প্রথম চাকরিতে মাসিক বেতন ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে কর্মচারীকে ইপিএফ পেনশন স্কিমে (ইপিএস) অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। ইপিএফও-র নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতনভোগীরাই বাধ্যতামূলকভাবে ইপিএস সদস্য হবেন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ভারতের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রক এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করল। টানা ১২ বছর পর ইপিএফও-র বেতনসীমা ১৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হলো । এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের প্রায় ৫১ লাখ নতুন কর্মচারী ইপিএফ, ইপিএস এবং ইডিএলআই-এর আওতায় আসবেন বলে সরকার আশা করছে । কিন্তু এই বড় পরিবর্তনের সঙ্গেই এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্ম নিয়ম, যা অনেক নতুন কর্মজীবীর কাছেই স্পষ্ট নয়। প্রথম চাকরিতে মাসিক বেতন ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে সেই কর্মচারী পেনশন স্কিমের আওতায় থাকবেন না । অর্থাৎ, তিনি ইপিএফ-এ যুক্ত থাকবেন, কিন্তু পেনশন সুবিধা পাবেন না।
ইপিএফও-র বেতনসীমা সবশেষ বাড়ানো হয়েছিল ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন তা ৬,৫০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা করা হয়েছিল । এরপর দীর্ঘ ১২ বছর এই সীমা অপরিবর্তিত ছিল। এই সময়ে দেশের মজুরি কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তরুণ প্রজন্মের বেতন বেড়েছে, কিন্তু ইপিএফ কাঠামো সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না। ২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এই প্রস্তাব অনুমোদন করে, এবং ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে এটি কার্যকর হয় ।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত “মজুরির স্থায়ী বৃদ্ধি, বাড়তে থাকা আয় এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ধারাবাহিক সম্প্রসারণকে প্রতিফলিত করে” । এর ফলে ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতনভোগী কর্মচারীরা প্রথমবারের মতো ইপিএফ, ইপিএস এবং ইডিএলআই-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় আসছেন ।
ইপিএফও-র নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইপিএস সদস্যপদ নির্ধারণ হবে তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে ।
প্রথম পরিস্থিতি: বেতন ২৫ হাজার টাকা বা কম
যদি কোনো কর্মচারীর বেতন ও ডিএ সহ মোট মজুরি ২৫ হাজার টাকা বা তার কম হয়, তাহলে ইপিএফ-এর সঙ্গে ইপিএস-এ অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক । এই ক্ষেত্রে কর্মচারী আগে ইপিএস সদস্য ছিলেন কি না, তা যাচাই করার প্রয়োজন নেই। নতুন বেতনসীমার অধীনে যোগ্য হলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইপিএস-এর সুবিধা পাবেন ।
দ্বিতীয় পরিস্থিতি: বেতন ২৫ হাজারের বেশি, কিন্তু পূর্বে ইপিএস সদস্য ছিলেন
যদি কোনো কর্মচারীর বর্তমান বেতন ২৫ হাজারের বেশি হয়, কিন্তু তিনি আগে ইপিএস সদস্য ছিলেন, তাহলে তাঁর ইপিএস সদস্যপদ বাধ্যতামূলকভাবে বহাল থাকবে । অর্থাৎ, বেতন বেড়ে যাওয়ার কারণে তিনি ইপিএস থেকে বাদ পড়বেন না।
তৃতীয় পরিস্থিতি: বেতন ২৫ হাজারের বেশি এবং পূর্বে ইপিএস সদস্য ছিলেন না
এটিই সেই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। যদি কোনো কর্মচারীর বেতন ২৫ হাজারের বেশি হয় এবং তিনি আগে কখনো ইপিএস সদস্য না হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর জন্য ইপিএস-এ কোনো নতুন অবদান জমা হবে না । তিনি ইপিএফ-এর সদস্য হিসেবে continue করবেন, কিন্তু পেনশন স্কিমের সুবিধা পাবেন না।
এই নিয়মের পেছনে রয়েছে ইপিএস-এর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। ইপিএস একটি নির্দিষ্ট অবদান-নির্দিষ্ট সুবিধা (defined contribution-defined benefit) সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প । এখানে নিয়োগকর্তার ১২% অবদানের মধ্যে ৮.৩৩% পেনশন তহবিলে যায়, আর বাকি ৩.৬৭% ইপিএফ অ্যাকাউন্টে জমা হয় । সরকারও অতিরিক্ত ১.১৬% অবদান রাখে ।
পেনশন তহবিলের আর্থিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা বিবেচনায় এই নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে । যদি ২৫ হাজারের বেশি বেতনভোগী নতুন কর্মচারীদেরও ইপিএস-এ অন্তর্ভুক্ত করা হতো, তাহলে তহবিলের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতো।
ইপিএফও নিয়োগকর্তাদের জন্য বিশেষ নির্দেশিকা জারি করেছে। ২৫ হাজারের বেশি বেতনভোগী নতুন কর্মচারী নিয়োগের সময় শুধু বর্তমান বেতন দেখে ইপিএস সদস্যপদ নির্ধারণ করা যাবে না। কর্মচারীর ইউনিভার্সাল অ্যাকাউন্ট নম্বর (ইউএএন) যাচাই করে দেখতে হবে তিনি আগে ইপিএস সদস্য ছিলেন কি না ।
ইপিএফও-র সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলা হয়েছে, “২৫ হাজারের বেশি বেতনভোগী কর্মচারীর ক্ষেত্রে ইপিএস অবদান করা উচিত কি না, তা নির্ধারণে কর্মচারীর পূর্ববর্তী ইপিএস সদস্যপদ গুরুত্বপূর্ণ।” যদি কোনো কর্মচারী আগে ইপিএস সদস্য না হন এবং বেতন ২৫ হাজারের বেশি হয়, তাহলে তাঁর জন্য ইপিএস-এ কোনো অবদান কাটা যাবে না ।
ইপিএফও সতর্ক করেছে, যদি ভুলবশত ২৫ হাজারের বেশি বেতনভোগী এবং পূর্বে ইপিএস-অসদস্য কর্মচারীর বেতন থেকে ইপিএস অবদান কাটা হয়, তাহলে নিয়োগকর্তাকে দ্রুত ইপিএফও-র সঙ্গে যোগাযোগ করে তা সংশোধন করতে হবে । ভুল অবদান ভবিষ্যতে পেনশন বা অন্যান্য দাবি নিষ্পত্তির সময় জটিলতা তৈরি করতে পারে।
নতুন বেতনসীমার ফলে ইপিএফ অবদানেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২৫ হাজার টাকা বেতনের ক্ষেত্রে কর্মচারী ও নিয়োগকর্তা উভয়ের ১২% হারে অবদান হবে ৩,০০০ টাকা । এর মধ্যে নিয়োগকর্তার ৩,০০০ টাকার মধ্যে ২,০৮২.৫০ টাকা (৮.৩৩%) ইপিএস-এ যাবে এবং ৯১৭.৫০ টাকা ইপিএফ-এ জমা হবে ।
পূর্বে ১৫ হাজার টাকা সীমার অধীনে নিয়োগকর্তার অবদান ছিল ১,৮০০ টাকা, যার মধ্যে ১,২৪৯.৫০ টাকা ইপিএস-এ যেত । অর্থাৎ, নতুন ব্যবস্থায় ইপিএস-এ যাওয়া পরিমাণ প্রায় ৮৩৩ টাকা বেড়েছে।
ইপিএস পেনশন নির্ধারিত হয় শেষ ৬০ মাসের গড় বেতন এবং পেনশনযোগ্য সেবার ভিত্তিতে। সূত্র হলো: পেনশন = (পেনশনযোগ্য বেতন × পেনশনযোগ্য সেবা) ÷ ৭০ ।
দশ বছরের সেবার ক্ষেত্রে পুরনো ১৫ হাজার টাকা সীমায় পেনশন হতো ২,১৪৩ টাকা। নতুন ২৫ হাজার টাকা সীমায় তা হবে ৩,৫৭২ টাকা—অর্থাৎ মাসে ১,৪২৯ টাকা বৃদ্ধি । তবে এই সুবিধা পেতে কমপক্ষে পাঁচ বছর নতুন বেতনসীমার অধীনে অবদান রাখতে হবে ।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলেন ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতনভোগী কর্মচারীরা। তাঁরা প্রথমবারের মতো ইপিএফ, পেনশন এবং বিমা সুরক্ষার আওতায় আসছেন । আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং কর্মী ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত সহায়ক হবে ।
কিন্তু যাঁদের বেতন ২৫ হাজারের বেশি এবং যাঁরা নতুন কর্মজীবী, তাঁদের জন্য ইপিএস সুবিধা নেই। তাঁদের জন্য ইপিএফ সঞ্চয় এবং বিমা সুরক্ষা থাকলেও পেনশন সুবিধা থাকবে না ।
ইপিএফও নিয়োগকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে, তাঁরা যেন ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতনভোগী কর্মচারীদের রেকর্ড পরীক্ষা করেন, পে-রোল আপডেট করেন এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির জন্য ইলেকট্রনিক চালান-কাম-রিটার্ন (ইসিআর) দাখিল করেন । সেপ্টেম্বর মাসের ক্ষেত্রে অবদান গণনা দুই ভাগে হবে—১ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর এবং ১৭ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ।
২০২৬ সালে ইপিএস-১৯৯৫-এর পরিবর্তে ইপিএস-২০২৬ নামে নতুন পেনশন কাঠামো কার্যকর হয়েছে । নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মাসিক পেনশন ১,০০০ টাকা বহাল রয়েছে। ঋণ ও অবসানের ক্ষেত্রে নিয়ম প্রায় অপরিবর্তিত। তবে নতুন বেতনসীমার সঙ্গে সমন্বয় করে কাঠামোটি আধুনিকীকরণ করা হয়েছে।
নতুন বেতনসীমা বৃদ্ধি স্বাগত, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত সূক্ষ্ম নিয়মগুলো সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। প্রথম চাকরিতে ২৫ হাজারের বেশি বেতন পেলে যে ইপিএস সুবিধা মিলবে না—এই তথ্য তরুণ কর্মজীবীদের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছানো প্রয়োজন। ইপিএফও ইতিমধ্যেই নিয়োগকর্তাদের জন্য নির্দেশিকা জারি করেছে এবং ইউএএন যাচাইয়ের উপর জোর দিয়েছে। কর্মচারীদেরও উচিত নিজেদের ইপিএস সদস্যপদ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ভুল অবদান হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। lenspedia ইপিএফও, ইপিএস পেনশন, নতুন বেতনসীমা, ২৫ হাজার টাকা, পেনশন স্কিম, ইপিএফ, ইপিএস সদস্যপদ, বেতনসীমা ২০২৬, পেনশন সুবিধা, ইউএএন যাচাই, প্রথম চাকরি