Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ফল সংরক্ষণে অজান্তেই বড় ভুল কমছে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ

শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ও পর্যাপ্ত হাওয়া চলাচল না থাকলে ফল দ্রুত পচে যায় এবং অণুজীবের সংক্রমণ বাড়ে। তবে সংরক্ষণের সময় কিছু ছোট ভুল এড়িয়ে চললেই ফল দীর্ঘ সময় সতেজ রাখা সম্ভব এবং পুষ্টিগুণও অটুট থাকে।

প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য—যে কোনও জলবায়ুতেই ফলমূল ও খাবারদাবার সংরক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আবহাওয়ার সামান্য বদল, তাপমাত্রার ওঠানামা, আর্দ্রতার হেরফের কিংবা হাওয়া চলাচলের ঘাটতি—এই সব কিছুর প্রভাব সরাসরি পড়ে ফল ও আনাজের উপর। বিশেষ করে শীতকালে অনেকেই মনে করেন ঠান্ডা থাকায় ফল বেশি দিন ভালো থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শীতকালীন শুষ্ক আবহাওয়া ও ঘরের ভিতরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না থাকলে অনেক ফল দ্রুত পচে যেতে শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অণুজীব ও ছত্রাকের সংক্রমণ, যা চোখে পড়ার আগেই ফলের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দেয়।

শীতকাল ও টকজাতীয় ফলের বাস্তব চিত্র

শীত এলেই বাজার ভরে ওঠে কমলালেবু, মাল্টা, কাগজি লেবু, আঙুরের মতো টকজাতীয় ফল দিয়ে। ভিটামিন সি-তে ভরপুর এই ফলগুলি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অত্যন্ত উপকারী। তাই অনেক পরিবারেই একসঙ্গে বেশ কিছু ফল কিনে আনা হয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় সংরক্ষণের সময়। এই ফলগুলির খোসায় ছত্রাক পড়া, ভিতরের রস শুকিয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত পেকে গিয়ে নরম হয়ে যাওয়া—এই সব সমস্যাই খুব পরিচিত।

শীতের সময়ে বাতাস তুলনামূলক শুষ্ক থাকে। আবার অনেক বাড়িতে জানলা-দরজা বন্ধ করে রাখা হয় ঠান্ডা আটকানোর জন্য। ফলে ফল রাখার জায়গায় হাওয়া চলাচল কমে যায়। এই পরিবেশেই অণুজীব সহজে বাসা বাঁধে এবং ফলের পচন ত্বরান্বিত হয়। তাই শীতকাল মানেই নিশ্চিন্তে ফল রেখে দেওয়া—এই ধারণা একেবারেই ভুল।

ইথাইলিন গ্যাস: অদৃশ্য শত্রু

ফল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কিন্তু অদৃশ্য শত্রু হল ইথাইলিন গ্যাস। অনেক ফল পাকার সময় স্বাভাবিকভাবেই এই গ্যাস নিঃসরণ করে। কলা, আপেল, নাশপাতি এই তালিকায় প্রথম সারিতে। ইথাইলিন গ্যাসের কাজ হল ফল পাকানো। কিন্তু সমস্যা হল—এই গ্যাস আশপাশে থাকা অন্য ফলের উপরও একই প্রভাব ফেলে।

টকজাতীয় ফল যেমন কমলালেবু বা আঙুর নিজেরা খুব বেশি ইথাইলিন তৈরি না করলেও, এই গ্যাসের সংস্পর্শে এলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। খোসার রং বদলে যায়, ভিতরের অংশ নরম হয়ে যায়, ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক বাড়িতেই ফ্রিজের ট্রে-তে সব ফল একসঙ্গে ভরে রাখা হয় অথবা ফ্রিজের বাইরে একটি ঝুড়িতে সব ফল রেখে দেওয়া হয়। এখানেই শুরু হয় বিপত্তি।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ইথাইলিনের প্রভাবে টকজাতীয় ফলের কোষের গঠন দ্রুত ভেঙে যেতে থাকে। ফলে ফল বাইরে থেকে ঠিকঠাক দেখালেও ভিতরে ভিতরে তার পুষ্টিগুণ অনেকটাই কমে যায়।

ফ্রিজ বনাম ঘরের তাপমাত্রা

ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাধারণত সাইট্রাস জাতীয় ফল ফ্রিজে সংরক্ষণ করার প্রবণতা বেশি। অন্য দিকে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় অনেকেই রান্নাঘরের কাউন্টার বা ঝুড়িতে ফল রেখে দেন। কিন্তু আসল কথা হল—ফ্রিজে রাখুন বা বাইরে রাখুন, ইথাইলিন গ্যাসের সংস্পর্শে এলে ফল নষ্ট হবেই।

ফ্রিজে রাখার আর একটি সমস্যা হল আর্দ্রতা। ফ্রিজের ভিতরে অনেক সময় অতিরিক্ত আর্দ্রতা জমে যায়, বিশেষ করে যদি ফল আগে ধুয়ে রাখা হয় বা প্লাস্টিকের থলিতে ভরা থাকে। এই আর্দ্র পরিবেশ ছত্রাকের জন্য আদর্শ। আবার ফ্রিজের বাইরে রাখলে হাওয়া চলাচল কম হলে একই সমস্যা দেখা দেয়।

ফল রাখার বাসনও গুরুত্বপূর্ণ

অনেকে ভাবেন, ফল রাখার বাসন খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু বাস্তবে বাসনের ধরন ফলের পচনের গতিকে অনেকটাই প্রভাবিত করে। বাটিতে ফল রেখে দিলে নিচের দিকের ফলগুলির উপর চাপ পড়ে। সেই ফলগুলি আগে নষ্ট হয়ে যায়। প্লাস্টিকের থলিতে রাখলে ভিতরে দ্রুত আর্দ্রতা জমে, যা ছত্রাক সংক্রমণ বাড়ায়। আবার একেবারে খোলা জায়গায় রাখলেও ধুলোবালি ও ব্যাক্টেরিয়ার ঝুঁকি থাকে।

ফল দ্রুত পচে যাওয়ার সাধারণ ভুলগুলো

ফল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই কিছু ছোট কিন্তু মারাত্মক ভুল করে থাকি—

প্রথমত, বাজার থেকে ফল এনে সঙ্গে সঙ্গেই জলে ধুয়ে ফেলা। পরিষ্কার করার উদ্দেশ্য ভালো হলেও এর ফলে ফলের খোসার উপর আর্দ্রতা আটকে যায়। এই আর্দ্রতাই ছত্রাকের বংশবিস্তার সহজ করে দেয়। ফল ধোয়া উচিত খাওয়ার ঠিক আগে।

দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে অনেক ফল রেখে দেওয়া এবং তার মধ্যে একটি নষ্ট হলেও সেটিকে আলাদা না করা। পচে যাওয়া একটি ফল থেকেই বিপুল পরিমাণ ইথাইলিন বেরোয়, যা আশপাশের সব ফলকে দ্রুত নষ্ট করে দেয়।

তৃতীয়ত, সব ধরনের ফল এক জায়গায় রাখা। কলা, আপেল, নাশপাতির সঙ্গে টকজাতীয় ফল রাখলে ক্ষতি অবশ্যম্ভাবী।

টকজাতীয় ফল সংরক্ষণের সঠিক উপায়

ফল দীর্ঘদিন ভালো রাখতে খুব বেশি প্রযুক্তি বা খরচের প্রয়োজন নেই। কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললেই বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব।

প্রথমেই বুঝে নিতে হবে, কোন ফল কোথায় রাখা উচিত। কলা, আপেল, নাশপাতির মতো বেশি ইথাইলিন নিঃসরণকারী ফল থেকে টকজাতীয় ফল দূরে রাখতে হবে। সম্ভব হলে আলাদা ঝুড়ি, আলাদা থলে বা একেবারে অন্য ঘরে রাখাই সবচেয়ে ভালো।

আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। টকজাতীয় ফল রাখার সময় নিচে খবরের কাগজ, পেপার টাওয়েল বা মোটা টিস্যু বিছিয়ে রাখা উচিত। এগুলি অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে নেয়। কয়েক দিন অন্তর সেই কাগজ বা কাপড় বদলে দিলে ফল আরও বেশি দিন সতেজ থাকে।

হাওয়া চলাচলের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। তাই বাটির বদলে ঝুড়ি বা মেশের থলে ব্যবহার করা ভালো। এতে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যেন ফলের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

ফ্রিজে রাখলে ফল সরাসরি ট্রেতে না রেখে কাগজ বা কাপড়ে মুড়ে রাখা ভালো। এতে আর্দ্রতা জমে ছত্রাক সংক্রমণের আশঙ্কা কমে।

অনেকে আবার সাইট্রাস জাতীয় ফলের উপর হালকা ভেজিটেবল অয়েল মেখে নেন। এতে ফলের খোসা দিয়ে ভিতরের আর্দ্রতা দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে না, ফলে ফল শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে। তবে তেল খুব সামান্য ব্যবহার করা উচিত।

পুষ্টিগুণ রক্ষার দিকটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

ফল শুধু স্বাদ বা তাজা থাকার জন্যই খাওয়া হয় না। এগুলির আসল মূল্য লুকিয়ে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে। ভুল সংরক্ষণে ফল দেখতে ভালো থাকলেও তার পুষ্টিগুণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন সি তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তনে খুব দ্রুত ভেঙে যায়। ফলে শীতকালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যে ফল খাওয়ার কথা, ভুল সংরক্ষণে তার উপকারই অনেকাংশে কমে যায়।

ফল সংরক্ষণ কোনও জটিল বিজ্ঞান নয়, আবার একেবারে অবহেলার বিষয়ও নয়—এই কথাটার গভীরতা আমরা অনেক সময় বুঝে উঠতে পারি না। দৈনন্দিন জীবনে ফল খাওয়াকে আমরা যতটা গুরুত্ব দিই, ফল রাখার পদ্ধতিকে তার চেয়ে অনেক কম গুরুত্ব দিয়ে থাকি। অথচ বাস্তব সত্য হল, ফল কী ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে শুধু ফল কত দিন ভালো থাকবে তা নয়, সেই ফল থেকে আমরা আদৌ কতটা পুষ্টিগুণ পাচ্ছি, সেটাও।

শীতকালে এই বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এই সময় আবহাওয়ার চরিত্র একেবারেই আলাদা। বাতাস শুষ্ক, তাপমাত্রা কম, অনেক বাড়িতেই জানলা-দরজা বন্ধ থাকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, ঠান্ডা থাকলে বুঝি সব কিছুই ভালো থাকবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শীতকাল ফল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু লুকোনো সমস্যাও নিয়ে আসে।


ফল সংরক্ষণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ফল মানেই শুধু স্বাদ নয়। ফল হল প্রাকৃতিক ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের অন্যতম প্রধান উৎস। প্রতিদিন একটি বা দুটি ফল খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা। কিন্তু যদি সেই ফলই ভুলভাবে সংরক্ষণ করা হয়, তা হলে ফল দেখতে ঠিক থাকলেও তার পুষ্টিগুণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ফল বাইরে থেকে টাটকা মনে হলেও ভিতরে ভিতরে তার কোষ ভেঙে যাচ্ছে। ভিটামিন সি-এর মতো সংবেদনশীল উপাদান খুব দ্রুত নষ্ট হয় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তারতম্যে। ফলে নিয়মিত ফল খাচ্ছেন ভেবে নিশ্চিন্ত হলেও শরীর আদৌ সেই উপকার পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।


শীতকালীন আবহাওয়া ও ফলের পচন

শীতের সময় বাতাসে আর্দ্রতা তুলনামূলক কম থাকে। আবার ঘরের ভিতরে বাতাস চলাচলও অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে ফলের খোসা দিয়ে ভিতরের আর্দ্রতা দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে কিছু ফল শুকিয়ে যায়, আবার কিছু ফলের খোসায় সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়। এই ফাটল দিয়েই অণুজীব ও ছত্রাক সহজে ঢুকে পড়ে।

news image
আরও খবর

শীতকালে আর একটি বড় সমস্যা হল—আমরা অনেক সময় বেশি পরিমাণে ফল কিনে রাখি। কারণ এই সময় কমলালেবু, মাল্টা, আঙুর, আপেলের মতো ফল সহজে পাওয়া যায় এবং দামও তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু একসঙ্গে অনেক ফল কিনে এনে যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা হয়, তা হলে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই অর্ধেক ফল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।


ইথাইলিন গ্যাস: না দেখেও যে ক্ষতি হয়

ফল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইথাইলিন গ্যাসের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি অথচ সবচেয়ে কম আলোচিত। ইথাইলিন হল এক ধরনের প্রাকৃতিক গ্যাস, যা অনেক ফল পাকানোর সময় নিজে থেকেই বের করে। কলা, আপেল, নাশপাতি, পেঁপে—এই ফলগুলি ইথাইলিন নিঃসরণে শীর্ষে।

সমস্যা হল, এই গ্যাস শুধু সেই ফলকেই পাকায় না, আশপাশে থাকা অন্য ফলের উপরও প্রভাব ফেলে। টকজাতীয় ফল যেমন কমলালেবু, লেবু, আঙুর নিজেরা খুব বেশি ইথাইলিন তৈরি না করলেও, এই গ্যাসের সংস্পর্শে এলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। খোসায় ছত্রাক পড়ে, রং বদলায়, ফল নরম হয়ে যায়।

অনেক বাড়িতেই দেখা যায়, রান্নাঘরের একটি ঝুড়িতে সব ফল একসঙ্গে রাখা। আবার ফ্রিজের একটি ট্রেতেও সব ধরনের ফলぎぎ詰 করে রাখা হয়। এই অভ্যাসটাই ফল নষ্ট হওয়ার অন্যতম বড় কারণ।


ফল ধোয়ার ভুল অভ্যাস

পরিচ্ছন্নতার কথা ভেবে আমরা অনেকেই বাজার থেকে ফল কিনে আনার পরই জলে ধুয়ে নিই। দেখতে পরিষ্কার লাগলেও এই অভ্যাস ফল সংরক্ষণের দিক থেকে সবচেয়ে বড় ভুলগুলির একটি।

ফল ধোয়ার পর যদি তা ভালোভাবে শুকানো না হয়, তা হলে খোসার উপর আর্দ্রতা আটকে থাকে। এই আর্দ্র পরিবেশ ছত্রাক ও ব্যাক্টেরিয়ার জন্য আদর্শ। বিশেষ করে শীতকালে, যখন বাতাস শুষ্ক হলেও ঘরের ভিতরে ফলের গায়ে জমে থাকা জল সহজে শুকোয় না।

ফলের সঠিক নিয়ম হল—খাওয়ার ঠিক আগে ধোয়া। সংরক্ষণের আগে নয়।


একটি নষ্ট ফল মানেই বিপদের শুরু

ফল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আর একটি সাধারণ কিন্তু মারাত্মক ভুল হল—একটি ফল নষ্ট হলেও সেটিকে আলাদা না করা। অনেক সময় ভাবা হয়, “একটু তো নষ্ট হয়েছে, পরে ফেলে দেব।” এই সামান্য অবহেলাই বাকি সব ফল নষ্ট করে দিতে পারে।

পচে যাওয়া ফল থেকে ইথাইলিন গ্যাস আরও বেশি বেরোয়। পাশাপাশি ছত্রাকের স্পোর ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ফলে। ফলে খুব দ্রুত পুরো ঝুড়ি বা ট্রের ফল একে একে নষ্ট হতে শুরু করে।


বাসনের ভূমিকা: যেখানে রাখা হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ

ফল রাখার বাসন অনেকেই গুরুত্ব দেন না। কিন্তু কোন বাসনে ফল রাখা হচ্ছে, তার উপর ফলের আয়ু অনেকটাই নির্ভর করে।

বাটিতে ফল রাখলে নিচের ফলগুলির উপর চাপ পড়ে। সেই ফলগুলি আগে নরম হয়ে যায় ও পচতে শুরু করে। প্লাস্টিকের থলিতে রাখলে ভিতরে বাতাস ঢুকতে পারে না, ফলে আর্দ্রতা জমে ছত্রাক সংক্রমণ দ্রুত হয়।

ঝুড়ি বা মেশের থলে ফল রাখার জন্য তুলনামূলক ভালো। এতে বাতাস চলাচল করতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ফল যেন বেশি গাদাগাদি করে না থাকে।


ফ্রিজে ফল রাখা: সুবিধা ও অসুবিধা

ফ্রিজে ফল রাখা নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা থাকে। কিছু ফল ফ্রিজে ভালো থাকে, আবার কিছু ফল ফ্রিজে রাখলে দ্রুত স্বাদ ও গুণ হারায়।

টকজাতীয় ফল অনেক সময় ফ্রিজে রাখা যায়, তবে সঠিকভাবে না রাখলে সমস্যা হয়। ফ্রিজের ভিতরে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই ফল সরাসরি ট্রেতে না রেখে কাগজ বা কাপড়ে মুড়ে রাখা ভালো।

আবার কলা বা খুব কাঁচা ফল ফ্রিজে রাখলে তাদের স্বাভাবিক পাকার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।


আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায়

ফল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুব বেশি আর্দ্রতা যেমন ছত্রাক ডেকে আনে, তেমনই খুব কম আর্দ্রতায় ফল শুকিয়ে যায়।

এই ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে সাধারণ কাগজ বা কাপড়। খবরের কাগজ, পেপার টাওয়েল, মোটা টিস্যু—এই সবই অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করতে পারে। ফল রাখার ঝুড়ির নিচে বা ট্রের ভিতরে এগুলি বিছিয়ে দিলে ফল অনেক বেশি দিন ভালো থাকে। কয়েক দিন অন্তর এই কাগজ বদলে নেওয়াও জরুরি।


ফল আলাদা করে রাখার অভ্যাস

সব ফল এক জায়গায় রাখার অভ্যাস ত্যাগ করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। ইথাইলিন নিঃসরণকারী ফল ও টকজাতীয় ফল আলাদা রাখতে হবে।

যদি জায়গার অভাব থাকে, তা হলেও অন্তত আলাদা থলে বা আলাদা বাটি ব্যবহার করা উচিত। সম্ভব হলে কলা, আপেল, নাশপাতি রান্নাঘরের এক প্রান্তে আর কমলালেবু, আঙুর অন্য প্রান্তে রাখা ভালো।


তেল মাখানোর ঘরোয়া কৌশল

অনেক বাড়িতে একটি পুরনো ঘরোয়া পদ্ধতি চালু আছে—সাইট্রাস জাতীয় ফলের খোসায় হালকা ভেজিটেবল অয়েল মাখিয়ে রাখা। এর উদ্দেশ্য হল, ফলের ভিতরের আর্দ্রতা যেন খুব দ্রুত বেরিয়ে না যায়।

এই পদ্ধতি কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করা উচিত নয়। খুব পাতলা স্তরেই কাজ হয়ে যায়। বেশি তেল মাখালে উল্টোভাবে ধুলো-ময়লা লেগে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।


পুষ্টিগুণ ধরে রাখাই আসল লক্ষ্য

শেষ পর্যন্ত ফল সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য শুধু পচন ঠেকানো নয়, পুষ্টিগুণ ধরে রাখা। ফল যত দিন ভালো থাকবে, তত দিন তার ভিটামিন ও খনিজ উপাদানও তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকবে।

ভুল সংরক্ষণে ফল দেখতে ঠিক থাকলেও ভিটামিন সি, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের পরিমাণ অনেক কমে যেতে পারে। ফলে শীতকালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর যে লক্ষ্য নিয়ে ফল খাওয়া, তা অনেকটাই ব্যর্থ হয়।


শেষ কথা

ফল সংরক্ষণ সত্যিই কোনও জটিল বিজ্ঞান নয়। আবার এটিকে অবহেলা করলে ক্ষতিটাও কম নয়। কখন ফল ধোবেন, কোথায় রাখবেন, কোন ফলের পাশে কোন ফল রাখা যাবে না—এই ছোট ছোট বিষয়গুলিই বড় ভূমিকা নেয়।

এই অভ্যাসগুলি মেনে চললে ফল অনেক বেশি দিন ভালো থাকবে, পচন কমবে, অপচয় কমবে। তার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—ফলের পুষ্টিগুণ অটুট থাকবে। শীতকালে ফল খাওয়ার আসল উপকার পেতে হলে সংরক্ষণের এই নিয়মগুলি মেনে চলাই নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

Preview image