দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে কাজ করলে শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা কখনও গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার কারণ হতে পারে। তাই কাজের ফাঁকে নিয়মিত উঠে হাঁটুন, শরীর সচল রাখুন এবং দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকা এড়িয়ে চলুন।
সকাল থেকে অফিসের চেয়ারে বসে কাজ। একের পর এক মিটিং, কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘক্ষণ থাকা, কাজের চাপে চেয়ার ছেড়ে ওঠার সময় নেই। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আবার মোবাইল ফোন, অনলাইন গেমিং কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিরিজ দেখার অভ্যাস। আধুনিক জীবনের এই রুটিন এখন বহু মানুষের দৈনন্দিন সঙ্গী। কিন্তু এই অভ্যাসের আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকার কারণে শরীরের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার আশঙ্কা বাড়তে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সমস্যাকে বলা হয় ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস বা DVT।
অনেকের ধারণা, রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা মূলত বয়স্ক মানুষ কিংবা দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী রোগীদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। বাস্তবে তা নয়। দীর্ঘক্ষণ নড়াচড়া না করা, সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার, কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যা এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণে তরুণদের মধ্যেও DVT হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দিনের বেশির ভাগ সময় ডেস্কে বসে কাটান, দীর্ঘক্ষণ গাড়ি বা বিমানে যাতায়াত করেন কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেমিং বা ওটিটি দেখেন, তাঁদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস হল শরীরের গভীর শিরার মধ্যে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার একটি অবস্থা। সাধারণত পায়ের গভীর শিরায় এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। তবে শরীরের অন্য অংশেও DVT হতে পারে। রক্ত জমাট বাঁধাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় থ্রম্বাস বলা হয়। এই জমাট রক্ত শিরার মধ্যে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরের রক্তনালির মধ্যে দিয়ে রক্ত নির্দিষ্ট গতিতে চলাচল করে। কিন্তু কোনও কারণে রক্তের প্রবাহ ধীর হয়ে গেলে, রক্তনালির ভিতরের স্তরে ক্ষতি হলে অথবা রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে গেলে থ্রম্বাস তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
DVT-এর সবচেয়ে বড় বিপদ হল, জমাট রক্তের কোনও অংশ ভেঙে রক্তপ্রবাহের সঙ্গে ফুসফুসে পৌঁছে যেতে পারে। সেখানে রক্তনালিতে বাধা তৈরি হলে তাকে বলা হয় পালমোনারি এম্বোলিজম বা PE। এটি একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা এবং দ্রুত চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতী হতে পারে।
তাই পায়ে ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে সব ক্ষেত্রেই DVT হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবার সাধারণ পেশির টান ভেবে সম্ভাব্য গুরুতর লক্ষণ উপেক্ষা করাও উচিত নয়। সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
মানুষের শরীরের রক্ত চলাচল সচল রাখতে পেশির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে পায়ের পেশি হাঁটাচলা করার সময় সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এই নড়াচড়া পায়ের শিরা থেকে রক্তকে হৃদ্যন্ত্রের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ব্যবস্থাকে অনেক সময় পেশির পাম্পিং কার্যকলাপ বলা হয়।
কিন্তু দীর্ঘক্ষণ একই জায়গায় বসে থাকলে পায়ের পেশির নড়াচড়া কমে যায়। ফলে পায়ের শিরায় রক্তের প্রবাহ ধীর হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা DVT-এর অন্যতম পরিচিত ঝুঁকির কারণ।
অফিসে কাজ করার সময় একটানা কয়েক ঘণ্টা চেয়ার ছেড়ে না ওঠা, দীর্ঘ পথ গাড়িতে যাতায়াত, বিমানে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কিংবা সোফায় বসে টানা সিরিজ দেখার মতো অভ্যাস এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে শুধু বসে থাকলেই প্রত্যেকের DVT হবে, এমন নয়। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, পূর্ববর্তী রোগ, ওষুধ এবং অন্যান্য ঝুঁকিও বিবেচ্য।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়মিত বিরতি নিয়ে দাঁড়ানো এবং হাঁটাচলা করা উচিত। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার সময় কমিয়ে শরীরকে সচল রাখলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য পাওয়া যায়।
DVT নিয়ে সচেতনতার অভাবের অন্যতম কারণ হল, অনেকে মনে করেন এটি শুধুই বয়স্কদের সমস্যা। কিন্তু তরুণ বয়সেও এই অসুখ হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করেন এবং নিয়মিত শরীরচর্চা বা হাঁটাচলা করেন না, তাঁদের জীবনযাপনের অভ্যাস খতিয়ে দেখা জরুরি।
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী, ডেস্কে বসে কাজ করা পেশাজীবী, অনলাইন গেমার, দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী এবং যাঁরা নিয়মিত দীর্ঘপথ ভ্রমণ করেন, তাঁদের একটানা নিষ্ক্রিয় থাকার অভ্যাস কমানো উচিত।
তবে ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু বয়স বা বসে থাকার সময়ই একমাত্র বিষয় নয়। আগে DVT হওয়ার ইতিহাস, সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার, হাসপাতালে ভর্তি থাকা, দীর্ঘদিন চলাফেরায় অক্ষমতা, ক্যানসারের মতো কিছু অসুখ, গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী সময় এবং কিছু হরমোন-যুক্ত ওষুধও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান এবং নির্দিষ্ট কিছু দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যাও সামগ্রিক ঝুঁকির মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই প্রত্যেকের জন্য একই ধরনের সতর্কতা বা চিকিৎসা প্রযোজ্য নয়। ব্যক্তিগত ঝুঁকি বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
DVT-এর ক্ষেত্রে সব সময় স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ মৃদু হতে পারে, আবার কারও কোনও লক্ষণ না থাকলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই ঝুঁকির বিষয়টি বোঝার পাশাপাশি সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি।
১. পা ফুলে যাওয়া: সাধারণত একটি পা বা পায়ের নির্দিষ্ট অংশে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে এক পায়ে নতুন করে ফোলা দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
২. পায়ে ব্যথা বা অস্বস্তি: পায়ের পেশিতে ব্যথা, টান বা চাপ অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় হাঁটলে বা দাঁড়ালে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
৩. ত্বকের রং পরিবর্তন: আক্রান্ত অংশের ত্বক লালচে, নীলচে বা অন্য রঙের দেখাতে পারে। তবে ত্বকের রং পরিবর্তন সব রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
৪. আক্রান্ত জায়গায় উষ্ণতা: পায়ের যে অংশে জমাট রক্ত তৈরি হয়েছে, সেখানে অন্য অংশের তুলনায় বেশি গরম অনুভূত হতে পারে।
৫. শিরার আশপাশে স্পর্শকাতরতা: আক্রান্ত জায়গায় চাপ দিলে ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে।
এই লক্ষণগুলি অন্য কারণেও দেখা দিতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে নিজে থেকে DVT নির্ণয় করা সম্ভব নয়। সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসক ডপলার আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন।
DVT-এর সবচেয়ে গুরুতর জটিলতাগুলির মধ্যে একটি হল পালমোনারি এম্বোলিজম। পায়ের শিরায় তৈরি হওয়া জমাট রক্তের একটি অংশ ভেঙে রক্তপ্রবাহের সঙ্গে ফুসফুসের রক্তনালিতে পৌঁছে গেলে এই সমস্যা হতে পারে।
ফুসফুসের রক্তনালিতে বাধা তৈরি হলে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ এবং হৃদ্যন্ত্রের কাজ ব্যাহত হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুও হতে পারে।
পালমোনারি এম্বোলিজমের সম্ভাব্য সতর্কসংকেতের মধ্যে রয়েছে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, শ্বাস নেওয়ার সময় বুকে ব্যথা, দ্রুত হৃদ্স্পন্দন, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং কখনও কাশির সঙ্গে রক্ত বের হওয়া।
এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা করা বা বাড়িতে নিজে থেকে চিকিৎসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা নিতে হবে। আগে থেকে পায়ে ফোলা বা ব্যথা থাকলে এবং তার সঙ্গে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথা শুরু হলে বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা অনেক পেশারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কাজের ধরন না বদলালেও দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা সম্ভব।
প্রথমত, নিয়মিত বিরতি নিন। দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ান। অফিসে সম্ভব হলে অল্প সময় হাঁটুন। মিটিংয়ের মধ্যে বিরতি থাকলে সেই সময়টুকু কাজে লাগাতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, পায়ের নড়াচড়া বজায় রাখুন। বসে থাকার সময় গোড়ালি ওঠানো-নামানো বা পায়ের পাতা নাড়ানোর মতো সহজ নড়াচড়া করা যেতে পারে। তবে এই ধরনের ব্যায়াম দীর্ঘক্ষণ অচল থাকার বিকল্প নয় এবং DVT পুরোপুরি প্রতিরোধের নিশ্চয়তাও দেয় না।
তৃতীয়ত, কাজের জায়গা এমনভাবে সাজান যাতে উঠতে উৎসাহ পান। প্রয়োজনীয় জিনিস সব সময় হাতের কাছে রাখার বদলে কাজের উপযোগীভাবে এমন ব্যবস্থা করতে পারেন, যাতে বিরতির সময় উঠে নড়াচড়া করা সহজ হয়। দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলা বা সহকর্মীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হেঁটে যাওয়া ছোট অভ্যাস হিসেবে কাজে আসতে পারে।
চতুর্থত, শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তুলুন। নিয়মিত হাঁটা এবং নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়াম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে DVT-এর ঝুঁকি বেশি থাকলে কোন ধরনের শরীরচর্চা উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো।
পঞ্চমত, উপসর্গকে গুরুত্ব দিন। এক পায়ে অস্বাভাবিক ফোলা, ব্যথা বা উষ্ণতা দেখা দিলে সেটিকে শুধু ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যাবেন না।
কাজের বাইরে অবসর কাটানোর জন্য অনলাইন গেমিং, সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ দেখা এখন অত্যন্ত পরিচিত অভ্যাস। কিন্তু কোনও কনটেন্টে মনোযোগ দিয়ে টানা কয়েক ঘণ্টা বসে থাকলে কখন সময় কেটে যায়, অনেকেই বুঝতে পারেন না।
এ ক্ষেত্রে বিরতির পরিকল্পনা করে রাখা যেতে পারে। দীর্ঘ পর্ব দেখার মাঝখানে উঠে হাঁটুন, জল আনতে যান অথবা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শরীর নাড়াচাড়া করুন। গেম খেলার সময়ও ম্যাচ বা রাউন্ডের মাঝের বিরতিগুলিকে কাজে লাগানো যায়।
মোবাইল বা কম্পিউটারে রিমাইন্ডার সেট করে নির্দিষ্ট বিরতিতে নড়াচড়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সোফা বা বিছানায় দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে পড়ে থাকার বদলে শরীরের অবস্থান বদলানো এবং নিয়মিত হাঁটাচলা করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
তবে মনে রাখতে হবে, মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ালেই সব ধরনের রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি দূর হয় না। আগে DVT হয়ে থাকলে, সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে অথবা অন্য কোনও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘক্ষণ গাড়ি, বাস, ট্রেন বা বিমানে বসে থাকলেও পায়ের রক্ত চলাচল ধীর হতে পারে। তাই দীর্ঘ যাত্রার সময় নিরাপদ সুযোগ পেলে বিরতি নিয়ে হাঁটাচলা করুন। বিমানে বা ট্রেনে বসে থাকলে পায়ের পাতা ও গোড়ালি নাড়ানোর চেষ্টা করুন।
ভ্রমণের সময় পর্যাপ্ত জল পান করা এবং নিজের স্বাভাবিক শারীরিক প্রয়োজনের দিকে নজর রাখা ভালো। তবে জল পান করাই DVT প্রতিরোধের নিশ্চয়তা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দীর্ঘ সময় অচল হয়ে না থাকা এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া।
যাঁদের আগে DVT হয়েছে, সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচার হয়েছে, গর্ভাবস্থা বা প্রসব-পরবর্তী সময় চলছে অথবা একাধিক ঝুঁকির কারণ রয়েছে, তাঁদের দীর্ঘপথ ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বিশেষ ব্যবস্থা, কমপ্রেশন স্টকিংস বা ওষুধের বিষয়ে নির্দেশ দিতে পারেন। নিজে থেকে রক্ত পাতলা করার ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও DVT-এর ঝুঁকি একাধিক কারণে বাড়তে পারে। যেমন—
আগে DVT বা পালমোনারি এম্বোলিজম হওয়ার ইতিহাস।
সাম্প্রতিক বড় অস্ত্রোপচার বা হাসপাতালে ভর্তি থাকা।
দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে থাকা বা চলাফেরায় অক্ষমতা।
কিছু ধরনের ক্যানসার এবং তার চিকিৎসা।
গর্ভাবস্থা ও প্রসবের পরবর্তী সময়।
কিছু হরমোন-যুক্ত ওষুধের ব্যবহার।
রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায় এমন কিছু বংশগত বা অর্জিত সমস্যা।
দীর্ঘপথ ভ্রমণ এবং দীর্ঘক্ষণ নড়াচড়াহীন থাকা।
বয়স বৃদ্ধি এবং একাধিক ঝুঁকির কারণ একসঙ্গে থাকা।
এই তালিকায় কোনও একটি বিষয় থাকলেই DVT হবে, এমন নয়। আবার কোনও পরিচিত ঝুঁকি না থাকলেও রোগটি হতে পারে। নিজের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।
পায়ের একদিকে নতুন করে ফোলা, ব্যথা, ত্বকের রং পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা, ডি-ডাইমার রক্তপরীক্ষা এবং শিরার ডুপ্লেক্স আল্ট্রাসাউন্ডের মতো পরীক্ষা করতে পারেন। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে, তা রোগীর উপসর্গ ও সামগ্রিক ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে।
নিজে থেকে অ্যাসপিরিন বা অন্য কোনও রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাবেন না। একইভাবে সন্দেহজনক উপসর্গকে অবহেলা করে শুধু বিশ্রাম নিয়ে অপেক্ষা করাও ঠিক নয়। জরুরি লক্ষণ দেখা দিলে সরাসরি জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা নিতে হবে।
DVT নির্ণয় হলে চিকিৎসক সাধারণত রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা করেন। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট বা রক্ত জমাট বাড়তে বাধা দেয় এমন ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এই ওষুধ জমাট রক্তকে সঙ্গে সঙ্গে গলিয়ে দেয় না; বরং জমাট আরও বড় হওয়া এবং নতুন জমাট তৈরির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, যাতে শরীর ধীরে ধীরে জমাটটি শোষণ করতে পারে। ওষুধ কত দিন চলবে, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করেন।
আধুনিক কর্মজীবনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা অনেক সময় এড়ানো কঠিন। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা বা বিনোদনের কারণে শরীরের প্রয়োজনীয় নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ রাখা ঠিক নয়। নিয়মিত বিরতি, হাঁটাচলা এবং নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিশেষ করে যাঁদের আগে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা হয়েছে বা অন্য কোনও ঝুঁকির কারণ রয়েছে, তাঁদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। সবার জন্য একই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা উপযুক্ত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
মনে রাখবেন, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলেই যে DVT হবে, তা নয়। কিন্তু একটানা অচল থাকার অভ্যাসের সঙ্গে অন্য ঝুঁকির কারণ যুক্ত হলে বিপদ বাড়তে পারে। পায়ের অস্বাভাবিক ফোলা বা ব্যথাকে অবহেলা করবেন না। আর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিকল্প নয়।