টিফিন খুললেই মন ভাল! ছোট থেকে বড়, সকলের পছন্দের সুস্বাদু পদ বানিয়ে নিন অল্প সময়েই।
সকাল হলেই বাড়িতে শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা। কারও স্কুলের তাড়া, কারও আবার অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি। এর মধ্যেই সবচেয়ে বড় চিন্তা, টিফিনে কী দেওয়া হবে? বিশেষ করে বাড়িতে ছোটদের থাকলে এই চিন্তা যেন আরও বেড়ে যায়। রোজ একই রকম খাবার খেতে খেতে অনেক সময় শিশুরা টিফিন খাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কখনও টিফিন বাক্সের খাবার অর্ধেক খেয়ে ফেরত আসে, কখনও আবার একেবারেই খাওয়া হয় না। ফলে সন্তানের পুষ্টি নিয়ে চিন্তায় পড়েন অভিভাবকেরা।
শুধু ছোটদের ক্ষেত্রেই নয়, বড়দেরও টিফিন নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা প্রতিদিন অফিসে যান, তাঁদের অনেকেরই দুপুরের খাবার নিয়ে বিশেষ কোনও পরিকল্পনা থাকে না। সকালে তাড়াহুড়ো করে শুকনো রুটি, তরকারি কিংবা আগের রাতের রান্না করা খাবার টিফিন বাক্সে ভরে নেন। কিন্তু একঘেয়ে খাবার প্রতিদিন খেতে কারই বা ভাল লাগে! ফলে অনেকেই বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত রাস্তার ধারের মুখরোচক খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অথচ বাইরের খাবারে অতিরিক্ত তেল, নুন কিংবা মশলা থাকতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাবারের ক্ষেত্রে বাড়িতে তৈরি পদকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই যে তা বিস্বাদ হবে, এমন নয়। বরং সামান্য পরিকল্পনা থাকলে অল্প সময়েই তৈরি করা যায় সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং মুখরোচক নানা পদ। এমন কিছু খাবার রয়েছে, যা ছোট থেকে বড়, পরিবারের সকলেরই পছন্দ হতে পারে। সেগুলি তৈরি করাও বেশ সহজ। চাল, ডাল, পনির, চিনেবাদাম, শাকসব্জির মতো পরিচিত উপকরণ দিয়েই বানিয়ে ফেলা যায় নানা রকমের টিফিন।
বিশেষ করে পোঙ্গল, পনির র্যাপ এবং পিনাট রাইস— এই তিনটি পদ হতে পারে রোজকার টিফিনের তালিকায় নতুন সংযোজন। স্বাদে একে অপরের থেকে আলাদা হলেও তিনটি খাবারই বাড়িতে সহজে তৈরি করা যায়। চাইলে আগের দিন কিছু প্রস্তুতি সেরে রেখেও সকালে রান্নার সময় বাঁচানো সম্ভব। তা হলে জেনে নেওয়া যাক, কী ভাবে তৈরি করবেন এই তিন সুস্বাদু পদ এবং কেনই বা এগুলি টিফিনের জন্য বেছে নিতে পারেন।
প্রতিদিনের টিফিনে ভাত কিংবা রুটি খেতে খেতে যাঁরা বিরক্ত, তাঁদের জন্য পোঙ্গল হতে পারে নতুন একটি বিকল্প। দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় এই পদটি মূলত চাল ও মুগ ডাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের খিচুড়ি। তবে সাধারণ খিচুড়ির সঙ্গে পোঙ্গলের স্বাদ ও রান্নার পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ঘি, জিরে, গোলমরিচ, কারিপাতা, আদা এবং কাজুবাদামের ব্যবহারে এই খাবারে তৈরি হয় আলাদা স্বাদ ও সুগন্ধ।
পোঙ্গল নরম হওয়ায় ছোটদের খেতেও সুবিধা হয়। অন্য দিকে, চাল ও ডালের মিশ্রণ থেকে পাওয়া যায় কার্বোহাইড্রেট ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। তাই পরিমাণমতো সব্জি যোগ করে পোঙ্গলকে আরও বৈচিত্র্যময় করা যেতে পারে। যাঁরা সকালে বেশি সময় রান্না করতে পারেন না, তাঁদের জন্যও এই পদটি বেশ সুবিধাজনক। প্রেশার কুকারে রান্না করলে সময়ও তুলনামূলক কম লাগে।
পোঙ্গল তৈরি করতে খুব বেশি উপকরণের প্রয়োজন নেই। বাড়িতে থাকা কয়েকটি সাধারণ উপকরণ দিয়েই এটি বানানো যায়।
চাল: ১ কাপ
মুগ ডাল: আধ কাপ
ঘি: ১-২ টেবিল চামচ
কাজুবাদাম: ৮-১০টি
জিরে: ১ চা চামচ
গোটা গোলমরিচ: আধ চা চামচ
আদাকুচি: ১ চা চামচ
কারিপাতা: ৮-১০টি
হিং: এক চিমটি
হলুদ গুঁড়ো: সামান্য
নুন: স্বাদমতো
জল: প্রয়োজনমতো
ইচ্ছা করলে এর সঙ্গে গাজর, মটরশুঁটি কিংবা বিনসের মতো সব্জিও যোগ করতে পারেন। তবে সব্জি দেওয়ার আগে সেগুলি ছোট ছোট করে কেটে নিতে হবে, যাতে সহজে সেদ্ধ হয়ে যায়।
প্রথমে মুগ ডাল একটি শুকনো কড়াইয়ে নিয়ে হালকা আঁচে ভেজে নিন। ডাল থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোলে এবং সামান্য রং বদলালে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। খুব বেশি ভাজবেন না। বেশি ভাজলে ডালের স্বাদ বদলে যেতে পারে।
এর পর চাল ও ভাজা মুগ ডাল ভাল করে ধুয়ে নিন। একটি প্রেশার কুকারে চাল, ডাল, প্রয়োজনমতো জল, সামান্য হলুদ ও নুন দিয়ে দিন। পোঙ্গল সাধারণত নরম ও মাখোমাখো হয়। তাই সাধারণ ভাতের তুলনায় কিছুটা বেশি জল ব্যবহার করতে হবে। কুকারের ঢাকনা বন্ধ করে মাঝারি আঁচে রান্না করুন। চাল ও ডাল ভাল করে সেদ্ধ হয়ে গেলে আঁচ বন্ধ করে দিন। কুকারের চাপ সম্পূর্ণ বেরিয়ে গেলে ঢাকনা খুলুন।
এ বার অন্য একটি কড়াইয়ে ঘি গরম করুন। ঘি গরম হয়ে এলে তাতে কাজুবাদাম দিয়ে হালকা সোনালি করে ভেজে নিন। এর পর একে একে জিরে, গোটা গোলমরিচ, হিং, আদাকুচি ও কারিপাতা দিয়ে দিন। সমস্ত উপকরণ হালকা ভাজা হলে আঁচ বন্ধ করে দিন। এই ফোড়নটি সেদ্ধ চাল ও ডালের মিশ্রণে ঢেলে ভাল করে মিশিয়ে নিন।
প্রয়োজন হলে সামান্য গরম জল দিয়ে পোঙ্গলের ঘনত্ব ঠিক করে নিতে পারেন। সব উপকরণ ভাল করে মিশে গেলে তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু পোঙ্গল। টিফিনে দেওয়ার আগে কিছুটা ঠান্ডা করে বায়ুরোধী বাক্সে ভরে নিন।
পোঙ্গলের অন্যতম সুবিধা হল, এটি তৈরি করতে খুব বেশি সময় লাগে না। চাল ও ডাল একসঙ্গে রান্না হওয়ায় আলাদা করে একাধিক পদ তৈরির প্রয়োজন নেই। মুগ ডালে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন রয়েছে এবং চাল শরীরে শক্তির জোগান দেয়। ঘি ও বাদাম খাবারে স্বাদ বাড়ায়। তবে ঘি ও বাদামের পরিমাণ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
ছোটদের জন্য পোঙ্গল তৈরি করলে গোলমরিচ ও লঙ্কার পরিমাণ কমিয়ে দিন। খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী খাবারের ঘনত্ব ও উপকরণ বেছে নেওয়া জরুরি। বড়দের জন্য চাইলে সামান্য সব্জি যোগ করে পোঙ্গলকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে পারেন।
পোঙ্গলের সঙ্গে নারকেলের চাটনি কিংবা সাধারণ দই পরিবেশন করা যায়। তবে অফিস বা স্কুলের টিফিনে দই রাখলে তা দীর্ঘক্ষণ গরমে ফেলে রাখা উচিত নয়। খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখার ব্যবস্থা থাকলে তবেই দই সঙ্গে নেওয়া ভাল।
বাড়িতে রুটি তৈরি হলে অনেক সময় তা পরের দিনের টিফিনেও চলে যায়। কিন্তু প্রতিদিন একই রকম রুটি ও তরকারি খেতে ভাল লাগে না অনেকেরই। বিশেষ করে ছোটদের ক্ষেত্রে রুটির প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে রুটিকে একটু অন্য ভাবে পরিবেশন করলে খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। পনির র্যাপ তেমনই একটি পদ।
পনির র্যাপ বানাতে খুব বেশি উপকরণের প্রয়োজন নেই। রুটি, পনির, টক দই এবং কয়েকটি সাধারণ মশলা দিয়েই তৈরি করা যায় এই খাবার। পনিরে প্রোটিন ও ক্যালশিয়াম থাকে। অন্য দিকে, রুটিতে থাকে কার্বোহাইড্রেট। সঙ্গে শসা, পেঁয়াজ কিংবা অন্যান্য সব্জি যোগ করলে খাবারে বৈচিত্র্য আসে। ফলে এটি স্কুলের টিফিন কিংবা অফিসের লাঞ্চবক্স, দুইয়ের জন্যই একটি বিকল্প হতে পারে।
পনির: ২০০ গ্রাম
রুটি: ৩-৪টি
টক দই: ৩ টেবিল চামচ
বেসন: ১ টেবিল চামচ
আদা-রসুন বাটা: ১ চা চামচ
হলুদ গুঁড়ো: আধ চা চামচ
কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো: ১ চা চামচ
কসৌরি মেথি: আধ চা চামচ
নুন: স্বাদমতো
পেঁয়াজ: ১টি
শসা: ১টি
ধনেপাতার চাটনি: প্রয়োজনমতো
ঘি বা তেল: প্রয়োজনমতো
ইচ্ছা করলে র্যাপে গাজর, ক্যাপসিকাম কিংবা লেটুস পাতাও ব্যবহার করতে পারেন। এতে খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্য বাড়বে।
প্রথমে পনির মাঝারি মাপের লম্বা টুকরো করে কেটে নিন। এ বার একটি পাত্রে জল ঝরানো টক দই, শুকনো কড়াইয়ে হালকা ভাজা বেসন, আদা-রসুন বাটা, হলুদ গুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, কসৌরি মেথি ও নুন একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। সমস্ত উপকরণ ভাল করে মিশিয়ে একটি মসৃণ মিশ্রণ তৈরি করুন।
এই মিশ্রণের মধ্যে পনিরের টুকরোগুলি দিয়ে ভাল করে মাখিয়ে নিন। পনিরে মশলা ভাল করে মাখানোর পর অন্তত ১৫ মিনিট রেখে দিন। এতে পনিরের গায়ে মশলার স্বাদ ভাল ভাবে মিশে যাবে।
এর পর একটি ননস্টিক প্যান কিংবা সাধারণ কড়াই গরম করুন। সামান্য তেল বা ঘি দিয়ে মশলা মাখানো পনিরের টুকরোগুলি অল্প আঁচে সেঁকে নিন। পনিরের দু'দিক হালকা সোনালি হয়ে এলে নামিয়ে রাখুন। পনির বেশি ক্ষণ ভাজবেন না। তা হলে শক্ত হয়ে যেতে পারে।
এ বার রুটি তৈরি করে নিন। আগে থেকে তৈরি রুটি থাকলে সেটিও ব্যবহার করতে পারেন। একটি তাওয়ায় রুটি হালকা গরম করে তাতে সামান্য ঘি মাখিয়ে নিন। এর উপর ধনেপাতার চাটনি ছড়িয়ে দিন। তার পর একে একে সেঁকা পনির, পেঁয়াজকুচি ও শসাকুচি সাজিয়ে দিন। চাইলে সামান্য লেবুর রসও ছড়িয়ে দিতে পারেন।
এ বার রুটির দু'পাশ ভাঁজ করে রোলের মতো মুড়ে নিন। প্রয়োজনে টুথপিকের সাহায্যে র্যাপটি আটকে রাখতে পারেন। তবে শিশুদের টিফিনে দেওয়ার আগে টুথপিক অবশ্যই সরিয়ে ফেলবেন। র্যাপটি মাঝখান থেকে কেটে দিলে খেতে আরও সুবিধা হবে।
পনির র্যাপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এটি হাতে ধরে সহজে খাওয়া যায়। ফলে স্কুলের টিফিনে কিংবা অফিসে কাজের ফাঁকে খাওয়ার জন্য সুবিধাজনক। আলাদা করে তরকারি কিংবা অন্য কোনও পদ নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। রুটির মধ্যে পনির ও সব্জি থাকায় একসঙ্গে একাধিক উপকরণ খাওয়া যায়।
পনিরে থাকা প্রোটিন শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পেশি রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্য দিকে, শসা, পেঁয়াজ ও অন্যান্য সব্জি থেকে পাওয়া যায় বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার। তবে খাবারের পুষ্টিগুণ নির্ভর করে ব্যবহৃত উপকরণ ও পরিমাণের উপর।
শিশুদের জন্য পনির র্যাপ তৈরি করলে ঝাল মশলার পরিমাণ কমিয়ে দিন। পেঁয়াজ বা শসা পছন্দ না হলে তার পরিবর্তে গাজর, ক্যাপসিকাম কিংবা অন্য কোনও পছন্দের সব্জি ব্যবহার করা যায়। ধনেপাতার চাটনির বদলে অল্প টক দইয়ের সসও ব্যবহার করতে পারেন।
অফিসের জন্য পনির র্যাপ বানালে একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। পনির ও দইয়ের মতো উপকরণ দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে রাখা ঠিক নয়। তাই টিফিনে পনির র্যাপ নিয়ে গেলে ইনসুলেটেড লাঞ্চ ব্যাগ ও আইস প্যাক ব্যবহার করা যেতে পারে। খাওয়ার আগে খাবারটি ভাল অবস্থায় রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার।
ভাত খেতে ভালবাসেন, অথচ রোজকার একঘেয়ে ভাত-তরকারি খেতে খেতে বিরক্ত? তা হলে টিফিনের তালিকায় রাখতে পারেন পিনাট রাইস। দক্ষিণ ভারতীয় রান্নায় চিনেবাদাম দিয়ে তৈরি ভাতের নানা রকম পদ জনপ্রিয়। সহজ উপকরণে তৈরি এই খাবারটি স্বাদে যেমন আলাদা, তেমনই টিফিনের জন্যও সুবিধাজনক।
পিনাট রাইস তৈরি করতে সাধারণত আগে থেকে রান্না করা ভাত ব্যবহার করা যায়। ফলে সকালে নতুন করে ভাত রান্না করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে আগের দিনের ভাত ব্যবহার করলে তা সঠিক ভাবে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা জরুরি। রান্না করা ভাত দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চিনেবাদামে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, ফাইবার ও অসম্পৃক্ত ফ্যাট রয়েছে। অন্য দিকে, ভাত শরীরে শক্তির জোগান দেয়। সব মিলিয়ে পরিমাণ ও উপকরণের দিকে নজর রেখে পিনাট রাইসকে টিফিনের তালিকায় রাখা যেতে পারে।
রান্না করা ভাত: ২ কাপ
চিনেবাদাম: আধ কাপ
পেঁয়াজ: ১টি
টম্যাটো: ১টি
কাঁচালঙ্কা: ১-২টি
সর্ষে: আধ চা চামচ
কারিপাতা: ৮-১০টি
ধনেগুঁড়ো: আধ চা চামচ
জিরেগুঁড়ো: আধ চা চামচ
নুন: স্বাদমতো
তেল: ১-২ টেবিল চামচ
ইচ্ছা করলে সামান্য হলুদ গুঁড়ো, লেবুর রস কিংবা ধনেপাতাও ব্যবহার করতে পারেন। আরও বেশি সব্জি খেতে চাইলে গাজর, বিনস ও ক্যাপসিকাপ যোগ করা যায়।
প্রথমে রান্না করা ভাত ঝরঝরে করে নিন। ভাত যেন অতিরিক্ত নরম বা মাখোমাখো না হয়, সে দিকে খেয়াল রাখুন। এ বার একটি কড়াইয়ে তেল গরম করুন। তেল গরম হলে তাতে সর্ষে দিয়ে ফোড়ন দিন। সর্ষে ফুটতে শুরু করলে কারিপাতা ও কাঁচালঙ্কা যোগ করুন।
এর পর চিনেবাদাম দিয়ে মাঝারি আঁচে ভাজুন। বাদামগুলি হালকা সোনালি হয়ে এলে কড়াই থেকে তুলে আলাদা করে রাখতে পারেন। তবে চাইলে কড়াইয়েই রেখে পরের ধাপের রান্না করতে পারেন।
এ বার কড়াইয়ে পেঁয়াজকুচি দিয়ে হালকা ভেজে নিন। পেঁয়াজ নরম হয়ে এলে টম্যাটোকুচি যোগ করুন। তার পর স্বাদমতো নুন, ধনেগুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো ও সামান্য হলুদ দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিন। মশলা থেকে কাঁচা গন্ধ চলে গেলে এবং টম্যাটো নরম হয়ে এলে ভাত দিয়ে দিন।
ভাতের সঙ্গে মশলা ভাল করে মিশিয়ে নিন। এ বার আগে থেকে ভেজে রাখা চিনেবাদাম দিয়ে আরও একবার নাড়াচাড়া করুন। সব উপকরণ ভাল করে মিশে গেলে আঁচ বন্ধ করে দিন। চাইলে উপর থেকে সামান্য লেবুর রস ও ধনেপাতা ছড়িয়ে দিতে পারেন। তৈরি হয়ে গেল সুস্বাদু পিনাট রাইস।
পিনাট রাইসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এটি তৈরি করতে খুব বেশি সময় লাগে না। আগে থেকে ভাত রান্না করা থাকলে সকালে অল্প সময়েই এই পদটি বানানো যায়। ভাতের সঙ্গে চিনেবাদাম ও মশলার মিশ্রণে তৈরি হয় আলাদা স্বাদ। ফলে সাধারণ ভাতের তুলনায় এটি অনেকের কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।
চিনেবাদামে থাকা প্রোটিন ও ফাইবারের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাট। তবে চিনেবাদামে ক্যালরির পরিমাণও বেশি। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বাদামের পরিমাণ ঠিক করা উচিত। যাঁদের চিনেবাদামে অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের এই খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি।
ছোটদের জন্য পিনাট রাইস তৈরি করলে ঝাল মশলা কম ব্যবহার করুন। বয়স অনুযায়ী চিনেবাদাম ছোট করে কুচিয়ে দিতে পারেন। তবে খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে গোটা বাদাম শ্বাসনালিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বয়স ও খাওয়ার সক্ষমতা অনুযায়ী বাদামের ব্যবহার করা উচিত।
অফিসের টিফিনে পিনাট রাইস নেওয়ার ক্ষেত্রেও খাবার সংরক্ষণের দিকে নজর দিতে হবে। রান্না করা ভাত দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখা উচিত। টিফিনে নিয়ে যাওয়ার সময় দীর্ঘক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় ফেলে না রেখে নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
স্কুল কিংবা অফিসের টিফিন তৈরি করার সময় শুধু স্বাদের দিকে নজর দিলেই হবে না। খাবারটি কতটা পুষ্টিকর, কতক্ষণ ভাল থাকবে এবং সহজে খাওয়া যাবে কি না, সে দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
১. প্রতিদিন একই খাবার না দেওয়াই ভাল
একই খাবার বারবার খেতে হলে ছোটদের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হতে পারে। বড়দের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। তাই টিফিনের তালিকায় বৈচিত্র্য রাখা জরুরি। এক দিন পোঙ্গল, অন্য দিন পনির র্যাপ, আবার অন্য কোনও দিন পিনাট রাইস রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া সব্জির পরোটা, ডালিয়া, সব্জি দিয়ে তৈরি উপমা কিংবা বাড়িতে তৈরি স্যান্ডউইচও রাখা যায়।
২. খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য রাখুন
টিফিনে শুধু পেট ভরানোর মতো খাবার রাখলেই হবে না। খাবারে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজের যথাযথ ভারসাম্য থাকা দরকার। চাল, রুটি কিংবা অন্য শস্য থেকে কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যায়। ডাল, পনির ও বাদাম থেকে মেলে প্রোটিন। পাশাপাশি মরসুমি সব্জি ও ফলও খাবারের তালিকায় রাখা যেতে পারে।
৩. অতিরিক্ত তেল ও নুন এড়িয়ে চলুন
খাবারের স্বাদ বাড়াতে অনেক সময় অতিরিক্ত তেল, নুন ও মশলা ব্যবহার করা হয়। তবে প্রতিদিনের খাবারে এগুলির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা ভাল। পোঙ্গলে বেশি ঘি না দিয়ে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যায়। পনির র্যাপ বানানোর সময়ও অতিরিক্ত তেলে পনির ভাজার প্রয়োজন নেই। পিনাট রাইসের ক্ষেত্রেও অল্প তেল ব্যবহার করে সুস্বাদু খাবার তৈরি করা সম্ভব।
৪. আগের দিন কিছু প্রস্তুতি সেরে রাখুন
সকালে সময় বাঁচাতে আগের দিন কিছু কাজ করে রাখা যেতে পারে। যেমন পনির কেটে রাখা, সব্জি ধুয়ে কুচিয়ে রাখা কিংবা প্রয়োজনীয় মশলা এক জায়গায় গুছিয়ে রাখা। তবে কাটা সব্জি ও পনির অবশ্যই ফ্রিজে ঢেকে রাখতে হবে। রান্না করা ভাতও দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত।
৫. টিফিন বাক্স পরিষ্কার রাখুন
খাবার রাখার পাত্র পরিষ্কার ও শুকনো হওয়া জরুরি। খাবার গরম অবস্থায় পাত্রে ভরে দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখার বদলে খাবারের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত সংরক্ষণ পদ্ধতি বেছে নিতে হবে। বিশেষ করে পনির, দই ও রান্না করা ভাতের মতো খাবারের ক্ষেত্রে নিরাপদ তাপমাত্রা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. শিশুদের পছন্দের দিকেও নজর দিন
শিশুদের জন্য খাবার তৈরি করার সময় তাদের পছন্দ-অপছন্দের কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন। খুব বেশি ঝাল কিংবা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার অনেক শিশুই পছন্দ করে না। তাই টিফিনে নতুন কোনও পদ দেওয়ার আগে বাড়িতে এক বার তৈরি করে খাইয়ে দেখতে পারেন। তাতে শিশুর পছন্দ বুঝতে সুবিধা হবে।
প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে টিফিন তৈরি করা অনেকের কাছেই বাড়তি কাজ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সামান্য পরিকল্পনা থাকলে এই কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। রোজ একই খাবার না দিয়ে পরিচিত উপকরণ দিয়েই তৈরি করা যায় নানা রকমের সুস্বাদু পদ। পোঙ্গল, পনির র্যাপ ও পিনাট রাইস তেমনই তিনটি বিকল্প।
পোঙ্গল যাঁরা নরম ও মশলাদার খাবার পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য উপযুক্ত হতে পারে। পনির র্যাপ তাঁদের জন্য, যাঁরা হাতে ধরে সহজে খাওয়া যায় এমন খাবার পছন্দ করেন। অন্য দিকে, যাঁরা ভাত খেতে ভালবাসেন, তাঁদের টিফিনে নতুন স্বাদ আনতে পারে পিনাট রাইস।
তবে এই তিনটি খাবারই প্রতিদিন খেতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। বয়স, শারীরিক চাহিদা, খাদ্যাভ্যাস ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী টিফিনের তালিকা তৈরি করাই ভাল। যাঁদের বিশেষ কোনও খাদ্যসংক্রান্ত সমস্যা বা অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের উপকরণ বেছে নেওয়ার সময় সতর্ক থাকা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, টিফিন যেন শুধু পেট ভরানোর জন্য না হয়। খাবার সুস্বাদু হলে খাওয়ার আগ্রহও বাড়তে পারে। তাই বাড়ির ছোট সদস্য থেকে শুরু করে অফিসে যাওয়া বড়রা— সকলের জন্যই টিফিনে একটু নতুনত্ব আনা যেতে পারে। পরিচিত উপকরণ, সহজ রান্নার পদ্ধতি এবং সামান্য পরিকল্পনাতেই রোজকার টিফিন হয়ে উঠতে পারে আরও আকর্ষণীয়।