Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মানুষের রক্তে অদ্ভুত আকর্ষণ মশার বিজ্ঞানীরা জানালেন আসল কারণ

ব্রাজ়িলের আটলান্টিক অরণ্যে বিজ্ঞানীরা ১,৭১৪টি মশার উপর গবেষণা চালান। পরীক্ষায় ধরা পড়ে, ১৪৫টি স্ত্রী মশার মধ্যে ২৪টির রক্ত বিশ্লেষণ করে জানা গিয়েছে তারা মূলত মানুষের রক্তই পান করেছিল।

শান্তিতে দু’দণ্ড কোথাও বসার উপায় নেই। পার্ক, ছাদ, বারান্দা বা জঙ্গলের ধারে—খোলা জায়গা দেখলেই কুট করে এসে কামড় বসাচ্ছে মশা। এক মুহূর্তে রক্ত শুষে নিয়ে উধাও। প্রতিরোধের জন্য কয়েল, লিকুইড, স্প্রে, মশারি—সবই যেন একে একে ফেল। ঘরের মধ্যে কোনও রকমে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও বাইরে মশার দাপট থামানোর উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—কেন মানুষ দেখলেই মশার এমন আগ্রাসন? কেন মানুষের রক্তের প্রতিই এত লোভ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, মশার এই আচরণের পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে মানুষেরই সৃষ্টি করা পরিবেশগত পরিবর্তন, বিশেষ করে জঙ্গল ধ্বংস ও জীববৈচিত্রের ক্ষয়।

? বহু যুগ আগে এমন ছিল না মশার স্বভাব

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বহু হাজার বছর আগে মশারা শুধুমাত্র মানুষের রক্তের উপর নির্ভরশীল ছিল না। তারা জঙ্গলভিত্তিক বাস্তুতন্ত্রে নানা প্রাণীর রক্ত থেকে পুষ্টি গ্রহণ করত—হরিণ, বানর, ইঁদুর, পাখি, উভচর প্রাণী প্রভৃতি ছিল তাদের খাদ্যতালিকায়। অর্থাৎ, তখন মশার “স্বাদ বদলানোর” সুযোগ ছিল প্রচুর।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জঙ্গলভিত্তিক খাদ্যচক্র ভেঙে পড়েছে। মানুষের লাগাতার আগ্রাসনে বনভূমি কমেছে, বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে বা সংখ্যায় অত্যন্ত কমে এসেছে। ফলে মশাদের সামনে বিকল্প খাদ্যের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

?? ব্রাজ়িলের আটলান্টিক অরণ্যে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা

এই বাস্তবতা যাচাই করতেই ব্রাজ়িলের আটলান্টিক অরণ্যে একটি বিশদ গবেষণা করেন বিজ্ঞানীরা। এই অরণ্য প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পৃথিবীর অন্যতম জীববৈচিত্রসমৃদ্ধ বনভূমি হিসেবে পরিচিত।

গবেষণাটি পরিচালনা করেন ব্রাজ়িলের ফেডেরাল বিশ্ববিদ্যালয় ও অলওয়াল্ডো ক্রুজ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল—
? মশারা এখন কাদের রক্ত পান করছে
? পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের খাদ্যাভ্যাসের কী সম্পর্ক

? ৭০ শতাংশ জঙ্গল হারিয়ে গিয়েছে

গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য। অতীতে যতটা বিস্তৃত ছিল আটলান্টিক অরণ্য, বর্তমানে তার মাত্র ৩০ শতাংশ টিকে রয়েছে। বাকি ৭০ শতাংশ জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছে মানুষের বসতি, কৃষি ও শিল্পের প্রয়োজনে।

এর ফলে—

  • হাজার হাজার উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত

  • খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে

  • প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে

এই অবস্থাতেই মশারা বাধ্য হয়েছে নতুনভাবে নিজেদের টিকে থাকার কৌশল বদলাতে।

? ১,৭১৪টি মশার উপর বিশ্লেষণ

গবেষণায় মোট ১,৭১৪টি মশা সংগ্রহ করা হয়, যা ছিল ৫২টি ভিন্ন প্রজাতির। এর মধ্যে ১৪৫টি ছিল স্ত্রী মশা, কারণ শুধুমাত্র স্ত্রী মশারাই রক্ত পান করে।

এই ১৪৫টির মধ্যে ২৪টি স্ত্রী মশার রক্ত পরীক্ষা করা হয় আধুনিক জেনেটিক ও মলিকিউলার পদ্ধতিতে, যাতে নির্ধারণ করা যায় তারা কাদের কামড়েছিল।

? চমকে দেওয়ার মতো ফলাফল

রক্ত বিশ্লেষণে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা বিজ্ঞানীদেরও চমকে দিয়েছে।

? ২৪টি স্ত্রী মশার মধ্যে
➡️ ১৮টির পেটে পাওয়া গেছে মানুষের রক্ত
➡️ বাকিদের পেটে মিলেছে ইঁদুর, পাখি, উভচর প্রাণী ও ক্যানিড (কুকুরজাতীয় প্রাণী) শ্রেণির রক্ত

অর্থাৎ, প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে মশারা মানুষকেই নিশানা করেছে, এমন এক অঞ্চলে যেখানে এখনও জীববৈচিত্র পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

? বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা কী?

ব্রাজ়িলের ফেডেরাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সার্জিয়ো মাচাদো জানাচ্ছেন, মানুষ এখন এই অঞ্চলের সবচেয়ে সহজলভ্য এবং সর্বাধিক উপস্থিত প্রাণী—যাকে তিনি বলছেন “Prevalent Host”

তাঁর মতে—

ফলে মশারা ধীরে ধীরে মানুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

⚠️ বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল—
মশাবাহিত রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যাওয়া।

একটি মশা যদি ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, জিকা বা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত কোনও ব্যক্তিকে কামড়ায় এবং পরে আরেকজন সুস্থ মানুষকে কামড়ায়, তাহলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

মানুষের সঙ্গে মশার এই ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।

? গবেষণা প্রকাশিত কোথায়?

এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা
? ‘Frontiers in Ecology and Evolution’-এ।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই তথ্য ব্যবহার করে—

  • মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের নতুন কৌশল তৈরি করা যাবে

  • নগরায়ণ ও বন সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য আনার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হবে

? শেষ কথা

বিজ্ঞানীদের মতে, মশার এই পরিবর্তিত আচরণের জন্য কোনওভাবে মানুষই দায়ী। জঙ্গল কেটে, প্রাণী ধ্বংস করে আমরা নিজেরাই মশাদের আমাদের দিকে ঠেলে দিয়েছি।

মশারা বদলে নিয়েছে তাদের খাদ্যাভ্যাস—বাঁচার তাগিদেই।
আর তার মূল্য এখন দিচ্ছে মানুষই। 

বিজ্ঞানীদের মতে, মশার এই পরিবর্তিত আচরণের জন্য কোনওভাবে মানুষই দায়ী। নির্বিচারে জঙ্গল কেটে, প্রকৃতির স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে আমরা নিজেরাই মশাদের ধীরে ধীরে মানুষের দিকে ঠেলে দিয়েছি। যে জঙ্গল এক সময় হাজারো প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় ছিল, আজ তা কংক্রিটের জঙ্গলে রূপান্তরিত। তার সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে অসংখ্য প্রাণী, যাদের উপর নির্ভর করেই একসময় টিকে ছিল মশারা। ফলে খাদ্যের উৎস সংকুচিত হওয়ায় মশাদের সামনে বিকল্প খুব কমই রয়েছে। সহজলভ্য ও সর্বত্র উপস্থিত মানুষের দিকেই তাই ঝুঁকছে তারা।

বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার ফলে শুধু প্রাণীর সংখ্যা কমেনি, নষ্ট হয়েছে পরিবেশের সূক্ষ্ম ভারসাম্যও। একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রে প্রতিটি প্রাণীর ভূমিকা থাকে নির্দিষ্ট। মশাও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সেই শৃঙ্খল ভেঙে গেলে, এক একটি প্রজাতির আচরণ বদলাতে বাধ্য হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মশারা এখন আর শুধুমাত্র সুযোগসন্ধানী নয়, বরং ধীরে ধীরে মানুষের উপর নির্ভরশীল প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছে। মানুষের শরীর তাদের কাছে হয়ে উঠছে সবচেয়ে সহজ এবং নির্ভরযোগ্য খাদ্যের উৎস।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নগরায়ণ। গ্রাম থেকে শহর, শহরতলি থেকে বনভূমি—মানুষের বসতি যত ছড়াচ্ছে, ততই মশাদের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান বাড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে জমে থাকা জল, নিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আবর্জনার স্তূপ মশাদের বংশবিস্তারকে আরও সহজ করে তুলছে। ফলে শুধু জঙ্গল নয়, শহর ও গ্রামও মশাদের জন্য আদর্শ পরিবেশ হয়ে উঠছে।

মশারা যে শুধুমাত্র রক্ত শোষণ করছে, তা নয়—তারা হয়ে উঠছে মারাত্মক রোগের বাহক। ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, জিকা—এই সব রোগের সংক্রমণ বাড়ার পিছনেও এই পরিবর্তিত পরিবেশগত বাস্তবতা বড় ভূমিকা নিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, মানুষের সঙ্গে মশার এই ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে নতুন নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

গবেষকদের মতে, মশাদের খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তন আসলে একটি সতর্কবার্তা। প্রকৃতি বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের উপরেই আঘাত হানে। মশারা তাদের খাদ্য বদলেছে বাঁচার তাগিদে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের ফল ভোগ করতে হচ্ছে মানুষকেই। এটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, বরং একটি গভীর পরিবেশগত সংকটের প্রতিফলন।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধুমাত্র কীটনাশক বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি। বনাঞ্চল রক্ষা, জীববৈচিত্র সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণই পারে মশার সঙ্গে মানুষের এই বিপজ্জনক সম্পর্ক কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে। অন্যথায় ভবিষ্যতে মশাবাহিত রোগ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা একদিকে যেমন মশার আচরণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তেমনই মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলাফলও স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়ার মূল্য যে কতটা চড়া হতে পারে, তারই এক বাস্তব উদাহরণ এই মশাদের বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস। মানুষ যদি এখনই সচেতন না হয়, তবে মশাদের এই ‘নতুন লোভ’ আগামী দিনে আরও বড় বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Preview image