Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মহাকাশে মৃতপ্রায় উপগ্রহে জ্বালানি ভরে ‘নতুন প্রাণ’ চিনের! আমেরিকার দাবি, গোটা ঘটনাই কি ভাঁওতা?

চিনের মহাকাশ প্রযুক্তিতে বড়সড় সাফল্যের দাবি ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। মহাকাশে জ্বালানি ভরে মৃতপ্রায় উপগ্রহকে ফের সক্রিয় করার দাবি করেছে বেজিং। তবে চিনের এই সাফল্যকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছে আমেরিকা। ওয়াশিংটনের দাবি, গোটা ঘটনাই হতে পারে ‘ভাঁওতা’। সত্যিই কি মহাকাশে নতুন নজির গড়ল চিন, নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও কৌশল?

মহাকাশে জ্বালানি ভরে মৃতপ্রায় উপগ্রহকে চাঙ্গা করে ফেলল চিন! কেন ‘গোটাটাই ভাঁওতা’ বলছে আমেরিকা?

মহাকাশে কোনও উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পর তার কাজ শেষ হয়ে যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে একটি স্যাটেলাইটকে বছরের পর বছর কক্ষপথে সক্রিয় রাখতে হয়। কিন্তু সেই সময়ের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় জ্বালানি। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা বহু উপগ্রহের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ, কক্ষপথ পরিবর্তন কিংবা নির্দিষ্ট উচ্চতায় ধরে রাখার জন্য ছোট ছোট থ্রাস্টার ব্যবহার করা হয়। আর সেই থ্রাস্টারের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে উপগ্রহটি প্রযুক্তিগতভাবে সচল থাকলেও ধীরে ধীরে তার কার্যক্ষমতা হারাতে পারে।

এই জায়গাতেই নতুন করে সামনে এসেছে স্যাটেলাইট রিফুয়েলিং বা কক্ষপথে উপগ্রহে জ্বালানি ভরার প্রযুক্তি। চিন এই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড়সড় অগ্রগতির দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মহাকাশে একটি কার্যত মৃতপ্রায় বা জ্বালানি-স্বল্প উপগ্রহের কাছে পৌঁছে সেটিতে জ্বালানি সরবরাহ করে ফের সক্রিয় করে তোলার মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তারা দেখিয়েছে।

ঘটনাটি সত্যিই যদি সেই মাত্রায় সফল হয়ে থাকে, তা হলে মহাকাশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বড়। কারণ এর ফলে ভবিষ্যতে কোনও স্যাটেলাইটের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলেই সেটিকে বাতিল করে দিতে হবে না। নির্দিষ্ট প্রযুক্তির সাহায্যে কক্ষপথেই তার সার্ভিসিং করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। চিনের দাবি এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আমেরিকাও। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে যেভাবে দেখা হচ্ছে, তাতে চিনের ঘোষণাকে সরাসরি প্রযুক্তিগত সাফল্য হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—চিন কি সত্যিই মহাকাশে মৃতপ্রায় উপগ্রহকে নতুন জীবন দিয়েছে, নাকি পুরো ঘটনাটির পিছনে রয়েছে অন্য কোনও ব্যাখ্যা?

স্যাটেলাইট রিফুয়েলিং আসলে কী?

সহজভাবে বললে, স্যাটেলাইট রিফুয়েলিং হল মহাকাশে থাকা একটি উপগ্রহে বাইরে থেকে গিয়ে প্রয়োজনীয় প্রপেল্যান্ট বা জ্বালানি সরবরাহ করা।

পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা অনেক উপগ্রহের ভিতরে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি থাকে। সেই জ্বালানি ব্যবহার করা হয় কক্ষপথ ঠিক রাখতে, অবস্থান পরিবর্তন করতে অথবা নির্দিষ্ট মিশন পরিচালনা করতে। একটি উপগ্রহের অন্যান্য যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক থাকলেও জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে তার কার্যক্ষমতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।

সাধারণত একটি স্যাটেলাইটের মিশন পরিকল্পনার সময়ই নির্ধারণ করা হয় কত বছর সেটি কার্যকর থাকবে। জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়া সেই মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা।

যদি কোনও সার্ভিসিং যান মহাকাশে গিয়ে সেই উপগ্রহের সঙ্গে নিরাপদে সংযুক্ত হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি স্থানান্তর করতে পারে, তা হলে উপগ্রহটির কার্যকর জীবন আরও বাড়ানো সম্ভব।

এই প্রযুক্তি সফল হলে মহাকাশে স্যাটেলাইট ব্যবহারের অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ চিনের এই দাবি?

একটি উপগ্রহ তৈরি, উৎক্ষেপণ এবং কক্ষপথে স্থাপন করতে বিপুল অর্থ এবং সময় লাগে। কোনও স্যাটেলাইটের যন্ত্রপাতি যদি ঠিক থাকে কিন্তু শুধু জ্বালানি কমে যাওয়ার কারণে সেটিকে নিষ্ক্রিয় করতে হয়, তাহলে সেটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি।

রিফুয়েলিং প্রযুক্তি সফল হলে একটি পুরনো স্যাটেলাইটকে আরও দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন উপগ্রহ উৎক্ষেপণের প্রয়োজনও কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে।

শুধু বাণিজ্যিক উপগ্রহ নয়, যোগাযোগ, আবহাওয়া, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, নেভিগেশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ পরিষেবাতেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণেই বিশ্বের বড় মহাকাশ শক্তিগুলি দীর্ঘদিন ধরেই on-orbit servicing, satellite life extension এবং orbital refueling প্রযুক্তির দিকে নজর দিচ্ছে।

কীভাবে একটি উপগ্রহে মহাকাশে জ্বালানি ভরা হয়?

পৃথিবীতে একটি গাড়িতে জ্বালানি ভরার সঙ্গে মহাকাশে স্যাটেলাইট রিফুয়েলিংয়ের তুলনা করা যাবে না। মহাকাশে দু’টি বস্তু একই সঙ্গে অত্যন্ত বেশি গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।

প্রথমে সার্ভিসিং যানকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছতে হয়। তারপর সেটিকে টার্গেট উপগ্রহের কাছে নিয়ে আসতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত নিখুঁত নেভিগেশন প্রয়োজন।

এর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল rendezvous and docking। সার্ভিসিং যানকে নির্দিষ্ট অবস্থানে গিয়ে উপগ্রহের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হয়।

সংযোগের পর শুরু হয় জ্বালানি স্থানান্তরের প্রক্রিয়া। এখানে সামান্য ভুলও বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ মহাকাশে মেরামত বা উদ্ধার করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

এই কারণে কোনও দেশ যদি সফলভাবে এই ধরনের প্রযুক্তি প্রদর্শন করতে পারে, তা মহাকাশ প্রকৌশলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মৃতপ্রায় উপগ্রহকে কীভাবে ফের সক্রিয় করা যায়?

‘মৃতপ্রায়’ উপগ্রহ বলতে সবসময় পুরোপুরি অকেজো উপগ্রহ বোঝায় না। অনেক ক্ষেত্রে উপগ্রহের কমিউনিকেশন সিস্টেম, সৌর প্যানেল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সচল থাকতে পারে। সমস্যা হতে পারে প্রধানত জ্বালানি বা কক্ষপথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়।

যদি সার্ভিসিং যান প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে, তাহলে উপগ্রহ তার কক্ষপথ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ফিরে পেতে পারে।

তবে শুধু জ্বালানি ভরলেই সব স্যাটেলাইটকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যদি কোনও উপগ্রহের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, কম্পিউটার, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা সেন্সর গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা হলে রিফুয়েলিং করেও তাকে সম্পূর্ণ কার্যকর করা সম্ভব নাও হতে পারে।

তাই চিনের দাবির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—ঠিক কী ধরনের উপগ্রহকে, কী অবস্থায় এবং কী ধরনের সার্ভিসিংয়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে?

আমেরিকা কেন প্রশ্ন তুলছে?

চিন ও আমেরিকার মধ্যে মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা বহুদিনের। নেভিগেশন, স্যাটেলাইট, চাঁদে অভিযান, মহাকাশ স্টেশন এবং সামরিক মহাকাশ সক্ষমতা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে।

ফলে চিন কোনও গুরুত্বপূর্ণ নতুন মহাকাশ প্রযুক্তির সাফল্য দাবি করলে আমেরিকা সেটিকে প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনও উপগ্রহে জ্বালানি ভরার প্রযুক্তি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যাবে এমন নয়। একই ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কক্ষপথে থাকা বিভিন্ন ধরনের মহাকাশযানের সঙ্গে যোগাযোগ বা শারীরিক সংযোগ তৈরিতেও ব্যবহার হতে পারে।

এই কারণে মার্কিন মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে এমন প্রযুক্তির সম্ভাব্য সামরিক প্রয়োগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

তবে কোনও নির্দিষ্ট চিনা মিশনকে ‘ভাঁওতা’ বলে চূড়ান্তভাবে আখ্যা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত তথ্য, পর্যবেক্ষণ এবং স্বাধীন যাচাই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

‘গোটাটাই ভাঁওতা’ বিতর্কের আসল জায়গা কোথায়?

চিনের কোনও মহাকাশ সাফল্যের দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠা নতুন নয়। মহাকাশ প্রযুক্তিতে একটি মিশনের সাফল্য যাচাই করতে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রয়োজন হয়।

যেমন—মিশনের কক্ষপথ, মহাকাশযানের অবস্থান, ডকিংয়ের তথ্য, টেলিমেট্রি, উপগ্রহের কার্যক্ষমতার পরিবর্তন এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণ।

শুধু কোনও দেশের সরকারি ঘোষণা যথেষ্ট নয়। স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করা তথ্য থাকলে একটি মিশনের প্রকৃত সাফল্য সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

এই জায়গাতেই চিনের দাবি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে আলোচনা চলছে। একদিকে রয়েছে চিনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দাবি, অন্যদিকে রয়েছে মার্কিন পক্ষের সন্দেহ ও প্রশ্ন।

ফলে পুরো ঘটনাকে সাদা-কালোভাবে দেখার বদলে কোন তথ্য নিশ্চিত এবং কোনটি এখনও দাবি বা বিশ্লেষণ—সেটি আলাদা করে দেখা জরুরি।

মহাকাশে পুরনো উপগ্রহের আয়ু বাড়ানোর সুবিধা

একটি সফল স্যাটেলাইট রিফুয়েলিং প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল মিশনের আয়ু বাড়ানো।

ধরা যাক, একটি স্যাটেলাইটের সব গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ঠিক আছে, কিন্তু জ্বালানি শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় কিছু সময় পরে সেটিকে অবসর নিতে হতে পারে।

কিন্তু রিফুয়েলিং সম্ভব হলে একই স্যাটেলাইট আরও কয়েক বছর পরিষেবা দিতে পারে—মিশনের নকশা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার উপর নির্ভর করে।

এর ফলে:

  • নতুন স্যাটেলাইট তৈরির চাপ কমতে পারে।
  • উৎক্ষেপণ খরচ কিছু ক্ষেত্রে কমানো সম্ভব হতে পারে।
  • মহাকাশে থাকা মূল্যবান হার্ডওয়্যার আরও দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • স্যাটেলাইট পরিষেবার ধারাবাহিকতা বাড়তে পারে।
  • পুরনো স্যাটেলাইটের আয়ু বাড়িয়ে বিনিয়োগের ওপর রিটার্ন বৃদ্ধি করা সম্ভব হতে পারে।

তবে সব ক্ষেত্রেই যে এই সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নয়।

মহাকাশে জ্বালানি ভরার প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

এই প্রযুক্তির সামনে রয়েছে একাধিক বড় সমস্যা।

প্রথম সমস্যা হল নির্ভুলতা। সার্ভিসিং যানকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে টার্গেট স্যাটেলাইটের কাছে পৌঁছতে হয়।

দ্বিতীয় সমস্যা হল ডকিং। কয়েক হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণরত দুটি মহাকাশযানের মধ্যে নিরাপদ সংযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জটিল।

news image
আরও খবর

তৃতীয় সমস্যা হল জ্বালানি স্থানান্তর। বিভিন্ন স্যাটেলাইটে বিভিন্ন ধরনের প্রপেল্যান্ট ব্যবহার হতে পারে। ফলে প্রতিটি উপগ্রহের নকশা অনুযায়ী রিফুয়েলিং ব্যবস্থা তৈরি করা সহজ নয়।

চতুর্থ সমস্যা হল নিরাপত্তা। ভুল সংযোগ বা জ্বালানি স্থানান্তরের সময় কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু দুটি মহাকাশযান নয়, আশপাশের অন্যান্য স্যাটেলাইটও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বাণিজ্যিক মহাকাশ শিল্পে কী পরিবর্তন আসতে পারে?

স্যাটেলাইট রিফুয়েলিং সফল হলে ভবিষ্যতে একটি নতুন পরিষেবা শিল্প তৈরি হতে পারে। যেমন পৃথিবীতে গাড়ি সার্ভিসিং বা বিমান রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, তেমনই মহাকাশে স্যাটেলাইট সার্ভিসিং একটি স্বতন্ত্র ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

ভবিষ্যতে এমন মহাকাশযান তৈরি হতে পারে যেগুলি নির্দিষ্ট কক্ষপথে গিয়ে বিভিন্ন উপগ্রহের:

  • জ্বালানি সরবরাহ করবে,
  • কক্ষপথ সংশোধন করবে,
  • যান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবে,
  • পুরনো উপগ্রহকে নিরাপদ কক্ষপথে সরিয়ে দেবে,
  • এবং প্রয়োজনে মহাকাশের আবর্জনা ব্যবস্থাপনাতেও ভূমিকা নেবে।

এমন পরিষেবা বাস্তবায়িত হলে মহাকাশে স্যাটেলাইট ব্যবহারের অর্থনীতি অনেকটাই বদলে যেতে পারে।

মহাকাশ আবর্জনা কমাতেও কি সাহায্য করবে?

স্যাটেলাইট রিফুয়েলিং প্রযুক্তির আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হল space debris management।

কোনও উপগ্রহ তার মিশন শেষ করার পর যদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তাহলে সেটি দীর্ঘ সময় পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে পারে। এমন পরিত্যক্ত বস্তু ভবিষ্যতে অন্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ভবিষ্যতে যদি সার্ভিসিং যান পুরনো স্যাটেলাইটকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে সেটিকে নির্দিষ্ট নিরাপদ কক্ষপথে সরিয়ে নেওয়া বা মিশন শেষে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করানোর মতো কাজ করা সম্ভব হতে পারে।

অবশ্য এই প্রযুক্তি এখনও জটিল এবং প্রতিটি মিশনের পরিস্থিতি আলাদা।

চিন-আমেরিকা মহাকাশ প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়?

চিন গত কয়েক বছরে মহাকাশ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে নিজের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন, চাঁদের বিভিন্ন মিশন এবং উন্নত উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির পাশাপাশি মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরির দিকেও দেশটি এগিয়েছে।

অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে একাধিক বেসরকারি সংস্থা এবং সরকারি মহাকাশ প্রকল্পও মহাকাশে সার্ভিসিং প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইট রিফুয়েলিং শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, ভবিষ্যতের মহাকাশ অর্থনীতি এবং কৌশলগত সক্ষমতার অংশও হয়ে উঠতে পারে।

তবে কোনও একটি মিশনের সাফল্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মহাকাশ প্রতিযোগিতার পুরো চিত্র নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।

সামরিক ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে কেন আলোচনা?

স্যাটেলাইট এখন আধুনিক সামরিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যোগাযোগ, নেভিগেশন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নজরদারির মতো কাজে বিভিন্ন দেশের সামরিক ব্যবস্থা মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল।

ফলে কোনও দেশ যদি অন্য দেশের স্যাটেলাইটের কাছে গিয়ে কাজ করার মতো প্রযুক্তি অর্জন করে, তা নিয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

একই প্রযুক্তি একদিকে কোনও বন্ধুত্বপূর্ণ বা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের আয়ু বাড়াতে ব্যবহার করা যেতে পারে, অন্যদিকে এর সম্ভাব্য কৌশলগত ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

এই দ্বৈত ব্যবহারযোগ্যতার কারণেই মহাকাশে servicing technology নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা এবং নিয়মকানুনের গুরুত্ব বাড়ছে।

তাহলে চিনের দাবি কতটা সত্য?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট মিশনের প্রযুক্তিগত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিনের দাবি যদি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, কক্ষপথের তথ্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেটি মহাকাশ প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আবার যদি দাবির সঙ্গে পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্যের অসঙ্গতি থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তাই এই ধরনের খবরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—দাবি এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যকে এক করে না দেখা।

কোনও পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়ার বদলে মিশনের তথ্য, প্রযুক্তিগত বিবরণ এবং স্বাধীন মহাকাশ পর্যবেক্ষণ দেখা প্রয়োজন।

ভবিষ্যতে কি মহাকাশে ‘সার্ভিস স্টেশন’ তৈরি হবে?

আজকের দিনে এই ধারণা অনেকটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো শোনালেও মহাকাশ শিল্প দ্রুত বদলাচ্ছে।

যদি on-orbit servicing প্রযুক্তি আরও উন্নত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পৃথিবীর কক্ষপথে নির্দিষ্ট সার্ভিসিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পারে। সেখানে স্যাটেলাইটকে নিয়ে গিয়ে মেরামত, রিফুয়েলিং বা আপগ্রেড করা সম্ভব হতে পারে।

এমনকি ভবিষ্যতে নতুন স্যাটেলাইটের নকশাই এমনভাবে তৈরি করা হতে পারে যাতে সেগুলিকে সহজে রিফুয়েল বা মেরামত করা যায়।

এর ফলে ‘একবার উৎক্ষেপণ করো এবং জ্বালানি শেষ হলে ফেলে দাও’—এই মডেল ধীরে ধীরে বদলে যেতে পারে।

ভারতের জন্যও কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

ভারত দ্রুত নিজের মহাকাশ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। যোগাযোগ, নেভিগেশন, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভারতের স্যাটেলাইটের ব্যবহার ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে satellite servicing এবং life-extension technology ভবিষ্যতে ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

একটি স্যাটেলাইটকে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা গেলে নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের চাপ কমতে পারে। পাশাপাশি মহাকাশে থাকা মূল্যবান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হতে পারে।

তবে ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে স্যাটেলাইটের নকশা, ডকিং ব্যবস্থা, জ্বালানি ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ মিশন পরিকল্পনার মতো বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

মহাকাশে নতুন প্রযুক্তির লড়াই

বর্তমানে মহাকাশ গবেষণা শুধুমাত্র চাঁদ বা মঙ্গল অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটকে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিও বড় প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

রিফুয়েলিং, ইন-orbit manufacturing, satellite servicing, space debris removal—এই সব প্রযুক্তিই আগামী দিনের মহাকাশ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

চিনের সাম্প্রতিক দাবি সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই একটি অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তবে কোনও প্রযুক্তির বাস্তব সাফল্য বুঝতে হলে প্রচারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং স্বাধীন যাচাই।

শেষ কথা

মহাকাশে মৃতপ্রায় উপগ্রহে জ্বালানি ভরে ফের সক্রিয় করার প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা নিঃসন্দেহে মহাকাশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। একটি স্যাটেলাইটের আয়ু বাড়ানো, মহাকাশে থাকা মূল্যবান যন্ত্রপাতিকে আরও দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা এবং ভবিষ্যতে মহাকাশ আবর্জনা নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই এর সম্ভাবনা রয়েছে।

চিন এই ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দাবি করেছে। অন্যদিকে আমেরিকার পক্ষ থেকে এই দাবির ব্যাখ্যা ও প্রকৃত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চিনের দাবি, মার্কিন প্রতিক্রিয়া এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রযুক্তিগত তথ্য—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা।

মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি সফল ডকিং বা জ্বালানি স্থানান্তর নিঃসন্দেহে বড় প্রযুক্তিগত অর্জন হতে পারে। কিন্তু কোনও একটি ঘটনার ভিত্তিতে পুরো মহাকাশ প্রতিযোগিতার চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।

আগামী দিনে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে হয়তো মহাকাশে এমন সময় আসবে, যখন কোনও স্যাটেলাইটের জ্বালানি শেষ হওয়া মানেই তার জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং পৃথিবীর কক্ষপথেই তাকে নতুন করে ‘সার্ভিস’ করে আরও কয়েক বছর কাজে লাগানো সম্ভব হবে। আর সেই ভবিষ্যতের পথ তৈরি করার দৌড়ে চিন, আমেরিকা এবং অন্যান্য মহাকাশ শক্তিগুলির প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Preview image