Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

"শীতের নতুন ঢেউ কলকাতায়! হঠাৎ পারদপতন, স্বাভাবিকের নীচে তাপমাত্রা"

কলকাতায় শীতের নতুন ঢেউ এসেছে, এবং এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। গতকাল শহরের তাপমাত্রা হঠাৎ করেই ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গিয়েছিল, যা মরসুমের সবচেয়ে শীতল দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের নিচে, এবং শীতের অনুভূতি ছিল নগরবাসীর মধ্যে। সাধারণত কলকাতা শহরে শীতের তীব্রতা খুব একটা থাকে না, কিন্তু এই তীব্র শীত শহরের পরিবেশকে ঠাণ্ডা করে দিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তাপমাত্রা আবার বাড়তে শুরু করেছে, তবে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন যে, এ ধরনের পরিবর্তন শীতকালীন আবহাওয়ার একটা স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। শহরের মানুষের মধ্যে শীতের এই হঠাৎ আগমন নিয়ে আলোচনা চলছে, এবং সবাই অপেক্ষা করছে যে, শীতের এই ঢেউ কতদিন স্থায়ী হবে।

 "শীতের নতুন ঢেউ কলকাতায়! হঠাৎ পারদপতন, স্বাভাবিকের নীচে তাপমাত্রা"
Environment & Nature

শীতের নতুন ঢেউ কলকাতায়! হঠাৎ পারদপতন, স্বাভাবিকের নীচে তাপমাত্রা

জানুয়ারির শুরুতেই কলকাতার আবহাওয়ায় হঠাৎ করেই নেমে এসেছে শীতের তীব্র ছোঁয়া। গত কয়েকদিনের তুলনামূলক মনোরম আবহাওয়ার পর এক ধাক্কায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস নেমে গেছে শহরের পারদ। এই আকস্মিক পরিবর্তন শহরবাসীকে যেমন অবাক করেছে, তেমনি আবহাওয়াবিদদের কাছেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শীত যে এখনও বিদায় নেয়নি, বরং নতুন করে জাঁকিয়ে বসতে চলেছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে এই পারদপতনে।

আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যেখানে ঘুরপাক খাচ্ছিল পনেরো থেকে ষোল ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে, সেখানে হঠাৎ করেই তা নেমে এসেছে তেরো থেকে চোদ্দ ডিগ্রিতে। এই তাপমাত্রা এই সময়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় দুই থেকে তিন ডিগ্রি কম। শীতকালীন মাসগুলিতে এমন হঠাৎ পারদপতন অস্বাভাবিক নয়, তবে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এই ধরনের তীব্র শীত শহরবাসীকে বেশ চমকে দিয়েছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন যে উত্তর ভারতের সমতল অঞ্চল এবং হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা শীতল বায়ুপ্রবাহই এই আকস্মিক তাপমাত্রা হ্রাসের মূল কারণ। হিমালয় অঞ্চলে চলমান তীব্র তুষারপাত এবং উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে শীতের প্রবল দাপট থাকায় সেখান থেকে বরফ ঠান্ডা বাতাস ধীরে ধীরে পূর্ব ভারতের দিকে এগিয়ে আসছে। এই শীতল উত্তরাঞ্চলীয় বায়ু যখন বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ুস্রোতের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন আবহাওয়ায় একটি বিশেষ ধরনের সংঘর্ষ ঘটে। এর ফলে রাতের বেলা তাপমাত্রা দ্রুত হারে নেমে যায় এবং ভোরের দিকে কনকনে ঠান্ডা অনুভূত হয়। সূর্যোদয়ের পর রোদ উঠলে কিছুটা উষ্ণতা ফিরলেও সন্ধ্যা নামতেই আবার শীতের তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে।

কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় এই তাপমাত্রা হ্রাসের প্রভাব ভিন্নভাবে অনুভূত হচ্ছে। শহরের উপকণ্ঠ এলাকাগুলি যেমন ব্যারাকপুর, বারুইপুর, সোনারপুর এবং বজবজে তাপমাত্রা আরও বেশি নেমেছে। এসব এলাকায় রাতের তাপমাত্রা নেমে গেছে এগারো থেকে বারো ডিগ্রিতে। অন্যদিকে, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলিতে, যেখানে দালানকোঠা এবং যানবাহনের কারণে তাপ উৎপন্ন হয়, সেখানে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি রয়েছে।

এই শীতের প্রভাব শুধুমাত্র তাপমাত্রার সংখ্যায়ই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর ব্যাপক ছাপ পড়ছে। ভোরের দিকে ঘন সাদা কুয়াশার চাদর নেমে আসছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে গঙ্গা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল এবং খোলা মাঠের কাছাকাছি এলাকাগুলিতে। এই কুয়াশা এতটাই ঘন হচ্ছে যে মাত্র কয়েক গজ দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ফলে সড়ক, রেল এবং বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত এই কুয়াশার প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকছে। সড়কপথে যানবাহন চালকদের অত্যন্ত সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে, হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে এগোতে হচ্ছে। হাওড়া এবং শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ছাড়া একাধিক লোকাল ট্রেন এবং দূরপাল্লার ট্রেন দশ থেকে তিরিশ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বিত হচ্ছে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও সকালের কয়েকটি ফ্লাইট দেরিতে ছাড়ছে কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায়।

শহরের সাধারণ মানুষজন শীতের এই অপ্রত্যাশিত ঢেউয়ে বেশ বিপাকে পড়েছেন। যারা ভেবেছিলেন জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই বুঝি শীত হালকা হয়ে যাবে এবং গরম কাপড় গুটিয়ে রাখা যাবে, তারা এখন আবার সেই কাপড় বের করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজারে শীতের পোশাকের চাহিদা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। গড়িয়াহাট, নিউ মার্কেট, বড়বাজার এবং গড়িয়ার মতো জনপ্রিয় বাজারগুলিতে সোয়েটার, জ্যাকেট, শাল, মাফলার এবং কম্বল কিনতে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দোকানদারদের মতে, গত তিন-চার দিনে শীতের পোশাকের বিক্রি প্রায় ত্রিশ শতাংশ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মাঝারি দামের কম্বল এবং ভারী সোয়েটারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। রাস্তার ধারে ফুটপাতে যারা শীতের পোশাক বিক্রি করেন, তাদের কাছেও ক্রেতাদের ভিড় লক্ষণীয়।

এই আকস্মিক তাপমাত্রা হ্রাসের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যের ওপর। শহরের বিভিন্ন হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমগুলিতে সর্দি, কাশি, জ্বর এবং শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এসএসকেএম হাসপাতাল, আরজি কর মেডিকেল কলেজ এবং কলকাতা মেডিকেল কলেজের বহির্বিভাগে প্রতিদিন পাঁচশোর বেশি রোগী আসছেন শীতজনিত অসুখ নিয়ে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ষাটোর্ধ্ব বয়স্কদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন যে হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষত যাদের আগে থেকেই অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস বা দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে, তাদের জন্য এই সময়টা অত্যন্ত কঠিন। চিকিৎসকদের পরামর্শ হল পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরা, হাত-মুখ নিয়মিত ধোয়া, গরম পানীয় পান করা এবং বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করা। বিশেষ করে সকাল এবং সন্ধ্যার সময় যখন তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে, তখন বাইরে যাওয়া এড়ানো উচিত।

শহরের রাস্তায় যারা আশ্রয়হীন জীবনযাপন করেন, তাদের জন্য এই শীত অসহনীয় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিয়ালদহ স্টেশন, হাওড়া ব্রিজের নীচ, পার্ক স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড এবং শহরের বিভিন্ন ফুটপাতে রাত কাটান এমন হাজার হাজার মানুষ এই কনকনে ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছেন। তাদের অনেকেরই পর্যাপ্ত গরম কাপড় নেই, থাকার জন্য নিরাপদ আশ্রয় নেই। রাতের তাপমাত্রা যখন দশ-এগারো ডিগ্রিতে নেমে যায়, তখন খোলা আকাশের নীচে থাকা এই মানুষগুলির অবস্থা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী দল এবং কিছু ব্যক্তি এগিয়ে এসেছেন তাদের সাহায্যে। প্রতি সন্ধ্যায় তারা রাস্তায় কম্বল এবং গরম খাবার বিতরণ করছেন। কলকাতা পুরসভা এবং রাজ্য সরকারও শহরের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী নাইট শেল্টার স্থাপন করেছে যেখানে আশ্রয়হীনরা রাত কাটাতে পারেন। তবে এসব আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা সীমিত এবং সকলের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই আরও বেশি সংখ্যক শেল্টার এবং সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন যাতে কেউ শীতে ভুগতে না হয়।

news image
আরও খবর

কলকাতার আশপাশের কৃষিপ্রধান এলাকাগুলিতেও এই হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়ার প্রভাব স্পষ্ট। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, উত্তর চব্বিশ পরগনা, নদিয়া এবং হুগলি জেলার কৃষকরা তাদের ফসলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। এই সময় শীতকালীন সবজির মূল মৌসুম। টমেটো, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, মটরশুঁটি, গাজর, মুলা এবং পালংশাকের চাষ এখন পূর্ণ গতিতে চলছে। তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেলে এসব সবজির বৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে। বিশেষ করে টমেটো এবং আলু গাছ ঠান্ডার প্রতি সংবেদনশীল। রাতের তাপমাত্রা যদি দশ ডিগ্রির নীচে নেমে যায়, তাহলে গাছের পাতায় তুষার পড়ার সম্ভাবনা থাকে যা ফসলের ক্ষতি করতে পারে। কৃষি দপ্তরের আধিকারিকরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন যে রাতের বেলা সম্ভব হলে গাছগুলি পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে বা ধোঁয়া তৈরি করে জমির তাপমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে রাখতে। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশ্বাস যে এই তাপমাত্রা হ্রাস যদি তিন-চার দিনের বেশি স্থায়ী না হয়, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতি হবে না। বরং হালকা শীত কিছু কিছু সবজির স্বাদ এবং গুণমান বাড়াতে সাহায্য করে।

আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী চার থেকে পাঁচ দিন এই শীতের তীব্রতা বজায় থাকবে। তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে দুই থেকে তিন ডিগ্রি কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা তেরো থেকে চোদ্দ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পঁচিশ থেকে ছাব্বিশ ডিগ্রির কাছাকাছি থাকবে। সকাল এবং রাতের তাপমাত্রা যথেষ্ট কম থাকলেও দিনের বেলা রোদ উঠলে কিছুটা উষ্ণতা অনুভূত হবে। তবে সূর্যাস্তের পর দ্রুত তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে। আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন যে আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে অর্থাৎ শনি-রবিবার নাগাদ উত্তর ভারত থেকে আসা শীতল বায়ুর প্রভাব ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করবে। তখন তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করবে এবং আবহাওয়া আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তবে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি শীতকালের প্রধান মাস হওয়ায় এই সময়ে তাপমাত্রার এমন ওঠানামা স্বাভাবিক। এমনকি আবার শীতের আরেকটি ঢেউ আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আবহাওয়াবিদরা আরও জানিয়েছেন যে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করতে পারে। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে উত্তর ভারত এবং হিমালয় অঞ্চলের আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর। যদি সেখানে তুষারপাত কমে যায় এবং শীতল বায়ুর প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে কলকাতায়ও তাপমাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। এছাড়া পশ্চিমী ঝঞ্ঝার গতিবিধিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ঝঞ্ঝাগুলি যখন উত্তর ভারতের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেখানে তাপমাত্রা আরও কমে যায় এবং সেই প্রভাব পূর্ব ভারত পর্যন্ত পৌঁছায়।

এই শীতকালে কলকাতায় তাপমাত্রার এই ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন কিন্তু নতুন কিছু নয়। গত কয়েক বছরের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে প্রতি জানুয়ারি মাসে গড়ে দুই থেকে তিনবার এমন তীব্র শীতের ঢেউ আসে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল এগারো ডিগ্রি পর্যন্ত এবং ২০২৪ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার ধরনে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কখনও কখনও শীত প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে বেশি তীব্র হচ্ছে, আবার কখনও শীতের তীব্রতা কম থাকছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে এই ধরনের অনিয়মিত আবহাওয়া ভবিষ্যতে আরও বেশি দেখা যেতে পারে।

শহরবাসীদের জন্য এই সময়ে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, পর্যাপ্ত এবং উপযুক্ত গরম কাপড় পরা দরকার। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে জ্যাকেট, সোয়েটার বা শাল নেওয়া উচিত, কারণ দিনের বেলা রোদ থাকলেও সকাল এবং সন্ধ্যার সময় ঠান্ডা অনুভূত হয়। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল পদার্থ গ্রহণ করা দরকার। শীতকালে তৃষ্ণা কম লাগলেও শরীরের পানির চাহিদা থেকেই যায়। গরম পানীয় যেমন চা, কফি, স্যুপ বা গরম জলের সঙ্গে মধু এবং লেবু পান করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। তৃতীয়ত, ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং আলো-বাতাসের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। অনেকেই শীতকালে জানালা-দরজা বন্ধ রেখে ঘরে থাকেন, কিন্তু এতে ঘরের বাতাস বাসি হয়ে যায় এবং রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ে। তাই দিনের কিছু সময়ের জন্য হলেও জানালা খুলে তাজা বাতাস প্রবেশ করানো উচিত। চতুর্থত, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্দি-কাশি-জ্বরের সংক্রমণ এড়াতে হলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। পঞ্চমত, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুমানোর মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো দরকার। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল যেমন কমলালেবু, মাল্টা এবং আমলকী খাওয়া ভালো।

এই শীতের সময়টা কলকাতার মানুষের জীবনে একটা বিশেষ মাত্রা যোগ করে। শীতকালীন খাবারের স্বাদ নেওয়ার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। গলির মোড়ে বা রাস্তার ধারে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের স্টল হয়ে ওঠে আড্ডার কেন্দ্র। চায়ের সঙ্গে পিঠে-পুলি, পায়েস, নলেন গুড়ের সন্দেশ, মোয়া, নাড়ু এবং অন্যান্য শীতকালীন মিষ্টি এই ঋতুর বিশেষ আকর্ষণ। সন্ধ্যার পর রাস্তার পাশে চায়ের দোকান, ঝালমুড়ি, ফুচকা, চপ, কাটলেট, মোমো এবং চাওমিনের স্টলগুলি মানুষে ভরে ওঠে। বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিট, গড়িয়াহাট, ভবানীপুর, কলেজ স্ট্রিট এবং এসপ্ল্যানেড এলাকার খাবারের দোকানগুলিতে শীতের সন্ধ্যায় ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। এছাড়া শীতকালীন বিশেষ কিছু খাবার যেমন মাছের ঝোল, মুরগির ঝোল, খিচুড়ি-পায়েসের আয়োজন প্রায় প্রতিটি বাঙালি ঘরে দেখা যায়। নতুন আলু দিয়ে রান্না করা তরকারি বা দম আলু শীতের একটি প্রিয় খাবার। রোদ পোহানোর জন্য মানুষ ছাদে বা বারান্দায় সময় কাটান, বিশেষ করে বয়স্করা সকালের রোদে বসে গল্পগুজব করেন। শীতের সূর্যের উষ্ণতা যেন এক বিশেষ সুখ এনে দেয়।

সব মিলিয়ে বলা যায় যে এই হঠাৎ পারদপতন এবং শীতের নতুন ঢেউ কলকাতার শীতকালের একটি স্বাভাবিক ও পরিচিত বৈশিষ্ট্য। জানুয়ারি মাস শীতের শেষ পর্যায় হলেও প্রকৃতি মাঝেমধ্যেই তার শক্তি প্রদর্শন করে এভাবে। আগামী এক সপ্তাহ এই শীত অব্যাহত থাকলেও তারপরে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে শীতকাল পুরোপুরি বিদায় নিতে এখনও প্রায় মাসখানেক সময় বাকি রয়েছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত শীতের প্রভাব কম-বেশি থাকবে এবং আরও একাধিক ঠান্ডার ঢেউ আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই শহরবাসীদের উচিত এই সময়ে সতর্ক থাকা, পর্যাপ্ত গরম কাপড় ব্যবহার করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের প্রতি বাড়তি যত্নশীল হওয়া জরুরি। শীতকে উপভোগ করার পাশাপাশি নিজের এবং পরিবার-পরিজনের স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। পাশের মানুষের প্রতিও সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার, বিশেষত যারা এই কনকনে ঠান্ডায় রাস্তায় জীবন কাটাচ্ছেন তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। শীত আসে যায়, কিন্তু মানবিকতা এবং সহমর্মিতা চিরকাল থেকে যাওয়া উচিত। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক চক্র মাত্র, আর আমাদের দায়িত্ব হল এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে সুস্থভাবে জীবনযাপন করা এবং যাদের সাহায্যের প্রয়োজন তাদের পাশে দাঁড়ানো।

Preview image