Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘পুরনো সব কিছু মুছে স্বস্তির জায়গায় ফিরলেই ব্যথা থাকে না’, নতুন অ্যালবাম নিয়ে অনুপমের অকপট কথা

বাবা হওয়ার পর জীবনের নতুন অধ্যায়ে অনুপম রায়। বুধবার প্রকাশ্যে এল তাঁর নতুন অ্যালবাম ‘ব্যথা নেই’—নতুন অনুভূতি ও নতুন গল্প নিয়ে।

পুজোর আবহ শুরু হওয়ার আগেই শ্রোতাদের জন্য নতুন উপহার নিয়ে এলেন অনুপম রায়। বুধবার প্রকাশ্যে এল তাঁর নতুন অ্যালবাম ‘ব্যথা নেই’। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে এক ধরনের স্বস্তি, মুক্তি এবং জীবনের নতুন দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। আর অ্যালবাম প্রকাশের সময়টা অনুপমের ব্যক্তিগত জীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সদ্যই জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রেখেছেন তিনি। গত ১৭ অগস্ট স্ত্রী, গায়িকা প্রস্মিতা পালের সঙ্গে পুত্রসন্তানের বাবা হয়েছেন অনুপম।

নতুন অ্যালবামের নাম কেন ‘ব্যথা নেই’? এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন অনুপম নিজেই। তাঁর কথায়, পুরনো সব কিছু যখন মুছে যায় এবং একজন মানুষ জীবনের এমন একটি জায়গায় এসে পৌঁছন, যেখানে ভিতর থেকে স্বস্তি অনুভব করা যায়, তখনই বলা সম্ভব—‘ব্যথা নেই’। অর্থাৎ এখানে ‘ব্যথা নেই’ শুধু শারীরিক যন্ত্রণা না থাকার কথা নয়। বরং এটি এক ধরনের মানসিক মুক্তি, অতীতকে পিছনে ফেলে নতুন করে বাঁচতে শেখা এবং নিজের ভিতরে শান্তি খুঁজে পাওয়ার অনুভূতি।

এই ব্যাখ্যার কারণেই অ্যালবামের নামটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনুপমের গানের জগতে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সম্পর্ক, স্মৃতি, একাকিত্ব, ভালোবাসা এবং জীবনের নানা টানাপড়েন বারবার ফিরে এসেছে। ‘ব্যথা নেই’-এর ক্ষেত্রেও সেই অনুভূতির একটি অন্য রূপ দেখা যাচ্ছে। এখানে ব্যথার কথা বলা হলেও লক্ষ্য যেন শেষ পর্যন্ত ব্যথার বাইরে পৌঁছনো—একটি স্বস্তির জায়গায় দাঁড়ানো।

অ্যালবাম প্রকাশের সময় অনুপমের ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ১৭ অগস্ট অনুপম ও প্রস্মিতা পালের পরিবারে এসেছে তাঁদের পুত্রসন্তান। সন্তান জন্মের সময়ও অনুপম ‘ব্যথা নেই’ গানটি নিয়ে কাজ করছিলেন। যদিও গান তৈরি এবং সন্তানের জন্মের সময়ের মধ্যে কোনও পরিকল্পিত যোগসূত্র ছিল না বলেই অনুপম জানিয়েছেন, তবুও পরে ঘটনাগুলি যেন একে অপরের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জুড়ে যায়। হাসপাতালেই সদ্যোজাতকে ঘিরে যখন প্রস্মিতা ছিলেন, সেই সময় গানটির সঙ্গে তাঁদের নতুন জীবনের একটি মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল।

এ কারণেই বাবা হওয়ার পর ‘ব্যথা নেই’ গানটির অর্থ অনুপমের কাছেও যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। একটি নতুন প্রাণের আগমন, জীবনের পরিবর্তন এবং পরিবারের নতুন সদস্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনুভূতি—সব মিলিয়ে গানটির কথাগুলিকে নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সদ্যোজাতের কানেও পৌঁছেছিল সেই গান। ফলে গানটি শুধুমাত্র একটি সৃষ্টিশীল কাজ হয়ে না থেকে অনুপমের জীবনের একটি বিশেষ সময়ের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।

‘ব্যথা নেই’ অ্যালবামে রয়েছে মোট আটটি গান। চলতি বছরের শুরু থেকেই অ্যালবামের গানগুলি একে একে শ্রোতাদের সামনে এসেছে। পরে সেই গানগুলিকে একত্র করে তৈরি হয়েছে পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম। এর মধ্যে রয়েছে ‘অবাস্তব প্রেম’, ‘শান্তিনিকেতন’ এবং ‘জুলাই তোমার প্রিয় মাসের নাম’-এর মতো গান। বিশেষ করে ‘জুলাই তোমার প্রিয় মাসের নাম’ শ্রোতাদের মধ্যে আলাদা করে সাড়া ফেলেছিল। এখন সেই গানগুলির সংকলিত রূপই পাওয়া যাচ্ছে ‘ব্যথা নেই’ অ্যালবামে।

অ্যালবামের শেষ প্রকাশিত গানটির নামও ‘ব্যথা নেই’। গানটির শুরু—‘শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে’। বাবা হওয়ার পর এই প্রথম পংক্তির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নতুন বাস্তবতার একটি অনিবার্য মিল খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু অনুপম জানিয়েছেন, এই মিলটি মূলত কাকতালীয়। গানটি তৈরি হয়েছিল আগেই। অর্থাৎ সন্তান জন্মের পরে গানটির ভাবনা তৈরি হয়নি। বরং গানটি আগে থেকেই তাঁর সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার অংশ ছিল।

এই গানের প্রথম পংক্তির পিছনেও রয়েছে সাহিত্যিক অনুপ্রেরণা। কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর লেখার প্রতি অনুপমের দীর্ঘদিনের অনুরাগ রয়েছে। তাঁর একটি কবিতার ‘শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে’ পংক্তি থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন গায়ক। ফলে গানটির সূচনাতেই যেমন শিশুর উপস্থিতি রয়েছে, তেমনই এর সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব।

গানটির সুরের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। অনুপম জানিয়েছেন, এর সুর তৈরি হয়েছে পাশ্চাত্য লোকসঙ্গীতের আধারকে সামনে রেখে। কিন্তু গানের মূল ভাবনা একেবারেই মানুষের অন্তর্জগতকে ঘিরে। তাঁর ভাষায়, এটি ‘হিলিং’-এর গান—একজন মানুষের সুস্থ জীবনে ফিরে আসার গল্প। অর্থাৎ কোনও কষ্ট বা অস্থিরতার মধ্যে আটকে থাকার পরিবর্তে ধীরে ধীরে সেই পরিস্থিতি পেরিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অনুভূতিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

news image
আরও খবর

এই জায়গা থেকেই ‘ব্যথা নেই’ নামটির সঙ্গে গানটির ভাবনার সম্পর্ক স্পষ্ট হয়। ব্যথা থাকা এবং ব্যথা পেরিয়ে যাওয়া—দুটি আলাদা অভিজ্ঞতা। অনুপমের ব্যাখ্যায়, মানুষ যখন পুরনো কষ্টকে পিছনে ফেলে এমন একটি জায়গায় পৌঁছতে পারেন যেখানে ভিতর থেকে শান্তি অনুভব করেন, তখনই সেই অনুভূতিকে বলা যায় ‘ব্যথা নেই’। ফলে অ্যালবামের নামটি একদিকে যেমন আবেগঘন, অন্যদিকে তেমনই জীবনের পরিবর্তনের কথাও বলে।

২০২৬ সাল অনুপমের জীবনে তাই একাধিক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। একদিকে নতুন গান ও অ্যালবাম, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা। বছরের শুরু থেকে একের পর এক গান প্রকাশিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার আটটি গানকে একসঙ্গে নিয়ে সামনে এল ‘ব্যথা নেই’।

অনুপমের শ্রোতাদের কাছে তাঁর নতুন গান মানেই শুধু সুর বা কথা নয়, বরং গানের মধ্যে থাকা অনুভূতিগুলিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর গানের বিশেষত্বের একটি দিক হল দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত অনুভূতিকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় প্রকাশ করা। ‘ব্যথা নেই’-এর ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নামটি শুনলেই প্রশ্ন তৈরি হয়—কোন ব্যথা নেই? কীভাবে ব্যথা শেষ হয়? মানুষ কখন সত্যিই বলতে পারে যে তার আর কোনও কষ্ট নেই? এই প্রশ্নগুলিই অ্যালবামের ভাবনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

সন্তান জন্মের পর অনুপমের জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটিও এই সময়ের আলোচনায় উঠে এসেছে। স্ত্রী প্রস্মিতা পাল জানিয়েছেন, বাবা হওয়ার পরে অনুপমকে তিনি যেন অন্যভাবে দেখছেন। সদ্যোজাতকে ঘিরেই তাঁর অনেকটা সময় কাটছে। তবে দু’জনেই তাঁদের সন্তানের ব্যক্তিগত পরিসরকে আপাতত ব্যক্তিগত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সন্তানের নাম বা মুখ প্রকাশ্যে আনেননি।

নতুন বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন অ্যালবামের প্রকাশ—দুটি ঘটনা সময়ের হিসেবে পাশাপাশি এসে যাওয়ায় ‘ব্যথা নেই’ আরও ব্যক্তিগত মাত্রা পেয়েছে। যদিও গানটির পরিকল্পনা বা সৃষ্টির সঙ্গে সন্তান জন্মের সরাসরি কোনও পূর্বপরিকল্পিত সম্পর্ক ছিল না, তবুও জীবনের নতুন অধ্যায়ের সঙ্গে গানটির কিছু শব্দ এবং অনুভূতির মিল তৈরি হয়েছে। শিল্পীর নিজের জীবন যখন তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায়, তখন শ্রোতার কাছেও সেই গান নতুন অর্থ পেতে পারে।

পুজোর আগে অ্যালবাম প্রকাশের সময়টিও আলাদা গুরুত্ব বহন করে। উৎসবের মরসুমে নতুন বাংলা গান ও অ্যালবাম প্রকাশের নিজস্ব একটা আবহ থাকে। সেই সময়েই অনুপম নিয়ে এলেন এমন একটি অ্যালবাম, যার নামের মধ্যেই রয়েছে শান্তি ও স্বস্তির ইঙ্গিত। আটটি গান একসঙ্গে শুনলে শ্রোতারা হয়তো অনুপমের ২০২৬ সালের সৃষ্টিশীল যাত্রার একটি পূর্ণ ছবি খুঁজে পাবেন।

‘অবাস্তব প্রেম’ থেকে ‘শান্তিনিকেতন’, ‘জুলাই তোমার প্রিয় মাসের নাম’ থেকে ‘ব্যথা নেই’—গানগুলির মাধ্যমে অ্যালবামটি বিভিন্ন অনুভূতির মধ্যে দিয়ে এগোয়। কোথাও সম্পর্কের আবেশ, কোথাও স্মৃতি, কোথাও ব্যক্তিগত অনুভব, আবার কোথাও সুস্থ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা। এই বৈচিত্র্যই আটটি গানকে একসঙ্গে একটি অ্যালবামের কাঠামোয় নিয়ে আসে।

সব মিলিয়ে ‘ব্যথা নেই’ শুধু নতুন আটটি গানের সংকলন নয়; এটি অনুপম রায়ের ২০২৬ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল অধ্যায়েরও প্রতিচ্ছবি। ব্যক্তিগত জীবনে বাবা হওয়ার নতুন অভিজ্ঞতা এবং একই সময়ে নিজের সঙ্গীতকে নতুনভাবে সামনে আনা—দুটি ঘটনাই এই সময়কে তাঁর কাছে বিশেষ করে তুলেছে। আর অ্যালবামের নামের ব্যাখ্যায় যে স্বস্তির কথা তিনি বলেছেন, সেটিই হয়তো এই নতুন অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় অনুভূতি—পুরনো কষ্টকে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া।

অনুপমের কথায় ‘ব্যথা নেই’ হল সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ ভিতর থেকে অনুভব করতে পারেন যে সত্যিই আর কোনও ব্যথা নেই। সেই অনুভূতিকেই সুর, কথা এবং আটটি গানের সংকলনে শ্রোতাদের সামনে হাজির করেছেন তিনি। আর তাই পুজোর আগে প্রকাশিত এই অ্যালবাম শুধু উৎসবের নতুন গান নয়, বরং নতুন জীবন, নতুন অনুভূতি এবং মানসিক স্বস্তির একটি সঙ্গীতময় গল্প হিসেবেও ধরা দিতে পারে।

Preview image