিন্তু একবার কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়লে সেটি সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলা কঠিন। এই কারণেই আদালতের বিভিন্ন মামলায় শুধু মূল নির্মাতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, সামাজিক মাধ্যম এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের ভূমিকার কথাও সামনে এসেছে।একজন অভিনেতা জনসমক্ষে কাজ করেন বলেই তাঁর সব ধরনের ছবি বা পরিচয় অন্য কেউ ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবেন—এমন ধারণা আদালতের বিভিন্ন মামলায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জনপ্রিয়তা এবং ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সামাজিক প্রশ্ন। কোনও অভিনেতার একটি সিনেমার দৃশ্যকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যবহার করা এবং তাঁর মুখ বসিয়ে আপত্তিকর বা ভুয়ো ভিডিয়ো তৈরি করা এক বিষয় নয়। আবার কোনও বিজ্ঞাপনে কোনও তারকার নাম বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও অনুমতির প্রশ্ন থাকে। ২০২৫ সালে শিলপা শেট্টির মামলায় বম্বে হাইকোর্ট ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিয়েছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, কোনও ব্যক্তিকে তাঁর জ্ঞান বা সম্মতি ছাড়া এমনভাবে উপস্থাপন করা যায় না, যা তাঁর privacy বা মৌলিক অধিকারের উপর প্রভাব ফেলে ডিপফেক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মৃণাল ঠাকুরও সরব হয়েছেন। ২০২৬ সালের আগস্টে তিনি তাঁর likeness ব্যবহার করে deepfake content তৈরি বা ছড়ানোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তা দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, অনুমতি ছাড়া তাঁর পরিচয় ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি বা প্রচার গ্রহণযোগ্য নয়। এটি দেখিয়ে দেয় যে বিষয়টি শুধু প্রবীণ বা প্রতিষ্ঠিত তারকাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন প্রজন্মের অভিনেতারাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকানোর ক্ষেত্রে শুধু অভিনেতা, আদালত বা সামাজিক মাধ্যমের দায়িত্ব নেই। সাধারণ দর্শকেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনও চমকপ্রদ ভিডিয়ো দেখলেই সেটিকে সত্যি ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে কোনও তারকার মুখে এমন বক্তব্য শোনা গেলে যা তাঁর পরিচিত অবস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গত, তখন উৎস যাচাই করা প্রয়োজন। ভিডিয়োর original source কোথায়, সেটি কোন verified account থেকে এসেছে, অন্য সংবাদমাধ্যমে একই তথ্য রয়েছে কি না—এসব দেখা জরুরি। শুধু views বা likes-এর সংখ্যা কোনও কনটেন্ট সত্যি হওয়ার প্রমাণ নয়। AI প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে। ভবিষ্যতে ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর আরও বাস্তবসম্মতভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব হতে পারে। ফলে এখনকার তুলনায় সত্য-মিথ্যা আলাদা করার প্রয়োজন আরও বাড়বে। আইন এবং প্রযুক্তির মধ্যে এই দৌড়ও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রযুক্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের অপব্যবহার তৈরি হচ্ছে। আদালতগুলি বিভিন্ন মামলার মাধ্যমে personality rights-এর পরিধি ব্যাখ্যা করছে। আইনজীবী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও এই বিষয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। একজন আইন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে AI ও personality rights-এর সংযোগে আরও নতুন আইনি প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। নাম, ছবি ও কণ্ঠস্বরের মতো পরিচিত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি কোনও তারকার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত অন্য বৈশিষ্ট্যও কীভাবে সুরক্ষিত হবে, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। বলিউডে AI-এর ব্যবহার বন্ধ হওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। বরং আগামী দিনে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। সিনেমায় ডিজিটাল ডাবল, পুরনো ফুটেজ পুনর্গঠন, ভয়েস রেস্টোরেশন, অনুবাদ এবং ভিএফএক্সের ক্ষেত্রে AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু একই সঙ্গে শিল্পী ও নির্মাতাদের মধ্যে অনুমতি, স্বত্ব, চুক্তি এবং ডিজিটাল পরিচয় নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোনও অভিনেতার ছবি বা কণ্ঠস্বর ভবিষ্যতে কোথায় ব্যবহার করা যাবে, কীভাবে ব্যবহার করা যাবে এবং ব্যবহারের বিনিময়ে কী অধিকার থাকবে এসব বিষয় চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন বাড়ছে প্রযুক্তি বলিউডের সামনে নতুন দরজা খুলেছে, আবার নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে। যে AI দিয়ে সিনেমার দৃশ্য আরও বাস্তবসম্মত করা যায়, সেই AI দিয়েই একজন তারকার পোশাক বদলে দেওয়া সম্ভব। যে প্রযুক্তি দিয়ে ভয়েস রেস্টোরেশন করা যায়, সেই প্রযুক্তি দিয়েই কোনও অভিনেতার কণ্ঠস্বর নকল করে ভুয়ো বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব। যে প্রযুক্তি বিনোদনের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, তার অপব্যবহার আবার ব্যক্তিগত অধিকার ও সুনামের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। প্রীতি জিন্টা থেকে বরুণ ধাওয়ান, জ্যাকি শ্রফ থেকে তবু, শিলপা শেট্টি থেকে সালমান খান একাধিক তারকার আদালতে যাওয়া দেখাচ্ছে যে বিষয়টি আর নিছক সোশ্যাল মিডিয়ার মজা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। আদালতের বিভিন্ন নির্দেশে ব্যক্তির নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর এবং স্বতন্ত্র পরিচয়ের অনুমতিহীন ব্যবহারের বিরুদ্ধে সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাই AI-এর যুগে প্রশ্নটা প্রযুক্তি থাকবে কি থাকবে না তা নয়। আসল প্রশ্ন হল, প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হবে। সৃজনশীল কাজে AI নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু কারও অনুমতি ছাড়া তাঁর পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়ো বা ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি হলে তার প্রভাব ব্যক্তি এবং সমাজ দুই ক্ষেত্রেই পড়তে পারে। বলিউডের তারকাদের সাম্প্রতিক আইনি লড়াই সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলে ধরছে।

news image
আরও খবর
Preview image