Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

২৬/১১-র বিভীষিকার রাত থেকে বলিউডের পর্দায়, অঞ্জলি কুলঠের সাহসিকতার গল্পে কঙ্গনা রানাউত

২০০৮ সালের ২৬/১১ হামলার বিভীষিকাময় রাতে মুম্বইয়ের হাসপাতালে নাইট শিফটে ছিলেন নার্স অঞ্জলি কুলঠে। জানলার বাইরে জঙ্গিদের গুলি চালাতে দেখে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২০ জন অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে নিরাপদে সরিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন এই সাহসী নার্স।

২৬/১১-র বিভীষিকার রাত থেকে বলিউডের পর্দায়, অঞ্জলি কুলঠের সাহসিকতার গল্পে কঙ্গনা রানাউত
বিনোদন

ভারতের ইতিহাসে ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর এক কালো অধ্যায়। সেই রাতের ভয়াবহতা আজও ভুলতে পারেননি মুম্বইবাসী। সমন্বিত জঙ্গি হামলায় কেঁপে উঠেছিল গোটা দেশ। শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালিয়েছিল সশস্ত্র জঙ্গিরা। রক্তাক্ত হয়েছিল রাস্তাঘাট, হোটেল, রেলস্টেশন এবং হাসপাতাল। সেই বিভীষিকাময় রাতের অসংখ্য বেদনাদায়ক স্মৃতির মাঝেও কিছু মানুষের অসাধারণ সাহসিকতা আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁদেরই একজন নার্স অঞ্জলি কুলঠে। নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যিনি হাসপাতালের অন্তঃসত্ত্বা রোগীদের নিরাপদে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর জীবনসংগ্রাম, কর্তব্যবোধ এবং সাহসিকতার কাহিনিই নতুন করে আলোচনায় এসেছে কঙ্গনা রনৌতের ছবি ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’-র মাধ্যমে।

অঞ্জলি কুলঠে ছিলেন মুম্বইয়ের কামা অ্যান্ড আলব্লেস হাসপাতালের একজন সিনিয়র নার্স। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর রাতে তাঁর ডিউটি ছিল মাতৃসদনে। নাইট শিফটে তিনি দায়িত্বে ছিলেন প্রায় ২০ জন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার। দিনের মতোই রাতটিও প্রথমে স্বাভাবিক ছিল। রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ওষুধপত্র দেওয়া, চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয়— সব কিছুই চলছিল নিয়মমাফিক। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি এমনভাবে বদলে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।

রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আচমকা বাইরে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। প্রথমে অনেকে ভেবেছিলেন হয়তো কোনও দুর্ঘটনা বা অন্য কিছু ঘটেছে। কিন্তু অঞ্জলি যখন জানলার বাইরে তাকান, তখন তিনি দেখেন দুই সশস্ত্র জঙ্গি হাসপাতাল চত্বরে ঢুকে নিরাপত্তারক্ষীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে ভয়াবহ বিপদ খুব কাছেই চলে এসেছে।

সাধারণ মানুষ হলে হয়তো আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়তেন। কিন্তু অঞ্জলি সেই মুহূর্তে নিজের ভয়কে নিয়ন্ত্রণে রেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর দায়িত্বে থাকা রোগীদের জীবন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময় নষ্ট না করে প্রথমেই ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করে দেন। তারপর একে একে রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করেন।

হাসপাতালের করিডরে তখন গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বাইরে কোথাও কোথাও বিস্ফোরণের আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল। আতঙ্কে অনেক রোগী কান্নাকাটি শুরু করেছিলেন। কেউ নিজের পরিবারের কথা ভাবছিলেন, কেউ আবার অনাগত সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে অঞ্জলি শুধু চিকিৎসাকর্মী নন, একজন অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করেন। তিনি প্রত্যেক রোগীকে শান্ত থাকতে বলেন এবং তাঁদের মধ্যে সাহস জোগানোর চেষ্টা করেন।

সেই রাতের একটি ঘটনা আজও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। জঙ্গি হামলার মধ্যেই একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার প্রসববেদনা শুরু হয়েছিল। চারদিকে মৃত্যু আর আতঙ্কের পরিবেশ, বাইরে গুলির শব্দ, তবু থেমে থাকেনি জীবন। সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যেই সন্তানের জন্ম দেন ওই মহিলা। অঞ্জলি এবং তাঁর সহকর্মীরা সমস্ত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে প্রসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। পরে অঞ্জলি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার একটাই চিন্তা ছিল— মা ও সন্তান যেন নিরাপদে থাকে।”

এই কথাগুলোই তাঁর মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। কারণ সে সময় তিনি নিজেও জানতেন না পরের মুহূর্তে কী হতে চলেছে। যে কোনও সময় জঙ্গিরা ওয়ার্ডে ঢুকে পড়তে পারত। তবুও নিজের প্রাণের কথা না ভেবে রোগীদের সুরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন তিনি।

অঞ্জলির উপস্থিত বুদ্ধিও সেদিন বহু প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করেছিল। তিনি রোগীদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিতে বলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ফোনের রিংটোন বা আলো জঙ্গিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। পরে তিনি জানান, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই ছোট ছোট পদক্ষেপই সেই রাতে রোগীদের নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

পরবর্তীকালে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে অঞ্জলি বারবার বলেছেন যে তিনি কোনও অলৌকিক কাজ করেননি। তিনি শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁর সাহসিকতা ছিল অসাধারণ। কারণ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অধিকাংশ মানুষ নিজের নিরাপত্তার কথা আগে ভাবেন। অঞ্জলি তার উল্টোটা করেছিলেন। তিনি নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে অন্যদের রক্ষা করেছিলেন।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার মধ্যে একটা জেদ কাজ করছিল। মানুষের সাহায্য না করে আমি মরতে চাইনি। ইউনিফর্মের শক্তিই আমাকে সাহস দিয়েছিল। আমি জানতাম গুলি আমারও লাগতে পারে। কিন্তু রোগীদের যেন কিছু না হয়, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

news image
আরও খবর

এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়, পেশার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা গভীর ছিল। নার্সিং শুধুমাত্র একটি চাকরি নয়, এটি মানুষের সেবা করার এক মহান দায়িত্ব— অঞ্জলি যেন সেই দর্শনেরই বাস্তব উদাহরণ।

তাঁর এই সাহসের পিছনে পারিবারিক প্রেরণারও বড় ভূমিকা ছিল। অঞ্জলি জানিয়েছেন, তাঁর বাবা ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তিনি সান্তাক্রুজ বিমানবন্দরে কাজ করতেন। ১৯৭৯ সালে সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার সেই সাহসিকতার গল্প শুনে বড় হয়েছেন অঞ্জলি। ফলে বিপদের মুখোমুখি দাঁড়ালে কীভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেই শিক্ষা তিনি পরিবার থেকেই পেয়েছিলেন।

২৬/১১-র সেই রাত শেষ হওয়ার পরও অঞ্জলির দায়িত্ব শেষ হয়নি। জঙ্গি হামলার তদন্তে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হয়েছিল তাঁকে। হামলার কয়েক সপ্তাহ পরে তাঁকে ডাকা হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে। জীবিত ধরা পড়া একমাত্র জঙ্গি আজমল কসাবকে শনাক্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।

এটি ছিল অত্যন্ত মানসিক চাপের একটি মুহূর্ত। কারণ যাকে সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে হবে, সেই ব্যক্তিই অসংখ্য নিরীহ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। তবুও অঞ্জলি সাহসের সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কসাবকে শনাক্ত করেন এবং নিশ্চিত করেন যে সে-ই হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের একজন।

পরে এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অঞ্জলি জানান, কসাবের আচরণ তাঁকে বিস্মিত করেছিল। তাঁর কথায়, “সে হেসে বলেছিল, ‘ম্যাডাম, আপনি ঠিকই চিনেছেন। আমিই আজমল কসাব।’” এত ভয়ঙ্কর ঘটনার পরও কসাবের মধ্যে কোনও অনুশোচনা বা অপরাধবোধের চিহ্ন দেখতে পাননি তিনি। এই বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

বছরের পর বছর কেটে গেলেও অঞ্জলি কুলঠের নাম সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। ২৬/১১-র হামলায় অনেক পুলিশকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী, চিকিৎসক ও সাধারণ নাগরিক বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। সেই তালিকায় অঞ্জলির নামও সমান গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নায়ক হতে গেলে হাতে অস্ত্র থাকা প্রয়োজন নেই। মানবতা, দায়িত্ববোধ এবং সাহস থাকলেই একজন মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন।

বর্তমানে কঙ্গনা রনৌতের ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’ ছবির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মও অঞ্জলি কুলঠের গল্প জানতে পারছে। ছবিতে একজন নার্সের চরিত্রে অভিনয় করে কঙ্গনা সেই মানবিক সাহসিকতার কাহিনি তুলে ধরেছেন। যদিও সিনেমা বাস্তব ঘটনাকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করে, তবুও এর কেন্দ্রে রয়েছে একজন সাধারণ নারীর অসাধারণ সাহসের গল্প।

অঞ্জলি কুলঠের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সংকটের মুহূর্তে প্রকৃত চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। ২৬/১১-র সেই ভয়াবহ রাতে তিনি আতঙ্ককে জয় করেছিলেন কর্তব্যবোধ দিয়ে। মৃত্যুভয়কে পরাজিত করেছিলেন মানবিকতার শক্তিতে। তাঁর সামনে ছিল গুলি, বিস্ফোরণ এবং অনিশ্চয়তা; তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি। কারণ তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর দায়িত্বে থাকা রোগীদের জীবন।

আজও যখন ২৬/১১-র হামলার কথা স্মরণ করা হয়, তখন রক্তক্ষয়ী ঘটনার পাশাপাশি উঠে আসে কিছু অনুপ্রেরণাদায়ক নাম। অঞ্জলি কুলঠে তাঁদের অন্যতম। তাঁর সাহস, ত্যাগ এবং দায়িত্ববোধ শুধু সেই রাতের কয়েকজন রোগীকেই রক্ষা করেনি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও মানবতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রয়েছে। সেই কারণেই ২৬/১১-র ইতিহাসে অঞ্জলি কুলঠের নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।২৬/১১-র সেই রাতের বহু বছর পরেও অঞ্জলি কুলঠের সাহসিকতার গল্প মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। বিভিন্ন মঞ্চে তাঁকে সম্মান জানানো হয়েছে, তবে তিনি বরাবরই নিজেকে নায়িকা বলতে অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, তিনি শুধু একজন নার্স হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হল, চরম বিপদের মুহূর্তে যে ধৈর্য, উপস্থিত বুদ্ধি এবং মানবিকতার পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন, তা অসাধারণ। চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত বহু তরুণ-তরুণীর কাছেও তিনি আজ আদর্শ। ২৬/১১-র সেই ভয়াবহ রাত প্রমাণ করেছিল, কখনও কখনও যুদ্ধক্ষেত্র শুধু সীমান্তে নয়, হাসপাতালের ওয়ার্ডেও তৈরি হয়। আর সেখানেও জন্ম নেন প্রকৃত নায়কেরা, যাঁদের সাহস ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে।

Preview image

About Us

Lenspedia brings you verified Bengali news, breaking updates, videos, and local stories. Our mission is to provide accurate and real-time coverage of events that matter to you.

সংবাদ অন্বেষণ করুন