২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোট রাজ্যে। সে দিন ভোট এই কলকাতা জুড়ে। এই মুহূর্তের মুখ্য আলোচনা, ভোটের দিন কি শুটিং চলবে টেলিপাড়ায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার ডট কম।মাসে এক দিন ছুটি। দিনে ১৪ ঘণ্টা শুটিং। এই হল ছোটপর্দার কাজের ধরন। কখনও কখনও ব্যাঙ্কিং বা পর্ব মজুত করার জন্য ‘ডবল ইউনিট’ কাজও করতে হয়। তথাকথিত চাকরিতে যাকে ‘ওভারটাইম’ বলে, সেটাই ধারাবাহিকের শিল্পীদের কাছে ‘ডবল ইউনিট’। সহজে শিল্পীরা শুটিং থেকে ছুটি পান না। ২৯ এপ্রিল এই শহরে ভোটের দিন কি ছুটি পাচ্ছেন তাঁরা? না কি ভোট দিয়েই ছুটতে হবে শুটিংয়ে?
অভিনেতা সাহেব ভট্টাচার্য জানালেন, ২৯ এপ্রিল তাঁদের ছুটি থাকবে। ইতিমধ্যেই সে কথা জানানো হয়েছে। তবে বাড়তি কাজ করতে হবে কি না সেই সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। সাহেবকে এই মুহূর্তে দর্শক দেখছে ‘গঙ্গা’ ধারাবাহিকে। সাধারণত, এক দিন ছুটির জন্য অনেক সময় ‘ডবল ইউনিট’-এর প্রয়োজন পড়ে না, বক্তব্য টেলিপাড়ার এক কার্যনির্বাহী প্রযোজকের।এই প্রসঙ্গে পরিচালক অনুপম হরি বললেন, “কোনও ধারাবাহিক সাত দিন সম্প্রচারিত হলে তখন এক দিন ছুটি হলে ডবল ইউনিটের প্রয়োজন পড়লেও পড়তে পারে। আমি এই মুহূর্তে যে ধারাবাহিকের পরিচালনা করছি, পরিকল্পনা করছি ব্যাঙ্কিংয়ের জন্য যদি একটু বেশি করে তুলে নেওয়া যায়। তবে ১৪ ঘণ্টার বেশি কাজ করা হবে না। এমনকি, ভোটের আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবারেও তাড়াতাড়ি প্যাকআপ করার চেষ্টা করব।” এই মুহূর্তে ‘শুধু তোমারই জন্য’ ধারাবাহিক পরিচালনা করছেন। খুব বেশি দিন হয়নি শুরু হয়েছে এই কাহিনি। তাই শুটিংয়ের চাপ তো আছেই।জোয়ার ভাঁটা’ ধারাবাহিকেও একই বিষয়। নায়িকা আরাত্রিকা মাইতি জানালেন, ভোট মানেই উৎসব। ছুটি দেওয়া হবে বলেই তিনি জানেন। ‘মিলন হবে কত দিন’-এ ধারাবাহিকের সেটে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সেখানেও ছুটি। অভিনেত্রী অলিভিয়া সরকার বলেছেন, “ছুটি আছে বলে বাড়তি কোনও চাপ নেই। যেমন রোজ শুটিং হয়, সে ভাবেই হচ্ছে। খালি কিছু আউটডোর শুটিং হওয়ার কথা ছিল, সেটা হল না। অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে। তাই চিত্রনাট্যে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। এমনিতে ব্যাঙ্কিং রয়েছে।”জোয়ার ভাঁটা’ ধারাবাহিকেও একই বিষয়। নায়িকা আরাত্রিকা মাইতি জানালেন, ভোট মানেই উৎসব। ছুটি দেওয়া হবে বলেই তিনি জানেন। ‘মিলন হবে কত দিন’-এ ধারাবাহিকের সেটে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সেখানেও ছুটি। অভিনেত্রী অলিভিয়া সরকার বলেছেন, “ছুটি আছে বলে বাড়তি কোনও চাপ নেই। যেমন রোজ শুটিং হয়, সে ভাবেই হচ্ছে। খালি কিছু আউটডোর শুটিং হওয়ার কথা ছিল, সেটা হল না। অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে। তাই চিত্রনাট্যে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। এমনিতে ব্যাঙ্কিং রয়েছে।”
টেলিভিশন ধারাবাহিকের জগৎ বরাবরই ব্যস্ততা, সময়সীমা আর নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের উপর দাঁড়িয়ে। প্রতিদিনের নির্দিষ্ট সময়ে দর্শকের ঘরে পৌঁছে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ পরিকল্পনা, শুটিং, সম্পাদনা এবং সম্প্রচারের কাজ চলে, তা অনেকেই কল্পনাও করতে পারেন না। তার মধ্যেই যখন কোনও বিশেষ দিন—বিশেষত ভোটের মতো গণতান্ত্রিক উৎসব—এসে পড়ে, তখন এই ব্যস্ততার মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য বজায় রাখা হয়, তা জানার আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।
‘জোয়ার ভাঁটা’ ধারাবাহিকের নায়িকা আরাত্রিকা মাইতি এই প্রসঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেন, “ভোট মানেই উৎসব।” তাঁর এই বক্তব্যে একদিকে যেমন দায়িত্ববোধের প্রতিফলন রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে একটি সাংস্কৃতিক অনুভূতি। বাংলায় ভোট কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি অনেকের কাছে সামাজিক অংশগ্রহণের দিন, উৎসবের মতোই এক আবহ। সেই কারণে শুটিং ইউনিটের পক্ষ থেকেও সাধারণত এই দিনটিতে ছুটি দেওয়া হয়, যাতে শিল্পী ও কলাকুশলীরা নিজেদের নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
আরাত্রিকার মতে, “ছুটি দেওয়া হবে বলেই আমি জানি।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে এই প্রথা অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ, ভোটের দিন শুটিং বন্ধ রাখা বা অন্তত কমিয়ে আনা এখন প্রায় নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। এতে করে শিল্পীদের মধ্যে একধরনের নিশ্চিন্ততা তৈরি হয়—তারা জানেন, কাজের চাপ থাকলেও এই বিশেষ দিনে তাঁদের ব্যক্তিগত সময় এবং দায়িত্বকে সম্মান জানানো হবে।
অন্যদিকে, ‘মিলন হবে কত দিন’ ধারাবাহিকের সেটেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানেও ভোটের দিনে ছুটি রাখা হয়েছে। এই বিষয়ে অভিনেত্রী অলিভিয়া সরকার তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “ছুটি আছে বলে বাড়তি কোনও চাপ নেই। যেমন রোজ শুটিং হয়, সে ভাবেই হচ্ছে।” তাঁর কথায় বোঝা যায়, ছুটি থাকলেও তার আগের বা পরের দিনগুলিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা হচ্ছে না। বরং পুরো কাজটাই একটি স্বাভাবিক ছন্দে চলছে।
তবে এই স্বাভাবিকতার আড়ালেও রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ। অলিভিয়া জানিয়েছেন, “কিছু আউটডোর শুটিং হওয়ার কথা ছিল, সেটা হল না। অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে।” ভোটের সময় নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কারণে অনেক জায়গায় শুটিংয়ের অনুমতি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বাইরে লোকেশন শুটের ক্ষেত্রে পুলিশের অনুমতি, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে জটিলতা বাড়ে।
ফলে প্রযোজনা সংস্থাগুলিকে তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। চিত্রনাট্যে পরিবর্তন আনা হয়, শুটিং পরিকল্পনায় বদল করা হয়, যাতে ধারাবাহিকের সম্প্রচারে কোনও প্রভাব না পড়ে। অলিভিয়া বলেন, “তাই চিত্রনাট্যে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে।” এই পরিবর্তন অনেক সময় গল্পের গতিপথেও প্রভাব ফেলে, তবে অভিজ্ঞ লেখক এবং পরিচালকরা সেই পরিবর্তনকে এমনভাবে সামলান, যাতে দর্শক খুব একটা পার্থক্য বুঝতে না পারেন।
এই পরিস্থিতিতে ‘ব্যাঙ্কিং’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অলিভিয়ার কথায়, “এমনিতে ব্যাঙ্কিং রয়েছে।” টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যাঙ্কিং বলতে বোঝায় আগে থেকে কিছু এপিসোড শুট করে রাখা, যাতে কোনও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে সম্প্রচার বন্ধ না হয়ে যায়। ভোট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিল্পীদের অসুস্থতা—এই ধরনের নানা পরিস্থিতির জন্যই ব্যাঙ্কিং একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে।
ব্যাঙ্কিংয়ের জন্য সাধারণত টিমকে অতিরিক্ত সময় দিতে হয়। অনেক সময় এক দিনে একাধিক এপিসোডের কাজ এগিয়ে রাখা হয়। এতে করে ভবিষ্যতের জন্য একটি সুরক্ষা তৈরি হয়। তবে এরও একটি সীমা রয়েছে। কারণ অতিরিক্ত কাজের চাপ শিল্পী এবং কলাকুশলীদের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই ব্যাঙ্কিং এবং দৈনন্দিন কাজের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ভোটের সময় শুটিং বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল মানবিক কারণেই নয়, বাস্তবিক কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় অনেক রাস্তা বন্ধ থাকে, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়, নিরাপত্তা জোরদার থাকে। ফলে শুটিং ইউনিটের চলাচল, যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া, লোকেশন সেটআপ—সবকিছুতেই সমস্যা দেখা দেয়। তাই অনেক প্রযোজকই আগেভাগে পরিকল্পনা করে রাখেন, যাতে এই দিনগুলিতে কাজ কম রাখা যায়।
তবে এই সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় শক্তি হল তাদের অভিযোজন ক্ষমতা। পরিস্থিতি যেমনই হোক, তারা নিজেদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেয়। কখনও ইনডোর শুটিং বাড়ানো হয়, কখনও গল্পের ধারা সাময়িকভাবে পরিবর্তন করা হয়, কখনও আবার সম্পূর্ণ নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
শিল্পীদের ক্ষেত্রেও এই সময়টা কিছুটা ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। প্রতিদিনের ব্যস্ত শুটিং সূচির মধ্যে হঠাৎ করে একটি ছুটির দিন পাওয়া তাঁদের জন্য স্বস্তির। অনেকেই এই সময়টা পরিবারের সঙ্গে কাটান, কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিগত কাজ সারেন, আবার কেউ কেউ বিশ্রাম নেন। একই সঙ্গে ভোট দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন।
এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—শিল্পীদের সামাজিক ভূমিকা। তাঁরা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নন, সমাজের একটি প্রভাবশালী অংশ। তাঁদের বক্তব্য, আচরণ, সিদ্ধান্ত অনেক সময় সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব ফেলে। তাই যখন তাঁরা বলেন “ভোট মানেই উৎসব” বা ভোট দেওয়ার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন, তা অনেক দর্শকের কাছেই একটি বার্তা হয়ে পৌঁছায়।
এছাড়াও, এই সময় সোশ্যাল মিডিয়াতেও শিল্পীরা সক্রিয় থাকেন। অনেকেই নিজেদের ভোট দেওয়ার ছবি বা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যা অন্যদেরও উৎসাহিত করে। ফলে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালন করা হয়, অন্যদিকে সমাজের প্রতি একটি ইতিবাচক বার্তাও দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভোটের সময় টেলিভিশন ধারাবাহিকের শুটিং একটি ভিন্ন রূপ নেয়। কাজ থেমে থাকে না, কিন্তু তার গতি এবং ধরন কিছুটা বদলে যায়। পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে এই সময়টাকে সামলানো হয়।
‘জোয়ার ভাঁটা’ এবং ‘মিলন হবে কত দিন’-এর মতো ধারাবাহিকগুলির উদাহরণ থেকে স্পষ্ট, ইন্ডাস্ট্রি এখন অনেক বেশি সংগঠিত এবং সচেতন। তারা জানে কীভাবে একটি বড় সামাজিক ঘটনার সঙ্গে নিজেদের কাজকে সামঞ্জস্য করতে হয়। শিল্পী থেকে শুরু করে পরিচালক, প্রযোজক—সকলেই এই প্রক্রিয়ার অংশ।
শেষ পর্যন্ত, এই পুরো বিষয়টির মধ্যে একটি বড় বার্তা লুকিয়ে রয়েছে—দায়িত্ব এবং পেশার মধ্যে ভারসাম্য। একদিকে যেমন নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে নাগরিক হিসেবে নিজের কর্তব্য পালন। এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ, এবং টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি তা সফলভাবেই করে চলেছে।
ভোটের দিন তাই কেবল একটি ছুটি নয়, এটি একটি উপলক্ষ—নিজের দায়িত্ব পালনের, নিজের অধিকার প্রয়োগের, এবং একই সঙ্গে নিজের পেশার প্রতি সম্মান বজায় রাখার। আর এই ভারসাম্যই প্রমাণ করে, টেলিভিশনের পর্দার আড়ালে থাকা মানুষগুলো কেবল শিল্পী নন, তাঁরা সমাজের সচেতন নাগরিকও।