Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নাটক, ক্ষোভ আর গোল—এএফকন ফাইনালের শেষ মিনিটে বাজিমাত সেনেগাল

রেফারির এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এএফকন ফাইনালে তৈরি হয় চরম নাটক। সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকার করে কিছু সময়ের জন্য মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান সেনেগালের ফুটবলারেরা, ফলে বেশ কিছু ক্ষণ বন্ধ থাকে খেলা। দর্শক থেকে শুরু করে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। তবে সমস্ত বাধা পেরিয়ে ফের খেলায় ফিরে আসে সেনেগাল। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে মরক্কোর বিরুদ্ধে নির্ণায়ক গোল করে নাটকীয় জয় ছিনিয়ে নেয় তারা, আর সেই সঙ্গেই এএফকন ফাইনালে চ্যাম্পিয়নের মুকুট ওঠে সেনেগালের মাথায়।

আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস ফাইনাল যেন রীতিমতো রোমাঞ্চকর নাটকের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। সেনেগাল বনাম মরক্কো ম্যাচে এমন কিছু মুহূর্ত দেখা গেল, যা দীর্ঘদিন মনে রাখবেন ফুটবলপ্রেমীরা। গোল বাতিল, পেনাল্টি বিতর্ক, খেলোয়াড়দের ওয়াক আউট, ম্যাচ বন্ধ থাকা এবং শেষ মুহূর্তের দুর্ধর্ষ গোলে চ্যাম্পিয়নের নিষ্পত্তি—সব মিলিয়ে অ্যাফকন ফাইনাল হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই। শেষ পর্যন্ত সমস্ত নাটক ও বিতর্ক ছাপিয়ে দ্বিতীয় বারের জন্য আফ্রিকা সেরার মুকুট জিতে নেয় সেনেগাল।

নির্ধারিত নব্বই মিনিটে দুই দলই আক্রমণ পালটা আক্রমণ চালালেও কেউ গোলের দেখা পায়নি। মরক্কোর সংগঠিত রক্ষণ ও সেনেগালের গতিময় আক্রমণের দ্বন্দ্বে ম্যাচ জমে উঠেছিল। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই নাটকের সূচনা। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই কর্নার থেকে হেডে বল জালে পাঠান সেনেগালের এক ফুটবলার। গ্যালারিতে উল্লাস শুরু হলেও মুহূর্তের মধ্যেই সেই আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। রেফারি গোল বাতিল করে দেন। তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গোলের আগে মরক্কোর এক ফুটবলারকে ফাউল করা হয়েছিল। ফলে সেনেগাল শিবিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

এর পরের মিনিটেই আবার বড় সিদ্ধান্ত নেন রেফারি। সেনেগালের বক্সের ভিতরে মরক্কোর তারকা ফুটবলার ব্রাহিম দিয়াজ় ফাউলের শিকার হন বলে রায় দেন তিনি এবং মরক্কোর পক্ষে পেনাল্টি ঘোষণা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন সেনেগালের ফুটবলারেরা। তাঁরা মনে করেন, ফাউলের সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। রেফারি তখন ভার প্রযুক্তির সাহায্য নেন। ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত যাচাই করলেও শেষ পর্যন্ত নিজের রায় বদলাননি তিনি।

এই সিদ্ধান্তের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রেফারির সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে সেনেগালের কোচ পাপে বৌনা থিয়াও এক কঠোর পদক্ষেপ নেন। তিনি নিজের দলের সমস্ত ফুটবলারকে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসার নির্দেশ দেন। কোচের নির্দেশ মেনে সেনেগালের ফুটবলারেরা মাঠ ছাড়েন। দর্শকরা অবাক হয়ে যান, ম্যাচ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় বিশ মিনিট ধরে খেলা বন্ধ থাকে। এই সময় সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে চতুর্থ রেফারি বারবার সেনেগালের কোচকে অনুরোধ করেন দলকে মাঠে ফেরানোর জন্য। তবে শুরুতে কোনও ফল হয়নি।

শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেন সেনেগালের অধিনায়ক সাদিয়ো মানে। তাঁর হস্তক্ষেপে এবং দলের স্বার্থের কথা ভেবে সেনেগালের ফুটবলারেরা ফের মাঠে নামেন। দীর্ঘ বিরতির পর আবার শুরু হয় ম্যাচ। তখনও যে নাটক শেষ হয়নি, তা বোঝা যায় পরের মুহূর্তেই।

পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন ব্রাহিম দিয়াজ়। গোটা স্টেডিয়াম তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। দিয়াজ় পানেনকা স্টাইলে বল মারার চেষ্টা করেন, কিন্তু সেনেগালের গোলরক্ষক এডুয়ার্ড মেন্ডি ছিলেন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অসাধারণ প্রতিক্রিয়ায় বল ধরে নেন তিনি। এই সেভ নতুন করে প্রাণ ফেরায় সেনেগাল শিবিরে। মনে হচ্ছিল, ম্যাচ বুঝি টাইব্রেকারের দিকেই গড়াবে।

কিন্তু ভাগ্য তখন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের জোরাল শট নেন পাপা গুয়েই। দুরন্ত গতির সেই শট মরক্কোর গোলরক্ষকের হাত ফসকে জালে ঢুকে যায়। স্টেডিয়াম ভেঙে পড়ে উল্লাসে। ওই একটি গোলেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় সেনেগালের উৎসব। সমস্ত বিতর্ক, ক্ষোভ আর নাটক ছাপিয়ে দ্বিতীয় বারের জন্য আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস চ্যাম্পিয়ন হয় সেনেগাল। অন্য দিকে, এত কাছে এসেও শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় মরক্কোর। নাটকীয় এই ফাইনাল শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং আফ্রিকান ফুটবলের আবেগ, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রইল।                                                                                                          

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে গোটা স্টেডিয়াম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সেনেগালের উচ্ছ্বাস। খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে সমর্থক—সবার চোখেমুখেই ধরা পড়ে আবেগের বিস্ফোরণ। পেনাল্টি বিতর্ক, মাঠ ছাড়ার নাটক, দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ থাকা এবং শেষ মুহূর্তের গোল—সব কিছু পিছনে ফেলে দ্বিতীয় বারের জন্য আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসের শিরোপা জিতে নেয় সেনেগাল। অন্য দিকে, মরক্কোর শিবিরে তখন নেমে আসে হতাশা ও নীরবতা। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়েও শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় তাদের।

এই ফাইনাল শুধু একটি ট্রফির লড়াই ছিল না, ছিল আফ্রিকান ফুটবলের চরিত্রের প্রতিফলন। আবেগ, প্রতিবাদ, আত্মসম্মান এবং শেষ পর্যন্ত অদম্য লড়াই—সবই দেখা গেছে এই একটি ম্যাচে। সেনেগালের ফুটবলারেরা রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠ ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত খেলায় ফিরে এসে প্রমাণ করে দেন, তারা শুধু আবেগপ্রবণ নয়, বরং মানসিক দৃঢ়তাতেও সমান শক্তিশালী। কঠিন পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রেখে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাই তাদের চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছে।

মরক্কোর ক্ষেত্রেও এই ফাইনাল ছিল গর্বের এক অধ্যায়। শিরোপা না জিতলেও গোটা প্রতিযোগিতা জুড়ে তাদের সংগঠিত ফুটবল, ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা এবং তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মেলবন্ধন প্রশংসা কুড়িয়েছে। ফাইনালে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচে টিকে থাকা প্রমাণ করে দেয়, আফ্রিকান ফুটবলে এখন কোনও দলই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। হারলেও মরক্কো দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে তারা আরও বড় মঞ্চে নিজেদের ছাপ রাখতে প্রস্তুত।

আসলে এই নাটকীয় ফাইনাল আফ্রিকান ফুটবলের ক্রমবর্ধমান শক্তিরই প্রতীক। গত কয়েক বছরে আফ্রিকার দলগুলি বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের জায়গা আরও শক্ত করেছে। ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে মরক্কোর ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছনো গোটা মহাদেশের ফুটবলের চিত্রটাই বদলে দিয়েছিল। সেনেগাল, ঘানা, ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্টের মতো দলগুলি ধারাবাহিক ভাবে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী দলগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের কথা মাথায় রাখলে আফ্রিকার অবদান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। দল সংখ্যা বাড়ায় আফ্রিকা থেকে আরও বেশি দল সুযোগ পাবে বিশ্বকাপের মঞ্চে। এর অর্থ শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং আরও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল উপহার দেওয়ার সম্ভাবনা। সেনেগাল, মরক্কো, নাইজেরিয়া বা মিশরের মতো দলগুলি এখন আর শুধু গ্রুপ পর্ব পার করাই লক্ষ্য রাখে না, তারা তাকিয়ে থাকে শেষ ষোলো বা কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার দিকে।

news image
আরও খবর

এই প্রেক্ষাপটে অ্যাফকন ফাইনালের মতো ম্যাচগুলি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। যেখানে চাপের মুখে সিদ্ধান্ত, আবেগের বিস্ফোরণ, বিতর্কের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত ফুটবলটাই কথা বলে। সেনেগালের এই জয় যেমন তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে, তেমনই মরক্কোর এই হার হয়তো আগামী বিশ্বকাপের আগে দলটিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

সব মিলিয়ে, এই ফাইনাল ছিল শুধুমাত্র একটি ট্রফির নিষ্পত্তি নয়, বরং আফ্রিকান ফুটবলের যাত্রাপথের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। যেখানে নাটক, উত্তেজনা ও আবেগের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিও লুকিয়ে ছিল। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে আফ্রিকার দলগুলি যখন আরও বড় ভূমিকা নেবে, তখন এই ধরনের ম্যাচগুলিই প্রমাণ হিসেবে ফিরে আসবে—আফ্রিকান ফুটবল শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী নির্মাতা।                                                                                                                                                                 

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে আফ্রিকার দলগুলি যখন আরও বড় ভূমিকা নেবে, তখন এই ধরনের ম্যাচগুলিই প্রমাণ হিসেবে ফিরে আসবে—আফ্রিকান ফুটবল শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বিশ্ব ফুটবলের শক্তিশালী নির্মাতা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আফ্রিকান দলগুলির পারফরম্যান্স দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, তারা আর কোনও বড় মঞ্চে নবাগত নয়। বরং কৌশল, শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তার মেলবন্ধনে তারা বিশ্বের সেরা দলগুলিকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।

এই ধারাবাহিকতার পরবর্তী অধ্যায় হবে আগামী আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস। পরবর্তী অ্যাফকন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০২৫ সালের শেষ ভাগে থেকে ২০২৬ সালের শুরুতে। আয়োজক দেশ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে মরক্কো। আধুনিক স্টেডিয়াম, উন্নত পরিকাঠামো এবং ফুটবলপ্রেমী দর্শকের উপস্থিতিতে এই প্রতিযোগিতা যে আরও জমজমাট হতে চলেছে, তা বলাই যায়। মরক্কোর মতো দেশে অ্যাফকন আয়োজন মানে আফ্রিকান ফুটবলের মানচিত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

পরবর্তী অ্যাফকনে অংশ নেবে মহাদেশের সেরা দলগুলি। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যে মাঠে নামবে। অন্য দিকে, সদ্য ফাইনালে হারের যন্ত্রণা নিয়ে মরক্কো নিজেদের ঘরের মাঠে নতুন ইতিহাস গড়তে মরিয়া থাকবে। নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, মিশর, ক্যামেরুন, আলজেরিয়ার মতো দলগুলিও শিরোপার দাবিদার হয়ে উঠবে। তরুণ প্রতিভা ও অভিজ্ঞ তারকাদের সমন্বয়ে প্রতিটি দলই নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে চাইবে

 

 

 

 

 

 

 

 

Preview image