পুজোর ভিড় সামলাতে ব্লু, গ্রিন, পার্পল, ইয়েলো ও অরেঞ্জ লাইনে চলবে বিশেষ মেট্রো পরিষেবা। যাত্রীদের সুবিধায় বাড়ানো হবে ট্রেনের সংখ্যা ও পরিষেবার সময়।
দুর্গাপুজোয় রাত জেগে প্যান্ডেল হপিং করতে যাঁরা কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে বেরোন, তাঁদের জন্য বড় স্বস্তির খবর। পুজোর ভিড় ও যাত্রীদের বাড়তি চাপের কথা মাথায় রেখে কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষ একাধিক লাইনে বিশেষ পরিষেবা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে ব্লু ও গ্রিন লাইনে পুজোর গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলিতে রাতভর মেট্রো পরিষেবা পাওয়া যাবে। ফলে রাতের কলকাতায় এক প্যান্ডেল থেকে অন্য প্যান্ডেলে ঘোরার ক্ষেত্রে যাত্রীদের অনেকটাই সুবিধা হবে।
পুজোর সময় কলকাতার রাস্তায় যানজট নতুন কোনও বিষয় নয়। ষষ্ঠী থেকেই শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, মেট্রো স্টেশন এবং পুজোমণ্ডপ সংলগ্ন এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে সেই ভিড় আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্যান্ডেল হপিংয়ের ভিড়ও থাকে চোখে পড়ার মতো। এই পরিস্থিতিতে গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে বিশেষ পরিকল্পনা করেছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ।
এবার পুজোয় ব্লু ও গ্রিন লাইনে বিশেষ সময়সূচি অনুযায়ী মেট্রো চলবে। বিশেষ করে দুই সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমীতে রাতভর মেট্রো পরিষেবা চালু থাকবে। ফলে রাত জেগে প্যান্ডেল হপিং করা যাত্রীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় সুবিধা। ব্যস্ত সময়ে ব্লু লাইনে মাত্র ৬ মিনিট অন্তর এবং গ্রিন লাইনে ৮ মিনিট অন্তর মেট্রো পাওয়া যাবে।
অর্থাৎ, পুজোর রাতে দীর্ঘক্ষণ স্টেশনে দাঁড়িয়ে মেট্রোর জন্য অপেক্ষা করার সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত পৌঁছনোর জন্য মেট্রোকেই এবার অনেকেই প্রধান ভরসা করতে পারবেন।
পঞ্চমী ও ষষ্ঠীতে ব্লু লাইনে বিশেষ পরিষেবা
পুজোর আগের গুরুত্বপূর্ণ দুই দিন অর্থাৎ পঞ্চমী ও ষষ্ঠীতেও ব্লু লাইনে বাড়তি পরিষেবা থাকবে। এই দুই দিনে মোট ২৮৪টি ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরিষেবা শুরু হবে সকাল ৬টা থেকে। দিনের শেষে শেষ ট্রেন পাওয়া যাবে রাত ১১টা নাগাদ।
যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি যে সময়গুলিতে থাকে, সেই ব্যস্ত সময়ে ব্লু লাইনে ৬ মিনিট অন্তর ট্রেন চালানো হবে। ফলে অফিসযাত্রী, পুজোর বাজার করতে বেরোনো মানুষ এবং আগেভাগে প্যান্ডেল হপিং শুরু করা দর্শনার্থীদের জন্যও এই পরিষেবা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত মেট্রো রুট হিসেবে ব্লু লাইনে পুজোর সময় যাত্রীর চাপ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি থাকে। সেই চাপ সামলাতেই ট্রেনের সংখ্যা এবং পরিষেবার সময় বাড়ানো হয়েছে।
গ্রিন লাইনেও থাকছে বাড়তি ট্রেন
শুধু ব্লু লাইন নয়, গ্রিন লাইনেও পঞ্চমী ও ষষ্ঠীতে বিশেষ পরিষেবা থাকবে। এই দুই দিনে মোট ২৪০টি ট্রেন চালানোর কথা জানানো হয়েছে।
পুজোর দিনগুলিতে গ্রিন লাইনের যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেই মনে করছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। তাই যাত্রীদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে এই লাইনে বাড়তি ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে পুজোর মূল আকর্ষণ হল সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত রাতভর পরিষেবা।
সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে রাতভর মেট্রো
এবারের পুজোয় বিশেষ নজর কেড়েছে রাতভর মেট্রো পরিষেবা। দুই সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমীতে ব্লু ও গ্রিন লাইনে রাতভর ট্রেন চলবে।
১৭ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ব্লু লাইনে দুপুর ১টা থেকে পরিষেবা শুরু হয়ে পরের দিন ভোর ৪টে পর্যন্ত চলবে। অর্থাৎ পুজোর রাতে গভীর রাতেও মেট্রো ব্যবহার করে যাতায়াত করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, গ্রিন লাইনে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট থেকে পরিষেবা শুরু হয়ে পরের দিন ভোর ৩টে ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মেট্রো চলবে।
রাত জেগে প্যান্ডেল হপিংয়ের ক্ষেত্রে এই পরিষেবা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহণের সংখ্যা অনেক সময় কমে যায়। ফলে পুজোর সময়ে বহু মানুষকে বাড়ি ফেরার জন্য সমস্যায় পড়তে হয়। রাতভর মেট্রো পরিষেবা সেই সমস্যা অনেকটাই কমাতে পারে।
বিশেষ করে কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকা থেকে পুজো দেখতে আসা মানুষদের জন্য মেট্রো পরিষেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাতের দিকে একাধিক পুজোমণ্ডপ ঘুরে বাড়ি ফেরার সময় মেট্রো থাকলে যাতায়াত অনেকটাই সহজ হবে।
ব্যস্ত সময়ে ব্লু লাইনে ৬ মিনিট অন্তর ট্রেন
পুজোর ভিড় সামলাতে ব্লু লাইনে পরিষেবার ফ্রিকোয়েন্সিও বাড়ানো হয়েছে। ব্যস্ত সময়ে মাত্র ৬ মিনিট অন্তর মেট্রো চলবে।
এর ফলে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক যাত্রী স্টেশনে জমা হলেও অপেক্ষার সময় তুলনামূলকভাবে কম থাকবে। পুজোর সময়ে সাধারণত সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত মেট্রো স্টেশনগুলিতে যাত্রীসংখ্যা দ্রুত বাড়ে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই ঘন ঘন ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্যান্ডেল হপিংয়ের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সুবিধা হল—একটি মেট্রো মিস হয়ে গেলেও পরের ট্রেনের জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পরের ট্রেন পাওয়া যাবে।
গ্রিন লাইনে ৮ মিনিট অন্তর মেট্রো
গ্রিন লাইনেও থাকছে ঘন ঘন ট্রেন। ব্যস্ত সময়ে ৮ মিনিট অন্তর মেট্রো চলবে।
গ্রিন লাইনের যাত্রীদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা। পুজোর রাতে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে যাত্রীরা এই লাইনের মাধ্যমে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন।
রাতভর পরিষেবার সঙ্গে ঘন ঘন ট্রেন চলার ফলে পুজোর সময়ে মেট্রো ব্যবস্থার উপর যাত্রীদের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
দশমীতে বদলাবে সময়সূচি
দশমীর দিন অবশ্য রাতভর মেট্রো পরিষেবা থাকবে না। সেদিন আলাদা সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেন চলবে।
ব্লু লাইনে দশমীর দিন দুপুর ১টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মোট ১৪০টি ট্রেন চালানো হবে। ব্যস্ত সময়ে এই লাইনে ৮ মিনিট অন্তর ট্রেন পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, গ্রিন লাইনে দশমীর দিন দুপুর ১টা ৩০ মিনিট থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৭৪টি ট্রেন চলবে। ব্যস্ত সময়ে গ্রিন লাইনে ১৫ মিনিট অন্তর মেট্রো পরিষেবা পাওয়া যাবে।
দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জন এবং বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি জনসমাগমের কারণে শহরের পরিবহণ ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ে। তাই সেদিনও মেট্রো পরিষেবা চালু রাখা হচ্ছে, যদিও সপ্তমী থেকে নবমীর মতো রাতভর পরিষেবা থাকবে না।
ইয়েলো ও পার্পল লাইনেও বিশেষ পরিষেবা
পুজোর সময় শুধু ব্লু এবং গ্রিন লাইন নয়, ইয়েলো ও পার্পল লাইনেও বিশেষ পরিষেবা পাওয়া যাবে। পুজোর সব দিনেই এই দুই লাইনে বিশেষ পরিষেবা দেওয়ার কথা জানিয়েছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ।
ফলে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন প্রান্তের যাত্রীদের জন্য মেট্রো যাত্রা আরও সুবিধাজনক হতে পারে।
পুজোর সময়ে শহরের রাস্তায় গাড়ির চাপ এবং যানজট বাড়ায় মেট্রো পরিষেবার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তাই একাধিক লাইনে বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্তকে যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অরেঞ্জ লাইনে বড় পরিবর্তন
তবে সব লাইনে পুজোর পাঁচ দিন সমান পরিষেবা পাওয়া যাবে না। অরেঞ্জ লাইনে পুজোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে মেট্রো পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
মেট্রো কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, অরেঞ্জ লাইনে শুধুমাত্র পঞ্চমী ও ষষ্ঠীতে মেট্রো চলবে। দুই সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমীতে এই লাইনে পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
তাই অরেঞ্জ লাইনের যাত্রীদের পুজোর পরিকল্পনা করার আগে এই বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। বিশেষ করে সপ্তমী থেকে দশমীর মধ্যে যাঁরা অরেঞ্জ লাইনের উপর নির্ভর করে যাতায়াতের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের বিকল্প পরিবহণের ব্যবস্থা আগে থেকেই ভেবে রাখা ভালো।
প্যান্ডেল হপিংয়ে বড় সুবিধা
দুর্গাপুজোয় রাতভর প্যান্ডেল হপিং বাঙালির বহু বছরের জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা, সল্টলেক থেকে নিউ টাউন—বিভিন্ন জায়গার পুজো দেখতে রাতভর ঘুরে বেড়ান বহু মানুষ।
এই সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যাতায়াত। রাস্তায় গাড়ির চাপ, যানজট এবং রাতের দিকে গণপরিবহণের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে অনেককেই সমস্যায় পড়তে হয়।
রাতভর মেট্রো পরিষেবা সেই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করতে পারে। একদিকে যেমন দ্রুত যাতায়াত সম্ভব হবে, অন্যদিকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পৌঁছনোর সুযোগও থাকবে।
বিশেষ করে রাতের প্যান্ডেল হপিংয়ে যাঁরা কয়েকটি মেট্রো রুট ব্যবহার করে একাধিক জায়গা ঘুরতে চান, তাঁদের জন্য পরিষেবার সময়সূচি জানা অত্যন্ত জরুরি।
যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
পুজোর সময় মেট্রোয় যাত্রা করার আগে যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট লাইনের সময়সূচি ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত। কারণ প্রতিটি লাইনে একই সময়সূচি থাকছে না।
ব্লু ও গ্রিন লাইনে রাতভর পরিষেবা থাকলেও ইয়েলো ও পার্পল লাইনের সময়সূচি আলাদা হতে পারে। আবার অরেঞ্জ লাইনে নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
তাই প্যান্ডেল হপিংয়ের রুট তৈরি করার আগে কোন স্টেশন থেকে কখন শেষ ট্রেন পাওয়া যাবে, কোন লাইনে পরিষেবা রয়েছে এবং কোথায় লাইন পরিবর্তন করতে হবে—এসব বিষয় জেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পুজোর সময় প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে মেট্রো স্টেশনেও যাত্রীদের চাপ বাড়তে পারে। তাই পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে স্টেশনে পৌঁছনো এবং মেট্রো কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা মেনে চলা যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও সুবিধাজনক হবে।
সব মিলিয়ে, পুজোর চার দিন রাতভর ব্লু ও গ্রিন লাইনে মেট্রো চালানোর সিদ্ধান্ত কলকাতার প্যান্ডেল হপিং সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর রাতে যাঁরা গভীর রাত পর্যন্ত পুজো দেখতে বেরোবেন, তাঁদের জন্য মেট্রো হয়ে উঠতে পারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতের মাধ্যম।
ব্লু লাইনে ব্যস্ত সময়ে ৬ মিনিট অন্তর এবং গ্রিন লাইনে ৮ মিনিট অন্তর ট্রেন, সঙ্গে রাতভর পরিষেবা—পুজোর ভিড় সামলাতে মেট্রোর এই বিশেষ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে অরেঞ্জ লাইনে সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত পরিষেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি যাত্রীদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে।
তাই এবার পুজোয় প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনা করার আগে মেট্রোর বিশেষ সময়সূচি দেখে রুট তৈরি করুন। কোন দিনে কোন লাইনে ট্রেন চলছে, রাতের শেষ ট্রেন কখন, কোথায় পরিষেবা বন্ধ—এই তথ্যগুলি জানা থাকলে রাতভর পুজো ঘোরা অনেকটাই সহজ ও নিশ্চিন্ত হতে পারে।