Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

হিমাচলে তুষারঝড়: কুফরিতে দু’ফুট বরফ, শিমলা-মানালিতে পর্যটকদের নির্দেশিকা

তুষারপাত শুরু হতেই চণ্ডীগড়, পঞ্জাব, হরিয়ানা ও দিল্লি থেকে হিমাচলে ঢল নামিয়েছেন পর্যটকেরা, শিমলা ও উঁচু পাহাড়ি এলাকায় এখনও চলছে বরফ পড়া।

হিমাচলে তুষারঝড়: কুফরিতে দু’ফুট বরফ, শিমলা-মানালিতে পর্যটকদের নির্দেশিকা
আবহাওয়া

দু’ফুট থেকে কোথাও কোথাও তিন ফুটেরও বেশি বরফে ঢেকে গিয়েছে হিমাচল প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। সঙ্গে চলছে টানা তুষারপাত। পাহাড়ি রাজ্যের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলি — কুফরি, শিমলা, মানালি, নারকাণ্ডা ও কিন্নৌরের একাধিক জায়গা — ইতিমধ্যেই সাদা চাদরে মোড়া। আর এই আবহে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে একাধিক সতর্কতামূলক নির্দেশিকা জারি করেছে প্রশাসন।

এক দিকে সপ্তাহান্তের ছুটি, অন্য দিকে ২৩ থেকে ২৬ জানুয়ারির টানা ছুটির সুযোগ — এই দুই মিলিয়ে হিমাচলের পাহাড়ি শহরগুলিতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। বরফে মোড়া রাস্তা, গাছের ডাল থেকে ঝরে পড়া তুষার আর চারপাশে সাদা পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করতে চেয়ে চণ্ডীগড়, পঞ্জাব, হরিয়ানা ও দিল্লি থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটক ছুটে আসছেন শিমলা, কুফরি ও মানালিতে।

তবে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে বিপদ। রাস্তা ঢেকে গিয়েছে বরফে, দৃশ্যমানতা কমেছে, কোথাও কোথাও যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। তাই ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বিশেষ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।

কোথায় কতটা তুষারপাত?

স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি তুষারপাত হয়েছে কিন্নৌর জেলার কোঠি এলাকায়। সেখানে রাস্তা চলে গিয়েছে প্রায় সাড়ে তিন ফুট বরফের নীচে। ভারী তুষারপাতের ফলে ওই এলাকায় যান চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।

অন্য দিকে, পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের জায়গা কুফরিতেও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। সেখানে জমেছে প্রায় দু’ফুট বরফ। শিমলাতেও রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর সাদা চাদরে ঢেকে গিয়েছে। মানালি ও আশপাশের উঁচু পাহাড়ি এলাকাগুলিতেও তুষারপাত অব্যাহত রয়েছে।

শনিবার সকালেও শিমলা ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে তুষারপাত চলছিল বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন পাহাড়ি এলাকায় ঠান্ডা ও বরফ পড়ার প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।

রাস্তা বন্ধ, যানজটে নাকাল পর্যটকরা

তুষারপাতের জেরে সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে রাস্তা চলাচল নিয়ে। বরফে ঢেকে যাওয়ায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে শিমলা ও কুফরির সংযোগকারী রাস্তায় যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

প্রশাসনের তরফে বাইক ও চারচাকা গাড়িচালকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। যাঁরা চণ্ডীগড় থেকে কুফরিতে যাচ্ছেন, তাঁদের শিমলা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ, শহরের ভিতরের রাস্তায় তুষারপাতের কারণে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়েছে। তার পরিবর্তে শিমলা বাইপাস ধরে নিউ আইএসবিটি তুতিকান্ডি হয়ে কুফরিতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কালকা-শিমলা বিভাগের প্রকল্প অধিকর্তা আনন্দ দাহিয়া জানিয়েছেন,

“তুষারপাত হলেও ৫ নম্বর জাতীয় সড়ক দিয়ে যান চলাচল তুলনামূলক ভাবে মসৃণ রয়েছে। তবে ঢাল্লি-ভট্টকুফ্ফর পুরতান শিমলা রোড শুক্রবার ভারী তুষারপাতের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

শনিবার কিছুটা আবহাওয়ার উন্নতি হলেও পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। বরফ সরানোর কাজ চলছে, কিন্তু উঁচু এলাকায় রাস্তায় বরফ জমে থাকার কারণে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

পর্যটকদের ঢল: বরফ দেখতে পাহাড়ে ভিড়

তুষারপাত শুরু হতেই হিমাচলের পাহাড়ি শহরগুলিতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, চণ্ডীগড়, পঞ্জাব, হরিয়ানা ও দিল্লি থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ ছুটে আসছেন শিমলা, কুফরি ও মানালিতে।

এক দিকে সপ্তাহান্তের ছুটি, অন্য দিকে ২৩ থেকে ২৬ জানুয়ারির টানা ছুটির সুযোগ — এই দুই মিলিয়ে অনেকেই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে বরফের শহরে সময় কাটাতে এসেছেন। হোটেল, রিসর্ট ও গেস্ট হাউসগুলিতে বুকিং দ্রুত বেড়েছে।

শিমলা হোটেল মালিকদের অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিন্দর শেঠ জানিয়েছেন,

“এই মরসুমে হোটেল, গেস্ট হাউস ও রেস্ট হাউস মিলিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং হয়ে যাবে।”

বরফে ঢাকা পাহাড়, সাদা গাছপালা আর শীতের রোদে ঝলমলে দৃশ্য পর্যটকদের কাছে এক স্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা এনে দিচ্ছে। তবে প্রশাসনের মতে, আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি।

প্রশাসনের নির্দেশিকা: কী কী মানতে বলা হয়েছে?

তুষারপাতের পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমাচল প্রদেশ প্রশাসন একাধিক নির্দেশিকা জারি করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল —

? প্রয়োজন ছাড়া রাতের বেলা পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো এড়াতে বলা হয়েছে।
? বরফে ঢাকা রাস্তায় বাইক চালাতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
? গাড়িতে স্নো চেন, অতিরিক্ত জ্বালানি ও জরুরি সরঞ্জাম রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
? আবহাওয়ার আপডেট নিয়মিত দেখে তবেই যাত্রা শুরু করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
? শিমলা ও কুফরির ভিতরের রাস্তায় অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের মতে, বরফে ঢাকা রাস্তায় সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই পর্যটকদের ধৈর্য ধরে চলাচল করতে এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

হিমাচলের শীতে তুষারপাত: স্বাভাবিক হলেও বিপজ্জনক

হিমাচল প্রদেশে শীতকালে তুষারপাত নতুন নয়। প্রতি বছরই ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বরফ পড়ে। তবে এ বছরের তুষারপাতের তীব্রতা ও বিস্তৃতি অনেক বেশি বলেই জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে উত্তর ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে এই ধরনের তুষারপাত হচ্ছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন হিমাচলের উঁচু এলাকাগুলিতে হালকা থেকে মাঝারি তুষারপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে এক দিকে যেমন কৃষকদের জন্য এটি উপকারী — কারণ বরফ গলে জল মাটিতে মিশে ফসলের উপকার করে — অন্য দিকে পর্যটন ও পরিবহণ ব্যবস্থার জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

কুফরি, শিমলা ও মানালি: সাদা স্বর্গে পরিণত পাহাড়ি শহর

news image
আরও খবর

কুফরি

শিমলা থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুফরি শীতকালে পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য। এবারে দু’ফুট বরফে ঢেকে যাওয়ায় জায়গাটি যেন এক রূপকথার দেশে পরিণত হয়েছে। স্কিইং, স্নো বল ফাইট ও বরফে হাঁটার অভিজ্ঞতা নিতে পর্যটকেরা ভিড় জমাচ্ছেন এখানে।

শিমলা

হিমাচলের রাজধানী শিমলা বরাবরই শীতকালে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। এবছর শহরের মল রোড, রিজ ও আশপাশের এলাকা সাদা বরফে ঢেকে গিয়েছে। যদিও তুষারপাতের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে, তবু পর্যটকদের উচ্ছ্বাসে কোনও ঘাটতি নেই।

মানালি

বিয়াস নদীর তীরে অবস্থিত মানালি শীতকালীন পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র। রোহতাং পাস ও সোলাং ভ্যালিতে তুষারপাতের ফলে স্কিইং ও স্নোবোর্ডিংয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ভারী তুষারপাতের কারণে কিছু রাস্তায় চলাচল সীমিত রাখা হয়েছে।

রাস্তা পরিষ্কার ও উদ্ধার তৎপরতা

বরফে ঢাকা রাস্তা পরিষ্কার করতে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে প্রশাসন। বিভিন্ন এলাকায় স্নো কাটার মেশিন নামানো হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে নজরদারি চালাচ্ছেন।

বিশেষ করে জরুরি পরিষেবা, অ্যাম্বুল্যান্স ও দুধ-খাবারের সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। কোথাও কোথাও আটকে পড়া যানবাহন উদ্ধারের কাজও চলছে।

প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনে পর্যটকদের নির্দিষ্ট এলাকায় ঢোকা সাময়িক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে।

পর্যটন শিল্পে খুশির হাওয়া

তুষারপাতের জেরে এক দিকে যেমন যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে, অন্য দিকে তেমনই হোটেল ও পর্যটন শিল্পে এসেছে খুশির হাওয়া। বহুদিন পরে পর্যটনের ভরা মরসুমে এমন বরফ পড়ায় হোটেল ব্যবসায়ীরা আশাবাদী।

শিমলা হোটেল মালিকদের অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিন্দর শেঠ জানিয়েছেন,

“এই মরসুমে হোটেল, গেস্ট হাউস ও রেস্ট হাউস মিলিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং হয়ে যাবে।”

অনেক হোটেল ইতিমধ্যেই ‘হাউসফুল’-এর কাছাকাছি চলে গিয়েছে। রেস্তরাঁ, ক্যাফে ও স্থানীয় দোকানগুলিতেও পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে।

তবে পর্যটন ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের নির্দেশিকা মেনে পর্যটকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে অনুরোধ করেছেন।

পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা

হিমাচলে তুষারপাতের সময়ে ভ্রমণে বেরোলে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি —

✔️ গরম পোশাক, গ্লাভস, জ্যাকেট ও ওয়াটারপ্রুফ জুতো সঙ্গে রাখুন
✔️ গাড়িতে স্নো চেন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি রাখুন
✔️ পাহাড়ি রাস্তায় ধীরে ও সতর্কভাবে গাড়ি চালান
✔️ আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত দেখুন
✔️ স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলুন
✔️ অচেনা পথে না গিয়ে নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করুন

এই সতর্কতা মেনে চললে বরফে ঢাকা পাহাড়ি শহরে ভ্রমণ আরও নিরাপদ ও আনন্দদায়ক হতে পারে।

পরিবেশ ও জলবায়ু দৃষ্টিভঙ্গি

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হিমালয় অঞ্চলে আবহাওয়ার ধরণ বদলাচ্ছে। কোথাও অস্বাভাবিক বেশি তুষারপাত, কোথাও আবার দীর্ঘ সময় বরফ না পড়ার ঘটনা ঘটছে। এই পরিবর্তন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলেই মনে করছেন তাঁরা।

হিমাচলের মতো পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে তুষারপাত শুধু পর্যটনের বিষয় নয় — এটি জলসম্পদ, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত। বরফ গলে নদী ও ঝরনায় জল জোগায়, যা কৃষি ও পানীয় জলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অতিরিক্ত তুষারপাত ভূমিধস, রাস্তা বন্ধ হওয়া এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আগামী দিনের পূর্বাভাস

আবহাওয়া দফতরের মতে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় হিমাচলের উঁচু এলাকাগুলিতে হালকা থেকে মাঝারি তুষারপাত চলতে পারে। শিমলা, কুফরি ও মানালির মতো এলাকায় তাপমাত্রা শূন্যের নীচে নামতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

পর্যটকদের যাত্রার আগে আবহাওয়ার আপডেট দেখে নেওয়ার এবং প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Preview image