খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের কী সম্পর্ক? ‘নিউট্রিয়েন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত ICMR-এর গবেষণায় উঠে এল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
বয়স এখনও তিরিশের কোঠায় পৌঁছয়নি, অথচ পিঠে, কোমরে কিংবা হাঁটুতে ব্যথা লেগেই রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বসে কাজ করার পর উঠে দাঁড়াতে অসুবিধা হচ্ছে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে শক্তভাব অনুভূত হচ্ছে কিংবা হাত-পায়ের গাঁটে ব্যথা হচ্ছে। অনেকেই এই ধরনের সমস্যাকে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব অথবা অনিয়মিত জীবনযাপনের ফল বলে মনে করেন। কিন্তু জয়েন্টের ব্যথার পিছনে আরও নানা কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হল রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, যা একটি প্রদাহজনিত অটোইমিউন রোগ।
সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, বাত বা আর্থ্রাইটিস মূলত বয়স্কদের সমস্যা। বাস্তবে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কম বয়সেও দেখা দিতে পারে। বয়স ছাড়াও জিনগত প্রবণতা, পরিবেশগত কারণ, ধূমপান এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এই রোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। এর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও শরীরের পুষ্টির অবস্থাও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউট্রিশন (NIN)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণায় খাদ্যাভ্যাসের গুণমান এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মধ্যে সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। ‘Nutrients’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে খাদ্যের প্রদাহ সৃষ্টির সম্ভাবনা, খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্য এবং প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট পাওয়ার পর্যাপ্ততা মূল্যায়ন করা হয়েছে।
গবেষণায় ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সি মোট ৬১৫ জনের খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৩০১ জন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ছিলেন। গবেষণায় আক্রান্ত এবং সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাসের বিভিন্ন সূচকের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। তবে এই ফলাফলকে বুঝতে গেলে মনে রাখতে হবে, কোনও দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেলেই একটি বিষয় সরাসরি অন্যটির কারণ, তা প্রমাণিত হয় না।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা RA হল একটি দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন রোগ। এই রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজের জয়েন্টের আবরণ বা সাইনোভিয়াল টিস্যুকে আক্রমণ করে। এর ফলে জয়েন্টে প্রদাহ, ব্যথা, ফোলাভাব এবং শক্তভাব দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন রোগটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে জয়েন্টের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
সাধারণত হাতের আঙুল, কবজি, পায়ের আঙুল এবং অন্যান্য ছোট জয়েন্টে এই রোগের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শরীরের দুই পাশের একই ধরনের জয়েন্ট আক্রান্ত হয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা, হাত মুঠো করতে অসুবিধা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সম্ভাব্য লক্ষণ।
তবে সব ধরনের জয়েন্টের ব্যথাই রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নয়। অস্টিওআর্থ্রাইটিস, পেশির সমস্যা, অতিরিক্ত পরিশ্রম, আঘাত, সংক্রমণ এবং অন্যান্য প্রদাহজনিত রোগের কারণেও ব্যথা হতে পারে। তাই শুধুমাত্র উপসর্গ দেখে নিজের রোগ নির্ধারণ করা উচিত নয়।
হ্যাঁ, অল্প বয়সেও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হতে পারে। এই রোগের সূচনা যে শুধুমাত্র বেশি বয়সে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কখনও কখনও প্রাথমিক লক্ষণগুলি হালকা হওয়ায় অনেকে সেগুলিকে সাধারণ ক্লান্তি, কাজের চাপ কিংবা ঘুমের অভাব বলে উপেক্ষা করেন।
দীর্ঘদিন ধরে জয়েন্টে ব্যথা, ফোলাভাব, সকালে শক্তভাব এবং দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে একাধিক জয়েন্ট আক্রান্ত হলে কিংবা উপসর্গ ক্রমশ বাড়তে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
পিঠ ও কোমরের ব্যথার সঙ্গে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে সরাসরি নয়। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ফলে পেশিতে টান বা অন্য ধরনের পেশি-হাড়ের সমস্যা হতে পারে। আবার কোমরের ব্যথার পিছনে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন রোগও থাকতে পারে। তাই ব্যথার অবস্থান, স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য উপসর্গ বিচার করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
খাদ্যাভ্যাস শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য, পুষ্টির ভারসাম্য এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিনের খাবারে কী ধরনের উপাদান থাকছে, কতটা বৈচিত্র্য রয়েছে এবং শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পাচ্ছে কি না, তা স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাটিতে খাদ্যাভ্যাসের গুণমান মূল্যায়ন করতে তিনটি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে—ডায়েটারি ইনফ্লেমেটরি ইনডেক্স (DII), ডায়েটারি ডাইভারসিটি স্কোর (DDS) এবং মিন প্রোবাবিলিটি অফ অ্যাডিকুয়েসি (MPA)। এই সূচকগুলি যথাক্রমে খাবারের সম্ভাব্য প্রদাহজনিত প্রভাব, খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্য এবং প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট গ্রহণের পর্যাপ্ততা বুঝতে সাহায্য করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত ফলাফল অনুযায়ী, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রদাহ সৃষ্টিকারী খাদ্যাভ্যাসের সূচক তুলনামূলক বেশি এবং খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্য ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের পর্যাপ্ততার সূচক তুলনামূলক কম ছিল।
এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, খাদ্যাভ্যাসের মান এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মধ্যে একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে রোগের কারণ নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। শুধু খাবারের ধরন বদলালেই রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধ করা যাবে বা রোগ সম্পূর্ণ সেরে যাবে, এমন সিদ্ধান্ত এই তথ্য থেকে নেওয়া যায় না।
ডায়েটারি ইনফ্লেমেটরি ইনডেক্স বা DII হল এমন একটি সূচক, যার সাহায্যে খাদ্যাভ্যাসের সম্ভাব্য প্রদাহজনিত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়। বিভিন্ন খাবার ও খাদ্য উপাদান শরীরের প্রদাহের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত হতে পারে, সেই বিষয়টি এই সূচকের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে DII-এর গড় মান ছিল ০.৩৭। অন্যদিকে, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এই মান ছিল ২.১৮। অর্থাৎ, গবেষণার নমুনায় আক্রান্তদের খাদ্যাভ্যাসের প্রদাহজনিত সূচক তুলনামূলক বেশি ছিল।
তবে DII-এর মান বেশি হলেই কোনও ব্যক্তির আর্থ্রাইটিস হবেই, এমন নয়। এই সূচক রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নয়। ব্যক্তির সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি গবেষণামূলক পরিমাপ।
খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত পরিমাণে উচ্চ প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত খাবার থাকলে সামগ্রিক পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এমন খাবার নিয়মিত খাওয়ার ফলে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সুযোগও কমে যেতে পারে।
তবে সব প্রক্রিয়াজাত খাবার সমান নয় এবং প্রতিটি খাবারের প্রভাবও এক নয়। তাই কোনও একটি খাবারকে বাতের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বরং পুরো খাদ্যতালিকার গুণমানের দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।
ডায়েটারি ডাইভারসিটি স্কোর বা DDS খাদ্যতালিকায় কত ধরনের খাবার রয়েছে, তা মূল্যায়নে সাহায্য করে। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি একটি মাত্র খাবার থেকে পাওয়া যায় না। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের ডায়েটারি ডাইভারসিটি স্কোর ছিল ৭৪.২ শতাংশ। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৫০.২ শতাংশ। অর্থাৎ, গবেষণায় আক্রান্ত গোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্যের সূচক তুলনামূলক কম ছিল।
খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বলতে শুধু বেশি পদ খাওয়াকে বোঝায় না। বরং বিভিন্ন খাদ্যগোষ্ঠী থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করাই আসল বিষয়। যেমন শাকসব্জি, ফল, ডাল, গোটা শস্য, বাদাম, বীজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার।
একই ধরনের খাবার বারবার খেলে কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থেকে যেতে পারে। অন্যদিকে, বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন এবং ফাইবার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়।
তবে DDS-এর নির্দিষ্ট মানের অর্থ গবেষণায় ব্যবহৃত স্কোরিং পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। এই শতাংশকে দৈনিক পুষ্টির চাহিদার সরাসরি শতাংশ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ভিটামিন ও খনিজ পদার্থকে সাধারণভাবে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বলা হয়। পরিমাণে অল্প প্রয়োজন হলেও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, হাড়ের স্বাস্থ্য, রক্ত তৈরি এবং কোষের বিভিন্ন কাজে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ভূমিকা পালন করে।
মিন প্রোবাবিলিটি অফ অ্যাডিকুয়েসি বা MPA এমন একটি সূচক, যা খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়ার সম্ভাবনা মূল্যায়নে সাহায্য করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের MPA-এর মান ছিল ৩২.৯ শতাংশ। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে তা কমে ১৮.৯ শতাংশে দাঁড়ায়। এই পার্থক্য থেকে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাসে পুষ্টির পর্যাপ্ততা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে।
ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থাকলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি রয়েছে কি না, তা কেবল এই গবেষণার গড় পরিসংখ্যান দেখে কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে বলা যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করে ঘাটতি নির্ণয় করা হয়।
নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার ভিটামিন বা খনিজের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে সুষম খাবারের মাধ্যমে পুষ্টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা উচিত। সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হলে তার ধরন ও মাত্রা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা ভালো।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে কোনও নির্দিষ্ট ডায়েটকে ব্যবহার করা যায় না। তবে সুষম এবং বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। ওজন, বয়স, দৈনন্দিন পরিশ্রম এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
১. প্রতিদিন শাকসব্জি রাখুন
বিভিন্ন রঙের শাকসব্জিতে ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার এবং অন্যান্য উপকারী উপাদান থাকে। পালং শাক, লাল শাক, গাজর, লাউ, কুমড়ো, ফুলকপি, বাঁধাকপি এবং অন্যান্য মরশুমি সব্জি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
২. নিয়মিত ফল খান
পেয়ারা, কমলালেবু, পেঁপে, কলা, আপেল এবং অন্যান্য মরশুমি ফল থেকে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। ফলের রসের বদলে গোটা ফল খেলে সাধারণত বেশি ফাইবার পাওয়া যায়। ডায়াবেটিস বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে ফলের পরিমাণ সম্পর্কে ব্যক্তিগত পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. ডাল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান
ডাল, ছোলা, মটর, রাজমা, সয়াবিন, ডিম, মাছ, দুধ এবং অন্যান্য উপযুক্ত খাবার থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়। প্রোটিন পেশি ও শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয়। নিরামিষভোজীরাও পরিকল্পিত খাদ্যতালিকার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রোটিন পেতে পারেন।
৪. গোটা শস্য বেছে নিন
আটার রুটি, ওটস, লাল চাল এবং অন্যান্য গোটা শস্য থেকে ফাইবার ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। তবে খাদ্যতালিকায় কোনও একটি শস্য সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, যদি না চিকিৎসাগত কারণে এমন পরামর্শ দেওয়া হয়।
৫. বাদাম ও বীজ পরিমিত খান
চিনাবাদাম, আখরোট, কাঠবাদাম, তিল এবং অন্যান্য বীজে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট থাকে। পরিমাণমতো এগুলি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। বাদামে অ্যালার্জি থাকলে সংশ্লিষ্ট খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
৬. মাছ ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের উৎস রাখুন
মাছে প্রোটিন থাকে এবং তৈলাক্ত কিছু মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। তবে ওমেগা-৩ গ্রহণ করলেই রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস সেরে যাবে, এমন দাবি করা ঠিক নয়। মাছ না খেলে উপযুক্ত বিকল্প সম্পর্কে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া যায়।
৭. অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চ প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান
নিয়মিত অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয়, মিষ্টি, ভাজাভুজি এবং উচ্চ প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমানোর চেষ্টা করুন। এই খাবারগুলি যেন শাকসব্জি, ফল, ডাল এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের জায়গা দখল না করে, সেদিকে নজর দিন।
৮. পর্যাপ্ত জল পান করুন
শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী জল পান করা জরুরি। গরম আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উপর জলের চাহিদা নির্ভর করে। শুধু বেশি জল খেলেই বাতের ব্যথা কমবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান এড়িয়ে চলা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে জয়েন্টে ব্যথা থাকলে নিজের শারীরিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে ব্যায়াম করা উচিত নয়।
হাঁটা, হালকা স্ট্রেচিং এবং চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যায়াম শরীরের সচলতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। জয়েন্টে তীব্র ব্যথা বা ফোলাভাব থাকলে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা নিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।
দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ানো, অল্প হাঁটাচলা করা এবং বসার ভঙ্গি ঠিক রাখাও উপকারী হতে পারে। তবে এসব অভ্যাসের মাধ্যমে সব ধরনের আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব, এমন নয়।
পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, আবার ঘুমের সমস্যা দৈনন্দিন ক্লান্তি বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত।
জয়েন্টে দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে কিংবা বারবার একই সমস্যা ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, সকালে দীর্ঘক্ষণ শক্তভাব থাকা, একাধিক জয়েন্টে ব্যথা, হাতের আঙুল নাড়াতে অসুবিধা অথবা দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জয়েন্ট হঠাৎ খুব ফুলে গেলে, লাল ও গরম হয়ে উঠলে এবং তার সঙ্গে জ্বর থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। এ ধরনের উপসর্গের পিছনে সংক্রমণসহ গুরুতর কারণ থাকতে পারে।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা এবং ইমেজিং পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত প্রদাহ জয়েন্টের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
শুধুমাত্র ডায়েট পরিবর্তন করে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় রোগের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। কোন চিকিৎসা উপযুক্ত হবে, তা রোগীর অবস্থা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ নির্ধারণ করেন।
ICMR ও NIN-এর সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণায় খাদ্যাভ্যাসের গুণমান এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মধ্যে সম্পর্কের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্ত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে DII-এর মান বেশি ছিল, DDS-এর মান কম ছিল এবং MPA-এর মানও তুলনামূলক কম ছিল।
এই ফলাফল স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে গবেষণার পর্যবেক্ষণ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে অস্বাস্থ্যকর খাবারই ওই অংশগ্রহণকারীদের আর্থ্রাইটিসের একমাত্র কারণ। গবেষণার নকশা, অংশগ্রহণকারীদের বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে ফলাফল ব্যাখ্যা করতে হয়।
অল্প বয়সে জয়েন্টে ব্যথা হলে সেটিকে শুধুমাত্র অলসতা বা খাদ্যাভ্যাসের ফল বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, শুধু ব্যথা হচ্ছে বলে নিজে থেকে আর্থ্রাইটিসের রোগী বলেও ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সঠিক মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সুষম খাবার, খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য, প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান, নিয়মিত উপযুক্ত শারীরিক কার্যকলাপ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা—এই বিষয়গুলি সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
হ্যাঁ। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও হতে পারে। জিনগত প্রবণতা, পরিবেশগত কারণ এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এই রোগের সঙ্গে যুক্ত। জয়েন্টে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা ফোলাভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
গবেষণায় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাসে প্রদাহজনিত সূচক বেশি এবং খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্য ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের পর্যাপ্ততার সূচক কম দেখা গিয়েছে। তবে এই সম্পর্ক থেকে খাদ্যাভ্যাসই রোগের একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
DII-এর সম্পূর্ণ নাম ডায়েটারি ইনফ্লেমেটরি ইনডেক্স। এটি খাদ্যাভ্যাসের সম্ভাব্য প্রদাহজনিত প্রভাব মূল্যায়নের একটি সূচক। এটি নিজে কোনও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নয়।
DDS বা ডায়েটারি ডাইভারসিটি স্কোর খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের খাবারের বৈচিত্র্য মূল্যায়ন করে। বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা থেকে শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
MPA বা মিন প্রোবাবিলিটি অফ অ্যাডিকুয়েসি প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়ার সম্ভাবনা মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়। এর নির্দিষ্ট মান গবেষণায় ব্যবহৃত পদ্ধতির উপর নির্ভর করে।
শাকসব্জি, ফল, ডাল, গোটা শস্য, বাদাম, বীজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাছ, ডিম বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দিয়ে বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা তৈরি করুন। ব্যক্তিগত পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
না। সুষম খাদ্যাভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের নির্দিষ্ট চিকিৎসার বিকল্প নয়। রোগ নির্ণয় হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।
না। আঘাত, পেশির সমস্যা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, অতিরিক্ত চাপ এবং অন্যান্য কারণেও হাঁটুতে ব্যথা হতে পারে। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা জয়েন্ট ফুলে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সারসংক্ষেপ: অল্প বয়সে জয়েন্টের ব্যথা দেখা দিলে অবহেলা না করে তার কারণ নির্ণয় করা জরুরি। ICMR ও NIN-এর সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণায় খাদ্যাভ্যাসের গুণমান ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। তাই পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন, নিয়মিত উপযুক্ত শারীরিক কার্যকলাপ করুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ তথ্যের জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।