ক্যানসারের একটি বড় অংশের নেপথ্যে রয়েছে সংক্রমণ। সংক্রমণজনিত ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে কী কী সতর্কতা জরুরি, জানালেন ভারতীয় চিকিৎসক।
ক্যানসার প্রতিরোধের কথা উঠলেই ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, সুষম খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চার কথা বলা হয়। কিন্তু ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যা অনেকেরই নজরের বাইরে থেকে যায়—দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ।
সম্প্রতি দ্য ল্যানসেট অনকোলজি-তে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৩ লাখ নতুন ক্যানসারের ঘটনা সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। অর্থাৎ, মোট ক্যানসার আক্রান্তের প্রায় ১২ শতাংশের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ভূমিকা ছিল। সহজ করে বললে, বিশ্বে প্রায় প্রতি আটটি ক্যানসারের একটি সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনও সংক্রমণ থেকেই ক্যানসার হয়। আবার কোনও ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনও সংক্রমণে আক্রান্ত হলেই তাঁর ক্যানসার হবে—এমনটাও নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত কিছু নির্দিষ্ট সংক্রমণ যদি দীর্ঘদিন শরীরে থেকে যায় এবং তার ফলে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, কোষের ক্ষতি বা টিস্যুতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন তৈরি হয়, তখন নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষণে পাঁচটি সংক্রমণকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলি হল—হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি বা H. pylori, হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা HPV, হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বা HBV, এপস্টেইন-বার ভাইরাস বা EBV এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাস বা HCV। সংক্রমণজনিত ক্যানসারের প্রায় সব ক্ষেত্রের সঙ্গেই এই পাঁচ ধরনের সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ক্যানসারের ঘটনা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে ক্যানসার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ, সময়মতো পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
সংক্রমণজনিত ক্যানসারের ক্ষেত্রে HPV অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। তার মধ্যে কিছু উচ্চঝুঁকির HPV দীর্ঘদিন শরীরে থাকলে জরায়ুমুখের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
ভারতীয় ক্যানসার চিকিৎসক ডা. কস্তুরী বড়ুয়া জানিয়েছেন, উচ্চঝুঁকির HPV-এর দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ প্রায় সব জরায়ুমুখের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু জরায়ুমুখ নয়, মলদ্বার, পুরুষাঙ্গ, ভলভা, যোনি এবং গলার কিছু ক্যানসারের সঙ্গেও HPV-এর সম্পর্ক রয়েছে।
তাই HPV প্রতিরোধে টিকাকরণ এবং নিয়মিত জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে জরায়ুমুখের কোষে ক্যানসারের আগের পর্যায়ের পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। ফলে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়।
HPV-এর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—সংক্রমণ থাকা মানেই ক্যানসার নয়। অনেক HPV সংক্রমণ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু উচ্চঝুঁকির ধরনের সংক্রমণ যদি দীর্ঘদিন থেকে যায়, তখন ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই কারণেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত বয়সে HPV টিকা এবং প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সংক্রমণজনিত ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ হল Helicobacter pylori বা H. pylori। এটি একটি ব্যাকটেরিয়া, যা পাকস্থলীতে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রেই H. pylori সংক্রমণ দীর্ঘদিন কোনও স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ফলে পাকস্থলীর আবরণে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই প্রদাহ পাকস্থলীর কোষ ও টিস্যুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডা. বড়ুয়ার মতে, H. pylori পাকস্থলীতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করতে পারে এবং এর সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার ক্যানসারের ঘটনা H. pylori সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। সংক্রমণজনিত ক্যানসারের কারণগুলির মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে বড় অংশ।
ভারতের ক্ষেত্রেও H. pylori গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষণে প্রায় ৪৭ হাজার ক্যানসারের ঘটনা এই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে H. pylori ধরা পড়লেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সংক্রমণ শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের পেটের সমস্যা থাকলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লিভার ক্যানসারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘস্থায়ী ভাইরাস সংক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাস দীর্ঘদিন শরীরে থাকলে লিভারের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস সংক্রমণের কারণে লিভারে দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ ও ক্ষতির প্রক্রিয়া চলতে পারে। সময়ের সঙ্গে লিভারের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যকারিতায় পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
ডা. বড়ুয়া জানিয়েছেন, হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি দীর্ঘস্থায়ী হলে বহু বছর ধরে লিভারের ক্ষতি করতে পারে এবং এর ফলে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এক্ষেত্রে প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল হেপাটাইটিস বি টিকা। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে কার্যকর টিকা রয়েছে। অন্যদিকে হেপাটাইটিস সি-এর ক্ষেত্রে বর্তমানে কোনও টিকা নেই। তবে আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ নিরাময় করা সম্ভব।
হেপাটাইটিস বি ও সি—দুই ধরনের সংক্রমণই নির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। তাই সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্রমণ ও ক্যানসারের সম্পর্কের আলোচনায় Epstein-Barr virus বা EBV-এর নামও উঠে আসে। এটি একটি সাধারণ ভাইরাস এবং বহু মানুষ জীবনের কোনও না কোনও সময়ে এর সংস্পর্শে আসেন।
বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে EBV সংক্রমণ ক্যানসারে পরিণত হয় না। তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী EBV সংক্রমণের সঙ্গে কয়েক ধরনের ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এই কারণেই সংক্রমণজনিত ক্যানসারের সামগ্রিক বিশ্লেষণে EBV-কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু কোনও একটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নয়—কিছু নির্দিষ্ট দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ এবং শরীরে তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ক্যানসারের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং সময়মতো শনাক্তকরণ ক্যানসার প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এজন্য কয়েকটি বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার।
HPV এবং হেপাটাইটিস বি-এর মতো সংক্রমণের বিরুদ্ধে টিকা রয়েছে। উপযুক্ত বয়স ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে জরায়ুমুখের ক্যানসারের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে অস্বাভাবিক কোষের পরিবর্তন ক্যানসারে পরিণত হওয়ার আগেই শনাক্ত করার সুযোগ পাওয়া যায়।
রক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকলে বা চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে হেপাটাইটিস বি ও সি-এর পরীক্ষা করানো যেতে পারে। দ্রুত শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নজরদারি শুরু করা সম্ভব।
একই সুচ বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত নয়। রক্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নিরাপদ ও পরীক্ষিত রক্ত ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
HPV ও হেপাটাইটিস বি-এর মতো সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ যৌন আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা সংক্রমণ প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
H. pylori-এর মতো সংক্রমণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া উচিত। দীর্ঘদিনের উপসর্গকে শুধুমাত্র সাধারণ গ্যাস বা অ্যাসিডিটি ভেবে উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি ক্যানসারের অন্যান্য পরিচিত ঝুঁকিও কমাতে হবে। ধূমপান এড়িয়ে চলা, মদ্যপান সীমিত করা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং সুষম খাবার খাওয়া ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংক্রমণ এবং ক্যানসারের সম্পর্কের এই তথ্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনও ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলেই ক্যানসার হবে। বরং বিষয়টি হল—কিছু নির্দিষ্ট সংক্রমণ দীর্ঘদিন শরীরে সক্রিয় থাকলে নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই আতঙ্কিত না হয়ে প্রতিরোধ, টিকাকরণ, স্ক্রিনিং, সময়মতো পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ওপর জোর দেওয়া উচিত।
বিশেষ করে HPV ও হেপাটাইটিস বি-এর মতো সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের সুযোগ রয়েছে। আবার হেপাটাইটিস সি শনাক্ত হলে কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিরাময় করা সম্ভব। একইভাবে H. pylori শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসার প্রতিরোধের লড়াই শুধু ধূমপান ছাড়া বা স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কিছু সংক্রমণকে প্রতিরোধ করা, সময়মতো শনাক্ত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা নেওয়াও ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং ও পরীক্ষা করানোই হতে পারে ভবিষ্যতে ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম কার্যকর পদক্ষেপ।