Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচনে যুগান্তকারী গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল তিন বিজ্ঞানীর

মানব-মস্তিষ্ক কীভাবে স্মৃতি তৈরি করে, অনুভূতি প্রকাশ করে এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে—এই জটিল রহস্যেরই সন্ধান দিয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতি মিলেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে।

স্টকহোম: মানুষের মস্তিষ্ক এখনও বিজ্ঞানের কাছে এক বিস্ময়কর রহস্য। কীভাবে মস্তিষ্কে স্মৃতি তৈরি হয়? কীভাবে মানুষ কোনও ঘটনা মনে রাখে, অনুভূতি প্রকাশ করে কিংবা কোনও পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট আচরণ করে? মস্তিষ্কের কোটি কোটি কোষের মধ্যে কীভাবে তথ্য আদানপ্রদান হয় এবং সেই প্রক্রিয়াই বা কীভাবে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানীরা। সেই গবেষণারই গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন কার্ল ডেসিয়েরথ, পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল।

সোমবার সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট মেডিকেল ইউনিভার্সিটির তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তিন বিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করা হয়। মস্তিষ্কের কোষ কীভাবে আলো ও বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে সক্রিয় হয় এবং সেই সক্রিয়তার সঙ্গে আচরণ ও অনুভূতির সম্পর্ক কী—এই জটিল ক্ষেত্রের গবেষণায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যই এই সম্মান বলে জানানো হয়েছে।

এই তিন বিজ্ঞানীর গবেষণা শুধু মস্তিষ্ক সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করেনি, ভবিষ্যতে বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যার চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। মস্তিষ্কের কার্যকলাপকে আরও নির্দিষ্টভাবে বোঝা এবং নির্দিষ্ট কোষের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তি আধুনিক নিউরোসায়েন্সের গবেষণায় নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে।

মস্তিষ্কের রহস্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মানুষের শরীরের অন্যতম জটিল অঙ্গ হল মস্তিষ্ক। আমরা হাঁটি, কথা বলি, সিদ্ধান্ত নিই, ভয় পাই, আনন্দ পাই, কোনও কিছু মনে রাখি কিংবা কোনও অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিই—প্রতিটি কাজের পিছনেই রয়েছে মস্তিষ্কের অসংখ্য জটিল প্রক্রিয়া।

কিন্তু মস্তিষ্ক কীভাবে এই সব কাজ করে, তার সবটা এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার নয়। মস্তিষ্কের অসংখ্য নিউরন বা স্নায়ুকোষ একে অপরের সঙ্গে বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। এই যোগাযোগের মাধ্যমেই তৈরি হয় নানা ধরনের স্নায়বিক কার্যকলাপ।

একটি নির্দিষ্ট ঘটনা আমাদের মনে কেন থেকে যায়? আবার অন্য কোনও ঘটনা কেন খুব দ্রুত ভুলে যাই? ভয় বা আনন্দের মতো অনুভূতি কীভাবে তৈরি হয়? কোনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন মানুষ কেন একটি বিশেষ আচরণ করেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে মস্তিষ্কের পৃথক কোষ ও তাদের কার্যকলাপ বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই জায়গাতেই কার্ল ডেসিয়েরথ, পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেলের গবেষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

কার্ল ডেসিয়েরথের গবেষণা

কার্ল ডেসিয়েরথ ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরনের কার্যকলাপ বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেই কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা আধুনিক নিউরোসায়েন্সে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন একই সময়ে একই ধরনের কাজ করে না। বরং বিভিন্ন নিউরনের আলাদা আলাদা ভূমিকা রয়েছে। কোনও নিউরন অনুভূতি তৈরির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, কোনওটি চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আবার কোনও নিউরন স্মৃতি বা আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

সমস্যা হল, মস্তিষ্কের ভিতরে থাকা নির্দিষ্ট কোনও নিউরনকে আলাদা করে শনাক্ত করা এবং তার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। ডেসিয়েরথের গবেষণা এই সমস্যার সমাধানের নতুন পথ দেখায়।

আলো দিয়ে মস্তিষ্কের কোষ নিয়ন্ত্রণ

এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল ‘অপ্টোজেনেটিক্স’। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট নিউরনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তিই অপ্টোজেনেটিক্স।

আগে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে অনেক সময় বুঝতে পারতেন না যে একটি নির্দিষ্ট আচরণের জন্য কোন কোষ বা কোন নিউরন সরাসরি দায়ী। কারণ একই সময়ে মস্তিষ্কের অসংখ্য কোষ সক্রিয় থাকে।

অপ্টোজেনেটিক্স সেই গবেষণায় বড় পরিবর্তন আনে। নির্দিষ্ট নিউরনকে আলো-সংবেদনশীল করে তোলার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সেই নিউরনের কার্যকলাপ নির্দিষ্টভাবে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ পান। ফলে কোনও নির্দিষ্ট আচরণ, অনুভূতি বা স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোন নিউরনের সম্পর্ক রয়েছে, তা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হয়।

এই প্রযুক্তি মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী গবেষণা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেলের ভূমিকা

জার্মানির গবেষক পিটার হেগম্যান এবং জর্জ নাগেলের গবেষণাও এই প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আলো কীভাবে নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে, সেই বিষয়ে তাঁদের গবেষণা পরবর্তীকালে মস্তিষ্কের নিউরন নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতি তৈরিতে সাহায্য করে।

জীবজগতে এমন কিছু প্রোটিন রয়েছে যেগুলি আলোর প্রতি সংবেদনশীল। এই ধরনের প্রোটিনকে কাজে লাগিয়ে স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীতে অপ্টোজেনেটিক্সের মতো প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে।

অর্থাৎ তিন বিজ্ঞানীর গবেষণাকে আলাদা আলাদা কোনও বিচ্ছিন্ন আবিষ্কার হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা কঠিন। বরং তাঁদের কাজ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মস্তিষ্ক গবেষণায় নতুন প্রযুক্তিগত পথ তৈরি করেছে।

কীভাবে তৈরি হয় স্মৃতি?

মানুষের স্মৃতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বহু পুরনো। আমরা শৈশবের কোনও ঘটনা বহু বছর পরেও মনে রাখতে পারি, আবার কয়েক মিনিট আগে কারও বলা একটি কথা ভুলে যেতে পারি। এর পিছনে মস্তিষ্কের অত্যন্ত জটিল কার্যকলাপ রয়েছে।

কোনও নতুন অভিজ্ঞতা হলে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশে নিউরনের কার্যকলাপ পরিবর্তিত হয়। নিউরনগুলির মধ্যে যোগাযোগের ধরনও বদলাতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিবর্তন স্থায়ী হলে একটি অভিজ্ঞতা স্মৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে।

তবে একটি নির্দিষ্ট স্মৃতি তৈরি হওয়ার সময়ে ঠিক কোন নিউরনগুলি সক্রিয় হচ্ছে, পরে সেই স্মৃতি মনে করার সময়ে একই নিউরনগুলি কীভাবে কাজ করছে—এই বিষয়গুলি বোঝা অত্যন্ত কঠিন ছিল।

অপ্টোজেনেটিক্সের মতো প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ দিয়েছে। নির্দিষ্ট নিউরনকে চিহ্নিত করে তাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্মৃতি ও আচরণের সঙ্গে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষগুলির সম্পর্ক নিয়ে আরও গভীর গবেষণা সম্ভব হয়েছে।

অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ক

মানুষের আচরণ শুধু বাহ্যিক পরিবেশের ফল নয়। কোনও পরিস্থিতি দেখার পরে মস্তিষ্ক কীভাবে সেটিকে বিশ্লেষণ করছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতে কী ধরনের অনুভূতি তৈরি হচ্ছে এবং তার পরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে—এই গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের জটিল যোগাযোগ জড়িয়ে রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে ভয়কে ধরা যায়। কোনও বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখলে মানুষ সতর্ক হয়ে যায়। হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে, শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য প্রস্তুত হয় এবং ব্যক্তি সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন।

এই আচরণের পিছনে কোন নিউরন সক্রিয় হয়, সেই নিউরনের কার্যকলাপ কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং অন্য নিউরনের সঙ্গে তার কী ধরনের যোগাযোগ তৈরি হয়—এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

news image
আরও খবর

তিন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর গবেষণা এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে নতুন পথ খুলেছে।

চিকিৎসাক্ষেত্রে সম্ভাবনা

মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বোঝার এই গবেষণা শুধুমাত্র মৌলিক বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এই গবেষণার ফল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পারকিনসনস, মৃগী, বিষণ্ণতা, আসক্তি, স্মৃতিজনিত সমস্যা এবং বিভিন্ন ধরনের স্নায়বিক সমস্যার সঙ্গে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ ও নিউরনের অস্বাভাবিক কার্যকলাপের সম্পর্ক রয়েছে। যদি বিজ্ঞানীরা আরও নির্ভুলভাবে জানতে পারেন কোন কোষ কখন এবং কীভাবে সক্রিয় হচ্ছে, তাহলে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কোষ বা স্নায়বিক সার্কিটকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে।

তবে গবেষণাগারে পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায় না। এর জন্য আরও বহু বছর ধরে গবেষণা, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন হতে পারে।

কেন এই নোবেল গুরুত্বপূর্ণ?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার সাধারণত এমন গবেষণাকে স্বীকৃতি দেয় যা মানুষের শরীর ও রোগ সম্পর্কে মৌলিক ধারণাকে বদলে দেয়। কার্ল ডেসিয়েরথ, পিটার হেগম্যান এবং জর্জ নাগেলের গবেষণাও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁদের কাজ বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্ককে শুধু একটি সামগ্রিক অঙ্গ হিসেবে দেখার পরিবর্তে আরও সূক্ষ্ম স্তরে তার কার্যকলাপ বিশ্লেষণের সুযোগ দিয়েছে। কোন নিউরন কী করছে, কখন সক্রিয় হচ্ছে এবং তার সঙ্গে আচরণের কী সম্পর্ক—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্দিষ্টভাবে সম্ভব।

মস্তিষ্কের মতো জটিল অঙ্গকে বোঝার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

তিন বিজ্ঞানী, তিন গবেষণার পথ

কার্ল ডেসিয়েরথের গবেষণা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষকে আলো ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে পিটার হেগম্যান এবং জর্জ নাগেলের গবেষণা আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন ও তার কার্যপ্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

তাঁদের গবেষণার সমন্বিত ফলাফল মস্তিষ্কের কোষ নিয়ে গবেষণার পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। আগে যেখানে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের কার্যকলাপকে অনেকটা বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করতেন, সেখানে এখন নির্দিষ্ট কোষের কার্যকলাপ নিয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই কারণেই তাঁদের গবেষণার গুরুত্ব শুধু একটি নির্দিষ্ট আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং মস্তিষ্ক গবেষণার একটি সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতির বিকাশের সঙ্গে তাঁদের কাজ জড়িয়ে রয়েছে।

ভবিষ্যতের নিউরোসায়েন্স

মানব মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বরং এই নোবেল পুরস্কার আরও অনেক নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

মস্তিষ্কে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি তৈরি হয়? স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোন নিউরন বা স্নায়বিক সার্কিটের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি? মানুষের আবেগ কীভাবে নির্দিষ্ট আচরণকে প্রভাবিত করে? মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোন পরিবর্তনগুলি গুরুত্বপূর্ণ? কীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত কার্যকলাপ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে আগামী দিনে আরও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি, জেনেটিক গবেষণা এবং নিউরোসায়েন্সের সমন্বয়ে মস্তিষ্কের রহস্য আরও গভীরভাবে উন্মোচন করা সম্ভব হতে পারে।

পুরস্কারের অর্থমূল্য

এই সম্মানের সঙ্গে তিন বিজ্ঞানী মোট ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রাউন পুরস্কার হিসাবে পাবেন বলে জানানো হয়েছে। এই অর্থমূল্য নোবেল পুরস্কারের মর্যাদারই অংশ। তবে তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্রে পুরস্কারের আর্থিক মূল্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় হল বিশ্ববিজ্ঞানে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি।

স্টকহোমে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা বরাবরই বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল ঘোষণার মধ্য দিয়ে বছরের নোবেল পুরস্কার পর্বও শুরু হয়।

বিজ্ঞান ও মানবজীবনের সম্পর্ক

বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন বহু গবেষণা রয়েছে যার তাৎক্ষণিক ব্যবহারিক ফল পাওয়া যায়নি। কিন্তু কয়েক দশক পরে সেই গবেষণাই চিকিৎসা বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে।

মস্তিষ্ক গবেষণার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আজ যে প্রযুক্তি গবেষণাগারে নিউরনের কার্যকলাপ বোঝার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, ভবিষ্যতে তার উন্নত সংস্করণ হয়তো কোনও জটিল স্নায়বিক সমস্যার চিকিৎসায় ভূমিকা নিতে পারে।

স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এগুলির পিছনে থাকা জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, গোটা মানবসমাজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

নোবেলজয়ী তিন বিজ্ঞানীর গবেষণার তাৎপর্য

কার্ল ডেসিয়েরথ, পিটার হেগম্যান এবং জর্জ নাগেলের সম্মান পাওয়ার পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের গবেষণা ও মস্তিষ্কের জটিল কার্যকলাপ বোঝার চেষ্টা। তাঁদের কাজ দেখিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরনের কার্যকলাপকে আরও নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এর ফলে স্মৃতি, অনুভূতি এবং আচরণের মতো জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণার নতুন দরজা খুলেছে। মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য গ্রহণ করে, কীভাবে তা সংরক্ষণ করে এবং প্রয়োজনের সময়ে সেই তথ্য ব্যবহার করে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার তাই শুধু তিন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি মস্তিষ্ক গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির স্বীকৃতিও বটে।

মানুষের মস্তিষ্কের রহস্য এখনও সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত হয়নি। বরং যত বেশি গবেষণা হচ্ছে, ততই নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এগিয়ে চলেছে নিউরোসায়েন্স। কার্ল ডেসিয়েরথ, পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেলের গবেষণা সেই যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তাঁদের গবেষণার হাত ধরে ভবিষ্যতে হয়তো স্মৃতি কীভাবে তৈরি হয়, অনুভূতি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় কিংবা মানুষের আচরণের নেপথ্যে ঠিক কোন স্নায়বিক প্রক্রিয়া কাজ করে—এই প্রশ্নগুলির আরও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে। আর সেই জ্ঞান একদিন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির পথও দেখাতে পারে।

মস্তিষ্কের অন্ধকার ও জটিল জগতকে আলো দিয়ে বোঝার এই বৈজ্ঞানিক প্রয়াসই এবারের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের মূল তাৎপর্য। তিন বিজ্ঞানীর কাজ প্রমাণ করেছে, মানবমস্তিষ্কের রহস্য যতই গভীর হোক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে তার প্রতিটি স্তরকে ধীরে ধীরে বোঝা সম্ভব।

Preview image