Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কালীপুজোকে ঘিরে মাটির প্রদীপ তৈরিতে ব্যস্ত শহরের ভাটিগুলি, বাড়ছে কারিগরদের কর্মব্যস্ততা

কালীপুজো সামনে রেখে শহরের বিভিন্ন মাটির ভাটিতে জোরকদমে শুরু হয়েছে মাটির প্রদীপ তৈরির কাজ। উৎসবের মরসুমে চাহিদা বাড়ায় ব্যস্ততা বেড়েছে মৃৎশিল্পী ও কারিগরদের।

কালীপুজোকে ঘিরে শহরজুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে উৎসবের প্রস্তুতি। আলোর উৎসবকে আরও উজ্জ্বল করে তুলতে মাটির প্রদীপের চাহিদা প্রতি বছরই বাড়ে। সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখে শহরের বিভিন্ন মাটির ভাটিতে ইতিমধ্যেই জোরকদমে শুরু হয়েছে প্রদীপ তৈরির কাজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৃৎশিল্পী ও কারিগররা।

কালীপুজোর সঙ্গে মাটির প্রদীপের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাড়ির উঠোন থেকে বারান্দা, ঠাকুরের আসন থেকে পুজোমণ্ডপ—প্রায় সর্বত্রই প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। আধুনিক আলোকসজ্জা, এলইডি লাইট কিংবা নানা ধরনের বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার বাড়লেও মাটির প্রদীপের জনপ্রিয়তা এখনও অটুট। বিশেষ করে কালীপুজোর সময় মাটির প্রদীপের চাহিদা অনেকটাই বেড়ে যায়।

এই বাড়তি চাহিদা মেটাতেই শহরের বিভিন্ন ভাটিতে এখন দিনরাত চলছে প্রদীপ তৈরির কাজ। কাঁচা মাটি সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে মাটি প্রস্তুত করা, প্রদীপের আকার দেওয়া, শুকিয়ে নেওয়া এবং পরে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা—প্রতিটি ধাপেই রয়েছে দীর্ঘ পরিশ্রম। অভিজ্ঞ কারিগরদের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও কাজে হাত লাগাচ্ছেন।

একজন দক্ষ মৃৎশিল্পীর হাতে সামান্য মাটিও ধীরে ধীরে প্রদীপের আকার নেয়। একের পর এক প্রদীপ তৈরি করে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরপর সেগুলিকে ভাটিতে পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে ব্যবহারযোগ্য মাটির প্রদীপ। কোথাও সাধারণ ছোট প্রদীপ তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও তৈরি হচ্ছে নকশা করা এবং বিভিন্ন আকারের প্রদীপ। কালীপুজোর বাজারের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রদীপ তৈরির প্রস্তুতি চলছে।

উৎসব যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কারিগরদের ব্যস্ততা। দিনের বেশিরভাগ সময়ই প্রদীপ তৈরির কাজে কেটে যাচ্ছে তাঁদের। সময়মতো বাজারে প্রদীপ পৌঁছে দিতে আগে থেকেই কাজ শুরু করেছেন অনেক কারিগর। কারণ কালীপুজোর আগে শেষ মুহূর্তে প্রদীপের চাহিদা আচমকা বেড়ে যায়। ফলে পর্যাপ্ত প্রদীপ তৈরি করে মজুত রাখার জন্য এখন থেকেই চলছে জোর প্রস্তুতি।

মৃৎশিল্পীদের কাছে উৎসবের মরসুম গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সারা বছর বিভিন্ন ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরি হলেও দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো এবং দীপাবলির সময় প্রদীপের চাহিদা বাড়ে। এই সময় বাড়তি কাজের সুযোগ তৈরি হয় কারিগরদের। তবে মাটির দাম, জ্বালানির খরচ, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে বলে মনে করছেন অনেক শিল্পী।

তারপরও কালীপুজোর আগে মাটির প্রদীপ তৈরির কাজ তাঁদের কাছে শুধু জীবিকার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্য ও আবেগ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির কাছে এই কাজ একটি দীর্ঘদিনের সংস্কৃতির অংশ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও তাঁরা ধরে রেখেছেন মাটির প্রদীপ তৈরির ঐতিহ্য।

বর্তমানে বাজারে বৈদ্যুতিক আলো এবং নানা ধরনের ডেকোরেটিভ লাইট সহজলভ্য। কম সময়ে ঘর সাজানোর জন্য অনেকেই সেগুলি ব্যবহার করেন। তবে মাটির প্রদীপের আবেদন একেবারেই আলাদা। সরষের তেল বা ঘিয়ের প্রদীপে জ্বলে ওঠা ছোট্ট শিখা কালীপুজোর পরিবেশে তৈরি করে এক অন্যরকম আবহ। সেই কারণেই এখনও বহু পরিবার পুজোর সময় মাটির প্রদীপ কিনতে বাজারে যান।

পরিবেশবান্ধব উৎসবের বিষয়টিও মাটির প্রদীপের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। মাটি দিয়ে তৈরি হওয়ায় ব্যবহারের পর প্রদীপ সহজেই প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পরিবেশ সচেতন মানুষের কাছেও মাটির প্রদীপের চাহিদা রয়েছে। অনেকেই কালীপুজো ও দীপাবলির সময় বৈদ্যুতিক আলোর পাশাপাশি বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় মাটির প্রদীপ জ্বালাতে পছন্দ করেন।

শহরের বিভিন্ন ভাটিতে এখন সেই চাহিদারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সারি সারি কাঁচা প্রদীপ শুকোতে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কারিগররা মাটি মাখছেন, কোথাও চাকার সাহায্যে প্রদীপের আকার দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও তৈরি প্রদীপ ভাটিতে পোড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। সব মিলিয়ে উৎসবের আগেই মাটির ভাটিগুলিতে তৈরি হয়েছে ব্যস্ততার পরিবেশ।

কারিগরদের আশা, কালীপুজো যত এগিয়ে আসবে, প্রদীপের চাহিদাও তত বাড়বে। পুজোর বাজারে সাধারণ প্রদীপের পাশাপাশি নকশা করা প্রদীপ, রঙিন প্রদীপ এবং বিভিন্ন আকারের প্রদীপের চাহিদাও থাকতে পারে। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উৎপাদনের কাজ চালিয়ে যেতে হবে তাঁদের।

কালীপুজোর আলোয় শহর যখন সেজে উঠবে, তখন সেই আলোর একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে মাটির প্রদীপের উষ্ণতা। সেই আলো জ্বালানোর পেছনে রয়েছে অসংখ্য মৃৎশিল্পী ও কারিগরের পরিশ্রম। তাঁদের হাতে তৈরি ছোট ছোট মাটির প্রদীপই উৎসবের সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দেবে আলোর বার্তা।

উৎসবের মরসুমে তাই শুধু প্রদীপ কেনাই নয়, স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় কারিগরদের তৈরি মাটির প্রদীপ কিনলে যেমন ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় থাকে, তেমনই উপকৃত হন এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু পরিবার। কালীপুজোর আগে শহরের ভাটিগুলিতে শুরু হওয়া এই ব্যস্ততা সেই ঐতিহ্যকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে। 

কালীপুজোর দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে মাটির প্রদীপ তৈরির ব্যস্ততা। ভাটিগুলিতে এখন যেন বিশ্রামের সময় নেই। সকাল হতেই শুরু হচ্ছে কাজ, আর দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেও অনেক জায়গায় প্রদীপ তৈরির কাজ চলছে। পুজোর আগে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক প্রদীপ তৈরি করে বাজারে পৌঁছে দেওয়াই এখন মূল লক্ষ্য কারিগরদের।

প্রদীপ তৈরির কাজে শুধু দক্ষ কারিগররাই নন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও সহযোগিতা করছেন। কেউ কাঁচা মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ প্রদীপের আকার দিচ্ছেন, কেউ আবার তৈরি প্রদীপ রোদে শুকোতে দিচ্ছেন। শুকিয়ে যাওয়া প্রদীপগুলি আলাদা করে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে ভাটিতে পোড়ানোর জন্য। এরপর সেগুলি বাজারে পাঠানোর উপযোগী হয়ে উঠছে। পুরো প্রক্রিয়াটিই সময়সাপেক্ষ এবং পরিশ্রমের।

অনেক মৃৎশিল্পীর কাছে কালীপুজোর মরসুম বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় প্রদীপের চাহিদা বাড়ায় তাঁদের আয়ও কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। সারা বছর মাটির বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করা পরিবারগুলির কাছে উৎসবের মরসুম তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কতটা থাকবে, তা নিয়ে কিছুটা চিন্তাও রয়েছে শিল্পীদের মধ্যে।

বর্তমানে মাটির প্রদীপের পাশাপাশি বাজারে নানা ধরনের আধুনিক আলো পাওয়া যায়। রঙিন এলইডি, বৈদ্যুতিক মালা এবং বিভিন্ন ডিজাইনের ডেকোরেটিভ লাইট দিয়ে অনেকেই ঘরবাড়ি সাজান। তবুও মাটির প্রদীপের ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি। বরং কালীপুজো ও দীপাবলির সময় মাটির প্রদীপের প্রতি মানুষের আলাদা আকর্ষণ দেখা যায়। বিশেষ করে পুজোর মণ্ডপ, ঠাকুরের আসন, বাড়ির দরজা, জানালা, বারান্দা এবং উঠোনে প্রদীপ সাজিয়ে রাখার রীতি এখনও বহু পরিবারে প্রচলিত।

মাটির প্রদীপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার সরলতা। সামান্য মাটি দিয়ে তৈরি একটি ছোট প্রদীপে তেল ও সলতে দিয়ে যখন আগুন জ্বলে ওঠে, তখন তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। বৈদ্যুতিক আলোর ঝলমলে সাজসজ্জার মধ্যেও মাটির প্রদীপের আলো উৎসবের আবহকে আরও ঐতিহ্যবাহী করে তোলে। কালীপুজোর রাতে তাই অনেকের বাড়িতেই দেখা যায় সারি সারি প্রদীপের আলো।

news image
আরও খবর

শুধু বাড়ির পুজো নয়, বিভিন্ন পুজো কমিটিও মাটির প্রদীপ ব্যবহার করে থাকে। মন্দির, পুজোমণ্ডপ কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রদীপের প্রয়োজন হয়। ফলে উৎসবের সময় একসঙ্গে বড় অর্ডার পাওয়ার আশায় থাকেন অনেক কারিগর। সেই অর্ডার পূরণ করার জন্যই আগে থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে হয় তাঁদের।

ভাটিতে তৈরি হওয়া প্রদীপগুলি প্রথমে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হয়। পর্যাপ্ত রোদ না থাকলে এই প্রক্রিয়ায় সময় আরও বেশি লাগে। এরপর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সেগুলি পোড়ানো হয়। পোড়ানোর সময় সামান্য ত্রুটি হলেও অনেক প্রদীপ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি ধাপেই কারিগরদের সতর্ক থাকতে হয়। বছরের পর বছর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাঁরা এই কাজের কৌশল আয়ত্ত করেছেন।

মাটির মানও প্রদীপ তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো মানের মাটি ব্যবহার করলে প্রদীপের আকার সুন্দর হয় এবং পোড়ানোর পর তা শক্ত ও টেকসই হয়। মাটি প্রস্তুত করার কাজেও রয়েছে যথেষ্ট পরিশ্রম। মাটি থেকে পাথর, ছোট ছোট কণা ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় বস্তু সরিয়ে সেটিকে উপযুক্ত করে তোলা হয়। এরপর প্রয়োজনমতো জল মিশিয়ে মাটি তৈরি করা হয় প্রদীপ বানানোর জন্য।

একসময় প্রায় প্রতিটি গ্রাম ও শহরতলিতেই মাটির সামগ্রী তৈরির ছোট-বড় ভাটি দেখা যেত। সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা অনেক জায়গাতেই কমেছে। আধুনিক সামগ্রীর ব্যবহার এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে মৃৎশিল্পীদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। তারপরও উৎসবের সময় মাটির প্রদীপের চাহিদা তাঁদের এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখতে কিছুটা সাহায্য করে।

কারিগরদের মতে, মানুষের মধ্যে দেশীয় ও স্থানীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়লে মৃৎশিল্পীরা উপকৃত হবেন। স্থানীয়ভাবে তৈরি মাটির প্রদীপ কেনার মাধ্যমে শুধু পুজোর প্রয়োজন মেটানো নয়, একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পকেও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। উৎসবের বাজারে বড় বড় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা তৈরি হলে তাঁদের কাজের সুযোগও বাড়বে।

কালীপুজোকে কেন্দ্র করে এখন শহরের বাজারগুলিতেও ধীরে ধীরে বাড়ছে উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন দোকানে পুজোর সামগ্রী সাজানো হচ্ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাটিগুলিতে চলছে প্রদীপ তৈরির কাজ। পুজোর কয়েক দিন আগে বাজারে প্রদীপের সরবরাহ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন বিক্রেতারা। চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন মাপ ও নকশার প্রদীপ বাজারে আনার প্রস্তুতিও চলছে।

সাধারণ ছোট প্রদীপের পাশাপাশি এখন ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ডিজাইনের প্রদীপও তৈরি করছেন কারিগররা। কিছু প্রদীপে নকশা করা হচ্ছে, আবার কিছু প্রদীপে রং ব্যবহার করে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হচ্ছে। পুজোর সাজসজ্জার সঙ্গে মিলিয়ে অনেকেই বিশেষ ধরনের প্রদীপ কিনতে পছন্দ করেন। সেই কথা মাথায় রেখেই কারিগররা নতুন নতুন নকশা নিয়ে কাজ করছেন।

অনেক পরিবারের কাছে কালীপুজোর প্রস্তুতি শুরুই হয় প্রদীপ কেনার মাধ্যমে। পুজোর আগের দিন বা পুজোর দিন সন্ধ্যায় প্রদীপে তেল ও সলতে দিয়ে একসঙ্গে জ্বালানো হয়। কোথাও বাড়ির প্রবেশপথে প্রদীপ সাজানো হয়, কোথাও আবার উঠোনজুড়ে তৈরি করা হয় আলোর নকশা। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রদীপও অনেক পরিবার কিনে রাখে।

মাটির প্রদীপ ব্যবহারের সঙ্গে পরিবেশের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। ব্যবহারের পর মাটির তৈরি প্রদীপ সহজেই ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। প্লাস্টিকজাত সামগ্রীর তুলনায় এটি অনেক বেশি প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি। তাই পরিবেশ সচেতন মানুষের কাছেও মাটির প্রদীপের গুরুত্ব রয়েছে। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশের কথা মাথায় রেখে অনেকেই মাটির প্রদীপ ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।

তবে মৃৎশিল্পীদের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। কাঁচামালের দাম, জ্বালানি, পরিবহণ এবং শ্রমের খরচ বৃদ্ধির ফলে প্রদীপ তৈরির মোট খরচ বেড়েছে। একইসঙ্গে বাজারে কম দামে বিভিন্ন বিকল্প সামগ্রী পাওয়া যাওয়ায় প্রতিযোগিতাও রয়েছে। ফলে পরিশ্রম করে প্রদীপ তৈরি করলেও উপযুক্ত দাম পাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। উৎসবের মরসুমে চাহিদা বাড়লেও শিল্পীদের লাভের অঙ্ক কতটা থাকবে, তা নির্ভর করে বাজারদর এবং উৎপাদন খরচের উপর।

এরপরও কাজ থামছে না। কারণ তাঁদের হাতে তৈরি মাটির প্রদীপই কালীপুজোর রাতের অন্ধকার দূর করার অন্যতম পরিচিত প্রতীক। একদিকে যেমন রয়েছে পুজোর আবেগ, অন্যদিকে রয়েছে জীবিকার প্রয়োজন—এই দুইয়ের সমন্বয়েই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা।

শহরের বিভিন্ন ভাটিতে এখন যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা উৎসবের আগমনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সারি সারি মাটির প্রদীপ, রোদে শুকোতে দেওয়া কাঁচা প্রদীপ, ভাটিতে পোড়ানোর প্রস্তুতি এবং ব্যস্ত কারিগরদের কর্মচাঞ্চল্য—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। পুজোর কয়েক দিন আগে এই ব্যস্ততা আরও কয়েক গুণ বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কালীপুজোর রাতে যখন শহরের অলিগলি, বাড়ির বারান্দা এবং পুজোমণ্ডপ আলোয় ঝলমল করবে, তখন সেই আলোর পেছনে থাকবে মৃৎশিল্পীদের কয়েক দিনের কঠোর পরিশ্রম। ছোট্ট একটি মাটির প্রদীপ তৈরি করতে যে সময়, শ্রম এবং দক্ষতার প্রয়োজন হয়, উৎসবের আলোয় তার গুরুত্ব অনেক সময় চোখের আড়ালে থেকে যায়। অথচ সেই কারিগরদের হাতেই তৈরি হয় পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী।

প্রদীপের আলো শুধু অন্ধকার দূর করে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাংলার লোকশিল্প, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই মাটির কাজ এখনও মানুষের উৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেও মাটির প্রদীপ সেই পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে।

তাই কালীপুজোর বাজারে মাটির প্রদীপের চাহিদা বাড়া শুধু একটি ব্যবসায়িক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মৃৎশিল্পী পরিবারের জীবন-জীবিকা এবং একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পের অস্তিত্ব। স্থানীয়ভাবে তৈরি প্রদীপের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়লে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলিও আরও উৎসাহ পাবে।

সব মিলিয়ে কালীপুজোর আগে শহরের বিভিন্ন মাটির ভাটিতে এখন তুঙ্গে ব্যস্ততা। মাটির গন্ধ, কারিগরদের ব্যস্ত হাত এবং সারি সারি প্রদীপ জানান দিচ্ছে—উৎসব আর বেশি দূরে নেই। খুব শীঘ্রই এই প্রদীপগুলিই পৌঁছে যাবে শহরের বিভিন্ন বাজার ও বাড়িতে। সন্ধ্যা নামলেই যখন একে একে জ্বলে উঠবে মাটির প্রদীপ, তখন তার আলোয় শুধু কালীপুজোর রাতই আলোকিত হবে না, আলোকিত হবে বহু মৃৎশিল্পী পরিবারের পরিশ্রম ও ঐতিহ্যও।

কালীপুজোর আলোর উৎসবে তাই মাটির প্রদীপের উপস্থিতি এখনও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক আলোর পাশাপাশি ঐতিহ্যের এই ছোট্ট প্রদীপটিই উৎসবের আবহে এনে দেয় এক অন্যরকম উষ্ণতা। আর সেই আলো জ্বালানোর প্রস্তুতিতেই এখন দিনরাত ব্যস্ত শহরের বিভিন্ন ভাটি ও মৃৎশিল্পীরা।

Preview image