আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস, বর্ষা এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। পুজোর আবহে বাংলার কয়েকটি জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছে।
দুর্গাপুজো আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। মহালয়া পেরিয়ে বাঙালি যখন উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখনই বাংলার আকাশে ফের নিম্নচাপের আশঙ্কা ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। পুজোর দিনগুলিতে আবহাওয়া কেমন থাকবে, বৃষ্টি কি প্যান্ডেল হপিং বা ঠাকুর দেখার আনন্দে বাধা দেবে, নাকি উৎসবের দিনগুলিতে থাকবে শুষ্ক ও মনোরম আবহাওয়া—এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বঙ্গবাসীর মনে। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসে আপাতত স্বস্তির পাশাপাশি রয়েছে বৃষ্টির সতর্কতাও।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়েই দুর্গাপুজোর মূল উৎসব। তার আগে বঙ্গোপসাগরে নতুন করে নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আবহাওয়া সংক্রান্ত পূর্বাভাসে ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে পুজোর সময় ফের বৃষ্টির দাপট দেখা দিতে পারে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। যদিও এখনই পুজোর প্রতিটি দিনের নির্দিষ্ট আবহাওয়া নিয়ে চূড়ান্ত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, তবে আবহাওয়া দপ্তরের নজর রয়েছে নিম্নচাপ, ঘূর্ণাবর্ত এবং অক্ষরেখার গতিবিধির উপর।
আজ, বৃহস্পতিবার নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সকাল ১১টার পর থেকে দুপুর পর্যন্ত এই দুই জেলায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। বৃষ্টির পাশাপাশি বজ্রপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। ফলে বাইরে বেরোনোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শুধু আজ নয়, চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হতে পারে। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, বর্ষা এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। জোড়া ঘূর্ণাবর্ত এবং তিনটি অক্ষরেখার প্রভাবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে পুজোর আগে পর্যন্ত বাংলার আবহাওয়ায় পুরোপুরি শুষ্ক ভাব আসতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।
আগামী শুক্রবারও নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তুলনামূলক বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই তিন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছে। তবে মহালয়ার দিন থেকে ধীরে ধীরে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।
কলকাতার ক্ষেত্রে আপাতত কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। মহালয়ার দিন কলকাতায় মূলত শুষ্ক আবহাওয়া থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকায় কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে এক-দু’পশলা বৃষ্টি হতে পারে। ফলে শহরে মহালয়ার উৎসব বা বাইরে বেরোনোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৃষ্টির আশঙ্কা আপাতত নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় শেষ মুহূর্তের পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতিও এখনই পুরোপুরি শুকনো হচ্ছে না। মহালয়া পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের উপরের দিকের জেলাগুলিতে বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। পাহাড়ি এলাকাতেও বৃষ্টি হতে পারে। তবে মহালয়ার পর রবিবার থেকে পাহাড়ে বৃষ্টির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমতে পারে বলে আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে।
দুর্গাপুজোর আগে আবহাওয়ার এই পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই চিন্তায় ফেলেছে পুজো উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে। কারণ পুজোর সময় কলকাতা এবং জেলার বিভিন্ন জায়গায় রাতভর প্যান্ডেল হপিং, প্রতিমা দর্শন, মণ্ডপে ভিড় এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি চললে মণ্ডপে ভিড়, যাতায়াত এবং প্রতিমা দর্শনের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে খোলা জায়গায় তৈরি প্যান্ডেল এবং অস্থায়ী কাঠামোগুলির ক্ষেত্রে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পুজোর দিনগুলিতে কি সত্যিই বৃষ্টি হবে? এই মুহূর্তে তার উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ নিম্নচাপের অবস্থান, গতিপথ, শক্তি এবং সেটি স্থলভাগের কতটা কাছে আসে, তার উপর বাংলার আবহাওয়ার অনেকটাই নির্ভর করবে। আগামী কয়েক দিনে এই পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।
আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা যাচ্ছে, শুক্রবার পুজোর দিনগুলিতে আবহাওয়া কেমন থাকতে পারে, তার একটি বিস্তারিত পূর্বাভাস দেওয়া হতে পারে। ফলে পুজোর সময় বৃষ্টি থাকবে কি না, মহালয়া থেকে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমীতে আকাশের পরিস্থিতি কেমন হবে—তা নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
বঙ্গবাসীর কাছে দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সবচেয়ে বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। সারা বছর অপেক্ষার পর পুজোর কয়েকটি দিন পরিবার, বন্ধু এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর জন্য মানুষ নানা পরিকল্পনা করেন। কলকাতার পাশাপাশি হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পুজোর প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। ফলে পুজোর সময়ে আবহাওয়া ভালো থাকাটা প্রত্যেকের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে কলকাতায় রাতভর প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনা করছেন বহু মানুষ। বড় বড় পুজো মণ্ডপে ইতিমধ্যেই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। কোথাও আলোর কাজ, কোথাও প্রতিমা সাজানোর কাজ, আবার কোথাও মণ্ডপ তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে বৃষ্টি হলে পুজোর প্রস্তুতিতে যেমন সমস্যা হতে পারে, তেমনই সাধারণ মানুষের আনন্দেও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, কৃষকদের কাছেও অক্টোবরের এই বৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষার বিদায় সম্পূর্ণ না হওয়ায় দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি এখনও হচ্ছে। নিম্নচাপ তৈরি হলে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ফলে কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবনের উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
পুজোর আগে তাপমাত্রার পরিস্থিতিও নজরে রাখছে আবহাওয়া দপ্তর। বৃষ্টির কারণে অনেক জায়গায় দিনের তাপমাত্রায় সাময়িক পরিবর্তন হতে পারে। আবার বৃষ্টি কমলে আর্দ্রতা এবং গরমের অনুভূতি বাড়তে পারে। তাই পুজোর সময়ে একেবারে শরতের পরিষ্কার আকাশ থাকবে, নাকি মেঘ-বৃষ্টির আনাগোনা থাকবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির উপর।
এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—বর্ষা পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। সাধারণত শরৎকালে আকাশ পরিষ্কার হয়ে পুজোর সময় মেঘমুক্ত আবহাওয়ার প্রত্যাশা করেন বাঙালিরা। কিন্তু চলতি বছরে আবহাওয়ার গতিবিধিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। জোড়া ঘূর্ণাবর্ত এবং একাধিক অক্ষরেখার প্রভাবে বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার উপর নতুন নিম্নচাপের সম্ভাবনা থাকায় পুজোর আগে আবহাওয়ার দিকে নজর রাখতেই হচ্ছে।
তবে পুজোর কয়েক দিন আগে পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাসে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই এখনকার পূর্বাভাসকে পুজোর প্রতিটি দিনের চূড়ান্ত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বিশেষ করে নিম্নচাপের গতিপথ পরিবর্তিত হলে বৃষ্টির পরিমাণ এবং প্রভাবিত জেলার তালিকাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে পুজোয় বাইরে বেরোনোর আগে আবহাওয়ার সর্বশেষ আপডেট দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা দূরের মণ্ডপে যাবেন, তাঁদের ছাতা বা প্রয়োজনীয় বৃষ্টির সরঞ্জাম সঙ্গে রাখলে সুবিধা হবে। বজ্রপাতের সতর্কতা থাকলে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা এড়িয়ে চলা উচিত। ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস থাকলে গাছের নিচে বা দুর্বল অস্থায়ী কাঠামোর কাছে না দাঁড়ানোই নিরাপদ।
এদিকে কলকাতা এবং দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের মানুষও পুজোর আবহাওয়া নিয়ে আগ্রহী। পাহাড়ে মহালয়া পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও রবিবারের পর বৃষ্টির পরিমাণ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে উত্তরবঙ্গেও পুজোর সময় আবহাওয়ার উন্নতি হবে কি না, তা নিয়ে আগামী কয়েক দিনের পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোর আগে বাংলার আকাশে এখন মেঘ-বৃষ্টির আনাগোনা। বৃহস্পতিবার নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনায় হলুদ সতর্কতা, শুক্রবার নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তুলনামূলক বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা এবং মহালয়ার পর বৃষ্টির পরিমাণ কমার পূর্বাভাস—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তনশীল। তবে পুজোর মূল দিনগুলিতে শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া কেমন থাকবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আগামী শুক্রবার আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের তরফে পুজোর দিনগুলির সম্ভাব্য আবহাওয়া নিয়ে বিস্তারিত পূর্বাভাস দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে। সেই পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনা, কোন কোন জেলায় বৃষ্টি হতে পারে, কলকাতার আবহাওয়া কেমন থাকবে এবং প্যান্ডেল হপিংয়ের জন্য রাতের আবহাওয়া কতটা অনুকূল হতে পারে—এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
তাই পুজোর আগে আবহাওয়ার আপডেট পেতে নজর রাখুন। নিম্নচাপের গতিপথ বদলালে বা নতুন কোনও সতর্কতা জারি হলে তার প্রভাব বাংলার পুজোর আবহাওয়াতেও পড়তে পারে। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে বাঙালি কি পাবে ঝকঝকে শরতের আকাশ, নাকি ফের বৃষ্টির ভ্রুকুটি থাকবে—উত্তর মিলবে আবহাওয়া দপ্তরের পরবর্তী পূর্বাভাসে।