দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কলকাতা-সহ একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। তিন জেলায় ভারী বর্ষণের সম্ভাবনার পাশাপাশি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গে বর্ষার আনুষ্ঠানিক প্রবেশের পর ধীরে ধীরে তার প্রভাব দক্ষিণবঙ্গের দিকে বিস্তার লাভ করছে। যদিও এখনও দক্ষিণবঙ্গে পূর্ণমাত্রায় বর্ষা পৌঁছয়নি, তবুও গত কয়েক দিন ধরে প্রাকবর্ষার বৃষ্টিতে ভিজছে কলকাতা-সহ একাধিক জেলা। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন রাজ্যের মানুষকে গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া থেকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টির কারণে সতর্কতা জারি করেছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর। বৃহস্পতিবার থেকে দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সমস্ত জেলাতেই ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। বিশেষ করে তিনটি জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কারণে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টা থেকে পরবর্তী তিন ঘণ্টার মধ্যে বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই তিন জেলায় ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
এই পরিস্থিতিকে মাথায় রেখেই ওই তিন জেলার জন্য লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। লাল সতর্কতা সাধারণত তখনই জারি করা হয় যখন আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিপজ্জনক হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায়ও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এই জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম, তবুও ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই তিন জেলার পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ আবহাওয়া প্রতিকূল হতে পারে এবং বজ্রপাত, দমকা হাওয়া বা মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির কারণে স্থানীয়ভাবে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প দক্ষিণবঙ্গের দিকে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে ভূমি ও সমুদ্রের তাপমাত্রার পার্থক্য এবং বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে অনুকূল বায়ুপ্রবাহের কারণে মেঘ সঞ্চার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলেই প্রায় প্রতিদিন বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
বর্ষা এখনও দক্ষিণবঙ্গে প্রবেশ না করলেও বর্ষা অগ্রগতির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গেও বর্ষার আনুষ্ঠানিক আগমন ঘটতে পারে।
শুধু বৃহস্পতিবারই নয়, শুক্রবারও দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি করা হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই জেলাগুলির জন্য কমলা সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর। প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়া জেলায় আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই জেলাগুলিতে মাঝেমধ্যে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিপাত এবং দমকা হাওয়া বইতে পারে।
অন্যদিকে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় আগামী সপ্তাহান্ত পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টির পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। ফলে মৎস্যজীবী, কৃষক এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কলকাতায় গত কয়েক দিন ধরেই দুপুরের পর আকাশ মেঘলা হয়ে যাচ্ছে এবং কোথাও কোথাও বৃষ্টিও হচ্ছে। বৃহস্পতিবারও শহরের বিভিন্ন অংশে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বজ্রবিদ্যুৎ এবং দমকা হাওয়ার কারণে যান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে।
নিম্নাঞ্চলগুলিতে জল জমার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে অফিস টাইমে বৃষ্টি হলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে যানজট তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রাকবর্ষার এই বৃষ্টি কৃষিক্ষেত্রে মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে জলাভাব দূর হওয়ায় কৃষকরা উপকৃত হবেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষ করে সবজি চাষ, আম, লিচু এবং অন্যান্য ফলের বাগানে ঝড়ের প্রভাব পড়তে পারে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রতি বছর বর্ষা ও প্রাকবর্ষার সময়ে বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। তাই আবহাওয়া দফতর এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে—
দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও আগামী বুধবার পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বর্ষা ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গে প্রবেশ করেছে এবং তার প্রভাবে বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত বৃষ্টি হচ্ছে।
জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারে ভারী বর্ষণের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পাহাড়ি জেলা দার্জিলিঙেও সপ্তাহান্তে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া দফতরের মতে, উত্তরবঙ্গের আটটি জেলাতেই হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নদী-নালার জলস্তর বৃদ্ধির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টির ফলে তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা-সহ একাধিক নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রশাসন ইতিমধ্যেই নদী সংলগ্ন এলাকার পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। পাহাড়ি এলাকায় পর্যটকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে ধরনের আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা বর্ষা অগ্রগতির পক্ষে অত্যন্ত অনুকূল। বঙ্গোপসাগর থেকে ক্রমাগত জলীয় বাষ্প প্রবেশ করছে এবং বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে সক্রিয় বায়ুপ্রবাহ বজায় রয়েছে।
ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দক্ষিণবঙ্গে বর্ষা প্রবেশ করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্ষা প্রবেশ করলে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে।
যদিও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে, তবুও আগামী সাত দিনে তাপমাত্রার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। দিনের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় একই থাকবে। তবে মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির কারণে গরমের অস্বস্তি কিছুটা কম অনুভূত হতে পারে।
আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সময়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বজ্রপাত, ঝোড়ো হাওয়া এবং ভারী বৃষ্টির কারণে নানা ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তাই আবহাওয়া দফতরের সতর্কবার্তা মেনে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া ঝড়ের সময়ে বাইরে না বেরোনোই বুদ্ধিমানের কাজ।
সব মিলিয়ে, উত্তরবঙ্গে বর্ষার সক্রিয়তার পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গেও প্রাকবর্ষার বৃষ্টির দাপট ক্রমশ বাড়ছে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সতর্কতা জারি হয়েছে। তিন জেলায় লাল সতর্কতা এবং বহু জেলায় কমলা সতর্কতা পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করে দিচ্ছে। আগামী কয়েক দিন রাজ্যজুড়ে আবহাওয়ার এই অস্থির পরিস্থিতি বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সতর্ক ও সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা।এদিকে আবহাওয়াবিদদের মতে, দক্ষিণবঙ্গে বর্তমানে যে বিক্ষিপ্ত ঝড়-বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত বর্ষা আগমনের পূর্বাভাস বহন করছে। বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প প্রবেশ করায় মেঘের সঞ্চার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দিনের বেলায় গরম ও আর্দ্রতার অস্বস্তি থাকলেও বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দিন এই প্রবণতা বজায় থাকবে। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাতেও স্থানীয়ভাবে প্রবল বৃষ্টি হতে পারে। ঝড়ো হাওয়ার কারণে গাছ উপড়ে পড়া, বিদ্যুৎ পরিষেবায় বিঘ্ন এবং যান চলাচলে সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আবহাওয়ার সর্বশেষ আপডেটের দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।