সরস্বতী পুজোর আগেই দক্ষিণবঙ্গে কার্যত বিদায় নিচ্ছে শীত। বুধবার কলকাতায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলেছে, যা স্বাভাবিকের থেকে ১.৩ ডিগ্রি বেশি। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী দিনে পারদ আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে
কলকাতা, ২১ জানুয়ারি:
সরস্বতী পুজোর আগেই দক্ষিণবঙ্গ থেকে কার্যত বিদায় নিচ্ছে শীত। বছরের এই সময়ে সাধারণত কনকনে ঠান্ডা, সকালের কুয়াশা আর দুপুরেও হালকা শীতের আমেজ থাকার কথা। কিন্তু চলতি বছরে জানুয়ারির মাঝামাঝি এসেই সেই চেনা ছবি বদলে যেতে শুরু করেছে। বুধবার সকালে কলকাতায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি পেরিয়ে যায়, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ১.৩ ডিগ্রি বেশি। শুধু তাই নয়, আগের দিনের তুলনায় একলাফে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১.২ ডিগ্রি।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পৌঁছেছে ২৬.৪ ডিগ্রিতে। যা স্বাভাবিকের তুলনায় ০.৫ ডিগ্রি বেশি। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে—শীত তার বিদায়ের ঘণ্টা বাজাতে শুরু করেছে।
সপ্তাহের শুরুতেই আবহাওয়া দপ্তর পূর্বাভাস দিয়েছিল যে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়বে। সেই পূর্বাভাস যে একেবারে নিখুঁতভাবে মিলেছে, তা বুধবারের আবহাওয়াই প্রমাণ করছে। রাত এবং ভোরের দিকে হালকা শীত শীত ভাব থাকলেও, সকাল গড়াতেই রোদের তেজ বাড়ছে চোখে পড়ার মতো। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় বেরোলে অনেকেরই মনে হচ্ছে, গরমকাল যেন আগেভাগেই ওয়ার্মআপ শুরু করে দিয়েছে।
দুপুরের দিকে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছাচ্ছে যে, গায়ে সোয়েটার বা জ্যাকেট রাখা দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অফিসযাত্রী থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা অনেকেই দুপুরে হালকা পোশাকেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন। কোথাও কোথাও আবার ঘাম জমে চিড়বিড় করার অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।
কলকাতার রাস্তাঘাটে দুপুরের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যাচ্ছে ঋতু বদলের ইঙ্গিত। চায়ের দোকানগুলিতে সকালে যেখানে গরম চায়ের ভিড়, দুপুরে সেখানে ঠান্ডা পানীয় বা লস্যির চাহিদা বাড়ছে। অনেকেই রোদ এড়াতে ছাতা ব্যবহার করছেন, যা জানুয়ারি মাসে সাধারণত বিরল দৃশ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার অন্যতম কারণ উত্তর দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া বা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব কমে যাওয়া। ফলে উত্তুরে হাওয়ার জোর না থাকায় শীত আর জাঁকিয়ে বসতে পারছে না।
আবহাওয়াবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম ভারতে কোনও শক্তিশালী পশ্চিমী ঝঞ্ঝা সক্রিয় নেই। তার ফলে উত্তর ভারতের শীতল বাতাস দক্ষিণবঙ্গে প্রবেশ করতে পারছে না। উপরন্তু, আকাশ মূলত পরিষ্কার থাকায় দিনের বেলায় সূর্যের তাপ সরাসরি মাটিতে এসে পড়ছে, যার ফলে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
এছাড়াও জলীয় বাষ্পের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকায় রাতের তাপমাত্রাও খুব একটা নামছে না। সব মিলিয়ে জানুয়ারির শেষভাগে দাঁড়িয়েও শীত তার পরিচিত রূপ দেখাতে পারছে না।
যদিও তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই প্রবণতা স্পষ্ট, তবুও আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে—শীত একেবারে শেষ হয়ে গেছে এমনটা বলা এখনই সম্ভব নয়। আগামী কয়েকদিনে রাতের দিকে হালকা ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। তবে দিনের বেলায় যে গরমের প্রভাব বাড়বে, তা প্রায় নিশ্চিত।
আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে ফের এক দফা সামান্য তাপমাত্রা কমতে পারে। তবে সেই শীত হবে ক্ষণস্থায়ী এবং খুব বেশি তীব্র নয়।
সরস্বতী পুজো মানেই বসন্তের ছোঁয়া। হলুদ শাড়ি, নীল আকাশ আর হালকা গরম—এই মিলনেই যেন পুজোর সৌন্দর্য। চলতি বছরের আবহাওয়া সেই ছবিটাকেই যেন আগেভাগে বাস্তব করে তুলছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সরস্বতী পুজোর সময় দক্ষিণবঙ্গে আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে এবং দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকতে পারে।
এদিকে বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা না থাকায় পুজোর আনন্দে বিশেষ বাধা পড়ার আশঙ্কাও নেই।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই ধরনের অস্বাভাবিক আবহাওয়ার পিছনে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে, শীতের সময়কাল ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং গরমের প্রভাব আগেভাগেই অনুভূত হচ্ছে। জানুয়ারি মাসে এই ধরনের উষ্ণতা ভবিষ্যতে আরও নিয়মিত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দক্ষিণবঙ্গের শীত এবার কার্যত বিদায়ের পথে। রাতের দিকে সামান্য ঠান্ডা থাকলেও, দিনের বেলায় রোদের দাপট স্পষ্ট করে দিচ্ছে—গরমকাল আর খুব বেশি দূরে নেই। সরস্বতী পুজোর আগেই ঋতুচক্রের এই বদল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তিত আবহাওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্টভাবে ধরা পড়তে শুরু করেছে। শহর কলকাতা থেকে শুরু করে মফস্সল—সর্বত্রই মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদে বদল চোখে পড়ছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়েও যেখানে সাধারণত উলের পোশাক অপরিহার্য থাকে, সেখানে এবছর অনেকেই দিনের বেলায় সুতির জামাকাপড়েই স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তন স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসকদের মতে, শীত ও গরমের এই হঠাৎ রূপ বদলের ফলে সর্দি-কাশি, জ্বর, অ্যালার্জি এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। দিনের বেলায় ঘাম হওয়া এবং রাতে হঠাৎ ঠান্ডা লাগার কারণে শরীর সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই এই সময়ে হালকা গরম পোশাক সঙ্গে রাখার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল পান এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, এই আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে কৃষিক্ষেত্রেও। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় এখন রবি ফসলের চাষ চলছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে এবং শীতের সময়কাল আরও ছোট হয়ে যায়, তাহলে গম, সর্ষে ও আলু চাষে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আলুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের ঠান্ডা আবহাওয়া প্রয়োজন হয়। তাপমাত্রা বেশি থাকলে ফলনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
এছাড়াও পরিবেশবিদরা মনে করছেন, শহরাঞ্চলে কংক্রিটের পরিমাণ বৃদ্ধি, সবুজের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এই উষ্ণতার প্রবণতাকে আরও তীব্র করছে। কলকাতার মতো মহানগরে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’-এর কারণে শহরের তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি থাকছে। এর ফলে দিনের বেলায় গরমের অনুভূতি আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
আবহাওয়া দপ্তরের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, গত এক দশকে জানুয়ারি মাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার গড় ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। যেখানে একসময় ১০-১২ ডিগ্রি তাপমাত্রা কলকাতায় খুব স্বাভাবিক ঘটনা ছিল, সেখানে এখন ১৪-১৬ ডিগ্রি তাপমাত্রাই বেশি দেখা যাচ্ছে। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে শীতের সংজ্ঞাই বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে সাধারণ মানুষের মনেও তৈরি হচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ এই তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়াকে স্বস্তিদায়ক বলে মনে করলেও, অনেকের কাছেই এটি উদ্বেগের কারণ। প্রবীণ নাগরিকদের একাংশের মতে, আগের মতো শীতের আমেজ আর পাওয়া যাচ্ছে না। সকালবেলার কুয়াশা, হিমেল হাওয়া—সবই যেন স্মৃতির পাতায় বন্দি হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
সরস্বতী পুজোর সময় আবহাওয়া সাধারণত বসন্তের আগমনের বার্তা দেয়। এবছর সেই বসন্তের আবহ যেন আগেভাগেই হাজির। হলুদ শাড়ি, নীল আকাশ আর উজ্জ্বল রোদ—সব মিলিয়ে পুজোর দিনে উৎসবের আনন্দ বাড়লেও, প্রকৃতির এই দ্রুত বদল অনেককেই ভাবিয়ে তুলছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি আমাদের আরও সচেতন হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধ করতে না পারলেও, তার ক্ষতিকর দিকগুলি কমানোর জন্য এখনই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনই হতে পারে ভবিষ্যতের জন্য একমাত্র পথ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দক্ষিণবঙ্গের শীত এবার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। রাতের দিকে সামান্য ঠান্ডা থাকলেও, দিনের বেলায় রোদের দাপট স্পষ্ট করে দিচ্ছে—গরমকাল আর খুব বেশি দূরে নেই। সরস্বতী পুজোর আগেই ঋতুচক্রের এই বদল শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনই নয়, বরং ভবিষ্যতের এক গভীর বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার প্রভাব আমাদের সকলকেই ভাবতে বাধ্য করছে।