Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

লিভার সিরোসিসের নীরব বিপদ ঘরের চেনা ওষুধই কি বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

লিভারের অসুখ অনেক সময়ই আমাদের দৈনন্দিন বদ অভ্যাস ও অসচেতনতার ফল। শিশুদের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই সঠিক জীবনশৈলীর শিক্ষা দিলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বড়দেরও উচিত লিভার সুস্থ রাখতে খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ সেবন ও জীবনযাপনে সচেতন হওয়া। লিভার ভালো রাখতে কী করবেন ও কী এড়াবেন জানুন প্রয়োজনীয় পরামর্শ।

লিভার সিরোসিসের নীরব বিপদ ঘরের চেনা ওষুধই কি বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
স্বাস্থ্য ও জীবনধারা

আধুনিক জীবনের দ্রুত গতি, অনিয়মিত জীবনযাপন আর অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস—এই তিনের মেলবন্ধনেই নীরবে শরীরে বাসা বাঁধছে একের পর এক জটিল রোগ। তার মধ্যে অন্যতম এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সমস্যাগুলির একটি হল লিভারের অসুখ। ফ্যাটি লিভার থেকে শুরু করে লিভার সিরোসিস—এই রোগগুলি আজ আর কেবল বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অল্প বয়সেই বহু মানুষ এই সমস্যার শিকার হচ্ছেন, এমনকি শিশুদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে লিভার সংক্রান্ত জটিলতা।

চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লিভারের অসুখের পিছনে রয়েছে আমাদেরই কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, বদ অভ্যাস এবং অসচেতন জীবনযাপন। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চার অভাব, অতিরিক্ত মদ্যপান, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ সেবন—এই সবকিছু মিলেই ধীরে ধীরে ক্ষতি করে লিভারের।

লিভার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিভার মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শরীরের ডানদিকে পাঁজরের নীচে অবস্থিত এই অঙ্গটি আমাদের দেহে প্রায় ৫০০-রও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে। খাবার হজম করা, রক্ত পরিষ্কার রাখা, বিষাক্ত পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেওয়া, ওষুধের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা, চর্বি ও শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখা—সবই লিভারের দায়িত্ব।

কিন্তু সমস্যা হল, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনও উপসর্গ দেখা যায় না। তাই অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের লিভার ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। যখন উপসর্গ প্রকাশ পায়, তখন অনেক সময়ই রোগ অনেকটা এগিয়ে যায়।

বদ অভ্যাস থেকেই রোগের শুরু

বর্তমান প্রজন্মের দৈনন্দিন জীবনে বাইরের খাবার, প্যাকেটজাত খাদ্য, ভাজাভুজি, রেড মিট ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। এই সমস্ত খাবারে থাকা ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি লিভারে চর্বি জমার প্রধান কারণ। এর ফলেই তৈরি হয় ফ্যাটি লিভার, যা পরবর্তী সময়ে সিরোসিসের দিকে এগোতে পারে।

শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, শরীরচর্চার অভাবও লিভারের ক্ষতির বড় কারণ। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে কাজ করা, হাঁটাহাঁটি না করা এবং অলস জীবনযাপন লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

শিশুদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সচেতনতা

লিভারের অসুখ শুধু বড়দের নয়, শিশুদের ক্ষেত্রেও এখন একটি বড় চিন্তার বিষয়। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুরা জাঙ্ক ফুডে অভ্যস্ত হয়, খেলাধুলোর বদলে মোবাইল বা স্ক্রিনে বেশি সময় কাটায়, তা হলে ভবিষ্যতে তাদের লিভার সংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।

চিকিৎসকদের মতে, বাবা-মায়েরা যদি ছোটবেলা থেকেই শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার ও সঠিক জীবনশৈলীতে অভ্যস্ত করেন, তা হলে ভবিষ্যতে বহু জটিল রোগ এড়ানো সম্ভব।

চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শ

সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে লিভার সুস্থ রাখার জন্য ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, “আমাদের দেশে লিভারের সমস্যার কারণে বহু মানুষ অসুস্থ হন, এমনকি অনেকের প্রাণও চলে যায়। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে মাত্র পাঁচটি বিষয়ে সচেতন হলেই এক বছরের মধ্যেই লিভারের সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।”

১) ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

লিভার সুস্থ রাখতে হলে সবার আগে প্রয়োজন ওজন নিয়ন্ত্রণ। অতিরিক্ত ওজন মানেই লিভারের উপর অতিরিক্ত চাপ। শরীরে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাটের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাইরের খাবারের বদলে ঘরের খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

চিকিৎসকের মতে, উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজন জানা খুব সহজ। নিজের উচ্চতা সেন্টিমিটারে মেপে তার থেকে ১০০ বাদ দিলেই আনুমানিক আদর্শ ওজন জানা যায়।

২) রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন

ডায়াবেটিস এবং লিভারের অসুখ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ে। তাই HbA1c যেন ৬.৪-এর বেশি না হয়, সে দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

news image
আরও খবর

৩) নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করুন

দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা লিভারের জন্য অত্যন্ত উপকারী। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে শরীরে চর্বি জমে এবং লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যায়। নিয়মিত হাঁটাহাঁটি রক্ত সঞ্চালন ভালো রাখে এবং লিভারের কর্মক্ষমতা বাড়ায়।

৪) টক্সিক ওষুধ থেকে দূরে থাকুন

সামান্য ব্যথা বা জ্বর হলেই অনেকেই নিজে নিজে ওষুধ খেতে শুরু করেন। কিন্তু কিছু ব্যথানাশক ও কোলেস্টেরলের ওষুধ লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে প্যারাসিটামল—খুব সাধারণ ওষুধ হলেও ডোজ়ের বাইরে গেলে তা লিভারের জন্য ভয়ঙ্কর হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।

৫) মদ্যপান সম্পূর্ণ বন্ধ করুন

লিভারের সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর শত্রু হল অ্যালকোহল। দেশি হোক বা বিদেশি—যে কোনও ধরনের অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ই লিভারের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অনেকেই মনে করেন, অল্প পরিমাণে মদ্যপান করলে তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সামান্য পরিমাণেও নিয়মিত মদ্যপান করলে ধীরে ধীরে লিভারের কোষ নষ্ট হতে শুরু করে।

নিয়মিত অ্যালকোহল গ্রহণের ফলে প্রথমে লিভারে প্রদাহ তৈরি হয়। এরপর সেখানে অতিরিক্ত চর্বি জমতে থাকে, যা ফ্যাটি লিভারের কারণ। সময়ের সঙ্গে এই ফ্যাটি লিভার আরও জটিল রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত লিভার সিরোসিসের মতো মারণরোগে পরিণত হতে পারে। সিরোসিস এমন এক পর্যায়, যেখানে লিভারের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল, লিভারের ক্ষতি শুরু হলেও দীর্ঘ সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের লিভার ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে। যখন উপসর্গ প্রকাশ পায়—যেমন দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, পেট ফুলে যাওয়া, চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া—ততদিনে রোগ অনেকটাই এগিয়ে যায়।

চিকিৎসকদের মতে, লিভার সুস্থ রাখতে চাইলে মদ্যপান সম্পূর্ণ বন্ধ করাই একমাত্র নিরাপদ ও কার্যকর পথ। ‘মডারেট ড্রিঙ্কিং’ বা ‘কন্ট্রোল করে খাওয়া’—এই ধারণাগুলি লিভারের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর। কারণ লিভার কোনও পরিমাণ অ্যালকোহলকেই নিরাপদ হিসেবে গ্রহণ করে না। বিশেষ করে যাঁদের ইতিমধ্যেই ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা লিভার সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে মদ্যপান আরও দ্রুত পরিস্থিতি খারাপ করে দিতে পারে।

সচেতন জীবনযাপনই সুস্থ লিভারের চাবিকাঠি

লিভার মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলেও দুঃখের বিষয় হল, এই অঙ্গটি অসুস্থ হলেও অনেক সময়ই তা নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। লিভারের অসুখের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনও স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে বেশির ভাগ মানুষ সমস্যাটিকে গুরুত্ব দেন না বা বুঝতেই পারেন না যে শরীরের ভিতরে ধীরে ধীরে একটি জটিল রোগ বাসা বাঁধছে। তাই শুধুমাত্র উপসর্গের উপর নির্ভর না করে আগেভাগেই সতর্ক হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা লিভার সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT), রক্তে শর্করার মাত্রা এবং শরীরের ওজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। অনেক সময় দেখা যায়, রক্তে শর্করার মাত্রা বা ওজন বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লিভারে চর্বি জমতে শুরু করে, যা ভবিষ্যতে ফ্যাটি লিভার কিংবা সিরোসিসের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তাই এই সূচকগুলি নিয়ন্ত্রণে রাখলে লিভারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

শুধু পরীক্ষা করালেই হবে না, দৈনন্দিন জীবনযাপনেও আনতে হবে সচেতন পরিবর্তন। সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা লিভার সুস্থ রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। বাইরের ভাজাভুজি, প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। এই ধরনের খাবারে থাকা ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত ক্যালোরি লিভারে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ায়। তার বদলে ঘরের স্বাস্থ্যকর খাবার, শাকসবজি, ফল, পর্যাপ্ত জল এবং সুষম আহার লিভারের জন্য অনেক বেশি উপকারী।

এর পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা শরীরচর্চা লিভারের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা বা শারীরিক পরিশ্রম না করার ফলে শরীরে চর্বি জমে এবং তা লিভারের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম করলে রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে এবং লিভার স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস, খেলাধুলা ও সক্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত করা যায়, তা হলে ভবিষ্যতে লিভারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বাবা-মায়েদের উচিত শিশুদের অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড ও স্ক্রিন নির্ভরতা থেকে দূরে রাখা।

চিকিৎসকদের একবাক্যে মত, আজ যদি আমরা সচেতন হই এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনি, তা হলে আগামী দিনে বহু বড় বিপদ সহজেই এড়ানো সম্ভব। লিভারের যত্ন মানেই আসলে গোটা শরীরের যত্ন। সুস্থ লিভার মানেই সুস্থ শরীর—এই সত্য মাথায় রেখেই এখন থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

Preview image