সকালে ওষুধ খেতে ভুলে গিয়ে রাতে একসঙ্গে ডবল ডোজ নেওয়া শরীরের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। অতিরিক্ত ওষুধের কারণে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ওষুধ খাওয়ার নিয়ম মেনে চলুন এবং ডোজ মিস হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ কিংবা ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খেতে ভুলে যান মানুষ। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার জন্য নিয়মিত ওষুধ খান, তাঁদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন বাদ পড়া ওষুধের ডোজ পূরণ করতে গিয়ে কেউ একসঙ্গে দুটি ডোজ খেয়ে ফেলেন। অনেকের ধারণা, সকালে ওষুধ না খেলে রাতে দুটি ট্যাবলেট খেয়ে নিলেই দিনের হিসাব মিটে যাবে। চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া ওষুধের ডোজ দ্বিগুণ করলে শরীরে একাধিক গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ, ডায়াবিটিসের নির্দিষ্ট ওষুধ, ইনসুলিন এবং রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধকারী ওষুধের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রতিটি ওষুধের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা, কার্যকারিতার সময় এবং শরীরে কাজ করার পদ্ধতি রয়েছে। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগের প্রকৃতি এবং অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করেই চিকিৎসকেরা ডোজ নির্ধারণ করেন।
কোনও ওষুধ দিনে একবার, কোনওটি দুবার আবার কোনওটি একাধিকবার খেতে হয়। এর কারণ, সব ওষুধ শরীরে সমান সময় ধরে কাজ করে না।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ রুদ্রজিৎ পাল এই সময় অনলাইনকে জানিয়েছেন, অনেক ওষুধের কার্যকারিতার সময় প্রায় ১২ ঘণ্টা। ফলে নির্ধারিত সময়ে ওষুধ না খেয়ে পরে একসঙ্গে দুটি ডোজ নিলে আগের সময়ের ঘাটতি পূরণ হয় না। বরং একই সময়ে শরীরে ওষুধের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অর্থাৎ, একসঙ্গে দুটি ট্যাবলেট খেলেই যে ওষুধের প্রভাব দ্বিগুণ সময় ধরে থাকবে, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশারের সমস্যায় ভুগছেন এমন বহু মানুষ প্রতিদিন নিয়মিত ওষুধ খান। এই ওষুধের মূল উদ্দেশ্য রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
কিন্তু নির্ধারিত মাত্রার বেশি ওষুধ খেলে কিছু ক্ষেত্রে রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে হাইপোটেনশন বলা হয়।
এই পরিস্থিতিতে মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বুক ধড়ফড় কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি এবং যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডোজের পরিণতি আরও জটিল হতে পারে।
তাই ভুল করে রক্তচাপের ওষুধ বেশি খেয়ে ফেললে নিজে থেকে পরবর্তী ডোজ পরিবর্তন না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ডায়াবিটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধের সঠিক মাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কিছু ডায়াবিটিসের ওষুধ এবং ইনসুলিন সরাসরি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
নির্ধারিত মাত্রার বেশি ওষুধ খেলে রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় হাইপোগ্লাইসেমিয়া।
এর সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ঘাম, হাত-পা কাঁপা, হঠাৎ খিদে পাওয়া, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং বুক ধড়ফড় করা।
পরিস্থিতি গুরুতর হলে বিভ্রান্তি, খিঁচুনি এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
তবে সব ডায়াবিটিসের ওষুধের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সমান নয়। কোন ওষুধ খাওয়া হচ্ছে এবং কতটা অতিরিক্ত ডোজ নেওয়া হয়েছে, তার উপর বিপদের মাত্রা নির্ভর করে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ভুল করে ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ বেশি নেওয়া হলে দ্রুত চিকিৎসা-পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণও জরুরি।
হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি রয়েছে এমন রোগীদের অনেক সময় অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট বা রক্ত জমাট প্রতিরোধকারী ওষুধ দেওয়া হয়। সাধারণভাবে এগুলিকে ব্লাড থিনার বলা হয়।
এই ধরনের ওষুধের কাজ রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ গ্রহণ করলে রক্তপাতের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, প্রস্রাবে রক্ত দেখা, কালো পায়খানা, অস্বাভাবিক ক্ষতচিহ্ন তৈরি হওয়া কিংবা শরীরের অভ্যন্তরে রক্তপাতের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের লক্ষণ প্রথমদিকে স্পষ্ট নাও হতে পারে। তাই ব্লাড থিনার অতিরিক্ত খেয়ে ফেললে কোনও উপসর্গ না থাকলেও দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
শরীরে প্রবেশ করার পর বিভিন্ন ওষুধের বিপাক এবং নিষ্কাশনের সঙ্গে লিভার ও কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোনও কোনও ওষুধ মাত্রাতিরিক্ত গ্রহণ করলে বিষক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে আগে থেকেই লিভার বা কিডনির অসুখ থাকলে কিছু ওষুধ শরীরে জমে গিয়ে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে একটি অতিরিক্ত ট্যাবলেট খেলেই সব ক্ষেত্রে লিভার বা কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমন নয়। বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ওষুধের ধরন, মাত্রা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার উপর।
এ কারণেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডোজ বাড়ানো বা কমানো উচিত নয়।
অনেকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সকালে ওষুধ খেতে ভুলে গেলে সন্ধ্যায় কী করা উচিত?
এ ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কোনও ওষুধ নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে মনে পড়লে খাওয়া যায়। আবার কোনও ওষুধের ক্ষেত্রে পরবর্তী ডোজের সময় কাছাকাছি চলে এলে বাদ পড়া ডোজ এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশ থাকে।
ডাঃ রুদ্রজিৎ পালের সাধারণ পরামর্শ, ভুলে যাওয়া ডোজ পূরণ করতে একসঙ্গে অতিরিক্ত ওষুধ না খেয়ে নিয়মিত সময়সূচি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নির্দিষ্ট ওষুধের ক্ষেত্রে কী করতে হবে, তা জানতে প্যাকেটের নির্দেশিকা পড়া এবং চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
বিশেষ করে ইনসুলিন, খিঁচুনির ওষুধ, ব্লাড থিনার, পারকিনসনসের ওষুধ কিংবা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর ব্যবহৃত ওষুধের ডোজ বাদ পড়লে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে ডোজ বাদ দেওয়া বা পরিবর্তন করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ভুলবশত দুটি ডোজ একসঙ্গে খেয়ে ফেললে প্রথমেই কোন ওষুধ কতটা খাওয়া হয়েছে এবং কখন খাওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ওষুধের প্যাকেট বা প্রেসক্রিপশন সঙ্গে রেখে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা উচিত।
যদি শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, প্রচণ্ড মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক রক্তপাত কিংবা তীব্র দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বমি করানোর চেষ্টা করা কিংবা অন্য ওষুধ খেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
ওষুধ খাওয়ার সময় ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে মোবাইল অ্যালার্ম সেট করে রাখা যেতে পারে। স্মার্টফোনের মেডিসিন রিমাইন্ডার অ্যাপও ব্যবহার করা যায়।
এ ছাড়া চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্তাহিক পিল অর্গানাইজার ব্যবহার করলে কোন দিনের ওষুধ খাওয়া হয়েছে, তা বুঝতে সুবিধা হয়।
বাড়িতে বয়স্ক সদস্য থাকলে তাঁদের ওষুধের একটি লিখিত তালিকা রাখা এবং নিয়মিত খোঁজ নেওয়াও উপকারী হতে পারে।
একাধিক ওষুধ খেতে হলে কোনটি সকালে, কোনটি দুপুরে এবং কোনটি রাতে খেতে হবে, তা স্পষ্টভাবে লিখে রাখা উচিত।
ওষুধ খেতে ভুলে যাওয়া একটি সাধারণ ঘটনা হলেও সেই ভুল সংশোধন করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছায় ডাবল ডোজ নেওয়া কখনও নিরাপদ অভ্যাস নয়।
কোনও কোনও ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রা সাময়িক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, আবার কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের ডোজ বাদ পড়লেও শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই ওষুধের নাম, নির্ধারিত ডোজ এবং রোগীর চিকিৎসা পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
মনে রাখবেন, ওষুধের হিসাব মেলানোর চেয়ে নিরাপদ চিকিৎসা বজায় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ডোজ বাদ পড়লে কিংবা ভুল করে অতিরিক্ত ওষুধ খেয়ে ফেললে চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলুন।
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সতর্কতা: এই প্রতিবেদন সাধারণ সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি কোনও ব্যক্তিগত চিকিৎসা নির্দেশ বা প্রেসক্রিপশনের বিকল্প নয়।