পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি একসময় অনেক বেশি ছিল, তাই দিনের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১০ ঘণ্টা। চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর করে দিনকে দীর্ঘতর করেছে। তবে সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাব সেই পরিবর্তনকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করেছে—ফলে পৃথিবীর দিন ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ হয়নি।
আজ পৃথিবীতে আমরা ২৪ ঘণ্টার একটি দিনকে স্বাভাবিক বলে মনে করি। সূর্য ওঠে, দিনের আলো আসে, তারপর সূর্য অস্ত যায় এবং রাত নামে—এই চক্রের সঙ্গেই মানুষের জীবন, প্রাণীর আচরণ, জলবায়ু এবং পৃথিবীর বহু প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টার দিন সবসময় ছিল না। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর ঘূর্ণন ছিল অনেক দ্রুত এবং দিনের দৈর্ঘ্য ছিল আজকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন মডেল ও ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসে দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ ঘণ্টার কাছাকাছি ছিল বলে কিছু গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণাতেও প্রাচীন পৃথিবীর জন্য ১০–১২ ঘণ্টার দিনের সম্ভাব্যতার উল্লেখ পাওয়া যায়।
এরপর ধীরে ধীরে পৃথিবীর ঘূর্ণন কমেছে। এর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে চাঁদের। চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পৃথিবীর ঘূর্ণনকে দীর্ঘমেয়াদে ধীর করে। ফলে দিন ক্রমশ দীর্ঘ হয়েছে।
কিন্তু এখানেই রয়েছে আরও চমকপ্রদ বিষয়। শুধু চাঁদের প্রভাব থাকলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের বিবর্তন একরকম হতে পারত। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সূর্যের তাপের কারণে যে atmospheric বা thermal tide তৈরি হয়, সেটি পৃথিবীর ঘূর্ণনে বিপরীত ধরনের torque সৃষ্টি করতে পারে। অর্থাৎ চাঁদ যেখানে পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর করার দিকে কাজ করে, সূর্যের কারণে তৈরি atmospheric tide নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই ঘূর্ণনকে দ্রুত করার দিকে কাজ করতে পারে।
এই দুই বিপরীত প্রভাবের ভারসাম্যই পৃথিবীর অতীতের দিন কতটা দীর্ঘ হয়েছিল, সেই প্রশ্নের একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় উত্তর দিতে পারে।
পৃথিবীর জন্মের প্রথম দিককার সময় ছিল অত্যন্ত অশান্ত। গ্রহটি তখন আজকের পৃথিবীর মতো স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল না। পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি ছিল অনেক বেশি। ফলে নিজের অক্ষের চারদিকে একবার ঘুরতে পৃথিবীর সময় লাগত আজকের তুলনায় অনেক কম।
পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি কমতে কমতে আজকের প্রায় ২৪ ঘণ্টার দিনে পৌঁছেছে। NASA-র বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর একটি দিন প্রায় ২৩.৯ ঘণ্টা, অর্থাৎ প্রচলিত হিসাবে ২৪ ঘণ্টার কাছাকাছি।
কিন্তু এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি। এটি হয়েছে কোটি কোটি বছর ধরে চলা মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া, জোয়ার-ভাটা, পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গতি এবং বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়ার ফলে।
পৃথিবীর ঘূর্ণন কমার ক্ষেত্রে চাঁদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর সমুদ্রের জলকে টেনে জোয়ার সৃষ্টি করে। NASA-র ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চাঁদের মহাকর্ষের কারণে পৃথিবীর সমুদ্রের জলে দুটি প্রধান tidal bulge বা জোয়ারের স্ফীতি তৈরি হয়। পৃথিবী ঘুরতে থাকায় বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমি এই জোয়ারের স্ফীতির মধ্য দিয়ে যায়।
এই জোয়ার-ভাটার প্রক্রিয়াই পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে শক্তি ও angular momentum-এর আদানপ্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। একই সঙ্গে পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরছে। পৃথিবীর ঘূর্ণন বর্তমানে চাঁদের কক্ষপথের গতির তুলনায় দ্রুত। এর ফলে পৃথিবীর tidal bulge চাঁদের ঠিক নিচে থাকে না; তা কিছুটা সামনে এগিয়ে থাকে।
এই tidal bulge এবং চাঁদের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়ার ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে angular momentum ধীরে ধীরে চাঁদের কক্ষপথে স্থানান্তরিত হয়। এর ফল হিসেবে চাঁদ ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হচ্ছে।
সহজভাবে বললে, চাঁদ পৃথিবীর ঘূর্ণনের শক্তির একটি অংশ কক্ষপথের গতিতে নিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর ঘূর্ণন যত ধীর হচ্ছে, দিনের দৈর্ঘ্য তত বাড়ছে।
এই কারণেই প্রাচীন পৃথিবীতে যদি দিনের দৈর্ঘ্য ১০–১২ ঘণ্টার কাছাকাছি হয়ে থাকে, তাহলে বহু কোটি বা বিলিয়ন বছরের বিবর্তনের পরে তা ২৪ ঘণ্টার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এখানেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। যদি চাঁদের tidal effect পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ক্রমাগত ধীর করে, তাহলে ভবিষ্যতে পৃথিবীর দিন কি আরও অনেক দীর্ঘ হতে থাকবে?
নীতিগতভাবে পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনে পৃথিবীর দিন দীর্ঘ হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণন কেবল চাঁদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। সূর্যও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও tidal system-এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৩ সালে Nature Geoscience-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেন যে পৃথিবীর ইতিহাসের একটি দীর্ঘ সময়কালে lunar oceanic tide এবং solar atmospheric tide-এর বিপরীতমুখী torque একে অপরকে প্রায় ভারসাম্য করতে পারে। তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মধ্য Proterozoic সময়ে প্রায় ১ বিলিয়ন বছর ধরে দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ ঘণ্টার আশেপাশে স্থির থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ পৃথিবীর ঘূর্ণন সবসময় একই গতিতে ধীর হয়নি। নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের atmospheric tide পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হওয়ার প্রক্রিয়াকে আংশিকভাবে প্রতিহত করতে পারে।
এখানে “সূর্য পৃথিবীর দিনকে ৬০ ঘণ্টা হতে দেয়নি”—এই বাক্যটিকে তাই একটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা ভালো। বৈজ্ঞানিকভাবে বিষয়টি আরও নির্দিষ্ট: সূর্যের তাপ বায়ুমণ্ডলে thermal tide তৈরি করে, যা নির্দিষ্ট rotational অবস্থায় পৃথিবীর ঘূর্ণনে lunar tidal torque-এর বিপরীতমুখী প্রভাব ফেলতে পারে।
আমরা সাধারণত tidal force বললে চাঁদের কথা ভাবি। সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে চাঁদের সম্পর্ক সবচেয়ে স্পষ্ট। কিন্তু সূর্যও পৃথিবীর ওপর tidal force প্রয়োগ করে।
তবে পৃথিবীর ক্ষেত্রে চাঁদের tidal effect সূর্যের tidal effect-এর তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সূর্য অনেক বেশি বিশাল হলেও পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব বিপুল।
কিন্তু সূর্যের আরেকটি বিশেষ প্রভাব রয়েছে—বায়ুমণ্ডলের ওপর তার উত্তাপ।
সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে সমানভাবে গরম করে না। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তর, জলীয়বাষ্প ও ওজোন সৌর বিকিরণ শোষণ করে। এই heating pattern-এর ফলে বায়ুমণ্ডলে atmospheric tide তৈরি হয়।
এটি সমুদ্রের জোয়ারের মতো সরাসরি জলীয় স্ফীতি নয়। বরং বায়ুমণ্ডলের চাপ ও গতিশীলতার নিয়মিত পরিবর্তন। বিজ্ঞানীরা একে atmospheric thermal tide বা solar atmospheric tide হিসেবে বর্ণনা করেন।
২০২৩ সালের Nature Geoscience-এর গবেষণা অনুযায়ী, এই solar atmospheric tide নির্দিষ্ট অবস্থায় পৃথিবীর ঘূর্ণনের ওপর accelerative torque প্রয়োগ করতে পারে, যা lunar oceanic tide-এর decelerative torque-এর বিপরীতে কাজ করে।
এখানে “ভারসাম্য” শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁদের tidal effect পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর করার দিকে কাজ করে। অন্যদিকে সূর্যের atmospheric thermal tide নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঘূর্ণন দ্রুত করার দিকে কাজ করতে পারে।
যদি কোনও সময়ে এই দুই torque-এর মাত্রা প্রায় সমান হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের দীর্ঘমেয়াদি ধীর হওয়ার হার অনেকটা কমে যেতে পারে। এমনকি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় স্থিরও থাকতে পারে।
Nature Geoscience-এর ২০২৩ সালের গবেষণায় এই ধরনের resonance-stabilized day length-এর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকরা geological record থেকে পাওয়া day-length constraints বিশ্লেষণ করে মধ্য Proterozoic সময়ে প্রায় ১৯ ঘণ্টার দিনের একটি দীর্ঘ স্থিতিশীল পর্যায়ের প্রমাণের কথা জানিয়েছেন।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর অর্থ হলো পৃথিবীর দিন শুধু “চাঁদ যত দূরে গেছে, দিন তত বড় হয়েছে”—এই সরল সমীকরণে বোঝানো যায় না।
আজ আমরা ২৪ ঘণ্টার দিনের সঙ্গে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রায় ১–২ বিলিয়ন বছর আগের পৃথিবীর পরিস্থিতি অনেক আলাদা ছিল।
গবেষকদের মতে, প্রায় ২ থেকে ১ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ ঘণ্টার কাছাকাছি স্থির থাকতে পারে। এই সময়কালকে পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে Mid-Proterozoic-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার সম্ভাব্য কারণ ছিল lunar oceanic tide এবং solar atmospheric tide-এর মধ্যে resonance বা ভারসাম্য।
অর্থাৎ সূর্যের তাপ শুধু পৃথিবীর জলবায়ুকে প্রভাবিত করেনি; পৃথিবীর ঘূর্ণনের দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনের ক্ষেত্রেও atmospheric dynamics-এর ভূমিকা থাকতে পারে।
এখানে কিছু সতর্কতা প্রয়োজন।
পৃথিবীর প্রথম দিককার দিনের দৈর্ঘ্য সরাসরি ঘড়ি দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ, astronomical modelling এবং বিভিন্ন ধরনের sedimentary record বিশ্লেষণ করে অতীতের day length সম্পর্কে অনুমান করেন।
কিছু গবেষণায় দেখা যায়, পৃথিবীর ইতিহাসের খুব প্রাচীন সময়ে দিনের দৈর্ঘ্য ১০–১২ ঘণ্টার মতো হতে পারে। একটি সাম্প্রতিক Nature গবেষণাপত্রের supplementary discussion-এও জীবনের প্রাথমিক সময়ের পৃথিবীর জন্য প্রায় ১০–১২ ঘণ্টার দিনের সম্ভাব্যতা উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব “পৃথিবীতে একসময় দিন ছিল ১০ ঘণ্টার”—এই কথাটি পৃথিবীর অত্যন্ত প্রাচীন ইতিহাসের একটি বৈজ্ঞানিক মডেলভিত্তিক অনুমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে পৃথিবীর ইতিহাসের প্রতিটি সময়ে ঠিক ১০ ঘণ্টাই ছিল—এমন সরল দাবি করা ঠিক হবে না।
পৃথিবী ও চাঁদের ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে angular momentum চাঁদের কক্ষপথে স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে চাঁদ ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যায়। এর বিনিময়ে পৃথিবীর rotation rate কমে।
এই প্রক্রিয়া এখনও চলছে।
তবে পৃথিবীর ঘূর্ণনের পরিবর্তন খুব ধীর। মানুষের জীবদ্দশায় দিনের দৈর্ঘ্যে পরিবর্তন এত ছোট যে আমরা তা দৈনন্দিন জীবনে অনুভব করতে পারি না। অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর rotation-এর ক্ষুদ্র পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারেন। Nature-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমন laser-based প্রযুক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা দিনের দৈর্ঘ্যের কয়েক মিলিসেকেন্ডের পরিবর্তন পরিমাপ করতে পারে।
অর্থাৎ পৃথিবীর দিন একটি স্থির সংখ্যা নয়। ২৪ ঘণ্টা মূলত মানুষের সময় মাপার সুবিধাজনক একক; পৃথিবীর প্রকৃত rotation rate সামান্য সামান্য করে পরিবর্তিত হয়।
এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি “হ্যাঁ” বলা যায় না।
কারণ পৃথিবীর ঘূর্ণনের ভবিষ্যৎ বিবর্তন অত্যন্ত দীর্ঘ সময়ের বিষয়। তার সঙ্গে চাঁদের কক্ষপথ, পৃথিবীর মহাসাগর, মহাদেশের বিন্যাস, বায়ুমণ্ডলের গঠন এবং সূর্যের প্রভাব—সবকিছু জড়িত।
“৬০ ঘণ্টার দিন হতে পারত”—এই ধরনের শিরোনাম মূলত একটি hypothetical বা তাত্ত্বিক সম্ভাবনাকে জনপ্রিয় ভাষায় তুলে ধরে। এর অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে বলে দিয়েছেন, পৃথিবীর দিন ৬০ ঘণ্টা হওয়ার পথে ছিল এবং সূর্য এসে সেটিকে আটকে দিয়েছে।
বরং বৈজ্ঞানিকভাবে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো—চাঁদের tidal torque এবং সূর্যের atmospheric thermal tide পৃথিবীর rotation-এ বিপরীতমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে এমন একটি resonance পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যকে দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থিতিশীল করে থাকতে পারে বলে গবেষণায় প্রস্তাব করা হয়েছে।
জনপ্রিয় ভাষায় বলা যায়, সূর্য পৃথিবীর দিনকে খুব দ্রুত দীর্ঘ হতে দেয়নি। কিন্তু এর পেছনের বিজ্ঞানটি আরও আকর্ষণীয়।
সূর্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে। এই উত্তাপ বায়ুমণ্ডলে periodic pressure variations তৈরি করে। পৃথিবীর rotation rate-এর সঙ্গে এই atmospheric waves-এর frequency যদি নির্দিষ্ট সম্পর্ক তৈরি করে, তাহলে atmospheric tide শক্তিশালী হতে পারে।
এই শক্তিশালী atmospheric tide পৃথিবীর rotation-এর ওপর এমন torque দিতে পারে, যা চাঁদের tidal torque-এর বিপরীতে কাজ করে।
Nature Geoscience-এর গবেষণায় এই ধারণাকে “resonance-stabilized day length” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অর্থাৎ সূর্য সরাসরি পৃথিবীর ঘূর্ণনকে হাতে ধরে আটকে রাখেনি। সূর্যের আলো ও তাপ বায়ুমণ্ডলের মধ্যে যে dynamic process তৈরি করে, সেটিই এখানে মূল বিষয়।
হ্যাঁ, এবং এই অংশটিই গবেষণাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
২০২৪ সালে Nature Geoscience-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রায় ০.৫ থেকে ১ বিলিয়ন বছর আগের অপেক্ষাকৃত ছোট দিনের পৃথিবীতে solar atmospheric tide ও atmospheric waves-এর resonance জলবায়ুকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তা মডেল করা হয়েছে। গবেষণায় প্রায় ২১–২২ ঘণ্টার দিনের ক্ষেত্রে একটি atmospheric resonance-এর কথা বলা হয়েছে।
গবেষকদের climate model অনুযায়ী, এই resonance পৃথিবীর tropical cloud cover, convection এবং rainfall-এর বিন্যাসে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণাটি আরও প্রস্তাব করে যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে cloud distribution-এর পরিবর্তন পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য শুধু সময়ের হিসাব নয়। এটি বায়ুমণ্ডল, মেঘ, বৃষ্টিপাত এবং জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ planetary parameter।
পৃথিবীর rotation rate কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফল।
পৃথিবীর শুরুতে rotation দ্রুত ছিল। চাঁদের tidal interaction ধীরে ধীরে সেই rotation কমিয়েছে। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক পর্যায়ে এই পরিবর্তনের হারও এক ছিল না।
মহাদেশের বিন্যাস, সমুদ্রের গভীরতা, মহাসাগরের আকার এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল—সবই tidal friction-এর মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই পৃথিবীর দিনকে একটি সরল সরলরেখায় ১০ ঘণ্টা থেকে ১২, ১৫, ১৯ এবং শেষে ২৪ ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
বরং এটি একটি জটিল planetary evolution-এর ফল।
চাঁদের tidal interaction-এর কারণে দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর rotation ধীর হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। তাই দিন দীর্ঘ হওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।
তবে পৃথিবীর rotation-এর ওপর আরও অনেক প্রভাব কাজ করে। বায়ুমণ্ডল, সমুদ্র, পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গতি এবং মৌসুমি বা স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন প্রক্রিয়াও rotation-এ সামান্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
তাই কয়েকশো বছর বা কয়েক হাজার বছরের স্কেলে দিনের দৈর্ঘ্য নিয়ে যে পরিবর্তন দেখা যায়, তা কোটি কোটি বছরের tidal evolution-এর সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
এখানেই পৃথিবীর rotation science-এর সৌন্দর্য। একই গ্রহে কয়েক মিলিসেকেন্ডের পরিবর্তন থেকে শুরু করে বিলিয়ন বছরের বিবর্তন—দুই ধরনের সময়স্কেলই কাজ করছে।
আমরা সাধারণভাবে বলি পৃথিবীর দিন ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানে “দিন” বলার একাধিক সংজ্ঞা রয়েছে।
একটি solar day হলো সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে পরপর দুইটি স্থানীয় মধ্যাহ্নের মধ্যবর্তী সময়। অন্যদিকে sidereal day হলো দূরবর্তী নক্ষত্রের তুলনায় পৃথিবীর একবার ঘূর্ণনের সময়।
NASA অনুযায়ী পৃথিবীর sidereal day প্রায় ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সময়ের হিসাবে অবশ্য ২৪ ঘণ্টার solar day-ই ব্যবহৃত হয়।
তাই “পৃথিবীর দিন ২৪ ঘণ্টা”—এই বক্তব্যটি দৈনন্দিন সময় মাপার জন্য সঠিক হলেও পৃথিবীর rotation physics আরও সূক্ষ্ম।
পৃথিবীর দিন কত ঘণ্টার ছিল—এটি শুধু একটি কৌতূহলের প্রশ্ন নয়।
দিনের দৈর্ঘ্য পৃথিবীর জলবায়ু, বায়ুমণ্ডলীয় circulation, জোয়ার-ভাটা এবং জীবনের বিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দিন ছোট হলে পৃথিবীর একেকটি অঞ্চল দ্রুত আলো ও অন্ধকারের মধ্যে পরিবর্তিত হয়। দিনের দৈর্ঘ্য বাড়লে সূর্যালোক পাওয়ার সময়ও বদলে যায়। ফলে তাপমাত্রার দৈনিক ওঠানামা, atmospheric circulation এবং জলবায়ুর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে।
২০২৪ সালের Nature Geoscience গবেষণায়ও প্রাচীন পৃথিবীর day length এবং atmospheric resonance-এর সঙ্গে cloud cover, rainfall ও climate-এর সম্পর্ক নিয়ে model-based analysis করা হয়েছে।
এমনকি পৃথিবীর জীবনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও এই গবেষণাগুলি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের Nature Geoscience গবেষণায় মধ্য Proterozoic সময়ে দীর্ঘস্থায়ী day-length stabilization-এর সম্ভাবনার সঙ্গে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ইতিহাসের কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। তবে এই সম্পর্ককে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ natural satellite। পৃথিবীর tidal evolution-এ তার ভূমিকা বিশাল।
চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার চরিত্র ভিন্ন হতো এবং পৃথিবীর rotation-এর দীর্ঘমেয়াদি evolution-ও বর্তমান ইতিহাসের মতো হতো না।
তবে “চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর দিন ঠিক কত ঘণ্টা হতো”—এর একক ও নিশ্চিত উত্তর নেই। কারণ পৃথিবীর rotation-এর বিবর্তনে আরও বহু physical process জড়িত।
তাই চাঁদকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনই সূর্যকে একমাত্র “রক্ষাকর্তা” হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে অতিসরলীকরণ।
আসল বিষয় হলো পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য, সমুদ্র এবং বায়ুমণ্ডল মিলে একটি জটিল gravitational ও dynamical system তৈরি করেছে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবন ২৪ ঘণ্টার ছন্দে বাঁধা। ঘড়ি, অফিস, স্কুল, ট্রেন, বিমান—সবকিছুই এই সময়ের কাঠামোর সঙ্গে তৈরি হয়েছে।
কিন্তু পৃথিবীর দৃষ্টিতে ২৪ ঘণ্টা কোনও চিরন্তন নিয়ম নয়।
বিলিয়ন বছর আগে দিনের দৈর্ঘ্য অনেক কম ছিল। পরে চাঁদের tidal interaction-এর ফলে পৃথিবীর rotation ধীরে ধীরে কমেছে। আবার পৃথিবীর ইতিহাসের নির্দিষ্ট পর্যায়ে সূর্যের atmospheric thermal tide এই ধীরগতিকে আংশিকভাবে প্রতিহত করতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
এই গল্পটি আসলে পৃথিবীর একটি চলমান planetary evolution-এর গল্প।
পৃথিবীতে আজ ২৪ ঘণ্টার দিন আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের অবস্থা মাত্র। প্রাচীন পৃথিবী অনেক দ্রুত ঘুরত এবং কিছু গবেষণায় সেই সময়ের দিনের দৈর্ঘ্য ১০–১২ ঘণ্টার কাছাকাছি ছিল বলে অনুমান করা হয়েছে।
এরপর চাঁদের tidal interaction পৃথিবীর rotation ধীর করতে থাকে। একই সময়ে সূর্যের উত্তাপে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তৈরি atmospheric thermal tide নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিপরীতমুখী torque তৈরি করতে পারে। ২০২৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, এই দুই প্রভাবের ভারসাম্য পৃথিবীর ইতিহাসের একটি দীর্ঘ পর্যায়ে দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ ঘণ্টার কাছে স্থির রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই “চাঁদের দাপটে পৃথিবীর দিন ৬০ ঘণ্টা হয়ে যেতে পারত, সূর্য তা ঠেকিয়েছে”—এই বক্তব্যকে সরাসরি একটি নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে না দেখে, পৃথিবীর rotation evolution-এর জটিল বিজ্ঞান বোঝানোর একটি জনপ্রিয় উপস্থাপন হিসেবে দেখা উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি হলো—পৃথিবীর দিন একটি স্থির সংখ্যা নয়। চাঁদ পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ধীর করে, সূর্যের উত্তাপ বায়ুমণ্ডলে এমন tidal process তৈরি করতে পারে যা সেই প্রভাবের বিপরীতে কাজ করে, আর এই মহাকর্ষীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় টানাপোড়েনই আমাদের গ্রহের দীর্ঘ ইতিহাসে দিনের দৈর্ঘ্যকে বারবার বদলে দিয়েছে।
আজকের ২৪ ঘণ্টার দিন তাই পৃথিবীর চিরন্তন পরিচয় নয়—এটি কোটি কোটি বছরের মহাজাগতিক বিবর্তনের একটি অধ্যায়।