নাগপুরে নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাত্র ২০ বলে ঝোড়ো ৪৪ রানের ইনিংস খেলেও তৃপ্ত নন রিঙ্কু সিংহ। দলের জয়ে অবদান রাখলেও নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না ভারতীয় এই ব্যাটার, আর সেই আফসোসই তাঁর মুখে স্পষ্ট।
নাগপুরের ভরা গ্যালারিতে ভারত বনাম নিউ জিল্যান্ড টি টোয়েন্টি ম্যাচে আবারও নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করলেন রিঙ্কু সিংহ। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলে ফেরার সুযোগ পেয়ে সেটিকে পুরোপুরি কাজে লাগালেন বাঁহাতি এই ব্যাটার। মাত্র ২০ বলে অপরাজিত ৪৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে ভারতকে ২৩৮ রানের বিশাল স্কোরে পৌঁছে দিলেন তিনি। ইনিংসের শেষ দিকে তাঁর ব্যাট থেকে বেরোনো আগ্রাসী শটগুলোই ম্যাচের রাশ পুরোপুরি ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। তবুও ম্যাচ শেষে রিঙ্কুর মুখে হাসির বদলে ছিল আফসোসের ছাপ। কারণ একটি ফেলে দেওয়া ক্যাচ তাঁকে মানসিক ভাবে এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
এই ম্যাচে রিঙ্কুর ব্যাটিং ছিল নিখুঁত পরিকল্পনার ফল। শুরুতে উইকেট পড়ছিল দ্রুত। টপ অর্ডার এবং মিডল অর্ডারের একাধিক ব্যাটার দ্রুত ফিরে যান প্যাভিলিয়নে। সেই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে খেলতে নামেন রিঙ্কু। শুরুতে অযথা ঝুঁকি না নিয়ে তিনি দৌড়ে রান নেওয়ার উপর জোর দেন। এক প্রান্ত আগলে রেখে ধীরে ধীরে ইনিংস গড়েন। তারপর শেষ ওভারগুলোতে নিজের স্বাভাবিক আগ্রাসী রূপে ধরা দেন। শেষ ওভারে একাই করেন ২১ রান। এই মুহূর্তেই প্রমাণ হয়, কেন তাঁকে ভারতের সেরা ফিনিশারদের একজন হিসেবে দেখা হয়।
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও নজর কাড়েন রিঙ্কু। বাউন্ডারিতে ঝাঁপিয়ে একাধিক নিশ্চিত চার বাঁচান তিনি। এমনকি একবার দুর্দান্ত লাফিয়ে এমন একটি বল ধরেন, যা সহজেই ছক্কা হতে পারত। মাঠে তাঁর ক্ষিপ্রতা এবং কমিটমেন্ট দর্শকদের পাশাপাশি সতীর্থদেরও মুগ্ধ করে। কিন্তু এই সব কিছুর মাঝেই ঘটে যায় একটি ভুল। একটি ক্যাচ হাতছাড়া করেন রিঙ্কু। সাধারণত যাঁর হাত থেকে ক্যাচ পড়তে খুব কমই দেখা যায়, সেই রিঙ্কুর জন্য এই ভুল সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
খেলা শেষে সেই হতাশাই ধরা পড়ে তাঁর কথায়। রিঙ্কু বলেন, শিশিরের জন্য কোনও সমস্যা হচ্ছিল না। আলো নিয়েও তেমন সমস্যা ছিল না। তার পরেও ক্যাচটা ধরতে না পারায় খুব খারাপ লাগছে। আফসোস হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন। এই কথার মধ্যেই বোঝা যায়, নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে তিনি কতটা আত্মসমালোচনামূলক। দলের জয়ে বড় ভূমিকা রাখার পরেও একটি ছোট ভুল তাঁকে মানসিক ভাবে নড়িয়ে দিয়েছে।
রিঙ্কুর এই মানসিকতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। তিনি শুধু নিজের ব্যাটিংয়ের জন্য নয়, বরং দলের জন্য প্রতিটি মুহূর্তে শতভাগ দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামেন। একজন ক্রিকেটারের কাছে এই আত্মদায়িত্ববোধই সবচেয়ে বড় গুণ। তাই একটি ক্যাচ ফেলাও তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি ভুল নয়, বরং দলের ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি করার সমান।
এই ম্যাচের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে দলে জায়গা পাননি রিঙ্কু। অনেকেই তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন তাঁকে নিয়মিত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে সুযোগ পাওয়ার পর নিউ জিল্যান্ড সিরিজে ফেরানো হয় তাঁকে। নাগপুরের ম্যাচেই তিনি বুঝিয়ে দেন, কেন তাঁকে দলে রাখা এতটা জরুরি। চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় ইনিংস শেষ করার ক্ষমতা ভারতের খুব কম ব্যাটারের মধ্যেই রয়েছে, আর রিঙ্কু সেই তালিকার শীর্ষে।
নিজের সুযোগ পাওয়া নিয়ে রিঙ্কু বলেন, ধারাবাহিক ভাবে সুযোগ পাচ্ছিলেন না তিনি। কিন্তু তবুও নিজেকে মানসিক এবং শারীরিক ভাবে তৈরি রেখেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সুযোগ এলে সেটাকে কাজে লাগাতেই হবে। এই ম্যাচে সেটাই করে দেখিয়েছেন তিনি। শুরুতে দৌড়ে রান নেওয়া, স্ট্রাইক রোটেট করা এবং শেষে বড় শট খেলা সব কিছুই ছিল পরিকল্পনার অংশ।
কোচ গৌতম গম্ভীরের উপর রিঙ্কুর ভরসার কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। রিঙ্কু জানান, গৌতম গম্ভীর সব সময় তাঁদের চালিয়ে খেলতে বলেন। পরিস্থিতি বুঝে আগ্রাসী হওয়ার স্বাধীনতা দেন। সেই নির্দেশ মেনেই তিনি খেলেছেন। বিশ্বকাপে সুযোগ পেলে একই মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামবেন বলেও জানান তিনি। কোচের উপর এই আস্থা এবং কোচের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার মানসিকতা রিঙ্কুর পেশাদারিত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয়।
ম্যাচের শেষ দিকে অর্শদীপ সিংহের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় নিয়মিত উইকেট পড়ছিল। রান তোলার গতি বজায় রাখা সহজ ছিল না। রিঙ্কু জানান, তিনি অর্শদীপকে বারবার বলছিলেন সিঙ্গল নিয়ে তাঁকে স্ট্রাইক দিতে। যদিও সব সময় সেটা সম্ভব হয়নি, তবুও পরিকল্পনা ছিল শেষ ওভার তিনি নিজেই খেলবেন। কারণ দলের মধ্যে তাঁর ভূমিকা সেটাই। পাঁচ ছয় বা সাত নম্বরে নামা মানেই শেষ পর্যন্ত ইনিংস টেনে নিয়ে যাওয়া এবং রান তোলা। সেই দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন।
এই ম্যাচেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ভারতের বিশ্বকাপ দলে রিঙ্কু সিংহ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যাটিং নয়, ফিল্ডিং এবং মানসিক দৃঢ়তার দিক থেকেও তিনি দলের বড় শক্তি। কোচ গম্ভীরের ভরসার দাম তিনি ব্যাট হাতে দিয়ে দিয়েছেন। এই পারফরম্যান্সের পর বিশ্বকাপে ভারতের প্রথম একাদশে তাঁর জায়গা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।
তবুও রিঙ্কু নিজে আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে রাজি নন। একটি ক্যাচ ফেলে দেওয়ার আফসোস তাঁর মনে বারবার ঘুরছে। এই আফসোসই হয়তো তাঁকে আরও ভালো খেলোয়াড় করে তুলবে। কারণ যে খেলোয়াড় নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেয় এবং নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করে, সেই খেলোয়াড়ই দীর্ঘদিন দলের সম্পদ হয়ে ওঠে।
নাগপুরের এই ম্যাচ রিঙ্কু সিংহের কেরিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। ব্যাট হাতে ম্যাচ ফিনিশ করা, ফিল্ডিংয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং ম্যাচ শেষে নিজের ভুল স্বীকার করা সব মিলিয়ে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, কেন তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যতের অন্যতম ভরসা। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে যদি সুযোগ পান, তবে এই মানসিকতা এবং আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামবেন রিঙ্কু। আর তখন হয়তো তাঁর ব্যাট এবং ফিল্ডিং দুটোই ভারতের জয়ের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠবে।
রিঙ্কুর ক্যারিয়ারের পূর্ব ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে দলে না থাকলেও তিনি ধারাবাহিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতেন। প্রতিটি অনুশীলন, প্রতিটি ম্যাচে মনোযোগ এবং সতর্কতা সবই তাঁর খেলার মান বাড়িয়েছে। দলের কোচ এবং সিনিয়র খেলোয়াড়রা জানেন, রিঙ্কু যেখানেই থাকুক, তিনি সর্বদা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
তিনি শুধু ব্যাটসম্যান নয়, একজন টিম প্লেয়ার। অন্য ব্যাটারদের সঙ্গে সমন্বয়, স্ট্রাইক ভাগাভাগি এবং দলীয় কৌশল মেনে খেলা সবকিছুই তিনি দক্ষতার সঙ্গে করেন। শেষ ওভারগুলোতে তিনি সব সময় দায়িত্ব নিয়ে খেলেন, এমনকি যদি পরিস্থিতি চাপের হয়। এই ধরনের দায়িত্ববোধ এবং আত্মবিশ্বাস তাঁকে ভারতের টি টোয়েন্টি দলে অপরিহার্য করেছে।
রিঙ্কুর মানসিকতা এবং পারফরম্যান্স ভারতের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তিনি ইতিমধ্যেই নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছেন। দলের জন্য সর্বোচ্চ দেয়ার মানসিকতা, ব্যাটিংয়ে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং ফিল্ডিংয়ে সতর্কতা সবই তাঁকে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নাগপুরের ম্যাচ শুধু তাঁর পারফরম্যান্সের উদাহরণ নয়, এটি দেখিয়েছে যে রিঙ্কু সিংহ কতটা দায়িত্বশীল, কতটা মানসিকভাবে দৃঢ় এবং কতটা অভিজ্ঞ। দলকে জিতাতে পারা, নিজের ভুল থেকে শেখা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকা এই গুণগুলো তাঁকে ভারতের ক্রিকেটের জন্য এক অপরিহার্য খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
রিঙ্কু সিংহের এই ম্যাচের পারফরম্যান্স ভারতের প্রথম একাদশে তাঁর অবস্থানকে প্রায় নিশ্চিত করেছে। বিশ্বকাপে তিনি যদি সুযোগ পান, তবে তাঁর আত্মবিশ্বাস, কৌশল এবং দৃঢ় মনোভাব ভারতকে জয় এনে দিতে সক্ষম হবে। ব্যাটিংয়ে ঝুঁকি নেওয়া, ফিল্ডিংয়ে সতর্কতা এবং মানসিক দৃঢ়তা সবই মিলিয়ে তিনি ভারতের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন।
এই ম্যাচের মাধ্যমে রিঙ্কু প্রমাণ করেছেন যে তিনি ভারতের বিশ্বকাপ দলে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোচের ওপর ভরসা, নিজের দক্ষতা এবং মানসিক দৃঢ়তার সমন্বয় তাঁকে দলীয় দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী করে তুলেছে। তাঁর স্থিতিশীলতা, পরিকল্পনা এবং আত্মবিশ্বাস বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ভারতের প্রথম একাদশে থাকা প্রায় নিশ্চিত করেছে। তিনি যে দলের জন্য নির্ভরযোগ্য, তা এই ম্যাচে প্রতিটি মুহূর্তে প্রমাণ করেছেন।
রিঙ্কু সিংহের এই অবদান শুধু সংখ্যার মাধ্যমে নয়, মানসিক প্রভাব এবং দলে প্রেরণা হিসেবে আরও বড়ভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। দলের অন্যান্য খেলোয়াড়রা তাঁর খেলায় অনুপ্রাণিত হচ্ছে, কোচের ভরসা আরও দৃঢ় হচ্ছে, এবং সমর্থকদের আস্থা আরও বাড়ছে। বিশ্বকাপে ভারতের প্রথম একাদশে তাঁর জায়গা প্রায় নিশ্চিত, এবং এই ম্যাচের পারফরম্যান্স সেই সিদ্ধান্তকে আরও শক্তিশালী করেছে।