ক্লাবের মহিলারাই নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন মণ্ডপসজ্জার দায়িত্ব। তাঁদের উদ্যোগ, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতায় নতুন রূপ পাচ্ছে পুজোর মণ্ডপ।
পাঁশকুড়া: একসঙ্গে কাজ করার তাগিদ থেকেই শুরু হয়েছিল পথচলা। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজেদের উদ্যোগে কিছু করার ইচ্ছা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব—এই তিনকে সঙ্গী করেই কয়েক জন মহিলা গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের ক্লাব। সময়টা ২০২৩ সাল। সেই বছরই পাঁশকুড়ার পাতন্দায় তৈরি হয় ‘বীরাঙ্গনা সঙ্ঘ’। দেখতে দেখতে এই সংগঠনের উদ্যোগে শুরু হয় সরস্বতী পুজো। তার পরে গত বছর থেকে দুর্গোৎসবের আয়োজনও শুরু করেছেন ক্লাবের সদস্যরা। এ বার তাঁদের দুর্গাপুজোর থিম ‘অক্ষরজ্ঞান’। পুজোর আনন্দের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
গ্রামীণ পরিবেশে আয়োজিত এই দুর্গাপুজো ইতিমধ্যেই এলাকার মানুষের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করেছে। তবে বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের পুজোর বিশেষত্ব শুধু প্রতিমা দর্শন কিংবা মণ্ডপসজ্জায় সীমাবদ্ধ নয়। পুজোর প্রতিটি আয়োজনের মধ্যে রয়েছে একটি সামাজিক বার্তা। অক্ষরজ্ঞান যে মানুষের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝাতে মণ্ডপজুড়ে সাজানো হয়েছে স্লেট, খাতা, পেনসিল এবং শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন উপকরণের মডেল। একই সঙ্গে পথ নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং ডেঙ্গি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির বার্তাও তুলে ধরা হয়েছে মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পাঁশকুড়ার মাইশোরা পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পাতন্দা এলাকার স্থানীয় বাজারে আগে থেকেই বারোয়ারি দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়। কিন্তু সেই পুজোয় মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তুলনামূলক ভাবে কম ছিল বলে মনে করতেন বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের সদস্যরা। পুজোর মতো একটি বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মহিলারাও যে সমান দক্ষতায় দায়িত্ব নিতে পারেন, সেই ভাবনা থেকেই নিজেদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন তাঁরা।
২০২৩ সালে কয়েক জন মহিলা একত্রিত হয়ে তৈরি করেন ‘বীরাঙ্গনা সঙ্ঘ’। সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে ছিল একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা, সামাজিক দায়িত্ব পালনের মানসিকতা এবং নিজেদের উদ্যোগে নতুন কিছু করে দেখানোর আগ্রহ। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, এমন একটি মঞ্চ তৈরি করা, যেখানে মহিলারা নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারবেন, বিভিন্ন কাজে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারবেন এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবেন।
সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ক্লাবের পথচলা। প্রথম দিকে সরস্বতী পুজোর আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক কাজ এগিয়ে নিয়ে যান সদস্যরা। ধীরে ধীরে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তাঁরা। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে দুর্গাপুজোর মতো বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে কাজে আসে।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের দুর্গাপুজোর সূচনা ২০২৫ সালে। ক্লাবের সম্পাদিকা সুনীতা মান্নার উদ্যোগে এবং অন্য সদস্যদের সহযোগিতায় দুর্গাপুজো আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধু পরিকল্পনা করেই থেমে থাকেননি তাঁরা। পুজোর জন্য প্রয়োজনীয় টাকা, চাল এবং অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করতে নিজেরাই উদ্যোগী হন। একে একে বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে শুরু হয় প্রস্তুতি।
একটি দুর্গাপুজো আয়োজনের জন্য যে পরিকল্পনা, পরিশ্রম এবং পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তা সদস্যরা নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। পুজোর আয়োজন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করা, মণ্ডপের পরিকল্পনা করা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি—সব ক্ষেত্রেই তাঁদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।
প্রথম বছরেই এলাকার মানুষের নজর কাড়ে বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের পুজো। মহিলাদের নিজেদের উদ্যোগে এমন একটি আয়োজন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করে। সেই সাফল্যকে সঙ্গী করেই এ বছর আরও একটি নতুন ভাবনা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন ক্লাবের সদস্যরা। তাঁদের বিশ্বাস, দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ানোর এবং সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের প্রধান আকর্ষণ ‘অক্ষরজ্ঞান’ থিম। শিক্ষা মানুষের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং অক্ষর চেনার প্রাথমিক অভ্যাস কী ভাবে জ্ঞানের জগতে প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন আয়োজকেরা।
অক্ষরজ্ঞান বলতে মূলত অক্ষর চেনা, পড়তে শেখা এবং লেখার প্রাথমিক দক্ষতা অর্জনকে বোঝায়। দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন তথ্য বোঝা, নিজের প্রয়োজনীয় কথা অন্যকে জানানো, সরকারি নির্দেশিকা পড়া কিংবা বিভিন্ন পরিষেবা সম্পর্কে জানা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতেই এই বিষয়টিকে দুর্গাপুজোর থিম হিসেবে বেছে নিয়েছেন ক্লাবের সদস্যরা।
মণ্ডপে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে শিক্ষা-সংক্রান্ত নানা উপকরণের ব্যবহার। পরিবেশবান্ধব সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। ভিতরে ঝোলানো রয়েছে অসংখ্য স্লেট। সেই স্লেটগুলিতে চক দিয়ে লেখা হয়েছে অক্ষরজ্ঞান অর্জনের প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন অক্ষর। শিশুদের প্রথম লেখা শেখার পরিচিত পরিবেশকে মণ্ডপের সাজসজ্জায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
স্লেটের পাশাপাশি পেনসিল, খাতা এবং বিভিন্ন শিক্ষা-সামগ্রীর মডেল দিয়েও সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। পরিচিত এই উপকরণগুলি সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষার গুরুত্বকে সহজ ভাবে তুলে ধরতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং প্রত্যেক মানুষের শেখার সুযোগ থাকা কেন জরুরি, সেই বিষয়টি মণ্ডপের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, মণ্ডপসজ্জার দায়িত্ব নিজেরাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন ক্লাবের মহিলারা। তাঁদের উদ্যোগ, শ্রম এবং পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে এ বছরের মণ্ডপ। সাজসজ্জার প্রতিটি অংশে থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহার করে মণ্ডপ তৈরি করার ভাবনাও এই আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পুজোর সময় নানা ধরনের সাজসজ্জার উপকরণ ব্যবহার করা হয়। সেই জায়গায় পরিবেশের কথা মাথায় রেখে উপকরণ নির্বাচন করার চেষ্টা করেছেন আয়োজকেরা। তাঁদের লক্ষ্য, উৎসবের আনন্দ বজায় রেখেই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে দর্শনার্থীরা সামাজিক বার্তা গ্রহণ করতে পারবেন।
মণ্ডপের ভিতরে স্লেট ও অক্ষরের ব্যবহার শুধু সাজসজ্জার উপাদান নয়, বরং গোটা থিমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অক্ষরজ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ থেকে শিক্ষার বৃহত্তর গুরুত্ব—এই ধারণাকে সহজ ও পরিচিত উপায়ে মানুষের সামনে তুলে ধরাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের মণ্ডপের চারপাশে তৈরি করা হয়েছে পাকা দালানের আদল। সেই দালানগুলিতে পোস্টারের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক বিষয়। তার মধ্যে অন্যতম পথ নিরাপত্তা।
রাস্তায় চলাফেরার সময় সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই পথচারী, সাইকেল আরোহী, মোটরবাইক চালক কিংবা গাড়ির চালক—সবারই ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। রাস্তা পারাপারের সময় সতর্ক থাকা, ট্রাফিক সিগন্যাল মানা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা এবং মোটরবাইক চালানোর সময় হেলমেট পরার মতো অভ্যাস দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
মণ্ডপের পোস্টারের মাধ্যমে পথ নিরাপত্তার মতো একটি প্রয়োজনীয় বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে। দুর্গাপুজোয় বহু মানুষ মণ্ডপ দেখতে বের হন। সেই সময় এই ধরনের বার্তা সাধারণ মানুষের নজরে এলে দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতনতা বাড়তে পারে। উৎসবের মঞ্চকে ব্যবহার করে মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
মণ্ডপসজ্জায় আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাল্যবিবাহ রোধ। বাল্যবিবাহ শিশুদের শিক্ষা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যতের সুযোগের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষাজীবন মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ার মতো সমস্যার সঙ্গে এই বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার, স্থানীয় সমাজ এবং প্রশাসনের সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অভিভাবকদের বোঝানো এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সাহায্য নেওয়া—এই বিষয়গুলি সামাজিক সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের মণ্ডপে বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে সদস্যরা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, উৎসবের আয়োজনের পাশাপাশি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলিকেও আলোচনার কেন্দ্রে আনা যায়। বিশেষ করে মহিলাদের উদ্যোগে আয়োজিত একটি পুজোয় এই বিষয়টির উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ শিক্ষা, মেয়েদের অধিকার এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলিতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
পথ নিরাপত্তা এবং বাল্যবিবাহের পাশাপাশি ডেঙ্গি সচেতনতার বিষয়টিও স্থান পেয়েছে বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের মণ্ডপে। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে জমে থাকা জলে মশার বংশবিস্তার হতে পারে। তাই বাড়ির আশপাশে জল জমতে না দেওয়া এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ডেঙ্গি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম কিংবা ছাদে পড়ে থাকা বিভিন্ন জিনিসে জল জমে থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাড়ির আশপাশের নালা ও জল জমার জায়গাগুলির দিকেও নজর রাখা জরুরি। জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপুজোর মণ্ডপে ডেঙ্গি সচেতনতার বার্তা তুলে ধরার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি জনস্বাস্থ্য বিষয়কে সামনে আনা হয়েছে। পুজোর সময় মণ্ডপে আসা দর্শনার্থীরা যাতে উৎসবের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের বিষয়েও সচেতন হন, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
থিমভিত্তিক মণ্ডপসজ্জার পাশাপাশি বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের প্রতিমার রূপ রাখা হয়েছে সাবেক। অর্থাৎ, মণ্ডপের সাজসজ্জায় আধুনিক সামাজিক ভাবনা থাকলেও প্রতিমার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী রূপকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক আবেগ এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। একদিকে নতুন নতুন থিম দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে, অন্যদিকে সাবেক প্রতিমা অনেকের কাছে পরিচিত উৎসবের আবহ ফিরিয়ে আনে। বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের আয়োজনেও এই দুইয়ের মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে। অক্ষরজ্ঞান, পথ নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ রোধ ও ডেঙ্গি সচেতনতার মতো সামাজিক বিষয়কে মণ্ডপে তুলে ধরা হয়েছে, আর প্রতিমায় রাখা হয়েছে ঐতিহ্যের ছোঁয়া।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের দুর্গাপুজোকে ঘিরে শুধু মণ্ডপসজ্জা নয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়েও রয়েছে সদস্যদের পরিকল্পনা। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানগুলিতে অংশ নেবেন ক্লাবের মহিলারা।
স্থানীয় স্তরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। গান, আবৃত্তি কিংবা অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের সদস্যদের নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পুজোর দিনগুলিতে এলাকার মানুষ মণ্ডপে আসবেন, প্রতিমা দর্শন করবেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। ফলে পুজোকে কেন্দ্র করে একটি সামাজিক মিলনক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রামীণ এলাকার এই ধরনের আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতেও সাহায্য করে।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের পুজোর আর একটি বিশেষ দিক হল সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের লোকজনের একত্রে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন। পুজোর কয়েক দিন দু’বেলা এই আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সদস্যদের মধ্যে একসঙ্গে সময় কাটানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ আরও মজবুত করার সুযোগ তৈরি হবে।
একটি ক্লাবের আয়োজন সফল করতে শুধু আর্থিক সংস্থান কিংবা মণ্ডপসজ্জাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। একসঙ্গে খাওয়াদাওয়ার মতো আয়োজন সেই পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও নিবিড় করতে সাহায্য করতে পারে।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে পুজোর আয়োজন করছেন। ফলে উৎসবের দিনগুলিতে তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও একসঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পুজোর আনন্দকে ব্যক্তিগত পরিসর থেকে বের করে সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় পরিণত করার এই প্রচেষ্টা গ্রামীণ এলাকার সামাজিক জীবনের সঙ্গে বিশেষ ভাবে মানানসই।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের এ বছরের দুর্গাপুজোর উদ্বোধন বৃহস্পতিবার পঞ্চমীতে করবেন পাঁশকুড়া পশ্চিমের বিধায়ক সিন্টু সেনাপতি। উদ্বোধনকে ঘিরে আয়োজকদের মধ্যে উৎসাহ রয়েছে। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত চলবে পুজোর বিভিন্ন আয়োজন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মহিলাদের নিজেদের উদ্যোগে তৈরি এই পুজো স্থানীয় স্তরে একটি বিশেষ পরিচিতি তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে। তাঁদের পরিকল্পনায় যেমন রয়েছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব, তেমনই রয়েছে শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে পুজোর মণ্ডপ দর্শনার্থীদের কাছে শুধুমাত্র প্রতিমা দর্শনের জায়গা হয়ে থাকছে না; বরং বিভিন্ন সামাজিক বার্তা জানারও একটি পরিসর তৈরি করছে।
দুর্গাপুজো বাঙালির অন্যতম বড় উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আনন্দ, মিলন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক জায়গায় পুজোর থিমের মাধ্যমে পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়। বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের ‘অক্ষরজ্ঞান’ থিমও সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত।
এখানে শিক্ষার প্রাথমিক ধাপকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাক্ষরতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি পথ নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং ডেঙ্গি সচেতনতার বার্তা দেখিয়ে বোঝানো হয়েছে, সমাজের নানা সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে স্থানীয় উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিশেষ করে কয়েক জন মহিলার সম্মিলিত উদ্যোগে এই আয়োজন তৈরি হওয়া ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৩ সালে ক্লাব গঠনের পর সরস্বতী পুজো দিয়ে শুরু, ২০২৫ সালে দুর্গাপুজোর আয়োজন এবং ২০২৬ সালে ‘অক্ষরজ্ঞান’ থিমের মাধ্যমে সচেতনতার বার্তা—এই ধারাবাহিকতা তাঁদের উদ্যোগের বিকাশকে তুলে ধরে।
পুজোর আয়োজন করতে গিয়ে সদস্যরা টাকা, চাল ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। মণ্ডপসজ্জার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়েছেন। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সম্মিলিত খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন। এই সবকিছুর মধ্যে রয়েছে দলগত কাজের অভিজ্ঞতা এবং একসঙ্গে এগিয়ে চলার চেষ্টা।
অক্ষরজ্ঞান মানুষের শেখার প্রথম ধাপ। সেই ধাপ থেকেই শুরু হয় বৃহত্তর জ্ঞান অর্জনের যাত্রা। একজন মানুষ পড়তে ও লিখতে পারলে দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন তথ্য বুঝতে, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা গ্রহণ করতে আরও সুবিধা পান। তাই সাক্ষরতার প্রসার ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের সদস্যরা এই বিষয়টিকেই তাঁদের দুর্গাপুজোর মূল ভাবনা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। স্লেট, চক, খাতা ও পেনসিলের মাধ্যমে অক্ষরজ্ঞানকে সহজ ও পরিচিত রূপে তুলে ধরেছেন তাঁরা। মণ্ডপের চারপাশে পথ নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং ডেঙ্গি সচেতনতার বার্তা দিয়ে সামাজিক দায়িত্বের পরিসরকেও আরও বিস্তৃত করেছেন।
পাঁশকুড়ার পাতন্দায় এই পুজো তাই একদিকে ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে মহিলাদের সম্মিলিত উদ্যোগের পরিচয়। নিজেদের শ্রম ও পরিকল্পনায় মণ্ডপ সাজিয়ে এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে ক্লাবের সদস্যরা দেখাতে চেয়েছেন, ইচ্ছা ও সহযোগিতা থাকলে স্থানীয় স্তরেও অর্থবহ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
বীরাঙ্গনা সঙ্ঘের এই আয়োজনের কেন্দ্রে রয়েছে একসঙ্গে কাজ করার ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছিল ক্লাব, সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছিল দুর্গোৎসব। এ বার ‘অক্ষরজ্ঞান’ থিমের মাধ্যমে তাঁদের বার্তা—উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি শিক্ষা ও সচেতনতার আলোও পৌঁছে যাক মানুষের কাছে।