Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কিং কোহলির মিশন ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে মাত্র ৩৬ ম্যাচ, ১০০ সেঞ্চুরির মাইলফলকে পৌঁছতে চাই আরও ১৪টি শতরান পারবেন বিরাট?

ভারতীয় ক্রিকেটের মহাতারকা বিরাট কোহলিকে ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। সামনে ২০২৭ সালের একদিনের আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপ। তার আগে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে বড় প্রশ্ন, বিশ্বকাপের মঞ্চে কি আরও একবার নিজের ব্যাটের জাদু দেখাবেন কিং কোহলি? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০টি শতরানের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করার স্বপ্নকে সামনে রেখে তাঁর প্রতিটি ইনিংসের দিকেই নজর থাকবে সমর্থকদের। বিরাট কোহলি ইতিমধ্যেই নিজের অসাধারণ ব্যাটিং দক্ষতা, ধারাবাহিকতা এবং রান করার ক্ষুধার মাধ্যমে বিশ্ব ক্রিকেটে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর শতরানের রেকর্ড তাঁকে কিংবদন্তিদের সারিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এবার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ১০০টি আন্তর্জাতিক শতরানের মাইলফলক। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে আরও ১৪টি শতরানের প্রয়োজন—এমন হিসাব ধরেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। তবে এই লক্ষ্য পূরণ কতটা সম্ভব, তা নির্ভর করবে তাঁর ফর্ম, ফিটনেস, ম্যাচ খেলার সুযোগ এবং দলের ভবিষ্যৎ সূচির উপর। বিশ্বকাপের আগে হাতে মাত্র ৩৬টি ম্যাচ থাকার যে হিসাব সামনে এসেছে, তা ক্রিকেটপ্রেমীদের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সীমিত ম্যাচে ১৪টি শতরান করা নিঃসন্দেহে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে কোহলির অতীতের পারফরম্যান্স তাঁকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে চাপ সামলানো, বড় রান তাড়া করা এবং ধারাবাহিকভাবে দলকে সাফল্য এনে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর অন্যতম বড় শক্তি।

বিরাট কোহলিকে ঘিরে ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশা বরাবরই আকাশছোঁয়া। ব্যাট হাতে তাঁর প্রতিটি ইনিংস, প্রতিটি চার ছক্কা এবং প্রতিটি শতরান ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এবার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৭ সালের একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপ এবং ১০০টি আন্তর্জাতিক শতরানের ঐতিহাসিক মাইলফলক। সামনে বিশ্বকাপ, আর সেই বড় প্রতিযোগিতার আগে বিরাটের ব্যাট থেকে আরও কতগুলি শতরান আসতে পারে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা। প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, ১০০টি আন্তর্জাতিক শতরানের লক্ষ্যে পৌঁছতে তাঁর আরও ১৪টি শতরান প্রয়োজন এবং বিশ্বকাপের আগে হাতে রয়েছে মাত্র ৩৬টি ম্যাচ এই সমীকরণই ক্রিকেটপ্রেমীদের কৌতূহল বাড়িয়ে তুলেছে। তবে এই ম্যাচসংখ্যা ও শতরানের হিসাবকে বর্তমান পরিসংখ্যান এবং ভবিষ্যৎ সূচির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচের সংখ্যা, খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ এবং ফরম্যাট অনুযায়ী শতরানের সুযোগ সব সময় এক রকম থাকে না। তা সত্ত্বেও বিরাট কোহলির নামের সঙ্গে বড় লক্ষ্য এবং রেকর্ডের আলোচনা যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এখন প্রশ্ন, ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে নিজের ব্যাটিংয়ের ধার আরও বাড়িয়ে তিনি কি নতুন ইতিহাসের দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন?

কোহলির ক্রিকেটজীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, রেকর্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা গভীর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে তিনি ধাপে ধাপে নিজের দক্ষতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং রান করার ক্ষুধার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষ করে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিং তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। রান তাড়া করার সময় পরিস্থিতি বুঝে ইনিংস সাজানো, প্রতিপক্ষের বোলারদের উপর চাপ তৈরি করা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বড় রান করা তাঁর অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য। তাঁর ব্যাটিংয়ে যেমন রয়েছে নান্দনিকতা, তেমনই রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা। সেই কারণেই বিরাট যখনই কোনও বড় লক্ষ্যের সামনে দাঁড়ান, সমর্থকদের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। ১০০টি আন্তর্জাতিক শতরানের মাইলফলকও তেমনই একটি লক্ষ্য, যা অর্জন করতে পারলে তাঁর ক্রিকেটজীবনের সাফল্যের তালিকায় যুক্ত হবে আরও একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়।

বিরাট কোহলির এই লক্ষ্যকে বুঝতে হলে প্রথমেই ফিরে তাকাতে হবে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিসংখ্যানের দিকে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কোহলির আন্তর্জাতিক শতরানের সংখ্যা ৮৬। এর মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে ৩০টি, একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৫৫টি এবং টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একটি শতরান রয়েছে। এই তালিকায় তাঁর উপরে রয়েছেন একমাত্র সচিন তেন্ডুলকর, যিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০টি শতরান করে অবসর নিয়েছেন। কোহলির সামনে তাই রয়েছে ১৪টি শতরান যোগ করে সচিনের রেকর্ড স্পর্শ করার এবং ১৫টি শতরান করে সেই রেকর্ড ছাপিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য।

এই ব্যবধান খুব বড় মনে হলেও কোহলির মতো ব্যাটারের ক্ষেত্রে আলোচনাটি একেবারে অমূলক নয়। তবে এই লক্ষ্য পূরণের জন্য তাঁকে নিজের সেরা ফর্মের পাশাপাশি অসাধারণ ধারাবাহিকতাও বজায় রাখতে হবে।

কোহলির ক্রিকেটজীবনের অন্যতম বড় শক্তি হল তাঁর মানসিক দৃঢ়তা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এমন সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে সামান্য ভুলও দলের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারত। কখনও রান তাড়া করার কঠিন পরিস্থিতি, কখনও শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে ইনিংস গড়ে তোলা, আবার কখনও বড় প্রতিযোগিতায় প্রত্যাশার চাপ সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর ব্যাটিংয়ের বিশেষত্ব হল, পরিস্থিতি অনুযায়ী ইনিংসের গতি বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। শুরুতে সতর্ক থেকে উইকেটে থিতু হওয়া, পরে ফাঁকা জায়গায় বল পাঠিয়ে রান বাড়ানো এবং সুযোগ পেলে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা তাঁর পরিচিত কৌশল। দীর্ঘ ইনিংস খেলার এই ক্ষমতাই তাঁকে বারবার শতরানের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে।

একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোহলির সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ফরম্যাটে তিনি ইতিমধ্যেই ৫৫টি শতরান করেছেন, যা একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ। সচিন তেন্ডুলকরের ৪৯টি একদিনের আন্তর্জাতিক শতরানের রেকর্ড ভেঙে তিনি প্রমাণ করেছেন যে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্স ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল। সেই প্রতিযোগিতায় তিনি একাধিক শতরান করেন এবং টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হিসেবে শেষ করেন। বড় মঞ্চে নিজের সেরাটা তুলে ধরার এই ক্ষমতাই ২০২৭ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে তাঁর সমর্থকদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। কোহলি টেস্ট এবং টি টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক শতরানের সংখ্যায় নতুন সংযোজন ঘটানোর জন্য এখন তাঁর সামনে রয়েছে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই। আগে তিনটি ফরম্যাটে খেলার সুযোগ থাকায় বিভিন্ন ধরনের ম্যাচে শতরান করার সম্ভাবনা তৈরি হতো। এখন সেই সুযোগ সীমিত। একদিনের ক্রিকেটে ব্যাটারদের ইনিংস গড়ার জন্য ৫০ ওভার থাকলেও প্রতিটি ম্যাচে শতরান করার পরিবেশ তৈরি হয় না। কখনও দল দ্রুত জিতে যায়, কখনও ব্যাটিং অর্ডারের কারণে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না, আবার কখনও পিচ এবং প্রতিপক্ষের বোলিংয়ের কারণে বড় ইনিংস গড়া কঠিন হয়ে ওঠে। এই কারণেই ১৪টি শতরানের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে কোহলিকে শুধু ভালো খেললেই হবে না, সুযোগগুলিকেও কাজে লাগাতে হবে।

বিশ্বকাপের আগে হাতে ৩৬টি ম্যাচ থাকার যে হিসাব নিয়ে আলোচনা চলছে, সেটিকেও সতর্কতার সঙ্গে বিচার করা প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সূচি, নির্বাচকদের পরিকল্পনা, চোট এবং বিশ্রামের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে কোহলি বাস্তবে কতগুলি ম্যাচ খেলতে পারবেন। নির্ধারিত সূচিতে কোনও পরিবর্তন হলে তাঁর শতরানের সুযোগের সংখ্যাও বদলে যেতে পারে। আবার বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতায় ভারতের অগ্রগতির উপর নির্ভর করবে দল কতগুলি ম্যাচ খেলবে। তাই ৩৬টি ম্যাচকে নিশ্চিত সুযোগ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং প্রতিটি ম্যাচকে সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে তাঁর পারফরম্যান্সের দিকে নজর দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

ধরা যাক, কোহলি ৩৬টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলেন। সেই পরিস্থিতিতেও ১৪টি শতরান করা অত্যন্ত কঠিন হবে। গড়ে প্রতি আড়াই থেকে তিনটি ম্যাচের মধ্যে একটি শতরান করতে হবে তাঁকে। কিন্তু ক্রিকেটে শতরান শুধু ব্যাটারের ব্যক্তিগত দক্ষতার উপর নির্ভর করে না। পিচের অবস্থা, প্রতিপক্ষের বোলিং, দলের জয়ের লক্ষ্য, ব্যাটিং অর্ডার এবং ম্যাচের পরিস্থিতি সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একজন ব্যাটার ভালো খেলেও ৭০ বা ৮০ রানে আউট হয়ে যেতে পারেন। কখনও দল দ্রুত রান তাড়া করতে গিয়ে শতরানের আগেই ম্যাচ শেষ করে দেয়। আবার কখনও বৃষ্টির কারণে খেলা সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এই সমস্ত অনিশ্চয়তা শতরানের লক্ষ্যে পৌঁছনোর পথে বড় বাধা হতে পারে।

তবে কোহলির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাঁকে নিয়ে আলোচনার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাঁর অপরাজিত ১৩৯ রানের ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। সেই ইনিংসের মাধ্যমে তিনি নিজের ৫৫তম একদিনের আন্তর্জাতিক শতরান করেন এবং আন্তর্জাতিক শতরানের সংখ্যা পৌঁছে দেন ৮৬ তে।

এই ধরনের ইনিংস প্রমাণ করে, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার সমন্বয়ে তিনি এখনও বড় রান করার ক্ষমতা রাখেন। তবে একটি দুর্দান্ত ইনিংসের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের সব ম্যাচে একই ধরনের সাফল্য আসবে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

কোহলির ব্যাটিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর ফিটনেস। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে কার্যকর রাখতে হলে শারীরিক সক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি। একদিনের ক্রিকেটে একজন ব্যাটারকে অনেকক্ষণ ক্রিজে থাকতে হয়। দীর্ঘ ইনিংস খেলার সময় মনোযোগ ধরে রাখা, দ্রুত এক রানকে দুই রানে পরিণত করা এবং ফিল্ডিংয়ের সময় সক্রিয় থাকা সবকিছুই শরীরের উপর চাপ সৃষ্টি করে। কোহলি তাঁর ফিটনেসের প্রতি মনোযোগের জন্য দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। তাঁর এই প্রস্তুতি ভবিষ্যতে আরও বড় ইনিংস খেলার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রাম, পুনরুদ্ধার এবং চোট এড়ানোর বিষয়গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

২০২৭ সালের বিশ্বকাপ কোহলির কাছে আরও একটি বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের একদিনের আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপই ভারতের হয়ে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হবে। অর্থাৎ, এই প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে তাঁর প্রস্তুতি শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডের জন্য নয়, বরং দেশের হয়ে আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠছে 

দীর্ঘ ক্রিকেটজীবনে তিনি ২০১১ সালের বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য ছিলেন। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সত্ত্বেও ভারত ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে যায়। সেই অভিজ্ঞতার পর ২০২৭ সালে আবার বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে।

কোহলির নিজের বক্তব্যেও বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সাফল্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জেতার আনন্দের সঙ্গে তার তুলনা করা কঠিন। একজন ক্রিকেটারের জীবনে বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতা সব সময় আলাদা গুরুত্ব বহন করে। সেখানে প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের শক্তি, মাঠের পরিস্থিতি এবং চাপের মাত্রা ভিন্ন হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া এবং জিম্বাবোয়েতে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৭ সালের বিশ্বকাপেও পরিবেশ ও পিচের বৈচিত্র্য ব্যাটারদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। কোহলিকে সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে এবং দলের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের ব্যাটিংয়ের ধরন নির্ধারণ করতে হবে।

news image
আরও খবর

বিশ্বকাপের আগে তাঁর প্রস্তুতির আরেকটি বড় অংশ হবে একদিনের ক্রিকেটে নিয়মিত ছন্দ ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ বিরতি বা ম্যাচের সংখ্যা কমে গেলে ব্যাটারের ছন্দে প্রভাব পড়তে পারে। তাই সিরিজের পর সিরিজে নিজের পরিকল্পনা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোহলির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষের বোলারদের বিশ্লেষণ, নিজের ব্যাটিংয়ের ভুল সংশোধন এবং শারীরিক প্রস্তুতি—সবই বড় ভূমিকা পালন করবে। তিনি যদি নিজের শক্তির জায়গাগুলিকে কাজে লাগাতে পারেন এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়িয়ে চলেন, তাহলে আরও শতরান করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শতরান করার জন্য ব্যাটারকে শুধু ভালো বল সামলালেই চলে না, খারাপ বলকে কাজে লাগাতে হয়। কোহলির অন্যতম শক্তি হল অফ স্টাম্পের বাইরের বলের বিরুদ্ধে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ফাঁকা জায়গায় শট খেলে রান বের করার ক্ষমতা। পাশাপাশি স্ট্রেট ড্রাইভ, কভার ড্রাইভ, ফ্লিক এবং দ্রুত সিঙ্গল নেওয়ার মতো দক্ষতা তাঁকে দীর্ঘ ইনিংস গড়তে সাহায্য করেছে। বোলাররা যখন তাঁর জন্য আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করবেন, তখন সেই পরিকল্পনার পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রতিপক্ষের কৌশল বুঝে নিজের ব্যাটিংয়ে পরিবর্তন আনতে পারলে তিনি আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারেন।

তবে ব্যক্তিগত শতরানের লক্ষ্য এবং দলের জয়ের লক্ষ্য সব সময় এক নয়। অনেক সময় দলের দ্রুত রান প্রয়োজন হয়, ফলে ব্যাটারকে নিজের শতরানের কথা না ভেবে আক্রমণাত্মক খেলতে হয়। আবার কখনও বড় লক্ষ্য তাড়া করার সময় একজন অভিজ্ঞ ব্যাটারকে শেষ পর্যন্ত উইকেটে থাকতে হয়। কোহলির ক্রিকেটজীবনে এই দুই ধরনের পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বহুবার দলের জয়ের জন্য নিজের ইনিংস সাজিয়েছেন। ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ হবে ব্যক্তিগত মাইলফলকের দিকে নজর রেখেও দলের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে তাঁর সাফল্য বিচার করা হবে শুধু শতরানের সংখ্যা দিয়ে নয়, ভারতীয় দলের জয়ে তাঁর অবদান দিয়েও।

সচিন তেন্ডুলকরের ১০০টি আন্তর্জাতিক শতরানের রেকর্ড বহু বছর ধরে ক্রিকেটের অন্যতম কঠিন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এত দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রান করা সহজ নয়। এর জন্য দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন সুস্থ থাকা, নিয়মিত সুযোগ পাওয়া এবং প্রতিটি ফরম্যাটে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। কোহলি ইতিমধ্যেই ৮৬টি শতরান করে দেখিয়েছেন যে তিনি এই রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছতে সক্ষম। কিন্তু এখন তাঁর সামনে সুযোগের পরিধি সীমিত হওয়ায় প্রতিটি শতরান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি যদি ১০০-র মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন, তবে তা হবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা। আর যদি সেই লক্ষ্য পূরণ না ও হয়, তবুও একদিনের ক্রিকেটে তাঁর শতরানের রেকর্ড এবং দীর্ঘদিনের অবদান বিশেষ মর্যাদা ধরে রাখবে।

ক্রিকেটবিশ্বে কোহলিকে নিয়ে আলোচনার আরেকটি দিক হল তাঁর মানসিকতা। মাঠে তিনি বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার আগ্রহ, নিজের পারফরম্যান্সের মান বাড়ানোর চেষ্টা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে হাল না ছাড়ার প্রবণতা তাঁকে বিশেষভাবে পরিচিত করেছে। তবে অভিজ্ঞতা যত বাড়ে, ততই খেলার ধরনকে পরিণত করতে হয়। আগের মতো সব বলে আক্রমণ না করে সঠিক বল বেছে নেওয়া, উইকেটের মূল্য বোঝা এবং দীর্ঘ ইনিংসের জন্য শক্তি বাঁচিয়ে রাখা ভবিষ্যতের ম্যাচগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে কোহলির শতরানের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।

সমর্থকদের কাছে বিরাট কোহলি শুধু একজন ব্যাটার নন, তিনি আবেগেরও নাম। তাঁর শতরান মানেই সামাজিক মাধ্যমে উদ্‌যাপন, ক্রিকেট বিশ্লেষকদের আলোচনা এবং ভারতীয় দলের জয়ের প্রত্যাশা। বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগে তাঁর প্রতিটি পারফরম্যান্সকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। কারণ ২০২৭ সালের বিশ্বকাপ তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এই কারণে তাঁর ক্রিকেটজীবনের শেষ বিশ্বকাপ-অভিযান নিয়ে আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই আরও বেড়েছে। সমর্থকেরা চাইবেন, তিনি যেন নিজের সেরা ক্রিকেট খেলেন এবং দেশের হয়ে আরেকটি বড় সাফল্য অর্জন করেন।

তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সম্ভাব্য হিসাব অনুযায়ী, ১০০টি আন্তর্জাতিক শতরানে পৌঁছনোর লক্ষ্যটি অত্যন্ত কঠিন। কিছু বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে, বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত কোহলির শতরানের সংখ্যা ৯০ থেকে ৯২ এর মধ্যে পৌঁছতে পারে। এটি কোনও নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বরং তাঁর সাম্প্রতিক ফর্ম, সম্ভাব্য ম্যাচের সংখ্যা এবং অতীতের শতরানের হারের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি অনুমান।

তিনি যদি ধারাবাহিকভাবে বড় ইনিংস খেলেন, তবে এই হিসাব বদলাতে পারে। আবার চোট, বিশ্রাম কিংবা ম্যাচের পরিস্থিতি তাঁর সুযোগ সীমিত করে দিতে পারে। তাই ১০০টি শতরান অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার সময় বাস্তব পরিস্থিতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

এখানে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ১০০টি শতরান স্পর্শ করা এবং সেই রেকর্ড ভাঙা দুটি আলাদা লক্ষ্য। কোহলি যদি আরও ১৪টি শতরান করেন, তবে তাঁর মোট সংখ্যা হবে ১০০। আর ১০০টি অতিক্রম করতে হলে তাঁকে আরও একটি শতরান করতে হবে, অর্থাৎ মোট ১৫টি নতুন শতরান প্রয়োজন। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্রিকেটের ইতিহাসে সচিন তেন্ডুলকরের রেকর্ড শুধু স্পর্শ করাই নয়, সেটিকে ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। কোহলির হাতে কতগুলি ম্যাচ থাকবে এবং তিনি সেই ম্যাচগুলিতে কতবার শতরান করতে পারবেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত এই লক্ষ্য নির্ধারণ করবে।

ভারতীয় দলের জন্যও কোহলির অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। তরুণ ব্যাটারদের পাশে একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার থাকলে বড় প্রতিযোগিতায় দল উপকৃত হতে পারে। চাপের মুহূর্তে কীভাবে ইনিংস সাজাতে হয়, প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা কীভাবে বুঝতে হয় এবং দীর্ঘ টুর্নামেন্টে নিজের মনোযোগ ধরে রাখতে হয়, সেই অভিজ্ঞতা দলের অন্য খেলোয়াড়দেরও সাহায্য করতে পারে। কোহলি যদি ২০২৭ বিশ্বকাপে নিজের সেরা পারফরম্যান্স তুলে ধরতে পারেন, তবে তাঁর অবদান শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের ব্যাটিং লাইনআপকে শক্তিশালী করা এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলের জয়ের সম্ভাবনা বাড়ানোও হবে তাঁর বড় ভূমিকা।

বিশ্বকাপের আগে একদিনের আন্তর্জাতিক সিরিজগুলিও তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রতিটি সিরিজ কোহলিকে নিজের ছন্দ যাচাই করার সুযোগ দেবে। কোথায় তাঁর ব্যাটিং আরও উন্নত করা প্রয়োজন, কোন ধরনের বোলিংয়ের বিরুদ্ধে তিনি বেশি সতর্ক থাকবেন এবং কোন পরিস্থিতিতে আক্রমণ বাড়াবেন এই সব বিষয় নিয়মিত খেলার মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে নির্বাচকদের পরিকল্পনা এবং দলের ব্যাটিং অর্ডারও তাঁর সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি যদি নিয়মিত তিন নম্বর বা উপযুক্ত ব্যাটিং পজিশনে খেলেন, তবে দীর্ঘ ইনিংস গড়ার সুযোগ বেশি পেতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট কোনও ম্যাচে শতরান হবে কি না, তা আগে থেকে বলা অসম্ভব।

বিরাট কোহলির সামনে তাই দুটি বড় লক্ষ্য রয়েছে। একদিকে ২০২৭ সালের বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের চেষ্টা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শতরানের সংখ্যাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে তাঁর আসল পরীক্ষা। বিশ্বকাপের আগে তিনি কতগুলি শতরান করতে পারবেন, তা নিয়ে জল্পনা চলবে। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে প্রতিটি ম্যাচে দলের জন্য কার্যকর অবদান রাখা। শতরান এলে তা হবে বাড়তি আনন্দ, আর শতরান না এলেও দলকে জিততে সাহায্য করতে পারলে সেই ইনিংসের মূল্য কম হবে না।

সব মিলিয়ে, কিং কোহলির ২০২৭ বিশ্বকাপ অভিযান ঘিরে উত্তেজনা ইতিমধ্যেই তুঙ্গে। ১০০টি আন্তর্জাতিক শতরানের লক্ষ্য তাঁর সামনে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। ৮৬ থেকে ১০০ তে পৌঁছতে আরও ১৪টি শতরান দরকার, আর সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজন অসাধারণ ধারাবাহিকতা। তাঁর অভিজ্ঞতা, ব্যাটিং দক্ষতা এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা তাঁকে এই আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর সুযোগ একদিনের ফরম্যাটেই সীমাবদ্ধ। তাই প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি ইনিংস এবং প্রতিটি শতরান তাঁর জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।

কোহলি কি পারবেন সচিন তেন্ডুলকরের ১০০ আন্তর্জাতিক শতরানের রেকর্ড স্পর্শ করতে? নাকি ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে আরও কিছু নতুন মাইলফলক গড়ে নিজের ক্রিকেটজীবনকে সমৃদ্ধ করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট বিশ্বকাপের আগে তাঁর প্রতিটি ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে থাকবে। ২০২৭ সালে দেশের হয়ে শেষ বিশ্বকাপ খেলার লক্ষ্য নিয়ে তিনি এগোচ্ছেন, আর সমর্থকেরা চাইবেন, সেই যাত্রা যেন স্মরণীয় হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলে সেটিই হবে কোহলির জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য। তাঁর ব্যাট থেকে আরও শতরান আসবে কি না, তা সময়ই বলবে  কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অবদান ইতিমধ্যেই ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে।

Preview image