Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ব্রিগেডের মঞ্চে নবতিপর মাখনলাল সরকারের পা ছুঁয়ে প্রণাম মোদী-শাহ-শুভেন্দুর

ব্রিগেডের মঞ্চে আবেগঘন মুহূর্ত নবতিপর প্রবীণ কর্মী মাখনলাল সরকারকে শাল পরিয়ে সম্মান জানালেন প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার পর তাঁকে আলিঙ্গন করতেও দেখা যায় মোদীকে।

ব্রিগেডের মঞ্চে নবতিপর মাখনলাল সরকারের পা ছুঁয়ে প্রণাম মোদী-শাহ-শুভেন্দুর
জাতীয় খবর

কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড শনিবার শুধু রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চই হয়ে ওঠেনি, বরং সাক্ষী থেকেছে এক বিরল আবেগঘন মুহূর্তেরও। পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকেই জনসমুদ্র ভেসে গিয়েছিল ব্রিগেড চত্বরে। প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah, একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিজেপিশাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে। তবে রাজনৈতিক ভাষণ বা শপথের চেয়েও বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন এক প্রবীণ মানুষ— নবতিপর মাখনলাল সরকার।

ব্রিগেডের বিশাল মঞ্চে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রবেশ করেন, তখন সকলের নজর ছিল তাঁর দিকেই। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যায়। মঞ্চে উপস্থিত প্রবীণ মাখনলাল সরকারের কাছে গিয়ে তাঁকে শাল পরিয়ে সম্মান জানান প্রধানমন্ত্রী। শুধু তাই নয়, তিনি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন এবং পরে আলিঙ্গনও করেন তাঁকে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণ মুহূর্তের মধ্যে আবেগের পরিবেশ তৈরি করে দেয় গোটা ব্রিগেডে। উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ হাততালিতে ফেটে পড়েন।

মাখনলাল সরকার সাধারণ কোনও রাজনৈতিক কর্মী নন। তিনি এমন এক ব্যক্তি, যাঁর রাজনৈতিক জীবন ভারতের জনসঙ্ঘ যুগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা Syama Prasad Mukherjee-র ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহু আন্দোলন, সংগ্রাম এবং কঠিন পরিস্থিতির সাক্ষী থেকেছেন মাখনলাল।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি Samik Bhattacharya অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই মাখনলালের পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি জানান, জনসঙ্ঘের সময় থেকেই সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন এই প্রবীণ নেতা। দেশাত্মবোধক গান গেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ছড়িয়ে দিতেন তিনি। সেই কারণেই কংগ্রেস আমলে একবার তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল।

শমীক ভট্টাচার্যের বর্ণনায় উঠে আসে এক অসাধারণ ঘটনার কথা। তিনি জানান, দিল্লি পুলিশ মাখনলাল সরকারকে গ্রেফতার করে আদালতে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে বলা হয়, ক্ষমা চাইলে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু মাখনলাল তাতে রাজি হননি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি কোনও অপরাধ করেননি। তিনি শুধু একটি দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন।

এরপর বিচারক তাঁকে সেই গানটি আদালতেই গেয়ে শোনাতে বলেন। আদালতকক্ষে দাঁড়িয়ে মাখনলাল গানটি গেয়ে শোনান। তাঁর কণ্ঠে দেশপ্রেমের আবেগে মুগ্ধ হন বিচারকও। শেষ পর্যন্ত বিচারক পুলিশকে নির্দেশ দেন, মাখনলালকে সম্মানের সঙ্গে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস টিকিট এবং যাতায়াতের জন্য ১০০ টাকা দেওয়ারও নির্দেশ দেন তিনি। সেই সময়ের হিসেবে এই অর্থের মূল্য ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির সাহসের কাহিনি নয়, বরং এক রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাসের প্রতীক। আজকের দিনে যখন রাজনীতিতে আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন মাখনলাল সরকারের মতো মানুষের জীবন নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পরে সমাজমাধ্যমেও মাখনলাল সরকারকে নিয়ে একটি আবেগঘন পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, “শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে মাখনলাল সরকারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হল। উনি নিবেদিত জাতীয়তাবাদী মানুষ। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং জম্মু ও কাশ্মীরে গ্রেফতার হয়েছিলেন। উনি আমাদের দলের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে আমাদের সংগঠনকে প্রসারিত করেছেন এবং মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।”

মোদীর এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, বিজেপির কাছে মাখনলাল সরকার শুধুমাত্র একজন প্রবীণ কর্মী নন, বরং দলের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যখন বাংলায় জনসঙ্ঘ সংগঠন গড়ে তোলা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ, তখন মাখনলালের মতো কর্মীরাই ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন দলের ভাবধারা।

ব্রিগেডের মঞ্চে শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং পশ্চিমবঙ্গের নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী Suvendu Adhikari-ও মাখনলাল সরকারকে প্রণাম করেন। রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বের এই আচরণ অনেকের কাছেই ছিল বিরল এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত বহু প্রবীণ বিজেপি কর্মী জানান, মাখনলাল সরকারের মতো নেতাদের হাত ধরেই বাংলায় বিজেপির সংগঠনের ভিত তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক লড়াই, সাংগঠনিক কাজ এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রসারের জন্য তিনি নিরলস কাজ করেছেন।

news image
আরও খবর

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ব্রিগেডের মঞ্চে এই দৃশ্য শুধুমাত্র একজন প্রবীণ নেতাকে সম্মান জানানোর মুহূর্ত নয়, বরং বিজেপির রাজনৈতিক বার্তারও অংশ। দল বোঝাতে চেয়েছে যে, তাদের বর্তমান সাফল্যের পেছনে বহু দশকের সংগ্রাম এবং প্রবীণ কর্মীদের আত্মত্যাগ জড়িয়ে রয়েছে।

এ দিনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ব্রিগেড চত্বরে উৎসবের আবহ ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। হাতে দলীয় পতাকা, মুখে স্লোগান এবং চারদিকে উচ্ছ্বাস— সব মিলিয়ে ব্রিগেড যেন পরিণত হয়েছিল এক রাজনৈতিক মহাসমাবেশে।

তবে এত কিছুর মাঝেও সবচেয়ে বেশি আবেগ তৈরি করে মাখনলাল সরকারকে ঘিরে সেই মুহূর্ত। বহু মানুষ মোবাইলে সেই দৃশ্য বন্দি করেন। সামাজিক মাধ্যমেও দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রণামের ছবি ও ভিডিও।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই দৃশ্য বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো একটি মুহূর্ত হয়ে থাকবে। কারণ, বর্তমান রাজনৈতিক প্রজন্মের সামনে এক প্রবীণ সংগ্রামী নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এমন ছবি খুব কমই দেখা যায়।

মাখনলাল সরকারের জীবন এক অর্থে ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ইতিহাসেরও অংশ। জনসঙ্ঘ থেকে বিজেপি— এই দীর্ঘ যাত্রাপথের বহু ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি। তাঁর মতো নেতাদের স্মৃতি এবং সংগ্রামই বর্তমান প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

শনিবারের ব্রিগেড সমাবেশ তাই শুধুমাত্র একটি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ, রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং প্রবীণ সংগ্রামীদের প্রতি সম্মানের এক অনন্য মেলবন্ধনের সাক্ষী হয়ে রইল।

এ দিনের অনুষ্ঠানে মাখনলাল সরকারকে ঘিরে যে আবেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা শুধু বিজেপি কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা ভুলে বহু সাধারণ মানুষও এই প্রবীণ নেতার প্রতি সম্মান প্রকাশ করেন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই লেখেন, বর্তমান রাজনীতিতে যেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কটূক্তির ঘটনা প্রায়শই সামনে আসে, সেখানে একজন প্রবীণ সংগ্রামী কর্মীকে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর প্রণাম করার দৃশ্য এক অন্যরকম বার্তা বহন করে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মাখনলাল সরকারের উপস্থিতি বিজেপির জন্যও অত্যন্ত প্রতীকী। কারণ, বাংলায় বিজেপির বর্তমান উত্থানের পিছনে যে দীর্ঘ সাংগঠনিক লড়াই রয়েছে, তার অন্যতম সাক্ষী এই প্রবীণ নেতা। একসময় বাংলায় জনসঙ্ঘ কিংবা বিজেপির সংগঠন খুব সীমিত ছিল। সেই সময় ঘরে ঘরে গিয়ে দলীয় আদর্শ প্রচার করা, ছোট ছোট সভা করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন মাখনলালের মতো কর্মীরাই। তাঁদের প্রচেষ্টা ছাড়া বাংলায় বিজেপির বর্তমান অবস্থানে পৌঁছনো সম্ভব হত না বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

ব্রিগেডের অনুষ্ঠান মঞ্চে মাখনলাল সরকারকে ঘিরে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের আচরণ অনেক পুরনো কর্মীকেও আবেগপ্রবণ করে তোলে। বহু প্রবীণ কর্মী বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে কাজ করলেও এমন সম্মান খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তাই এই মুহূর্ত তাঁদের কাছেও গর্বের এবং আবেগের।

এ দিনের অনুষ্ঠানে মাখনলাল সরকারের মুখেও ছিল স্পষ্ট আবেগের ছাপ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তাঁর চোখেমুখে ছিল আত্মবিশ্বাস এবং গর্ব। রাজনৈতিক জীবনের এত দীর্ঘ পথচলার পর দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন সম্মান পাওয়াকে তিনি জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত বলেই উল্লেখ করেন বলে জানা গিয়েছে।

ব্রিগেডের এই দৃশ্য রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেবে বলেই মনে করছেন অনেকেই। কারণ, এটি শুধুমাত্র ক্ষমতার পরিবর্তনের অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এক প্রবীণ সংগ্রামী নেতার প্রতি সম্মান, রাজনৈতিক ঐতিহ্যের স্মরণ এবং অতীতের আত্মত্যাগকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার এক বিরল মুহূর্ত হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকল।

Preview image