৯৪ বছর বয়সে প্রয়াত বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্ত। দীর্ঘদিন ধরে বয়সজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে রবীন্দ্রসংগীতের জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর সুরেলা কণ্ঠ ও সংগীতের অবদান শ্রোতাদের স্মৃতিতে থেকে যাবে।
বাংলার সংগীতজগতে নেমে এল শোকের ছায়া। প্রয়াত বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্ত। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বয়সজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এই প্রবীণ শিল্পী। সেখানেই মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ রবীন্দ্রসংগীতের জগৎ এবং তাঁর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও অনুরাগী।
রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি গভীর নিষ্ঠা, নিজস্ব গায়কির বৈশিষ্ট্য এবং সংগীতশিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য পরিচিত ছিলেন বিভা সেনগুপ্ত। তাঁর জীবন কেবল মঞ্চে গান গাওয়া কিংবা শ্রোতাদের প্রশংসা পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং সংগীতের উত্তরাধিকারকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াকেই তিনি নিজের কাজের অন্যতম লক্ষ্য করে তুলেছিলেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি তৈরি করেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থীকে। তাঁদের কণ্ঠে, চর্চায় এবং সংগীতের প্রতি ভালোবাসায় বেঁচে থাকবে তাঁর শিক্ষা ও সাধনা।
১৯৩২ সালের ১২ মে আগরতলায় জন্মগ্রহণ করেন বিভা সেনগুপ্ত। তাঁর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে রবীন্দ্রসংগীত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয়। বাংলা গান, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্ট সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগই তাঁকে ধীরে ধীরে এই ধারার একজন নিষ্ঠাবান শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে।
রবীন্দ্রসংগীত কেবল সুর ও কথার সমন্বয় নয়; এর মধ্যে রয়েছে কবিতা, দর্শন, প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ, ভক্তি এবং মানুষের অন্তর্জগতের নানা অনুভূতি। এই সংগীত পরিবেশন করতে গেলে শুধু সুরের শুদ্ধতা যথেষ্ট নয়। গানের কথা, তার অন্তর্নিহিত অর্থ, আবেগ এবং রচনার প্রেক্ষাপট উপলব্ধি করাও জরুরি। বিভা সেনগুপ্তের সংগীতচর্চার ক্ষেত্রেও এই নিষ্ঠার কথা বিশেষভাবে উঠে আসে।
একজন শিল্পীর পরিচয় তৈরি হয় দীর্ঘদিনের অনুশীলন, শিক্ষাগ্রহণ এবং নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বিভার সংগীতজীবনও সেই দীর্ঘ সাধনার পথেই এগিয়েছে। নিজের গায়কিকে পরিণত করার পাশাপাশি তিনি যে সংগীতশিক্ষার ধারাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।
১৯৫৯ সালে কলকাতায় আসেন বিভা সেনগুপ্ত। বাংলা সংস্কৃতি ও সংগীতচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র কলকাতা তাঁর সংগীতজীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা, প্রশিক্ষণ এবং শিল্পীদের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য শহরটির একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই পরিবেশে নিজের সংগীতসাধনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান তিনি।
কলকাতায় এসে তিনি সংগীতের তালিম নিতে থাকেন। তাঁর সংগীতশিক্ষার প্রথমদিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মায়া সেনের। একজন শিক্ষার্থীর গায়কির ভিত তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক তালিম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বর, লয়, উচ্চারণ, সুরের শুদ্ধতা এবং গানের অভিব্যক্তি—প্রতিটি বিষয়ই দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হয়। বিভা সেনগুপ্তের সংগীতজীবনের প্রাথমিক পর্বেও এই শিক্ষার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী সময়ে দেবব্রত বিশ্বাসের সান্নিধ্যে আসেন তিনি। রবীন্দ্রসংগীতের জগতে দেবব্রত বিশ্বাসের নাম বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর সংগীত পরিবেশনের স্বতন্ত্র ধরন এবং রবীন্দ্রসংগীতকে নিজস্ব ব্যাখ্যায় তুলে ধরার ক্ষমতা বহু শ্রোতা ও শিল্পীর উপর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর সান্নিধ্য বিভার সংগীতচর্চার পথেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সংগীতশিল্পী হিসেবে বিভা সেনগুপ্তের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—মায়া সেন এবং দেবব্রত বিশ্বাস। প্রথমদিকে মায়া সেনের কাছে তালিম নেওয়ার মাধ্যমে সংগীতশিক্ষার ভিত তৈরি করেন তিনি। পরে দেবব্রত বিশ্বাসের সান্নিধ্য তাঁর সংগীতভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
একজন শিল্পী কীভাবে গান শিখছেন, কীভাবে সেই গানকে নিজের মধ্যে ধারণ করছেন এবং কীভাবে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তা তাঁর গায়কির স্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলে। গুরু বা শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা শিল্পীর কণ্ঠে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে সেই শিক্ষাকে নিজের উপলব্ধির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় নিজস্ব সংগীতভাষা।
বিভা সেনগুপ্তের ক্ষেত্রেও এই ধারাবাহিক শিক্ষাগ্রহণ এবং সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ধীরে ধীরে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। তাঁর গানের চর্চা শুধু পরিবেশনার মধ্যেই থেমে থাকেনি; সংগীতের সূক্ষ্ম বিষয়গুলি অনুধাবন করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা পৌঁছে দেওয়াও তাঁর জীবনের বড় অংশ হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে শিল্পীর নিজস্ব গায়কির গুরুত্ব অপরিসীম। একই গান বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে আলাদা অনুভূতি তৈরি করতে পারে। গানের কথা, সুর, উচ্চারণ, আবেগ এবং পরিবেশনের ধরন মিলিয়ে একজন শিল্পী নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন।
বিভা সেনগুপ্তও ধীরে ধীরে নিজের মতো করে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করতে শুরু করেন। তাঁর সংগীতচর্চার মূল ভিত্তি ছিল রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি নিষ্ঠা এবং সেই গানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা। রবীন্দ্রসংগীতের পরিসরে শিল্পীর দায়িত্ব শুধু সুর ঠিক রাখা নয়; গানের ভাব ও কথার মর্যাদা রক্ষা করাও সমান জরুরি।
রবীন্দ্রনাথের গানে প্রকৃতি, প্রেম, পূজা, স্বদেশ, জীবনবোধ এবং বিচিত্র মানবিক অনুভূতির প্রকাশ রয়েছে। এই বৈচিত্র্যের কারণে রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা একই সঙ্গে কঠিন ও সমৃদ্ধ। একজন নিষ্ঠাবান শিল্পীকে প্রতিটি গানের নিজস্ব আবহ বুঝতে হয়। বিভা সেনগুপ্তের দীর্ঘ সংগীতসাধনাও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বিভা সেনগুপ্তের জীবন ও কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলির মধ্যে রয়েছে সংগীতশিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা। অনেক শিল্পী মঞ্চে পরিবেশনা, রেকর্ডিং কিংবা জনপ্রিয়তার মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করেন। কিন্তু বিভার ক্ষেত্রে প্রচারের আলোয় থাকার চেয়ে শিক্ষার্থীদের তৈরি করার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল বলে জানা যায়।
নিজের সংগীতজীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সময়, ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলনের পরিবেশ এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর স্বতন্ত্র ক্ষমতাকে বুঝতে পারার দক্ষতা। একজন শিক্ষককে শুধু গান শেখালেই হয় না; শিক্ষার্থীর কণ্ঠের সীমাবদ্ধতা, সুরের সমস্যা, উচ্চারণের ভুল এবং আবেগ প্রকাশের ধরনও বুঝতে হয়।
বিভা সেনগুপ্ত অগণিত ছাত্রছাত্রীকে নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁদের সংগীতচর্চার ভিত গড়ে তোলা, রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা এবং গানের শুদ্ধতার বিষয়ে সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্পী তৈরি করার এই কাজ অনেক সময় জনসমক্ষে তেমন আলোচিত হয় না। মঞ্চে একজন শিল্পীর পরিবেশনা সরাসরি দর্শকের প্রশংসা পায়, কিন্তু একজন শিক্ষকের অবদান ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাজের মধ্যে দিয়ে। শিক্ষার্থীরা যখন গান পরিবেশন করেন, নতুনদের শেখান কিংবা রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, তখন তাঁদের শিক্ষকের প্রভাবও পরোক্ষভাবে বেঁচে থাকে।
এই অর্থে বিভা সেনগুপ্তের অবদানকে শুধু তাঁর নিজের গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। তাঁর হাতে তৈরি শিক্ষার্থীরাও তাঁর সংগীতভাবনার ধারক হয়ে উঠেছেন।
বর্তমান সময়ে শিল্পীদের পরিচিতি অনেকটাই নির্ভর করে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনসমক্ষে তাঁদের উপস্থিতির উপর। কিন্তু সংগীতের ইতিহাসে এমন বহু শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা ব্যাপক প্রচার না পেলেও নিজেদের কাজের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিভা সেনগুপ্ত সেই ধরনের শিল্পীদের একজন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
তিনি জনপ্রিয়তার পিছনে না ছুটে সংগীতচর্চা এবং শিক্ষাদানের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এই সিদ্ধান্তের মধ্যে একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত মূল্যবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। কারণ সংগীতের জগতে পরিচিতি অর্জনের অনেক পথ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে শেখানো এবং নতুন শিল্পীদের তৈরি করার কাজটি ধারাবাহিক পরিশ্রম দাবি করে।
প্রচার থেকে দূরে থাকা মানেই অবদান কম হওয়া নয়। বরং বহু সাংস্কৃতিক ধারার ভিত তৈরি হয় এমন শিল্পীদের হাত ধরেই, যাঁরা নিয়মিত শিক্ষাদান করেন, সংগীতের চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে প্রস্তুত করেন। তাঁদের কাজের ফল অনেক সময় কয়েক দশক পরে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিভা সেনগুপ্তের জীবনও সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সংগীতসাধনা এবং শিক্ষাদানের কাজ রবীন্দ্রসংগীতের ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রবীন্দ্রসংগীত বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। এই সংগীতের চর্চা শুধু গান শেখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, আবেগ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিল্পী ও শিক্ষকেরা এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
রবীন্দ্রসংগীত শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গানের সুর ও তাল আয়ত্ত করার পাশাপাশি গানের কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা, অর্থ বোঝা এবং অনুভূতির সঙ্গে পরিবেশন করার অভ্যাস তৈরি করতে হয়। এই শিক্ষার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি। শিক্ষার্থীর মধ্যে সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা তৈরি করাও শিক্ষকের দায়িত্বের অংশ।
বিভা সেনগুপ্তের মতো শিল্পীরা এই কাজের মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করেন। একজন শিক্ষার্থীর কাছে শেখা গান শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে না; পরবর্তীকালে সেই গান অন্য শ্রোতার কাছে পৌঁছতে পারে। এভাবেই একটি সংগীতধারা টিকে থাকে এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়।
তাঁর প্রয়াণে তাই শোকের পাশাপাশি মনে পড়ছে সংগীতশিক্ষার এই নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিকটিও।
জীবনের শেষ পর্যায়ে বয়সজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন বিভা সেনগুপ্ত। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানেই মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
দীর্ঘ জীবন ধরে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন শিল্পীর প্রয়াণ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পরিচিত মহল ও শিক্ষার্থীদের কাছে গভীর আবেগের বিষয়। তবে তাঁর শেষ জীবনের চিকিৎসা, অসুস্থতার নির্দিষ্ট কারণ কিংবা মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে অতিরিক্ত কোনও তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত না হলে তা উল্লেখ করা উচিত নয়।
একজন শিল্পীর জীবনকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে তাঁর শেষ সময়ের পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিভা সেনগুপ্তের ক্ষেত্রেও তাঁর সংগীতসাধনা এবং শিক্ষার্থীদের তৈরি করার কাজই হয়ে থাকবে স্মরণের অন্যতম প্রধান বিষয়।
বিভা সেনগুপ্তের প্রয়াণে রবীন্দ্রসংগীতের জগতে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। তাঁর জীবন ও কাজের সঙ্গে যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন, বিশেষ করে তাঁর ছাত্রছাত্রী ও পরিচিত শিল্পীমহল, তাঁদের কাছে এই বিদায় এক আবেগঘন মুহূর্ত।
তাঁর সংগীতজীবনের কথা বলতে গেলে উঠে আসে আগরতলা থেকে কলকাতায় আসা, মায়া সেনের কাছে তালিম নেওয়া, দেবব্রত বিশ্বাসের সান্নিধ্যে আসা এবং পরে নিজের গায়কির পরিচয় তৈরি করার দীর্ঘ যাত্রা। পাশাপাশি বারবার সামনে আসে সংগীতশিক্ষার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা।
বিভা সেনগুপ্ত হয়তো প্রচারের আলোয় সবসময় ছিলেন না, কিন্তু তাঁর হাতে তৈরি অসংখ্য শিক্ষার্থীর মধ্যে দিয়ে তাঁর শিক্ষা ও সংগীতভাবনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই অবদানকে কোনও একটি অনুষ্ঠান, রেকর্ডিং বা পুরস্কারের হিসাব দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। কারণ একজন শিক্ষকের প্রভাব অনেক সময় তাঁর নিজের জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাজের মধ্যেও প্রবাহিত হয়।
৯৪ বছরের জীবনপথে বিভা সেনগুপ্ত সংগীতকে নিজের সাধনা এবং শিক্ষাদানকে নিজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, শিল্পীর সাফল্য শুধু পরিচিতি বা জনপ্রিয়তার উপর নির্ভর করে না। কখনও কখনও নীরবে কাজ করে যাওয়া, নতুন শিল্পী তৈরি করা এবং একটি সাংস্কৃতিক ধারার প্রতি নিষ্ঠা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, দীর্ঘ সংগীতচর্চা এবং অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে তৈরি করার কাজ তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সংগীতজগৎ হারাল এক বর্ষীয়ান শিল্পীকে। তবে তাঁর শিক্ষা যাঁদের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে, তাঁদের কণ্ঠে এবং সংগীতচর্চায় সেই উত্তরাধিকার বেঁচে থাকার সুযোগ থাকবে।
প্রচার থেকে দূরে থেকেও যাঁরা সংস্কৃতির ভিত মজবুত করেন, বিভা সেনগুপ্ত তাঁদেরই একজন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়, একজন শিল্পীর জীবন শেষ হলেও তাঁর শেখানো সুর, সংগীতের প্রতি নিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করে দেওয়া ভালোবাসা দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে থাকতে পারে।