Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বিশ্ব হার্ট দিবসে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে মেনে চলুন এই নিয়মগুলি

কম বয়সিদের মধ্যেও বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি, তাই সুস্থ হৃদযন্ত্রের জন্য সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি।

বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হৃদরোগের সমস্যা ক্রমশই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একটা সময় মনে করা হতো, মূলত পঞ্চাশ বা ষাট বছর বয়সের পরেই হার্টের অসুখের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এখন কম বয়সি মানুষদের মধ্যেও হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক এমনকী কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মতো গুরুতর সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আচমকা হার্টের গতি থেমে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব হার্ট দিবসে তাই হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ উদয় শঙ্কর দাসের বক্তব্য, কম বয়সিদের মধ্যে হৃদরোগের সমস্যা এখন আর বিরল ঘটনা নয়। তাঁর মতে, জরুরি বিভাগে প্রায় প্রতিদিনই ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সি রোগীরা বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়বে—এমন ধারণার পাশাপাশি এখন কম বয়স থেকেই হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

কেন কম বয়সেই বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কম বয়সে হৃদরোগের পিছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হল বংশগত প্রবণতা। পরিবারের কারও অল্প বয়সে হৃদরোগ হয়ে থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে কম বয়স থেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এর পাশাপাশি আধুনিক জীবনযাত্রাও হৃদরোগের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, নিয়মিত ব্যায়াম না করা এবং অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলত্ব শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দিনের একটা বড় সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্যান্য স্ক্রিনের সামনে বসে কাটানোর ফলে শারীরিক সক্রিয়তা কমছে। তার সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস যুক্ত হলে হৃদযন্ত্রের উপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহারও হৃদরোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। নিয়মিত তামাক সেবন রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একইভাবে মদ্যপানের অভ্যাস, অতিরিক্ত নুন ও তেলযুক্ত খাবার এবং নিয়মিত ফাস্ট ফুড খাওয়ার অভ্যাসও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

অনির্ণীত অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়াও হৃদস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘুমের সময় বারবার শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা তৈরি হলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রায় পরিবর্তন হতে পারে এবং এর সঙ্গে রক্তচাপসহ বিভিন্ন কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি জড়িয়ে থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিন নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতাকেও অবহেলা নয়

কম বয়সিদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও এখন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গ না থাকায় মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তাঁর রক্তচাপ বেড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর উপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই বয়স কম হলেও নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলত্বের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলসহ একাধিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই কারণগুলি একসঙ্গে কাজ করলে হৃদরোগের আশঙ্কাও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রার এই কারণগুলি একত্রে হৃদযন্ত্রের ধমনীর মধ্যে প্লাক তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। সময়ের আগেই ধমনীগুলি শক্ত হয়ে যেতে পারে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এর ফলেই গুরুতর হৃদরোগের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মানসিক চাপও হতে পারে হৃদযন্ত্রের উপর বাড়তি বোঝা

বর্তমান সময়ে কাজের চাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা, আর্থিক উদ্বেগ এবং বিভিন্ন সামাজিক কারণে বহু মানুষ দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে ভুগছেন। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের স্ট্রেসকেও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

ফর্টিস হাসপাতাল আনন্দপুরের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর ডাঃ শুভানন রায় জানিয়েছেন, সব বয়সেই হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়াতে পারে। এর প্রভাব হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপের উপর পড়তে পারে।

শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে ঘুমের অভ্যাস, শারীরিক কার্যকলাপ, খাবারের ধরন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ মানসিক চাপ সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শরীরের পাশাপাশি মনের যত্ন নেওয়াও জরুরি।

কোন উপসর্গ দেখলে সতর্ক হবেন?

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্ভাব্য সতর্কতামূলক লক্ষণগুলি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা থাকা দরকার।

হঠাৎ বুকে চাপ ধরা বা বুকের মধ্যে ভারী কিছু চেপে বসে থাকার মতো অনুভূতি হলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক সময় এই ধরনের ব্যথা বা অস্বস্তি হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

news image
আরও খবর

প্রত্যেকের ক্ষেত্রে উপসর্গ একই রকম নাও হতে পারে। তাই বুকের অস্বস্তি বা উপরের মতো কোনও গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে আগে থেকে হৃদরোগের ঝুঁকি থাকলে এমন কোনও উপসর্গকে সাধারণ সমস্যা বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

জটিল হৃদরোগের চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তি

হৃদরোগের চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রযুক্তিও ক্রমশ উন্নত হচ্ছে। সম্প্রতি বিএম বিড়লা হার্ট হাসপাতালে এক জটিল হৃদরোগীর সফল চিকিৎসা হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

উত্তর ২৪ পরগনার ৬২ বছর বয়সি ওই মহিলা দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর হৃদরোগ এবং বারবার অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের সমস্যায় ভুগছিলেন। হৃদপেশির জটিলতার কারণে তাঁর বারবার হার্ট ফেলিওরের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল এবং একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল।

তাঁর শরীরে এআইসিডি বা বিশেষ ধরনের হার্ট ডিভাইস থাকা সত্ত্বেও অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছিল না। এরপর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও ইলেকট্রোফিজিওলজিস্ট ডাঃ রাকেশ সরকার পালস ফিল্ড অ্যাবলেশন নামে অত্যাধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসা করেন। হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, এই পদ্ধতিতে সফলভাবে রোগীর সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে হৃদরোগের চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধের উপরেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

কীভাবে সুস্থ রাখা যায় হৃদযন্ত্র?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রথমেই খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিদিনের খাবারে শাকসব্জি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ বাড়ানো উচিত। অতিরিক্ত তেল ও নুন খাওয়ার অভ্যাস কমাতে হবে।

প্যাকেটজাত ও সংরক্ষিত খাবার এবং অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলা ভালো। এই ধরনের খাবারে অনেক সময় অতিরিক্ত নুন, চিনি বা অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকতে পারে। তাই যতটা সম্ভব তাজা ও সুষম খাবার বেছে নেওয়া উচিত।

ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মদ্যপানের অভ্যাস থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণ বা পরিত্যাগ করার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

শারীরিক সক্রিয়তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা বা অন্য কোনও উপযুক্ত শরীরচর্চা করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন সকালে বা বিকেলে প্রায় ৪০ মিনিট দ্রুতগতিতে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে কারও আগে থেকেই হৃদরোগ বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

স্ট্রেস কমাতে কী করবেন?

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম বা ধ্যানের মতো অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিজের পছন্দের কাজ করার জন্য কিছুটা সময় বের করা যেতে পারে। গান শোনা, বই পড়া, বাগান করা বা অন্য কোনও শখের কাজে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হৃদরোগের ঝুঁকি শুধু বেশি বয়সিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কম বয়সি হলেও পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থাকলে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব হার্ট দিবসে তাই বিশেষজ্ঞদের বার্তা একটাই—হৃদযন্ত্রের যত্ন শুরু করতে বয়স বাড়ার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপানমুক্ত জীবন, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই অভ্যাসগুলিই দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে কোনও ব্যক্তির নির্দিষ্ট হৃদরোগের ঝুঁকি বা চিকিৎসার প্রয়োজন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়া জরুরি।

Preview image