Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

চিংড়িঘাটা জট কাটতেই মেট্রোর ট্রায়াল রান! বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার, কবে শুরু হবে পরিষেবা?

গত বছরের অগস্টে বেলেঘাটা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয় নিউ গড়িয়া-বিমানবন্দর মেট্রো পরিষেবা। তবে বাকি অংশের কাজ আটকে থাকায় আইটি সেন্টার পর্যন্ত মেট্রো চলাচল শুরু হয়নি।

Orange Line Metro: বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত সফল ট্রায়াল রান, কবে চালু হবে যাত্রী পরিষেবা?

কলকাতার গণপরিবহণ ব্যবস্থায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বহু প্রতীক্ষিত অরেঞ্জ লাইন মেট্রোয় বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ভাবে রেক চালানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চিংড়িঘাটা মোড়ে কাজের জটিলতার কারণে এই মেট্রোপথের সম্প্রসারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তবে সেই বাধা কাটিয়ে অবশেষে ওই অংশে ট্রায়াল রান সম্পন্ন হওয়ায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন কলকাতার মেট্রোযাত্রীরা।

মেট্রো কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গিয়েছে, মহালয়ার দিন শনিবার নির্মাণ সংস্থা রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড (আরভিএনএল) বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ভাবে মেট্রো রেক চালায়। এই অংশে প্রথমবারের মতো ট্রায়াল রান সম্পন্ন হওয়া অরেঞ্জ লাইনের পরবর্তী পর্যায়ের কাজের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। সূত্রের খবর, পরীক্ষামূলক যাত্রা সফল হয়েছে। এর পর ওই অংশে ‘কমিউনিকেশন বেসড ট্রেন কন্ট্রোল’ বা সিবিটিসি ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

তবে ট্রায়াল রান সফল হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ যাত্রীদের জন্য পরিষেবা চালু হয়ে যাচ্ছে, এমন নয়। যাত্রী পরিষেবা শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, সিগন্যালিং ব্যবস্থার যাচাই, নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মতো বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কবি সুভাষ থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত সম্পূর্ণ অরেঞ্জ লাইন কবে চালু হবে, তা জানতে মেট্রো কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ঘোষণা এবং বাকি পরীক্ষার অগ্রগতির দিকে নজর রাখতে হবে।

অরেঞ্জ লাইনে নতুন অগ্রগতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কলকাতা মেট্রোর অরেঞ্জ লাইন নিউ গড়িয়া থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। এই করিডর চালু হলে দক্ষিণ কলকাতার নিউ গড়িয়া এলাকা, বাইপাস সংলগ্ন অঞ্চল, বেলেঘাটা এবং বিমানবন্দরমুখী যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন একটি গণপরিবহণের বিকল্প তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের সঙ্গে যুক্ত যাত্রীদের কাছে এই রুটের গুরুত্ব অনেক।

কলকাতায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসায়িক এলাকা এবং বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য বাস, অটো, ট্যাক্সি, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা অন্যান্য পরিবহণের উপর নির্ভর করেন। ব্যস্ত সময়ে রাস্তায় যানজটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রার সময় বেড়ে যায়। মেট্রো পরিষেবা সম্প্রসারিত হলে নির্দিষ্ট রুটে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সময়ের অনিশ্চয়তা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অরেঞ্জ লাইনের বাকি অংশের কাজ সম্পন্ন হওয়া এবং পর্যায়ক্রমে পরিষেবা চালু হওয়া তাই শুধু একটি নতুন মেট্রোপথ চালুর বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শহরের পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি, যানজটের উপর চাপ কমানোর সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ করার পরিকল্পনা।

চিংড়িঘাটা মোড়ে কী কারণে আটকে ছিল মেট্রোর কাজ?

অরেঞ্জ লাইনের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল চিংড়িঘাটা মোড়। ওই এলাকায় মেট্রোর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যস্ত বাইপাস অঞ্চলে যান চলাচল বন্ধ রাখা বা তার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা সহজ ছিল না। ফলে নির্মাণকাজ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের মধ্যে সমন্বয় করা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়।

চিংড়িঘাটা কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। ইএম বাইপাসের এই অংশ দিয়ে প্রতিদিন বহু বাস, গাড়ি, পণ্যবাহী যান এবং অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই মোড়ের ভূমিকা রয়েছে। ফলে এখানে দীর্ঘ সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ রাখা হলে সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে অফিসযাত্রী এবং ব্যবসায়িক পরিবহণ—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

মেট্রোর কাজের জন্য যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন রাজ্য সরকার এবং মেট্রো কর্তৃপক্ষের মধ্যে একাধিকবার মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এই জটিলতার কারণে অরেঞ্জ লাইনের নির্দিষ্ট অংশের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে বেলেঘাটা পর্যন্ত মেট্রো চলাচল শুরু হলেও পরবর্তী অংশের কাজ এবং পরিষেবা সম্প্রসারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় ছিল।

পরবর্তী সময়ে চিংড়িঘাটা এলাকার কাজের জটিলতা কাটে এবং নির্মাণকাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ভাবে রেক চালানো সম্ভব হয়েছে বলে মেট্রো সূত্রে জানা গিয়েছে।

বেলেঘাটা পর্যন্ত আগে থেকেই চলছিল মেট্রো

নিউ গড়িয়া থেকে বিমানবন্দরমুখী অরেঞ্জ লাইনের একটি অংশ আগেই যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের অগস্টে নিউ গড়িয়া-বিমানবন্দর মেট্রোপথ বেলেঘাটা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। সেই সময় ইএম বাইপাসের মেট্রোপলিটন মোড়ের আগে বেলেঘাটা স্টেশন চালু করা হয়েছিল।

তবে বেলেঘাটা পর্যন্ত পরিষেবা চালু হলেও গোটা রুটের কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। বিশেষ করে চিংড়িঘাটা সংলগ্ন অংশের জটিলতার কারণে পরবর্তী অংশে নির্মাণ এবং পরিষেবা সম্প্রসারণ নিয়ে অপেক্ষা চলছিল। ফলে অরেঞ্জ লাইনের বাকি অংশের যাত্রীরা কবে মেট্রো পরিষেবা পাবেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল।

এ বার বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত ট্রায়াল রান হওয়ায় সেই অপেক্ষার ক্ষেত্রে নতুন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। পরীক্ষামূলক ভাবে রেক চালানো মেট্রোপথের কার্যকারিতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে তার পরেও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।

কী এই ট্রায়াল রান এবং কেন করা হয়?

কোনও নতুন মেট্রোপথ চালু করার আগে ট্রায়াল রান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষায় নির্দিষ্ট রুটে মেট্রো রেক চালিয়ে লাইন, ট্র্যাক, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সিগন্যালিং এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। প্রকল্পের পর্যায় এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে পরীক্ষার ধরন ও পরিধি আলাদা হতে পারে।

ট্রায়াল রানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা বুঝতে পারেন, নির্দিষ্ট অংশে রেক চলাচলের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না। ট্র্যাকের অবস্থা, রেকের চলাচল, বিভিন্ন ব্যবস্থার পারস্পরিক সমন্বয় এবং নির্ধারিত প্রযুক্তিগত শর্তগুলি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

নতুন মেট্রোপথের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যাত্রী পরিষেবা শুরু হলে প্রতিদিন বহু মানুষ ওই ব্যবস্থার উপর নির্ভর করবেন। তাই সাধারণ যাত্রীদের জন্য লাইন খুলে দেওয়ার আগে পরিকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলি যথাযথ ভাবে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করা দরকার।

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত ট্রায়াল রান সফল হওয়ার খবর তাই অরেঞ্জ লাইনের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য ইতিবাচক। তবে একটি সফল পরীক্ষামূলক যাত্রার পরেও আরও পরীক্ষা বা অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে। সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরই যাত্রী পরিষেবা চালুর বিষয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

কী এই CBTC সিগন্যালিং ব্যবস্থা?

অরেঞ্জ লাইনের এই অংশে ট্রায়াল রানের পর ‘কমিউনিকেশন বেসড ট্রেন কন্ট্রোল’ বা সিবিটিসি ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার কথা জানা গিয়েছে। আধুনিক মেট্রো ব্যবস্থায় সিবিটিসি একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ও সিগন্যালিং প্রযুক্তি।

এই ব্যবস্থায় ট্রেন এবং নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামোর মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রেনের অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত বিন্যাস অনুযায়ী ট্রেনের গতিবিধি, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সিবিটিসি ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে রয়েছে নিরাপদ ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা এবং মেট্রোর পরিচালন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। তবে বাস্তবে এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করবে, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট লাইনের নকশা, ব্যবহৃত সরঞ্জাম, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থার উপর।

অরেঞ্জ লাইনে সিবিটিসির পরীক্ষা শুরু হলে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাগুলি সঠিক ভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে। ট্রেনের চলাচল এবং সিগন্যালিং ব্যবস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করা যাত্রী পরিষেবা চালুর প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখানে মনে রাখা দরকার, সিবিটিসি পরীক্ষা শুরু হওয়া এবং যাত্রী পরিষেবা চালু হওয়া এক বিষয় নয়। পরীক্ষার ফলাফল, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পরই পরিষেবা চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

অরেঞ্জ লাইন চালু হলে যাত্রীদের কী সুবিধা হতে পারে?

অরেঞ্জ লাইন সম্পূর্ণ ভাবে চালু হলে কলকাতার গণপরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন সংযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কলকাতা, ইএম বাইপাস সংলগ্ন অঞ্চল এবং বিমানবন্দরমুখী যাতায়াতের ক্ষেত্রে মেট্রো পরিষেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে।

প্রথমত, নির্দিষ্ট মেট্রোপথে যাতায়াতের সময় আরও পরিকল্পিত ভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে। রাস্তায় যানজটের কারণে বাস বা গাড়ির যাত্রার সময় অনেক সময় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মেট্রো পরিষেবা ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট সময়সূচির ভিত্তিতে যাত্রা পরিকল্পনা করার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, অফিসযাত্রীদের জন্য নতুন যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ইএম বাইপাস সংলগ্ন বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র, বাণিজ্যিক এলাকা এবং তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মেট্রো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষের জন্য একাধিক পরিবহণের বিকল্প থাকা সুবিধাজনক।

news image
আরও খবর

তৃতীয়ত, বিমানবন্দরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অরেঞ্জ লাইনের সম্পূর্ণ পরিষেবা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিমান ধরতে যাওয়া যাত্রীদের ক্ষেত্রে সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছনো অত্যন্ত জরুরি। উপযুক্ত সংযোগ এবং পরিষেবা চালু হলে গণপরিবহণের মাধ্যমে বিমানবন্দরে যাওয়ার সুযোগ আরও বাড়তে পারে। তবে নির্দিষ্ট যাত্রাপথ, সংযোগ এবং সময়ের সুবিধা পরিষেবা চালুর পর বাস্তব পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে।

চতুর্থত, সড়কপথের উপর চাপ কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। আরও বেশি মানুষ মেট্রো ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট কিছু রুটে ব্যক্তিগত গাড়ি বা অন্যান্য সড়ক পরিবহণের উপর নির্ভরতা কমতে পারে। যদিও যানজটের উপর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে পরিষেবার পরিধি, যাত্রীসংখ্যা এবং অন্যান্য গণপরিবহণের সঙ্গে সংযোগের উপর।

পঞ্চমত, শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের বিকল্প বাড়লে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ব্যবসা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের জন্য যাতায়াতের পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে। তবে এসব সুবিধা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে অরেঞ্জ লাইনের সম্পূর্ণ পরিষেবা চালু হওয়া এবং তার সঙ্গে অন্যান্য পরিবহণ ব্যবস্থার সমন্বয়ের উপর।

কবি সুভাষ থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর—কবে চালু হবে সম্পূর্ণ রুট?

অরেঞ্জ লাইনের বিষয়ে যাত্রীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও একটাই—কবি সুভাষ থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত সম্পূর্ণ মেট্রো পরিষেবা কবে চালু হবে?

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত সফল ট্রায়াল রান সেই লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অংশে রেক চালানো সম্ভব হওয়ায় প্রকল্পের পরবর্তী ধাপের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ রুট চালুর নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে মেট্রো কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রয়োজন।

কারণ, কোনও একটি অংশে পরীক্ষামূলক ভাবে মেট্রো চালানো মানেই পুরো রুটে পরিষেবা চালুর জন্য সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে, এমন নয়। বাকি অংশের কাজ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাচাই এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া নতুন মেট্রোপথে পরিষেবা চালুর সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তাই শুধু ট্রায়াল রান সফল হওয়ার খবরের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দিন বা মাস ধরে নেওয়া উচিত নয়।

যাত্রীদের জন্য আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অরেঞ্জ লাইনের বেলেঘাটা-আইটি সেন্টার অংশে পরীক্ষামূলক যাত্রা সম্পন্ন হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে সিবিটিসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে মেট্রো কর্তৃপক্ষের ঘোষণা সামনে এলে পরিষেবা চালুর সম্ভাব্য সময় আরও স্পষ্ট হতে পারে।

আরভিএনএলের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

অরেঞ্জ লাইনের নির্মাণকাজে রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড বা আরভিএনএল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মেট্রো পরিকাঠামো নির্মাণ, সংশ্লিষ্ট কাজের বাস্তবায়ন এবং প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নির্মাণ সংস্থার ভূমিকা থাকে।

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত ট্রায়াল রান আরভিএনএলের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার খবর থেকে বোঝা যায়, ওই অংশে নির্মাণ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে পরিষেবা চালুর আগে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা যাচাইও প্রয়োজন।

মেট্রো প্রকল্পের মতো বড় পরিকাঠামোগত কাজে একাধিক সংস্থা এবং কর্তৃপক্ষের সমন্বয় জরুরি। নির্মাণ সংস্থা, মেট্রো পরিচালন কর্তৃপক্ষ, সিগন্যালিং প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত সংস্থা এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষকে নিজেদের নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে হয়।

এই সমন্বিত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরই নতুন অংশে নিয়মিত যাত্রী পরিষেবা চালুর পথ তৈরি হয়।

কলকাতার পরিবহণ ব্যবস্থায় অরেঞ্জ লাইনের ভবিষ্যৎ গুরুত্ব

কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গণপরিবহণের উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন কর্মস্থল, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, বাজার এবং বিমানবন্দরে যাতায়াতের জন্য বহু মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে নতুন মেট্রোপথ চালু হলে শহরের যোগাযোগব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।

অরেঞ্জ লাইন সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। নিউ গড়িয়া থেকে বিমানবন্দরমুখী যোগাযোগের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শহরের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যাতায়াতের নতুন বিকল্প তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইএম বাইপাস সংলগ্ন এলাকার মানুষের জন্য এই রুটের গুরুত্ব রয়েছে।

তবে নতুন মেট্রোপথের সম্পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে স্টেশনগুলির সঙ্গে বাস, অটো, অন্যান্য মেট্রো রুট এবং প্রয়োজনীয় পরিবহণ পরিষেবার সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রীরা সহজে স্টেশনে পৌঁছতে পারলে এবং সেখান থেকে গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে মেট্রো ব্যবহারের সুবিধা বাড়তে পারে।

অরেঞ্জ লাইনের সম্প্রসারণ তাই শুধু ট্র্যাক নির্মাণ বা স্টেশন চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শহরের সামগ্রিক গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলার সম্ভাবনা।

এখন কোন বিষয়গুলির দিকে নজর থাকবে?

বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত ট্রায়াল রান সম্পন্ন হওয়ার পর অরেঞ্জ লাইনের পরবর্তী অগ্রগতি বুঝতে কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর রাখা জরুরি।

প্রথমত, সিবিটিসি সিগন্যালিং ব্যবস্থার পরীক্ষা কবে শুরু হচ্ছে এবং সেই পরীক্ষার ফলাফল কী হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, ওই অংশে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের অগ্রগতি জানতে হবে। তৃতীয়ত, পরিষেবা চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি নজরে রাখতে হবে।

এর পাশাপাশি অরেঞ্জ লাইনের বাকি অংশের কাজ এবং সম্পূর্ণ রুটের পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা সম্পর্কেও মেট্রো কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এই সমস্ত ধাপ সম্পন্ন হলে তবেই যাত্রীদের জন্য পরিষেবা চালুর বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সময়সূচি জানা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে

চিংড়িঘাটা মোড়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার কারণে আটকে থাকা অরেঞ্জ লাইন মেট্রোর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বেলেঘাটা থেকে আইটি সেন্টার পর্যন্ত সফল ট্রায়াল রান একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। মহালয়ার দিন আরভিএনএলের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক ভাবে রেক চালানো হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে সিবিটিসি ব্যবস্থার পরীক্ষা শুরু করার কথা জানা গিয়েছে।

গত বছরের অগস্টে বেলেঘাটা পর্যন্ত পরিষেবা সম্প্রসারিত হওয়ার পর ওই লাইনের পরবর্তী অংশের জন্য অপেক্ষা চলছিল। চিংড়িঘাটা এলাকার কাজের জটিলতা কাটার পর এখন প্রকল্পের অগ্রগতি নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।

তবে কবি সুভাষ থেকে জয় হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত সম্পূর্ণ অরেঞ্জ লাইন কবে চালু হবে, তার নির্দিষ্ট তারিখ এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে নিশ্চিত না হলে কোনও সময়সীমাকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ট্রায়াল রান, সিবিটিসি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই যাত্রী পরিষেবা চালুর বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

কলকাতার মেট্রোযাত্রীদের এখন নজর পরবর্তী পরীক্ষার অগ্রগতি এবং মেট্রো কর্তৃপক্ষের ঘোষণার দিকে। সেই ঘোষণা সামনে এলেই বোঝা যাবে, বহু প্রতীক্ষিত অরেঞ্জ লাইনের বাকি অংশে সাধারণ যাত্রীদের জন্য পরিষেবা শুরু হতে আর কতটা সময় লাগবে।

 

Preview image